ট্যাক্টিকাল ভিউঃ রিয়ালের অস্ত্রে রিয়ালকেই বধ করেছিল আয়েগ্রি, বাঁধ সাধল পেনাল্টি, আদৌ কি বৈধ?

ট্যাক্টিকাল ভিউঃ রিয়ালের অস্ত্রে রিয়ালকেই বধ করেছিল আয়েগ্রি, বাঁধ সাধল পেনাল্টি, আদৌ কি বৈধ?

প্রতিপক্ষের মাঠে ৩-০ আগিয়ে। স্বাগতিক হয়ে খেলতে নামার সময় এর থেকে সহজ সমীকরণ হয়তো আর কিছুই হতে পারে না, অন্তত প্রতিপক্ষ যখন ইউভেন্টাস। অথচ এই সহজ সমীকরণটাকেই যেন স্রোডিঞ্জারের সমীকরণের চেয়েও জটিল করে ফেলল জিদান বাহিনী।

সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে দুই দলকেই কিছুটা মূল অস্ত্ররসদ বাদেই নামতে হয়েছিল। ইউভেন্টাসের নামতে হয়েছিল তাদের আর্জেন্টাইন তারকা পাওলো দিবালাকে ছাড়া। অপরদিকে, রিয়ালকে নামতে হয়েছিল তাদের অধিনায়ক সার্হিও রামোসকে ছাড়া।

ইউভে কাগজে কলমে ৪-১-২-৩ ফর্মেশনে নামে। বিশ্বস্ত হাতে বুফন, দুই সেন্টার জুটিতে বেনশিয়া আর কিয়েলিনি, দুই  প্রান্তে ফুলব্যাক সান্দ্রো এবং ডি শিলিও। মাঝমাঝে হোল্ডিং মিডে খেদিরা, উপরে পিয়ানিচ আর মাতুইদির ডাবল পিভোট। এবং আক্রমণভাগে দুই উইঙ্গে মাঞ্জুকিচ আর কস্তা এবং স্ট্রাইকার হিগুয়েন।

রিয়াল নামে ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফর্মেশনে। গোলবারে নাভাস, সামনে তরুণ ভারান আর ভ্যায়েহো, দুইদিকে মার্সেলো আর কার্ভাহাল। মাঝমাঠে হোল্ডিং মিডে ক্যাসেমিরো, উপরে ক্রুস আর মদ্রিচের পরীক্ষিত ডাবল পিভোট আর ট্রেকোয়ার্টিস্তা ইস্কো। আক্রমণভাগে ১৯৪ মিলিয়নের রোনালদো আর বেল।

ইউভের চকিৎ আক্রমণ এবং আহত সিংহ রিয়ালের গর্জে ওঠা


রেফারীর বাঁশির সাথে সাথেই ক্ষুধার্ত বাঘের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে ইউভে, শুরু থেকেই আক্রমণ। দুই ফুলব্যাক সান্দ্রো আর ডি শিলিও ক্রমাগত উপরে ওঠায় ইউভে ৪-১-২-৩ থেকে ২-৫-৩ এ রূপ নিচ্ছিল, এবং ফলাফল হাতেনাতে। কস্তার বাড়ানো বল থেকে ২ মিনিটের মাথায় গোল করে বসেন বিশালাকার মাঞ্জুকিচ। 

রিয়াল এবার আহত সিংহের মতো একের পর এক আক্রমণে শানিয়ে যাচ্ছে ইউভেন্টাসের রক্ষণকে। ইস্কো, রোনালদো এবং গ্যারেথ বেলের ফ্রি ফ্লুয়েন্সি ব্যবহার করে রিয়াল ক্রমাগত ৪-৪-২ ডায়মন্ড আর ৪-১-২-৩ এর মধ্যে অদলবদল করছিল। বিশেষত ইস্কো আর রোনালদোর নৈপুণ্য মুহুর্মুহু আক্রমণে বারংবার রক্ষণকে ছিন্নভিন্ন করে ফেলছিল রিয়াল। এর মাঝে ইঞ্জুরীর কারণে যে ডি শিলিওকে বাধ্য হয়ে তুলে নিয়ে অভিজ্ঞ লিচিস্টেইনারকে নামান আয়েগ্রি। কিন্তু কিয়েলিনি আর বুফন অতন্দ্র প্রহরীর মতো বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়ে কোন আক্রমণকেই স্কোরবোর্ডে অনুবাদ করতে দেননি। একজন "গ্রেইট ওয়াল অব চায়না" তো আরেকজন "মাউন্ট এভারেস্ট" এর মতো রিয়াল আর গোলের মধ্যে দাঁড়িয়ে ছিলেন।


লিচিস্টেইনারকে নামানোর ফলে ইউভে লপসাইডেড(রাইটসাইডেড) ৩-৩-২-২ এ রূপ নেয়। লিচিস্টেইনার, বেনাশিয়া আর কিয়েলিনির সমন্বয়ে ব্যাকলাইন। সান্দ্রো খানিকটা উইঙ্গব্যাকের মতো খেলছিলেন। খেদিরা ভোলান্তের মতো ফরোয়ার্ড রান নিচ্ছিলেন, খেদিরা নীচে নেমে আসলে ফলস ৮ এর মতো ফরোয়ার্ড রান নিচ্ছিলেন মাতুইদি। ফলে কেউ না কেউ উপরে থাকছিলেন এরফলে মাঞ্জুকিচ হিগুয়েনের পাশাপাশি  বক্স স্ট্রাইকারের মতো খেলছিলেন। ডগলাস কস্তা ডান দিকে চেপে খেলছিলেন ফলে ইউভে ট্যাক্টিকালি ৩-৩-২-২ রূপান্তরিত হয়।

এই ট্যাক্টিকাল বৈচিত্র‍্য ঠিক যুঝতে পারেনি রিয়াল। তাই  রিয়ালের আক্রমণ খানিকটা ঝিমিয়ে গেলে ইউভে স্রোতের বিপরীতে কাউন্টার করে, কস্তা আর খেদিরার সমন্বয়ে মাঞ্জুকিচ আরেকটি গোল করে বসেন। যদিও এই গোলে নাভাসের বাজে গোলকিপিং এরও অবদান আছে।

২৭ মিনিটে ২-০। এরপর রিয়াল আবার আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে কিন্তু লাভ হয় না। এই অর্ধে ডায়মন্ড ফর্মেশনের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা উইঙ্গে ২ বনাম ১ এর সম্পূর্ণ সুবিধা আদায় করে ইউভে মার্সেলো আর কার্ভাহালকে দিশেহারা করে।

দ্বিতীয়ার্ধে জিদানের ফর্মেশন পরিবর্তন এবং ইউভের কামব্যাক সম্পূর্ণ


খেলার অবস্থা বেগতিক দেখে জিদান দ্বিতীয়ার্ধে জাদুর মন্ত্রে কতবার যে খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছেন তার হিসাবের ইয়ত্তা নেই। এই ইউভেই গত ফাইনালে তার শিকার। এবারও জিদান তার সেই জাদুর কাঠি প্রয়োগ করলেন, ৪-৪-২ ডায়মন্ড থেকে ৪-৪-২ ফ্ল্যাটে রূপান্তর করলেন দলকে। দুই তুরূপের তাস এসেন্সিও ও ভাস্কেজকে দুই উইঙ্গে নামিয়ে দেন। এবং ইস্কো রোনালদোর পিছে সেকেন্ড স্ট্রাইকার রোলে প্লে-মেকিং করতে থাকেন, রোনালদো নামে চেপে যান ফলে রিয়ালকে লপসাইডেড(লেফটসাইডেড) ৪-৪-১-১ দেখাচ্ছিল।


রিয়াল এবারও উইঙ্গ ধরে মুহুর্মুহু আক্রমণ করতে থাকে, এসেন্সিও আলাদা মাত্রা যোগ করেন, ভাস্কেজ যথাসম্ভব সাহায্যে করছিলেন দিশেহারা কার্ভাহালকে।

আবারও স্রোতের বিপরীতে কাউন্টার ইউভের, মাঞ্জুকিচের শট নাভাসের হাতে, বাজে গোলকিপিং এবং সম্পূর্ণ সুযোগ নিলেন মাতুইদি। ঘণ্টার কাটার মাথায় ৩-০। "ক্যামব্যাক কমপ্লিট", বুফনের গগণবিদারী চিৎকার আর উল্লাস!

মদ্রিচের বেগতিক অবস্থা দেখে আরেক ক্রোয়েশিয়ান কোভাচিচকে নামিয়ে দেন জিদান, রিয়াল লপসাইডেড ৪-৪-১-১ রক্ষা করে।


এরপর মাদ্রিদের আক্রমণ চলতে থাকে, স্রোতে বিপরীতে ইউভের কিছু কাউন্টার। এরকম সময় অতিরিক্ত সময়ে রোনালদোর অসাধারণ হেডে বাড়ানো বল ভাস্কেজের পায়ে, ফাউল করেন বেনাশিয়া। পেনাল্টি দেন রেফারী, মেজাজ হারিয়ে লাল কার্ড দেখেন বুফন।

পেনাল্টি কি বৈধ ছিল?


ভাস্কেজকে যখন ফাউল করা হয় তখন তিনি ডি বক্সে গোলস্কোরিং অবস্থানে, এরূপ অবস্থায় ফাউলটি অব্যশই পেনাল্টি হবে, রেফারী তাই-ই দিলেন। এবং পেনাল্টি নিলেন রোনালদো তার বিশ্বস্ত ডান পায়ে, চ্যাম্পিয়ন্স লীগের ইতিহাসে যার পেনাল্টি রেশিও ঈষর্ণীয় সে কি মিস করে? হলোও গোল। 

১-৩, এগ্রিগেটে ৪-৩। টানা অষ্টমবারের মতো সেমিফাইনালে রিয়াল, শেষ ৫ বছরে ৪ টি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ের হাতছানি! তবে ইতালিয়ান চ্যাম্পিয়নরা লড়াই করে গেলে শেষ পর্যন্ত, ওল্ড লেডিরা যে সহজে হাল ছাড়ে না!

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন