মাদ্রিদের এক রাজার গল্প

মাদ্রিদের এক রাজার গল্প

“ There was a time when the best players of the world wanted to shine in Madrid. It began in 2000 with Florentino Perez as president of Real Madrid.

“ হ্যা, ঠিক ই ধরেছেন। বলছি সেই লস গ্যালাক্টিকোস যুগের কথা। যখন এক ঝাঁক বিশ্বসেরা প্লেয়ারের খেলা দেখার জন্য যখন সমস্ত দুনিয়া মুখিয়ে থাকতো তখনকার সময়ের কথা। সেই স্বর্ণযুগের কথা যেখানে রিয়াল মাদ্রিদ মানেই ছিল ব্যালন ডি’ অর জয়ী খেলোয়াড়দের আকাশচুম্বী আকাংখা। বহু ফুটবল সমর্থকের ড্রিম টীম ছিল সেটা। যাদের একসাথে খেলতে দেখা মানে আকাশের সকল নক্ষত্র কে একসঙ্গে পথ চলতে দেখা। আর সেটা সম্ভব করেছিলেন মাদ্রিদের প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ। এভাবেই সমর্থকদের মুখে তারা প্রচলিত হয় গ্যালাক্টিকোস নামে। তাই আজ থেকে শুরু করতে যাচ্ছি লস গ্যালাক্টিকোস প্রোজেক্ট যেখানে গ্যালাক্টিকোস এর সকল খেলোয়াড় কে নিয়ে থাকবে তাদের আলাদা আলাদা জীবনগাথা। আচ্ছা কাকে দিয়ে শুরু করা যায় বলুন তো? রোনালদো লিমা নাকি জিদান? ডেভিড বেকহাম নাকি লুইস ফিগো? আচ্ছা চলুন আজ শুরু করি লম্বা চুলের এক স্প্যানিশ হিরো কে নিয়ে। কি, চিনতে পারলেন না বুঝি? আচ্ছা নামটা এখন না বলি। আগে গল্প টা শুরু করি। পরে আপনারাই বুঝে যাবেন। আমাদের নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এতলেটিকো মাদ্রিদ কে এখন অনেকেই চিনে। অথচ এই ক্লাবটির আগে তেমন কোন নাম গন্ধই ছিল না সারা ফুটবল দুনিয়ায়। তো একবার হল কি, ক্লাবের টাকা পয়সার অভাব পড়ল হঠাত করেই। বুঝতেই পারছেন তাহলে কেমন ছিল তাদের অবস্থা। এখন অভাব যেহেতু পড়েছে সেটাকে তো সামাল দিতে হবে। কি করা যায়? ক্লাবের প্রেসিডেন্ট জেসাস গিল অনেক ভেবে চিন্তে সমাধানে আসলেন। সেটা হল তাদের ক্লাবের যে ইউথ একাডেমি আছে সেটা বন্ধ করে দিবেন। এতে তাদের বেশ কিছু টাকা সেভ হবে এবং অর্থাভাব কাটিয়ে উঠতে পারবেন। সাথে প্লেয়ারগুলো কে বেঁচে আলাদা কিছু টাকাও যোগ হবে। তো সেবারের এতলেটিকোর ইয়ুথ টীমে বেশ কয়েকটি প্রতিভাবান প্লেয়ার ছিল। যাদের মাঝে ১৭ বছর বয়সী রাউল গঞ্জালেজ ব্লাঙ্কো অন্যতম। এই যাহ, বলে দিলাম নাম টা। এবার আশা করি চিনতে কষ্ট হবে না। কথায় আছে আল্লাহ্‌ যা করেন ভালোর জন্যই করেন। তারই ফলস্বরূপ নগর প্রতিদ্বন্দ্বী রিয়াল মাদ্রিদ কোন অপেক্ষা না করেই কিনে ফেলে এতলেটিকো মাদ্রিদের সেই ইয়ুথ টীমের ছেলেটাকে। কিন্তু তখন এতলেটিকো মাদ্রিদ ও বুঝতে পারে নি তারা কি হারাচ্ছে আর রিয়াল মাদ্রিদ কল্পনাও করে নি তারা আসলে কোন এক হীরের টুকরো পেয়েছে। এভাবেই শুরু হয়েছিলো লা লীগার ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ খেলোয়াড় ও রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য এক লিজেন্ড রাউল গঞ্জালেজ এর গল্প টা।

২৭ জুন, ১৯৭৭ মাদ্রিদের প্রতিবেশী শহর সান ক্রিস্টোবাল দে লস এঞ্জেলস এ জন্ম নেন রাউল। ফুটবলের হাতেখড়ি টা হয়েছিলো স্থানীয় ক্লাব সিডি সান ক্রিস্টোবাল দে লস এঞ্জেলস এই। তবে এতলেটিকো মাদ্রিদে যোগ দিয়েছিলেন বাবার ইচ্ছায়। এতলেটিকোর ফ্যান হিসেবে অনেকটা বাবার স্বপ্ন পূরণের জন্যই সেখানে পদার্পণ তার। নিজেকে যে নিয়ে যেতে পারবেন অনন্য এক উচ্চতায় তার আভাস দিয়েছিলেন এতলেটিকো মাদ্রিদেই। তাদের ইয়ুথ টীমের হয়ে করেছিলেন ৬৫ গোল। এরপরের গল্প টা আগেই বলে ফেলেছি। তো ১৯৯২-১৯৯৩ সিজনে মাদ্রিদের ইয়ুথ টীমে তাকে প্রথম আনা হয়। এরপর জুভেনাইল এ, জুভেনাইল বি সহ মাদ্রিদের বিভিন্ন ইয়ুথ স্তরে রাউল খেলেন এবং ১৯৯৪ এর অক্টোবর এ কোচ জর্জ ভালদানোর অধীনে মাত্র ১৭ বছর ৪ মাস বয়সে রিয়াল মাদ্রিদের প্রধান দলে পদার্পণ করেন এবং এক রেকর্ড গড়ে বসেন। তিনি ছিলেন তখন পর্যন্ত রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে মেইন টীমে খেলা সর্ব কনিষ্ঠ প্লেয়ার। ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার লিকলিকে গড়নের এক প্লেয়ার সেবার মূল দলে যোগ দিয়েই সবার নজড় কেড়ে নেন। প্রথম সিজনে ২৮ ম্যাচ খেলেই করেন ৯ গোল আর জিতে নেন রিয়াল মাদ্রিদ এর হয়ে প্রথম লীগ শিরোপা। তবে নজড়টা কেড়েছিলেন ২য় ম্যাচেই। কিভাবে? মাদ্রিদের জার্সি গায়ে প্রথম গোলই যে করেছিলেন নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এবং নিজের প্রাক্তন ক্লাব এতলেটিকো মাদ্রিদের বিপক্ষে। এরপর আর কি? শুরু করলেন ইতিহাসের পাতায় নতুন এক অধ্যায়ের। কত রেকর্ড ই না করেছেন, কত রেকর্ড ই না ভেঙেছেন। চলুন কয়েকটি জেনে নেয়া যাক সেগুলোর মাঝে। হয়েছেন স্যার আলফ্রেড ডি স্টেফানো কে টপকে রিয়াল মাদ্রিদের সর্বচ্চ গোলদাতা। যদিও এখন তা ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর দখলে। রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে সাদা জার্সি পড়ে মাঠে নেমেছেন ৭৪১ টি ম্যাচে। আর তারই সাথে করে ফেলেছেন মাদ্রিদের জার্সি তে সর্বাধিক ম্যাচ খেলা প্লেয়ারের রেকর্ড। করেছেন প্রথম প্লেয়ার হিসেবে আলাদা দুই চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালে গোল যাতে পরে স্যামুয়েল ইতো এবং লিওনেল মেসি ভাগ বসিয়েছেন। ছিলেন চ্যাম্পিয়নস লীগের ইতিহাসের সর্বাধিক গোলদাতা যেখানে পরে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং লিওনেল মেসি তাকে ছাড়িয়ে গেছেন। এছাড়াও ক্যাপ্টেন হিসেবে রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে এবং চ্যাম্পিয়নস লীগের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশী ম্যাচ খেলা প্লেয়ার ও রাউল। আরো একটি অনন্য রেকর্ড হল তার ১৭ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারে কখনও লাল কার্ড দেখেন নি। এখন পর্যন্ত স্পেনের জাতীয় দলের হয়ে ২য় সর্বাধিক গোলদাতা তিনি। সকল ধরনের ইউরোপিয়ান ফুটবল প্রতিযোগিতায় সর্বাধিক ম্যাচে অংশগ্রহণকারী প্লেয়ার হিসেবে এখনও অক্ষুণ্ণ রেখেছেন নিজের রেকর্ড। এরকম আরও কত রেকর্ড যে রয়েছে তার নামের পাশে তা আমরা নিজেও জানি না। পেশাগত দিক দিয়ে তিনি একজন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হলেও খেলতে পারতেন সামনের যেকোন জায়গায়। ছিলেন একজন অসাধারণ গোল স্কোরার এবং তার সময়ের অন্যতম কন্সিস্টেন্স প্লেয়ার। দলের প্রয়োজনে কখনও করেছেন গোল কিংবা কখনও তা বানিয়ে দিয়েছেন। তার খেলার মাঝে অন্যরকম এক ক্রিয়েটিভিটি ছিল। বাম পায়ের জাদু তে মাতিয়েছেন সারা দুনিয়া কে। অসাধারণ বল কন্ট্রোল আর দুর্দান্ত ওয়ার্করেট থাকায় তাকে মাঠের অন্যতম প্রধান প্লেয়ার হিসেবেই গণ্য করা হত। বল আকাশে বলুন আর মাটিতে, সবখানেই রাউল ছিলেন পারদর্শী। তবে নিজেকে তিনি সকলের কাছে ফুটিয়ে তুলেছেন একজন আদর্শ লিডার ও ফেয়ার প্লেয়ারের মডেলে। তবে খুব প্রতিভা সম্পন্ন প্লেয়ার কখনওই ছিলেন না রাউল। নিজের অক্লান্ত পরিশ্রম আর ফুটবলের প্রতি অকৃত্রিম প্যাশন থেকেই নিজেকে তুলে এনেছেন ইতিহাসের পাতায়।

Image result for raul gonjales

তাকে নিয়ে রিয়াল মাদ্রিদের প্রাক্তন আর্জেন্টাইন কোচ জর্জ ভালদানো বলেছিলেন, “He plays like an angel. Chases everything that moves. Rests only when he has achieved his goal: winning. His pride comes from his desire to win, from giant challenges, he has an extra gene, he is a winner. He is Raúl.” টীমমেট মিচেল সালগাদো রাউল কে নিয়ে বলেছেন, “Raul is the soul of Real Madrid.” আরেক সতীর্থ এবং বর্তমান রিয়াল মাদ্রিদ কোচ জিনেদিন জিদান রাউল কে নিয়ে বলেছেন, “He is a role model for anyone who sets foot on the field of play.” রিয়াল মাদ্রিদ প্রেসিডেন্ট ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ রাউল কে নিয়ে বলেছেন, “Dear Raul, wherever you may go and wherever you may play, the Real Madrid shirt is and always be your shirt, the crest is and always will be your crest, the fans will and always will be your fans and this Santiago Bernabeu is and always will be your home.” রিয়াল মাদ্রিদ লিজেন্ড স্যার আলফ্রেড ডি স্টেফানো রাউল কে নিয়ে বলেছেন, “Raul does something that few players dare to try: he walks into a stadium with 100,000 people watching him and he plays as if he was playing in his neighborhood.”

Image result for raul gonjales

নিজের পেশাদারী জীবনের সিংহভাগ কাটিয়েছেন লস ব্লাঙ্কোসদের জার্সি গায়ে। মাদ্রিদের প্রতি যদি আবেগ আর ভালোবাসার দৃষ্টান্ত দেখতে চান তো তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ এই রাউল। চার পুত্র ও এক কন্যা সন্তানের জনক রাউল বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন ১৯৯৯ সালে মামেন সানজ এর সাথে। বউ এর প্রতি ভালোবাসার উদাহরণ সরূপ প্রতি গোলের পর ই নিজের ডান হাতে বউ এর দেয়া আংটি চুমু খেয়ে গোল উদযাপন করতেন রাউল। এছাড়াও ন্যু ক্যাম্পের ক্যালমা সেলিব্রেশন এর জনক ও এই রাউল গঞ্জালেস। ছোটবেলায় যখন ফুটবল খেলা দেখতাম তখন কিছুই বুঝতাম না। বাবা-চাচাদের সাথে খেলা দেখার সময় প্রায়ই বলতে শুনতাম মাদ্রিদ গোল করেছে। আমার ছোটচাচার অনেক পছন্দের প্লেয়ার ছিল রাউল আর তার চেহারার সাথেও কিভাবে যেন মিল ছিল রাউলের। বিশেষ করে চুলের কাটিং এ। প্রায়ই সে আমাকে গল্প শুনাতো। কখন কাকে কিভাবে মন থেকে ভালো লাগবে তা কেওই বলতে পারে না। রিয়ালের জার্সি গায়ে রাউল নামক ৭ নাম্বার জার্সি পড়া ওই প্লেয়ারের প্রতি ভালোলাগার তৈরিটা সেখান থেকেই। তাইতো ছোটবেলায় রাউল মাদ্রিদ রাউল মাদ্রিদ বলে চিল্লিয়ে বেড়িয়েছি কত। শুধু আমি নই, আমার মত লাখো লাখো মানুষ তখন রিয়াল মাদ্রিদ কে রাউল মাদ্রিদ নামেই ডাকতো। এতোটাই পরিচিতি ছিল তার তখনকার ফুটবল জগতে যে ইতিহাসের সেরা ক্লাবটির নামও তার নামের সাথে মিলিয়ে নিয়েছিলেন। ওই লোগোটির প্রতি যে ভালোবাসা, আবেগ আর প্রতিশ্রুতি রাউল দেখিয়ে গেছেন তা আজও হাজারো মাদ্রিদিস্তার মনে গেথে রয়েছে। তার অবদান আর ডেডিকেশনের গল্প লিখে শেষ করা সম্ভব নয়। এখনও অনেক বৃদ্ধা-বৃদ্ধি কে দেখা যায় সাদা জার্সি গায়ে বারনাব্যু তে বসে খেলা দেখতে। যদি কোনদিন সুযোগ হয় আপনার আমার জীবনে তো তাদের কাছে বসে পড়বেন রাউলের গল্প শুনতে। আজও তারা মাদ্রিদের মাঠে সবুজ ঘাসের আড়ালে ৭ নাম্বার জার্সি তে রাউল কে খুজে বেড়ান। যেদিন শেষবারের মত সাদা জার্সি পড়ে মাঠে নেমেছিলেন সেদিন মানুষের আর্তনাদের ঢল নেমেছিলো ওই সান্টিয়াগো বারনাব্যু তে। হলুদ জার্সি পড়া ওই লাইন্সম্যান ও সেদিন কেঁদেছিল রাউল কে জড়িয়ে। এতোটা আনুগত্য, এতোটা সম্মান আর কয়জনের কপালে থাকে বলুন? কয়জনই বা এতোটা ভালোবাসা অর্জন করে নিতে পারে? হাজারো প্লেয়ার আসবে ওই ব্লাঙ্কোসদের জার্সি পড়ে মাঠ মাতাতে। কয়জন কে আমরা মনে রাখতে পারবো? তবে ওই রাউল কে সবাই মনে রেখেছে এবং রাখবে। মরে গেলেও সে জীবিত থাকবে ওই বারনাব্যুর মাটিতে, রিয়াল মাদ্রিদের ইতিহাসে আর কোটি কোটি মাদ্রিদিস্তার ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে। তারই এক উক্তি দিয়ে আজ শেষ করতে চাই রাউল গঞ্জালেস অধ্যায়। “I would like to tell the fans that in every run, every tackles I have given everything. I have always given 100% for this club. My heart will always be with Madrid. Real Madrid is my life and my home.” ভালোবাসি রিয়াল মাদ্রিদ কে, ভালোবাসি ওই রাউল মাদ্রিদ কে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন