'আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল '- এক সাম্রাজ্যের সম্রাটের ইতিকথা

'আর্সেন ওয়েঙ্গারের আর্সেনাল '- এক সাম্রাজ্যের সম্রাটের ইতিকথা

আসলে আমরা সবাই পিতার ছায়ায় বড় হই পিতার ছায়ায় থেকে আমরা সুন্দর ভাবে বেড়ে উঠি  কারও জন্য এই ছায়াটা অনেক যুগ ধরে থাকে ,আর কারও জন্য অল্প সময়ের এতুকুই পার্থক্য কিন্তু পিতার ছায়া সবাইকে একদিন না একদিন হারাতে হয়, অর্থাৎ কোন এক সময় নিজেকেই এই পিতার ছায়া হতে হয়

আর্সেন ওয়েঙ্গার (Arsène Wenger) ওয়েঙ্গার হচ্ছেন সেই পিতার ছায়া  যে আর্সেনাল-কে ছায়া  দিয়েছেন,পালন করেছেন। এখন সময় হয়ে গিয়েছে আর্সেনাল-এর নিজেই নিজের সেই পিতার  ছায়া হবার। আর্সেন ওয়েঙ্গার আর্সেনালকে সেই যোগ্য করেই গিয়েছেন।

আজকের গল্পটা এক সাম্রাজ্য ও সেই সাম্রাজ্য এর সম্রাটকে নিয়ে। সাম্রাজ্যটির নাম “আর্সেনাল”আর সেই সাম্রাজ্যের সম্রাট এর নাম হচ্ছে  “ আর্সেন ওয়েঙ্গার (Arsène Wenger)

[ প্রথমেই বলে নেই আমি আর্সেনাল ফ্যান না , আর্সেন ওয়েঙ্গার এরও ফ্যান না। তবে আমি সেই সুন্দর খেলাটির ফ্যান যা আর্সেনাল ও আর্সেন ওয়েঙ্গার  আমাদের এতদিন ধরে উপভোগ করার সুযোগ করে দিয়েছে ]

Image result for arsene wenger



শুরু করা যাক না হয় গল্পটা।

সালটা ১৯৪৯ । ঐ সালের ২২শে  অক্টোবর ফ্রান্সের ইস্ত্রাসবার্গ ( Strasbourg ) শহরে ওয়েঙ্গার ১৯৬৯ সালে  প্রথমবারের মত ওয়েঙ্গার (Wenger) প্রফেশনাল ফুটবলার হিসাবে  খেলা শুরু করেন ফ্রেঞ্চ তৃতীয় লিগের ক্লাব এ,এস মাটউইজ এর হয়ে ১৯৭৮ সালে আর,সি ইস্ত্রাসবার্গ  (RC Strasbourg) এ  তিনি ডিফেন্ডার হিসাবে নামেন দলকে আরও শক্তিশালী করতে মোনাকো এর সাথে ম্যাচে। ১৯৭৮ সালে তিনি তাঁর প্রথম লিগ  টাইটেল জিতেন তার একাডেমিক  ক্যারিয়ারই আভাশ দেয় তার ম্যানেজার হিসাবে গড়ে উঠার।

তার খেলোয়ারি জীবনের বিস্তারিত-তে  আজ যাব না।

তিনি তার আন্ডার- গ্রেজুয়েশন ডিগ্রি শেষ করেন  ইস্ত্রাসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং ফ্যাকাল্টি থেকে এবং একোনোমিক্স  সাবজেক্টে একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স পাশ করেন। তিনি নিজের মাতৃভাষা ফ্রেঞ্চ ছাড়াও আরও অনেক ভাষায় পারদর্শী ছিলেন। তিনি আলসাতিয়ান,জার্মান  এবং ইংলিশ ভাষায় তিনি অবিলম্বে কথা বলতে পারতেন এছাড়াও তিনি ইতালিয়ান, স্প্যানিশ এবং জাপানিজ ভাষায়ও অনেক দক্ষ ছিলেন এত ভাষায় পারদর্শী হবার জন্যই তাঁকে  “ল্যা প্রফেসর “ উপাধি দেয়া হয়। 

এবার আমরা আজকের গল্পের মূল আলোচনায় আসি না হয় তাহলে শুরু করা যাক ম্যানেজার হিসাবে  আর্সেন ওয়েঙ্গার (Arsène Wenger) এর পথচলা।

ফুটবলার এর ক্যারিয়ার শেষ হবার তিন বছর পরেই তিনি ১৯৮৩ সালে ফ্রেঞ্চ দ্বিতীয় লিগের দল ক্যান্নেস (Cannes)  এ অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার হিসাবে যোগ দেন।

তিনি প্রথম সিনিওর টিমের কোচের দায়িত্ব নেন বর্তমান এফ,সি ন্যান্সি এর ১৯৮৪ সালে কিন্তু  কোচ হিসাবে তিনি সেখানে বেশি উন্নতি করতে পারেননি এমনকি এফ,সি ন্যান্সি প্রথম লিগ থেকে ছিটকে দ্বিতীয় লিগে যায়। ১৮৮৭ সালে ক্লাব তাকে বরখাস্ত করে কোচ এর রোল থেকে।

তার কোচিং ক্যারিয়ারের মোড় ঘুড়ে ; ১৮৮৭ সালে যখন মোনাকো তে কোচ হিসাবে যোগ দেন। যোগ দিয়েই তিনি ১৯৮৭-৮৮ সিজন এই লিগ জিতান মোনাকোকে।   এটি মোনাকো এর পঞ্চম লিগ টাইটেল ছিল। এছাড়াও তিনি মোনাকো এর হয়ে ১৯৯০-৯১ সিজনে ফ্রেঞ্চ কাপ জিতেন। তিনি মোনাকো এর প্রতি এতটাই লয়্যাল ছিলেন যে তিনি ফ্রেঞ্চ ন্যাশনাল টিমের দায়িত্ব নিতেও না করে দেন।  কিন্তু দুঃখের বিষয় মোনাকোও তাকে বরখাস্ত করে দেয় ১৯৯৪ সালেই টিম এর খারাপ পারফর্মেন্স এর জন্য।

১৯৯৫ সালে তিনি জাপানিজ ক্লাব নাগোয়া গ্রামপাস এইট (Nagoya Grampus Eight) এর দায়িত্ব নেন। তিনি নাগোয়া গ্রামপাস এইটকে ১৯৯৫ সালে জাপান এম্পেরর’স কাপ জিতান। তিনি ১৯৯৬ সালে “ম্যানেজার অব দ্যা ইয়ার এ্যাওয়ার্ড” পান । ঠিক তার কিছুদিন পরেই তিনি মাইটি আর্সেনাল এর জন্য এই ক্লাব ছাড়েন।

১৯৯৭ সালে একটি বই প্রকাশ করেন যার নাম ;” দ্যা ইস্পিরিট অব কোনকুয়েস্ট যেখানে তিনি জাপানিজ ফুটবল নিয়ে লিখেন।

তিনি ১৯৯৬ সালের গ্রীষ্মে  আর্সেনাল ক্লাবে ম্যানেজার হিসাবে যোগ দেন। ব্রুসি রিওচ কে স্যাক  করার পর আর্সেন  ওয়েঙ্গার (Arsène Wenger)কে যখন ম্যানেজার এর দায়িত্ব দেয়া হয় তখন লোকে তাকে ওইভাবে চিনত বা জানত না যেমনটা আজ তাঁর বিদায়ের সময় ফুটবল যারা দেখে সবাই তাকে চিনে  বা জানে।তাকে অনেকেই “ অপরিচিত ও  বিষয়কর ফ্রেঞ্চ” বলে আখ্যায়িত করেছিল। ফ্যানরা তাকে মেনে নিতে পারেনি। রুমোর উঠেছিল তখন যে বার্সা ও আয়াক্স লিজেন্ড  জোহান ক্রফকে আর্সেনাল এর ম্যানেজার হিসাবে আনা হবে। সেই জায়গায় এরকম অজানা একজনকে শুধু ফ্যানরা নয় কেউই মেনে নিতে পারছিল না ।


Image result for arsene wenger


অনেকের মনে বিস্ময়ও জেগেছিল তাঁর নামের প্রথম অংশ ক্লাবের নামের সাথে মিল দেখে। তাঁকে ক্লাবের ম্যানেজার হিসাবে নিয়োগের পিছনে সব থেকে বেশি ভূমিকা পালন করেছিল তৎকালিন আর্সেনাল ভাইস-প্রেসিডেন্ট  ডেভিড ডিয়েন। তাঁকে ম্যানেজার নিয়োগের ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি গণমাধ্যম কে জানান যে তিনি ভিশন দেখেছেন যে ,”  আর্সেন ফর আর্সেনাল “। ওয়েঙ্গারের জন্য শুরুতে আর্সেনালে মানিয়ে নেয়া সহজ হয়নি ।কয়েক সপ্তাহ পর এমনও খবর আসে যে তিনি অসুস্থ হয়ে পরেছেন। এব্যাপারে পরবর্তীতে ওয়েঙ্গার বলেছিলেন ,” তিনি যখন আর্সেনালের দায়িত্ব নেন , তখন তিনি প্রাই ভাবতেন তিনি সার্ভাইভ করতে পারবেন  না “ ।

তিনি আর্সেনালে যোগ দিয়েই প্রথমে যা করেছিলেন তা ছিল প্লেয়ারদের খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন ও খাবারের ডায়েট । তিনি জাপানে থাকা অবস্থায় খাবারের ডায়েট নিয়ে পরিচিত হন। তিনি আর্সেনালে এসে কিছু খাবারের আইটেম খাওয়া  সম্পূর্ণ নিষেধ করে দেন প্লেয়ারদের জন্য।  

তিনি ফুড হেবিট নিয়ে এতটাই সচেতন ছিলেন যে স্যার আলেক্স ফারগুসন একবার বলেছিলেন ,,”  আর্সেন কখনও আমার সাথে ড্রিংক করতে আসেননি ম্যাচ শেষে , ইংলিশ প্রিমিয়ারশিপে  সেই একমাত্র  ম্যানেজার যে এমনটা করেছে।“

তিনি পরবর্তীতে আর্সেনাল এর হয়ে  তিনটি প্রেমিয়ার লিগ টাইটেল জিতেছেন  ১৯৯৭-৯৮ , ২০০১-০২ এবং ঐতিহাসিক ২০০৩-০৪। ২০০৩-০৪ সিজনে তাঁর আর্সেনাল একটি ম্যাচ ও হারেনি যার ফলে আর্সেনাল আনবিটেন প্রেমিয়ার  লিগ জিতে । এজন্য ঐ সিজন আর্সেনালকে সোনার কাপ দেয়া হয় যা ইংলিশ ফুটবলের ইতিহাসে শুধুমাত্র আর্সেনালেরই আছে।



Image result for arsene wenger


এছাড়াও আর্সেনাল ওয়েঙ্গার এর অধীনে ৭ টি এফ,এ কাপ ( ১৯৯৭-৯৮, ২০০১-০২, ২০০২-০৩, ২০০৪-০৫, ২০১৩-১৪, ২০১৪-১৫, ২০১৬-১৭ ) জিতে নেয় ও ৭ টি এফ,এ কমিউনিটি শেইলড ( ১৯৯৮, ১৯৯৯,২০০২,২০০৪, ২০১৪,২০১৫,২০১৭) জিতে। এছাড়াও তিনি আর্সেনাল এ থাকা অবস্থায় তিনবার ( ১৯৯৮,২০০২,২০০৪)  প্রিমিয়ারলিগ  ম্যানেজার অব দ্যা সিজন এ্যাওয়ার্ড পান। কোচদের ব্যালন খ্যাত  অঞ্জ ডি’অর  (Onze d'Or Coach of The Year ) তিনি ৪ বার (২০০০, ২০০২,২০০৩,২০০৪)  পেয়েছেন। ২০০৬ সালে  “ইংলিশ ফুটবল হল অব ফেইম “ –এ তাঁকে স্থান দেয়া হয়। Related image


আর্সেনাল কে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ক্লাব গুলোর একটিতে , ফুটবল পরাশক্তিতে পরিণত করতে তাঁর অবদান অনন্য।

২০১৭-১৮ সিজন শেষে অর্থাৎ এই সিজন শেষে তিনি পদত্যাগ নিবেন আর্সেনাল এর ম্যানেজার পোস্ট থেকে। ২০ই এপ্রিল,২০১৮ তে তিনি এই ঘোষণাটি দেন। 

তিনি সুদীর্ঘ ২১বছর  আর্সেনাল এর  দায়িত্ব পালন করার সময় অনেকের মন জয় করেছেন। এক আর্সেনাল ফ্যান তাঁর নামে নিজের খুজে পাওয়া  স্টিরয়েড এর নাম করন করেছেন ,” Arsènewenger 33179 “ যেটি মঙ্গল গ্রহ ও জুপিটার গ্রহ এর মধ্যবর্তী কক্ষপথে প্রদক্ষিণ করে।

আর্সেনালে তাঁর হাত ধরেই হেনরি , ভিয়েরা,ওজিল,অবামিয়াং ,বার্গক্যাম্পরা মাঠ কাপিয়েছে। তিনি উপহার দিয়েছেন সুন্দর এক ফুটবল কে।

বিগত কয়েক সিজন ধরে লিগ এ ভালো অবস্থানে আর্সেনাল ক্লাব না থাকায় এবং চ্যাম্পিয়ন লিগ এ অংশ গ্রহণ করতে না পারায় বিগত সিজন থেকে অনেক ফ্যান “ওয়েঙ্গার আউট (wenger out)” প্ল্যাকার্ড নিয়ে ম্যাচ দেখতে আসে স্টেডিয়ামে। তাছাড়া ফেসবুক ও অন্যান্য  সামাজিক মাধ্যম গুলোতেও একই স্লোগান তুলতে দেখা যায় অনেককে। 


Image result for wenger out

তিনি সিজন শেষে হয়তো চলেই যাচ্ছেন। কিন্তু সেই কয়দিন বেঁচে থাকবেন যে কয়দিন এই আর্সেনাল ক্লাবটি থাকবে । আর্সেনাল এর প্রতিটি জয়ে তাঁকে মনে করা হবে। আজকের এই আর্সেনাল এর কারিগর তিনি । নিজের ছায়া দিয়ে পালন করেছেন আর্সেনাল কে।


Image result for arsene wenger

অবশেষে ওয়েঙ্গার আউট (wenger out)” ঘটতে চলেছে। এখবর শুনে আসলে যারা ওয়েঙ্গার আউট বলেছিল তারাও হয়তো খুশি হতে পারেনি। 

এক সাম্রাজ্যকাল শেষ হতে চলেছে। এক সম্রাটকে হারাতে চলছে আর্সেনাল ।আসা করি , আর্সেনাল আবারও বিধ্বংসী রুপে ফিরে আসবে  কেনই বা না এটি আর্সেন ওয়েঙ্গার (Arsène Wenger) এর আর্সেনাল।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন