জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান

জিনেদিন ইয়াজিদ জিদান

জিনেদিন জিদান ওরফে জিজু কে চেনে না এমন ফুটবলার মনে হয়না ফুটবল জগতে আছে। তার মত সম্পূর্ণ খেলোয়াড় যে খুব কমই এসেছে ফুটবল এর ইতিহাসে। এখনও অনেক প্লেয়ারকেই দেখা যায় যাদের আইডল হল এই জিজু। তাই আজ আমি আপনাদের এই জিজুর গল্প বলব। গল্প বললে অবশ্য ভুলই হবে। আমরা তো শুধু ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপ জয়ী আর রিয়াল মাদ্রিদ এর প্রান জিজু কে চিনি। কিন্তু তার জীবনী আসলে কয়জন জানি? তার রোমাঞ্চে ভরা ওই জিবনের সবকিছু বলার জন্যই আজ লিখতে বসা। তবে একটা কথা আগেই বলি। আমার দৃঢ় বিশ্বাস, পোষ্ট টা পড়ার পর অনেকেই শুধু অবাক না নির্বাক, ত্রিবাক অনেক কিছুই হবেন।

জিনেদিন ইয়াজিদ জিদানে তার আসল নাম। অবাক হলেন নামটা পড়ে? হ্যা ঠিকই পড়েছেন। জিদান ধর্মে মুসলমান। তবে সে কথায় পরে আসছি। তার ডাকনাম জিজু। জুনের ২৩ তারিখ ১৯৭২ এ ফ্রান্সের দক্ষিন এলাকা মার্সেই এর লা ক্যাস্টেলানে তে জন্মগ্রহণ করেন জিজু। তার বাবা ইসমাইল এবং মা মালিকা ১৯৫৩ সালে আলজেরিয়ান যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই প্যারিস এ চলে আসেন। তাই বলা যায় জিদান আলজেরিয়ান বংশভুত এবং তার গোত্র ছিল ক্যাবেলে বেরবের। প্রথমে তারা প্যারিস এ মাইগ্রেট করলেও পরে ১৯৬০ এর মাঝামাঝি তে তারা মার্সেই তে চলে আসে। ৫ ভাইবোনের ভেতর জিদান ছিলেন সবার ছোট। তার বাবা ছিলেন একটি দোকানের রাত্রি প্রহরী । আর মা ছিলেন গৃহিণী। ছোটবেলায় প্রতিবেশীদের সাথে ফুটবলে মগ্ন থাকতেন জিদান। তবে একজন প্লেয়ার হিসেবে স্বীকৃতি পান মাত্র ১০ বছর বয়সে যখন সে তার এলাকা ক্যাস্টেলান এর স্থানীয় ক্লাব ইউ এস সেইন্ট হেনরিতে জুনিয়র টীমে যোগ দেন। সেখানে দেড় বছর কাটানোর পর এস ও সেপ্টেমেস লেস ভালোনস নামক এক ক্লাবের ম্যানেজার রবার্ট সেন্টেনিরোর চোখে পড়েন এবং সেখানে তাকে আনা হয়। ১৪ বছর বয়স পর্যন্ত এই ক্লাবেই অবস্থান করেন জিদান।


এরপরই আসে তার জিবনের মোড় ঘুরে যাওয়ার মুহূর্ত। ৩ দিনের একটি ট্রেনিং ক্যাম্পে ডাক পান তিনি যেখানে বড় বড় ক্লাবের স্কাউটরা থাকবেন। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের আয়োজন করা হয় ফ্রান্স জাতীয় ফুটবল কমিটির আন্ডারে। আর সেখানেই তিনি নজরে পড়েন এ এস কান এর স্কাউট এবং সেই ক্লাবেরই পুরানো প্লেয়ার জিন ভারাউড এর চোখে। এরপর জিদান সেখানে ৬ সপ্তাহের জন্য যান কারন তখনও তিনি মনঃস্থির করতে পারেন নাই যে সেখানে থিতু হবেন কিনা। পরে সেখানেই যোগ দেন এবং ৪ বছর কাটান। কান এ যখন যোগ দেন তখন ক্লাবের ডিরেক্টর জিন ক্লদিও এলিনেও তাকে প্রস্তাব দেন ডরমিটরি ছেড়ে তার পরিবারের সাথে এসে থাকার জন্য। কেননা তখন জিদান কে ডরমিটরিতে আরও ২০ জনের সাথে শেয়ার করে থাকতে হত। আর তাছাড়া ওই প্রথম সে তার পরিবার সে ছেড়ে বাইরে থাকতে এসেছিল যা যেকোনো ছেলেরে জন্যই অনেক কষ্টের। পরে জিদান সেই প্রস্তাব এ রাজি হন এবং সেখানেই থাকতে শুরু করেন। এই কান এই জিদানের প্রথম কোচ খেয়াল করেন যে সে অনেক বুদ্ধিমান এবং যোগ্যতা সম্পন্ন প্লেয়ার। কিন্তু তার ভেতর ছোট থেকেই রাগ একটু বেশী ছিল। ক্লাবে যোগদানের প্রথম সপ্তাহেই সে এক অপনেন্ট প্লেয়ার কে ঘুষি মারেন তার বর্ণ নিয়ে বাজে কথা বলার জন্য। তাই কোচ তাকে রাগ কমিয়ে তার নিজের খেলায় মনোযোগ দিতে উদ্বুদ্ধ করেন। জিদান কান এর হয়ে তার পেশাদারী জিবনের প্রথম ম্যাচ খেলেন ১৮ই মে, ১৯৮৯ এ নান্টেস এর বিপক্ষে ফ্রান্স ডিভিশান ওয়ান এ। সবাইকে তাক লাগিয়ে দেন জিদান কারন এই ম্যাচ খেলার সময় তার বয়স ছিল মাত্র ১৭। এরপর আর পিছনে ফিরে তাকাতে হয়নি তাকে। সেখানে পাকপাকি ভাবে জায়গা করে নেন। কান এর হয়ে প্রথম গোল টি করেন ৮ ফেব্রুয়ারি, ১৯৯১ এ। ক্লাবের চেয়ারম্যান অ্যালাইন পেড্রেত্তি এই ম্যাচ এর পর জিদান কে একটি গাড়ি উপহার দেন কারন তিনি বলেছিলেন জিদান যেদিন প্রথম গোল করবেন সেদিন তাকে একটি উপহার দেয়া হবে। কান এ জিদানের দ্বিতীয় সিজন ততোটা আশাপ্রদ ছিলোনা। কিন্তু খেলোয়াড়ি জীবনের বাইরে এ সময়েই তার জীবন সঙ্গিনী স্প্যানিশ নৃত্যশিল্পী ভেরোনিকার সাথে জিদানের প্রথম দেখা হয়। ১৯৯২-১৯৯৩ সিজনে জিদান এফসি জাইরোন্ডিন্স দ্যা বোরডোও এ যোগ দেন। ৪ বছর তিনি এই ক্লাবে কাটান। এর মাঝে তিনি ১৯৯৫ সালের ইন্টারটোটো কাপ জয় করেন এবং ১৯৯৬ এর উয়েফা কাপে দ্বিতীয় স্থান দখল করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। বোরডোও তে খেলার সময়েই প্রথম বিজেন্তে লিজারাজু এবং ক্রিস্টোফার ডুগারির সাথে তিনি মিডফিল্ড এ একসাথে খেলেন। পরবর্তিতে এই মিডফিল্ডারত্রয়ী ফ্রান্স জাতীয় দলেও একসাথে খেলেন এবং ১৯৯৮ সালের ফুটবল বিশ্বকাপ জয়ে অসামান্য ভুমিকা রাখেন।

১৯৯৬ সালে জিদান ৩.৫ মিলিয়ন ইউরোর ট্রান্সফার ফির বিনিময়ে ইতালিয়ান জায়ান্ট জুভেন্টাসে যোগ দেন। মূলত বোরডোও এর অসাধারণ পারফর্মেন্স আর ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে আলো ছড়ানোর কারনেই তাকে জুভেন্টাসে আনা হয়। তবে এখানে এসে জিদান যেন তার আসল রূপ ফিরে পায়। এসেই ১৯৯৬-১৯৯৭ সিজনে তিনি সিরিয়া এ জয় করেন। তবে ১৯৯৭ এর চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনাল এ জার্মান ক্লাব বরুশিয়া ডরটমুন্ড এর কাছে ৩-১ এ হেরে যায় তার দল। ৩২ ম্যাচে ৭ গোল করে জুভেন্টাস কে আবার লীগ জেতান ১৯৯৭-১৯৯৮ সিজনে। তবে এবার বাধ সাধে স্প্যানিশ জায়ান্ট রিয়াল মাদ্রিদ। টানা তৃতীয়বারের মত ফাইনালে উঠে জুভেন্টাস রিয়াল মাদ্রিদ এর কাছে ১-০ তে হেরে যায়। তবে ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে অসাধারণ পারফর্মেন্স আর ক্লাবের লীগ জয়ের অন্যতম কারিগর হবার কারনে তাকে ১৯৯৮ এর ফিফা বর্ষসেরা প্লেয়ার হিসেবে ঘোষণা করা হয় এবং তিনি ফিফা ব্যালন ডি অর পুরষ্কার পান। ২০০০-২০০১ সিজনে জুভেন্টাস লীগ ২য় স্থানে থেকে শেষ করে কিন্তু চ্যাম্পিয়ন্স লীগ এ গ্রুপ পর্বেই বাদ পড়ে। এর পিছনে অবশ্য জিদান কে দোষারোপ করা হয়। কারন এর আগেই তিনি হামবারগ এস ভি এর এক প্লেয়ার কে মাথা দিয়ে আঘাত করার তাকে ব্যান করা হয়। ফলে বছর টা খারাপ ই যাচ্ছিলো জিদান এর। কিন্তু বিধাতা মনে হয়ে তাকে আরও অনেক কিছু দিতে চেয়েছিলেন। ফলশ্রুতিতে ২০০১ এ রেকর্ড ৭৫ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে জিদান রিয়াল মাদ্রিদ ওরফে গ্যালাকটিকোসদের একজন হিসেবে যোগ দেন ৪ বছর এর চুক্তি তে। রিয়াল মাদ্রিদ এর সেই স্বর্ণযুগের এক অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হন জিদান। প্রথম মৌসুম এই এক রেকর্ড গড়ে বসেন জিদান। ২০০২ এর চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল এ লেভারকুসন এর বিপক্ষে এক ম্যাচ উইনিং গোল করেন জিদান। কার্লোস এর একটা ক্রস বল কে উড়ন্ত অবস্থায় উইক ফুট দিয়ে আশ্চর্য রকমের এক ভলি শট করেন জিদান। তার এই গোল কে চ্যাম্পিয়নস লীগ ফাইনাল এর ইতিহাসে সেরা গোল হিসেবে হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এই বছর তিনি আবার ফিফা বর্ষসেরা প্লেয়ার এর জন্য মনোনীত হন। ২০০২-২০০৩ সিজনে জিদান এবং ফিগোর মিডফিল্ড জুটির খেলায় দর্শকরা মুগ্ধ হন এবং এই সিজনে রিয়াল মাদ্রিদ লীগ জয় করে। ২০০৪ এ ফ্যানদের ভোটে বিগত ৫০ বছরের শ্রেষ্ঠ ইউরোপিয়ান ফুটবলার হিসেবে মনোনীত হন। জিদান মাদ্রিদ এ তার প্রথম হ্যাট্রিক করেন ২০০৬ এর জানুয়ারি তে সেভিয়ার বিপক্ষে যেখানে মাদ্রিদ ৪-২ এ জয় পায়। ২০০৫-২০০৬ সিজন শেষ করেন ২য় সর্বাধিক গোল স্কোরার এবং অ্যাসিস্ট স্কোরার হিসেবে ৯ গোল এবং ১০ অ্যাসিস্ট করে ২৮ টি ম্যাচ খেলে। ২০০৬ সালের ৭ মে সান্টিয়াগো বার্নাবু স্টেডিয়ামে রিয়াল মাদ্রিদের জার্সি গায়ে জিদান তার শেষ ম্যাচটি খেলেন। কালজয়ী এই খেলোয়াড়ের সম্মানে সেদিন তার সতীর্থরা ক্লাব লোগোর নিচে "জিদান ২০০১-২০০৬" লিখা সম্বলিত বিশেষ জার্সি পরে খেলতে নামেন। ভিলারিয়াল ক্লাবের বিরুদ্ধে খেলা এই ম্যাচটি ৩-৩ গোলে ড্র হয় যার দ্বিতীয় গোলটি ছিলো জিদানের করা। ৮০০০০ দর্শক সেদিন উপস্থিত ছিলেন মাঠে। ম্যাচ শেষে জিদান ভিলারিয়াল মিডফিল্ডার ও আর্জেন্টাইন তারকা জুয়ান রোমান রিকুয়েমের সাথে তার জার্সি বদল করেন। খেলার পুরোসময় জুড়ে রিয়াল মাদ্রিদ সমর্থকদের মুর্হূমুহূ করতালিতে তিনি অভিনন্দিত হন এবং খেলা শেষে হাজারো ভক্তের ভালোবাসায় সিক্ত জিদান অশ্রুসিক্ত নয়নে রিয়াল মাদ্রিদকে বিদায় জানান। সেদিন সকলের হাতে একটি ব্যানার ছিল যাতে লেখা ছিল, “ Thanks for the Magic. “

 

এ ছিল শুধুই তার ক্লাব ক্যারিয়ার এর কথা। কিন্তু তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার যে আরও সমৃদ্ধ এবং নাটকীয়তায় ভরা। আসুন আমরা এখন সেই গল্পে পা বাড়াই। জিদান দ্বৈত নাগরিকত্বের অধিকারী ছিলেন (ফ্রান্স এবং আলজেরিয়া)। সেই সুবাদে তিনি চাইলে আলজেরিয়া জাতীয় দলের হয়েও খেলতে পারতেন। কিন্তু আলজেরিয়া ফুটবল দলের তদানীন্তন কোচ আবদেল হামিদ কারমালি যথেষ্ট গতিসম্পন্ন নয় এই অজুহাতে তাকে জাতীয় দলে নেয়া থেকে বিরত থাকেন। পরে ২০০৫ জিদান এই রিউমার কে উড়িয়ে দিয়ে বলেন তিনি ততদিনে ফ্রান্স ইউথ টীমের হয়ে খেলে ফেলেছিলেন। ফলে চাইলেও তার পক্ষে আলজেরিয়ার হয়ে খেলা সম্ভব ছিল না। জিদান ১৯৯৪ সালের ১৭ আগস্ট ফরাসি জাতীয় দলের জার্সি গায়ে তার প্রথম ম্যাচটি খেলেন। চেক প্রজাতন্ত্র জাতীয় দলের বিরুদ্বে অনুষ্ঠিত এই প্রীতি ম্যাচটিতে জিদান ৬৩ মিনিটের মাথায় যখন বদলি খেলোয়াড় হিসেবে মাঠে নামেন ফ্রান্স তখন ২-০ গোলে পিছিয়ে ছিল। জিদান আসার পর তিনি দুইটি গোল করেন এবং ম্যাচটি শেষ পর্যন্ত ২-২ গোলে ড্র হয়। এই সময়ে ফ্রান্স দলের ম্যানেজার আইমে জ্যাক ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড এর ততকালীন ফুটবল তারকা এরিক ক্যান্টোনাকে কেন্দ্র করে দল সাজাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ক্যান্টোনার উপরে তখন একবছরের নিষেধাজ্ঞা থাকায় প্লেমেকার হিসেবে তিনি জিদানকে খেলান। তার এই খেলোয়াড় নির্বাচনের ব্যাপারে ভক্ত এবং ফুটবল বোদ্ধাদের ব্যাপক সমালোচনা স্বত্বেও ফ্রান্স ইউরো ১৯৯৬ এর সেমিফাইনালে ওঠে এবং কিন্তু চেক প্রজাতন্ত্রের কাছে পেনাল্টিতে ৬-৫ গোলে হেরে যায়। ইউরো তে জিদান এর পারফর্মেন্স চোখ ধাঁধানো না থাকলেও তিনি কোয়ার্টার ফাইনাল এবং সেমিফাইনাল এ পেনাল্টি তে গোল করেন। এরপর ১৯৯৮ এর বিশ্বকাপে জিদান প্রথম অংশগ্রহণ করেন। এটিই ছিল তার প্রথম বিশ্বকাপ এবং তা অনুষ্ঠিত হয়েছিল তার নিজের দেশ ফ্রান্সেই। গ্রুপ পর্বের তিন ম্যাচে জয় পেলেও ঘটে এক আপত্তিকর ঘটনা। সৌদি আরবের বিপক্ষে বিশ্বকাপে ফ্রান্সের গ্রুপ পর্বের দ্বিতীয় ম্যাচে সৌদি অধিনায়ক ফুয়াদ আনোয়ার কে থুথু মারার অপরাধে জিদানকে লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় এবং পরবর্তী দুই ম্যাচের জন্য তিনি নিষিদ্ধ হন। এ সময়ে যারা তার পাশে ছিলেন তাদের ভাষ্যমতে ফুয়াদ জিদানকে উদ্দেশ্য করে গালিগালাজ করেছিলেন। দলের প্লে মেকার কে ছাড়াই ফ্রান্স শেষ ১৬ তে প্যারাগুয়ে কে ১-০ তে পরাজিত করে। তবে কোয়ার্টার ফাইনাল এ ইতালির বিপক্ষে ম্যাচে তিনি মাঠে ফিরে আসেন। ওই ম্যাচ গোল শুন্য থাকলেও পেনাল্টি তে ৪-৩ ফলাফলের উপর ভর করে জিদানের ফ্রান্স সেমি ফাইনালে পৌঁছে যায়। সেখানে কোন গোল না পেলেও ম্যাচ এর ভাগ্য গড়তে জিদান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন এবং ২-১ এ ম্যাচ শেষ হয়। ফাইনালে ফ্রান্স মুখোমুখি হয় ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিল এর সাথে। ম্যাচের শুরু থেকেই ফ্রান্স ডমিনেট করে খেলতে থাকে। হাফ টাইমের আগেই দুই কর্নার থেকে হেড করে দুটি গোল করেন জিদান। পুরো স্টেডিয়াম এ তখন আনন্দের বন্যা চলছে। হাফ টাইমের আগেই বিশ্বকাপ ট্রফি তে তারা এক হাত রেখে ফেলে। পরে ২য় হাফের শেষের দিকে পেতিত এর গোলে ফ্রান্স ৩-০ গোলে জয় পায় এবং ফ্রান্স প্রথমবারের মত বিশ্বকাপ জয় করে। জিদান ম্যান অফ দা ম্যাচ নির্বাচিত হন। এই একটি ম্যাচ জিদান কে ফ্রান্স এর জাতীয় হিরো তে পরিণত করে এবং তারা সকলেই হাতে ব্যানার নিয়ে সারা দেশব্যাপী তাকে স্বাগত জানায় যাতে লেখা ছিল, "Merci Zizou". যার বাংলা অর্থ ধন্যবাদ জিজু।

অসাধারণ ফুটবল শৈলী ও গুরুত্বপুর্ণ গোল করার মাধ্যমে ইউরো ২০০০ এ ফ্রান্স জাতীয় দলকে ফাইনালে তুলতে জিদান অসামান্য অবদান রাখেন। তিনি স্পেনের বিপক্ষে সরাসরি ফ্রি কিক থেকে একটি এবং সেমিফাইনালে পর্তুগালের বিপক্ষে পেনাল্টি থেকে গোল্ডেন গোল করে দলকে ফাইনালে তোলেন। ফাইনালে ফ্রান্স ইতালিকে পরাজিত করে ফুটবল ইতিহাসে ২৬ বছর পর প্রথমবারের মত একই সাথে বিশ্বকাপ ও ইউরোপীয়ান কাপ উভয় শিরোপা অর্জনের অসামান্য গৌরব অর্জন করে (১৯৭৪ সালে জার্মানী সর্বশেষ এ গৌরব অর্জন করেছিলো)। ফলশ্রুতিতে ফ্রান্স ফিফা বিশ্ব র‌্যাংকিং এ ১ নম্বর অবস্থানে চলে আসে। জিদান প্লেয়ার অফ দা টুর্নামেন্ট নির্বাচিত হন। উরুতে ইনজুরির জন্য জিদান ২০০২ সালে অনুষ্ঠিত ফিফা বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে নিয়মিত একাদশের বাইরে থাকেন। তার অনুপস্থিতিতে খেলা বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ফ্রান্স আফ্রিকার নবাগত দল সেনেগালের বিরুদ্ধে ১-০ গোলে বিস্ময়করভাবে পরাজিত হয়। ইনজুরি থেকে ফিরে জিদান তৃতীয় ম্যাচে খেলতে নামলেও তিনি তার স্বাভাবিক খেলা খেলতে ব্যর্থ হন। ফলশ্রুতিতে জিদান ও তার দল কোন গোল না করেই বিশ্বকাপ আসরের প্রথম রাউন্ড থেকেই বিদায় নেয় এবং বিশ্বকাপ শিরোপা অক্ষুণ্ণ রাখতে ব্যর্থ হয়। ইউরো ২০০৪ এ জিদান ও তার দলের শুরুটা ভালোই হয়েছিল। গ্রুপ পর্যায়ের ম্যাচে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথমে পিছিয়ে থেকেও জিদানের নৈপুণ্যে ফ্রান্স শেষ পর্যন্ত জয়ী হয়। এ ম্যাচটিতে জিদান দুটি গোল করেন যার একটি ফ্রি কিক ও আরেকটি পেনাল্টি থেকে করা।২০০৪ সালের ১২ আগস্ট কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রান্স পরবর্তী সময়ে ইউরো ২০০৪ শিরোপা জয়ী গ্রিস এর কাছে অপ্রত্যাশিত ভাবে হেরে যায়। এর পর পরই জিদান আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে অবসরের ঘোষণা দেন।

ফ্রান্স এর বিশ্বকাপ জয়ের পর এইরকম বাজে পারফর্মেন্স আর দলের অনেক গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার যেমন লিজারাজু, মারকেল দেসাইলি, ক্লদিও ম্যাকলেলে, লিলিয়ান থুরাম এর অবসর ঘোষণার পর দলে কালো মেঘের ছাপ নেমে আসে। পরবর্তীকালে ২০০৬ সালের বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ফ্রান্স যখন চূড়ান্ত পর্বে উঠতে হিমশিম খাচ্ছিল তখন ফ্রান্সের কোচ রেমন্ড ডমেনেচ এর অনুরোধে ২০০৫ সালের ৩ আগস্ট জিদান আবার আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রত্যাবর্তনের ঘোষণা দেন এবং ফ্রান্স জাতীয় দলের অধিনায়ক নিযুক্ত হন। ২০০৫ সালের ৩ সেপ্টেম্বর বিশ্বকাপ বাছাই পর্বে ফ্যারো দ্বীপপুঞ্জের বিপক্ষে ৩-০ গোলে জয়ের মধ্য দিয়ে জিদান প্রতিযোগিতামূলক ফুটবলে দ্বিতীয় বারের মতো প্রত্যাবর্তন করেন এবং ফ্রান্স গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হিসেবে বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে। তার সাথে থুরাম এবং ম্যাকলেলেও ফিরে আসেন অবসর ভেঙ্গে। রিয়াল মাদ্রিদে এক মৌসুম ইনজুরিতে কাটানোর পর ২০০৬ সালের ২৫ এপ্রিল জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপের পর পরই অবসর নেবার কথা ব্যাক্ত করেন। ফলে সবাই ধরেই নেয় এই বিশ্বকাপ ই হবে তার ফ্রান্সের হয়ে শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ২০০৬ এর বিশ্বকাপের শুরুটা খুব একটা ভালো ছিল না জিদানের জন্য। গ্রুপ পর্যায়ের দ্বিতীয় ম্যাচে দক্ষিণ কোরিয়ার বিপক্ষে খেলার একবারে শেষ মুহূর্তে এক কোরিয়ান ডিফেন্ডারকে ধাক্কা দেয়ার অপরাধে জিদান হলুদ কার্ড দেখেন। টুর্নামেন্টের উপর্যুপরি দুই ম্যাচে হলুদ কার্ড পাওয়ায় জিদান গ্রুপের তৃতীয় এবং শেষ ম্যাচের জন্য সাসপেন্ড হন। জিদানকে ছাড়াই গ্রুপের তৃতীয় ম্যাচে ফ্রান্স টোগোর বিপক্ষে ২-০ গোলে জয়ী হয়। এর ফলে ফ্রান্স নকআউট পর্বে উত্তীর্ণ হয় এবং জিদান পরবর্তী ম্যাচগুলোতে দলের জন্য কিছু করার সুযোগ পান। রাউন্ডের ১৬তম ম্যাচে জিদান স্পেনের বিপক্ষে খেলায় আবার মাঠে ফেরেন। জিদানের ফ্রি কিক থেকে পেনাল্টি এরিয়াতে পাওয়া বলে প্যাট্রিক ভিয়েরা ম্যাচের দ্বিতীয় গোলটি করেন। এরপর খেলার অতিরিক্ত সময়ে (স্টপেজ টাইম) জিদান ম্যাচের শেষ গোলটি করেন এবং ফ্রান্স ৩-১ এ জয়ী হয়। এই জয়ের ফলে ফ্রান্স কোয়ার্টার ফাইনালে উত্তীর্ণ হয় এবং বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন ব্রাজিলের মুখোমুখি হয়। জিদানের ফ্রি কিক থেকে পাওয়া বলে ম্যাচের একমাত্র গোলটি আসে ফরাসি স্ট্রাইকার থিয়েরি অরির পা থেকে এবং ম্যাচটিতে ফ্রান্স ১-০ গোলে জয়ী হয়। খেলার পুরোটা সময়জুড়ে ব্রাজিলিয়ানদের উপর ফরাসিদের একচ্ছত্র আধিপত্য বজায় থাকে। জিদানের নেতৃত্বে ফরাসি মধ্যভাগ প্রতিপক্ষের সীমানায় যেখানে একের পর এক আক্রমণ রচনা করেছে তার বিপরীতে ব্রাজিলিয়ানরা ম্যাচের পুরোসময়ের মধ্যে মাত্র একবারের জন্য বিপক্ষ সীমানায় সত্যিকারের আক্রমণ চালাতে পেরেছিলো। ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত জিদান তার পায়ের মায়াবী কারুকার্যে পুরো ফুটবল বিশ্বকে মোহাবিষ্ট করে রাখে। ফিফার টেকনিক্যাল স্টাডি গ্রুপের বিবেচনায় জিদান ম্যাচটিতে ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ নির্বাচিত হন। এর চারদিন পর অনুষ্ঠিত সেমিফাইনালে ফ্রান্স পর্তুগালের মুখোমুখি হয়। জিদান পেনাল্টি থেকে ম্যাচের একমাত্র গোলটি করেন এবং পর্তুগালকে হারিয়ে ফ্রান্স ফাইনালে উত্তীর্ণ হয় এবং ৬ বছর পর জিদান আবার পর্তুগীজদের চোখের পানিতে ভাসান একই ইতিহাস রচনা করে। ২০০৬ সালের ৯ জুলাই ফ্রান্স ফাইনালে ইতালির মুখোমুখি হয়। এটি ছিলো জিদানের জন্য দ্বিতীয় এবং শেষ বিশ্বকাপ ফাইনাল। ম্যাচের সপ্তম মিনিটের মাথায় জিদান পেনাল্টি থেকে গোল করে ফ্রান্সকে ১-০ তে এগিয়ে দেন। এরই সাথে পেলে, পল ব্রিটনার এবং ভাভার পরে মাত্র চতুর্থ খেলোয়াড় হিসেবে দুটি বিশ্বকাপ ফাইনালে গোল করার বিরল সম্মান অর্জন করেন। একই সাথে জিদান বিশ্বকাপ ফাইনালে সর্বোচ্চ গোলদাতা হিসেবে যুগ্মভাবে ভাভার সাথে প্রথম স্থানে চলে আসেন। খেলার ১১০ মিনিটের মাথায় জিদান লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন ইতালির মাতেরাজ্জি কে মাথা দিয়ে ঢুস মেরে ফেলে দেয়ার কারনে। সে ঘটনায় আমরা পরে আসছি। ফলে অতিরিক্ত সময়ের পরেও ফলাফল ১-১ থাকায় অনুষ্ঠিত পেনাল্টি শুট আউটে জিদান অংশ নিতে পারেননি। টাইব্রেকারে ইতালি ৫-৩ গোলে ফ্রান্সকে পরাজিত করে ২০০৬ ফুটবল বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন হয়। ফাইনালে জিদানের অসংলগ্ন আচরণের জন্য নানা সমালোচনা স্বত্বেও জিদান ২০০৬ বিশ্বকাপের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল লাভ করেন। ২০০৬ সালের ২৭ মে জিদান ফ্রান্স জাতীয় দলের