ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার: নেপথ্যের নায়ক

ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার: নেপথ্যের নায়ক
Abdullah Rumi Shishir March 14, 2017, 5:38 pm Articles

কাওকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় যে, ১৯৯৮ সালে ফ্রান্সের বিশ্বকাপ জয়ের নায়ক কে ছিলেন? অথবা আন্তর্জাতিক ফুটবলে স্পেন এর সফলতার অন্যতম কান্ডারী কারা? প্রথম ক্ষেত্রে মোটামুটি শতভাগ উত্তর আসবে "জিনেদিন জিদান" আর দ্বিতীয় ক্ষেত্রে "জাভি/ইনিয়েস্তা/ভিয়া"। খুব কম মানুষই প্যাট্রিক ভিয়েরা কিংবা সার্জিও বুসকেটস এর নাম নিতে পারেন। এমন কি যদি প্রশ্ন করা হয় কাওকে যে "১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপ জয়ে ভিয়েরা কিংবা ২০১০ এর বিশ্বকাপ জয়ে বুসকেটস এর অবদান কেমন ছিল বলে আপনি মনে করেন?" সেক্ষত্রে এমন উত্তরও পাওয়া যেতে পারে যেমন," হাহ!! ওদের আবার কি অবদান, ওদেরকে তো শুধু দেখতাম মিডফিল্ডে বল কেড়ে নেয়ার জন্যে প্রতিপক্ষের প্লেয়ারদের সাথে মারামারি করছে... গোল তো করেন তেমন একটা..... গোল না করলে ফুটবল খেলায় আবার নায়ক হয় কিভাবে, শিরোপা জয়ে অবদান রাখে কিভাবে??" সত্যিই তো তাই!! ফুটবল গোলের খেলা, যে গোল দিবে সেই নায়ক। একজন প্লেয়ার যাকে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বল দখলের যুদ্ধে লিপ্ত থাকতে দেখা যায় সে আবার কিভাবে নায়ক হয় ফুটবল খেলায়??? তবে একবার চিন্তা করে দেখুন, এই প্লেয়ার গুলো যদি প্রতিপক্ষের পা থেকে বল না কেড়ে নিতো, তবে জয়ের নায়কদের কাছে গোল করার জন্যে বল পৌছাতো কি করে? কিংবা আদৌ কি পৌছাতো?

মিডফিল্ডাররা ফুটবলের একটি অপরিহার্য অংশ যারা ব্যাতিত ফুটবল কল্পনাতীত। মিডফিল্ডারদের ভূমিকা কি সেটা আর নতুন করে বলার কোনো প্রয়োজন নেই। কয়েকদিন আগেই বার্সেলোনার হেক্সাজয়ী কোচ এবং বর্তমান ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা তো বলেই বসলেন, " আমি মিডফিল্ডার পছন্দ করি, আমি যদি ১১ জন মিডফিল্ডার নিয়ে খেলতে পারতাম, আমি তাই করতাম!!" এ থেকেই বোঝা যায় মিডফিল্ডাররা ফুটবলে কত গুরুত্বপূর্ণ। আজ যাদের কথা বলবো তারাও মিডফিল্ডার। তবে কাকা, ইনিয়েস্তা কিংবা জিদান এর মতো মুহুর্মুহু আক্রমণে যেতে দেখা যায়না। আবার বেকহাম, পিরলোর কিংবা টনি ক্রুসদের মতো নিখুঁত নিশানার লং পাসিংও এদের সবার থাকেনা। তবে তাদের ভূমিকাটা আসলে কি? এই মিডফিল্ডাররা, যাদেরকে মূলত বলা হয় "ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার" এদের কাজ মিডফিল্ডে প্রতিপক্ষের কাছ থেকে বল দখল করে নিজেদের আওতায় আনা এবং আক্রমণের সূচনা করা। তবে শুধুই কি বল দখল তাদের কাজ? এই মিডফিল্ডাররা আরো যেই কাজ তা করেন তা হলো ডিফেন্স লাইনের সামনে ঢাল হয়ে কাজ করা যা একটা দলের ডিফেন্ডারদের কাজ অনেক সহজ করে দেয়। অনেক সময় দেখা যায় কর্নার কিকের সময় দলের সেন্টার ব্যাক/মেইন ডিফেন্ডাররা প্রতিপক্ষের ডি-বক্সের ভিতরে চলে আসেন। সেক্ষেত্রে তাদের ফাঁকা রেখে আশা রক্ষণ সামলানোর কাজ করেন এই ডিফেন্সিভ মিল্ডফিল্ডাররা যা কর্নার কিকের পর প্রতিপক্ষের আচমকা প্রতি-আক্রমণ ঠেকাতে সাহায্য করে। এছাড়াও তারা সিমুলেটর হিসাবে দলের ডিফেন্স আর ফরওয়ার্ড লাইনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে থাকেন।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই বিভিন্ন দলের সফলতার অনেকখানি নির্ভর করে এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এর পারফরম্যান্সের উপর। উদাহরণস্বরূপ এই মৌসুমের দুর্দান্ত চেলসির কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। গত মৌসুমে ধুঁকতে থাকা চেলসি এই মৌসুমে রীতিমত অপ্রতিরোদ্ধ। এই সফলতার পিছনের কারণ যদি দেখা হয়, তবে প্রথমেই আসবে নব-নিযুক্ত কোচ এন্টোনিও কন্তের কথা। তার ক্ষুরধার ট্যাক্টিক্স শুধুমাত্র চেলসিকেই সাফল্যই এনে দেয়নি, অনেকের মতে এই মৌসুমে ইংলিশ প্রিমিয়ার লীগে সবচেয়ে আকর্ষণীয় ফুটবল চেলসিই উপহার দিয়েছে। চেলসির এই সফলতা কিংবা কোচ কন্তের ট্যাক্টিক্স সফলভাবে প্রয়োগের জন্য যে প্লেয়ারটির ভূমিকা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সে হলো গত মৌসুমে লিস্টার রূপকথার জন্ম দিয়ে এই মৌসুমে চেলসিতে আসা ফরাসি ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এনগোলো কান্তে। তিনি গোলের পর গোল করেন নাই, গোলে সহযোগিতাও নিত্তান্তই কম। তিনি তাহলে কি করেন যার জন্যে চেলসি এই মৌসুমে এতো দুর্দান্ত? উত্তর: তিনি বল দখল করেন, আর এই কাজটা কান্তে এতটাই সফলতার সাথে করে থাকেন যে এই কারণে চেলসির বাকি প্লেয়ারদের কাজ অনেকটাই সহজ হয়ে যায়। এই মৌসুমে কান্তের ট্যাকল সংখ্যা ২৬৯ যার মধ্যে ৭০% সফল। তার এই বল দখলে সফলতা কন্তের ট্যাক্টিক্স কে আরো ভয়ংকর করে তোলে যার ফলে চেলসি এখন পর্যন্ত লীগে শীর্ষস্থান ধরে রেখে চলেছে।

ঠিক কি কি দক্ষতা একজন খেলোয়াড়কে একজন দক্ষ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসাবে গড়ে তোলে? পৃথিবীর সমস্ত বিখ্যাত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারদের মধ্যে যে গুণগুলো সাধারণত প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যেত এবং এখনও যায় তা হলো ফিজিক্যাল স্ট্রেংথ এর সাথে "ইন্টারসেপশন" এবং "ট্যাকলিং"। এই দুই দক্ষতার বলে এক জন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের প্লে-বিল্ডআপে বাধা দেয়া এবং বল নিজেদের আওতায় এনে নিজেদের আক্রমণের সূচনা ঘটাতে পারে। এর সাথে নিখুঁত লং পাসিং, দুর্দান্ত ভিশন আর গেম রিড করতে পারার ক্ষমতাসমৃদ্ধ একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার যেকোনো দলের জন্যে অমূল্য সম্পদ।

যেই সমস্ত ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা নিজেদেরকে আলোকিত করতে পেরেছেন অন্যতম ফ্রান্সের ১৯৯৮ বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য প্যাট্রিক ভিয়েরা। এছাড়াও আছেন ১৯৮২ এর ব্রাজিলের সক্রেটিস, স্পেনের জাভি আলোনসো, ইতালির ড্যানিয়েল দি রসি প্রমুখ আরো অনেকে। ফ্রান্সের ক্লদিও ম্যাকেলেলে এই পজিশনের অনেক বিখ্যাতদের একজন , এমন কি তার রোলটাকে ফুটবলে অনেকে "ম্যাকেলেলে রোল" কিংবা "ম্যাকেলেলে পজিশন"ও বলে থাকেন।

বর্তমানে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসাবে যারা নাম কুড়িয়েছেন, তাদের মধ্যে স্পেন ২০০৮ ও ২০১২ ইউরো এবং ২০১০ বিশ্বকাপজয়ী দল এবং বার্সেলোনার ড্রীমটিমের অপরিহার্য অংশ সার্জিও বুসকেটস এর নাম সবার প্রথমেই বলতে হয়। এছাড়াও রয়েছেন বর্তমান ইউরোপের সব চেয়ে দামী খেলোয়াড় ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ফরাসি মিডফিল্ডার পল পগবা, জার্মানির বাস্তিয়ান শোয়েনস্টাইগার, ইতালির জেনারো গাত্তুসো, আর্জেন্টিনার হাভিয়ের মাশ্চেরানো, চিলির আর্তুরো ভিদাল, বেলজিয়ামের নাইনগোলান, চেলসির এনগোলো কান্তে প্রমুখ খেলোয়াড়েরা।

সাম্প্রতিক সময়ে যে সমস্ত তরুণ ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা ভবিষ্যতে মাঠের এই গুরুত্বপূর্ণ জায়গাটি আলোকিত করার বার্তা দিয়ে যাচ্ছেন তাদের মধ্যে ইতালির মার্কো ভেরাত্তি এবং ম্যানুয়েল লোকাতেল্লির কথা অবশ্য বলা প্রয়োজন। ভেরাত্তি ইতিমধ্যে প্যারিস সেইন্ট জার্মেইনে তার আলো ছড়াচ্ছেন অন্যদিকে লোকাতেল্লি মাত্র ১৯ বছর বয়সে এসি মিলানের অন্যতম মিডফিল্ড ভরসার নাম। নাপোলির আমাদৌ দিওয়ারা, রিয়াল মাদ্রিদ ও ব্রাজিলের কার্লোস কাসেমিরো, ব্রাজিলের অলিম্পিকজয়ী দলের ওয়ালেস, আর্জেন্টিনা ও রোমা মিডফিল্ডার লিয়ান্দ্র পারেডেস, বার্সেলোনা একাডেমির সার্গি সাম্পাররাও ভবিষ্যতের আগমনীবার্তা দিয়ে যাচ্ছেন।

অনেক সময় অনেক সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারও ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডারের কাজ অত্যন্ত দারুণভাবে করে থাকেন। এদের মধ্যে রিয়াল মাদ্রিদ ও জার্মান স্নাইপারখ্যাত টনি ক্রুস এবং একই ক্লাবের ক্রোয়েশিয়ান লুকা মদ্রিচ অন্যতম।

ফুটবল গোলের খেলা হলেও আধুনিক ফুটবলে সেই গোলের জন্যে শুধু মাত্র "গোল-স্কোরার" ছাড়াও আরো অনেক কিছুর প্রয়োজন। তবে দিন শেষে শুধু গোল স্কোরার কেই মানুষ মনে রাখে, কিন্তু জয়ের নেপথ্যে যারা অনন্য ভূমিকা পালন করে যায়, তাদের আর কজনইবা মনে রাখে ? বছরের পর বছর এই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডাররা তাদের নৈপুণ্যের মাধ্যমে দলকে সাফল্যের রাস্তায় তুলে দিলেও দিন শেষে মানুষ তাদের একটি ভুলের জন্যে হলুদ কার্ড পাওয়াকেই মনে রাখবে। তবে এরাই ফুটবলের সবচেয়ে বড় হতভাগা? 





Similar Post You May Like

Find us on Facebook