হয়ে তার ১০০ তম ম্যাচ খেলেন। প্যারিসের সেইন্ট ডেনিসের স্টাডে দ্যা ফ্রান্স স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর বিপক্ষে অনুষ্ঠিত এ ম্যাচটিতে ফ্রান্স ১-০ তে জয়ী হয়। স্টেডিয়ামটিতে এটিই ছিলো তার শেষ ম্যাচ এবং দিদিয়ের ডেসম, মার্সেই দেশাই এবং লিলিয়ান থুরামের পরে চতুর্থ ফরাসি খেলোয়ার হিসেবে জিদান ১০০ টি ম্যাচ খেলার গৌরব অর্জন করেন। জিদান ফুটবল বিশ্বে শান্ত, বিনয়ী এবং লাজুক হিসেবেই পরিচিত। তদুপরি খুব অল্প সময়ই তিনি মাঠে উত্তেজিত আচরণ প্রকাশ করেছেন। ১৯৯৮ এবং ২০০৬ বিশ্বকাপের দুটো লাল কার্ড প্রাপ্তি ছাড়াও ২০০০-২০০১ সালে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়ন্স লিগে জুভেন্টাস বনাম হামবুর্গ এসভি ম্যাচে জোসে কিয়েন্তেকে ঢুঁ মেরে জিদান লাল কার্ড পেয়েছিলেন। তবে ২০০৬ এর বিশ্বকাপ ফাইনালে এর ঘটনা সবকিছু কে ছাপিয়ে যায়। ঘটনাটি ছিল মূলত এরকম, ‘ঘটনার শুরু হয় জিদান এবং মাতারাজ্জির মধ্যে উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ের মধ্য দিয়ে। এরপর জিদান যখন মাতারাজ্জির কাছ থেকে চলে আসতে শুরু করেন তাকে উদ্দেশ্য করে মাতারাজ্জি আবার কিছু কথা বলেন। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে জিদান হঠাথ করে ঘুরে দাড়ান, কিছুটা দৌড়ে এসে সরাসরি মাতারাজ্জির বুকে মাথা দিয়ে ঢুঁ মারেন। ফলশ্রুতিতে মাতারাজ্জি বুক চেপে ধরে মাটিতে পরে যান। ঘটনার পরবর্তীকালে খেলা যদিও থেমে যায় কিন্তু ব্যাপারটি ঘটেছিলো রেফারি হোরাসিও এলিযোন্ডোর চোখের আড়ালে। ম্যাচ কর্মকর্তাদের রিপোর্ট অনুযায়ী, চতুর্থ কর্মকর্তা লুইস মেদিনা ক্যান্তালেযো ইয়ারফোনের মাধ্যমে রেফারিকে বিষয়টি অবহিত করেন। পরবর্তীতে সহকারী রেফারির সাথে আলোচনা করে বিষয়টি নিশ্চিত হবার পর এলযোন্ডো জিদানকে লাল কার্ড প্রদর্শন করেন এবং তাকে মাঠের বাইরে পাঠিয়ে দেন।‘ ফরাসি পত্রিকা "লা ফিগারো" জিদানের গুতো দেবার ঘটনাটিকে "অমার্জনীয়" বলে আখ্যায়িত করে। ফ্রান্সে প্রকাশিত খেলাধুলা বিষয়ক দৈনিক পত্রিকা "লা ইকুইপে" এর প্রধান সম্পাদক জিদানকে মুহাম্মদ আলীর সাথে তুলনা করেন। একই সাথে তিনি এও উল্লেখ করেন যে মুহাম্মদ আলী, জেসি ওয়েন্স কিংবা পেলে কখনো জিদানের মত খেলাধুলার নিয়ম ভঙ্গ করেনি। একি সাথে তিনি প্রশ্ন রাখেন যে জিদান পুরো ব্যাপারটিকে সমগ্র বিশ্বের শিশুদের সামনে কিভাবে বিষয়টি ব্যাখ্যা করবেন, অবশ্য পরবর্তী দিন উক্ত মন্তব্যের জন্য তিনি ক্ষমা চান। ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট জ্যাক শিরাক জিদানকে জাতীয় বীর হিসেবে আখ্যায়িত করেন এবং উদার হৃদয়ের ম

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন