বার্সেলোনা বনাম চেলসিঃ ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস

বার্সেলোনা বনাম চেলসিঃ ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস

চ্যাম্পিয়নস লীগের শেষ ১৬ এর প্রথম লেগে চেলসির ঘরের মাঠ স্ট্যামফোর্ড ব্রিজে মুখোমুখি হয়েছিল বার্সেলোনা এবং চেলসি। বহুল প্রতিক্ষীত, উত্তেজনাপূর্ন ম্যাচে ঘরের মাঠে চেলসির সাথে ১-১ গোলে ড্র করে মহামূল্যবান একটি এওয়ে গোল নিয়ে বাড়ি ফেরে বার্সেলোনা।

বার্সা কোচ ভালভার্দে তেমন কোন এক্সপেরিমেন্টে না গিয়ে তার প্রেডিক্টেবল একাদশ নামান। সেখানে চেলসি ৩-৪-৩ ফরমেশনে স্টার্ট করে যেখানে হ্যাজার্ডকে উপরে ফলস নাইন হিসেবে খেলানো হয়। আরো একটু অবাক করা ব্যাপার হল মোরাতা ও জিরুডের বেঞ্চে থাকা।

স্টার্টিং লাইনআপঃ

চেলসি (৩-৪-৩)ঃ কর্তোয়া, আজপিলিকুয়েটা, ক্রিসটেন্সেন, রুডিগার, আলোনসো, ফ্যাব্রিগাস, কান্তে, মসেস, পেদ্রো, উইলিয়ান, হ্যাজার্ড।

বার্সেলোনা (৪-৪-২) ঃ স্টেগান, রবার্তো, পিকে, উমতিতি, আলবা, বাস্কুয়েটস, রাকিটিচ, ইনিয়েস্তা, পৌলিনহো, মেসি, সুয়ারেজ।



ম্যাচের শুরু থেকেই বার্সা ম্যান ওরিয়েন্টেড প্রেসিং এর মাধ্যমে চেলসিকে তাদের পিছন থেকে খেলতে বাধা দেয়। বাধ্য হয়ে পিছন থেকে লং বলগুলোকে কাজে লাগিয়ে আক্রমণের চেষ্টা চালায় চেলসি। এবং যখনই চেলসি লং বলগুলো সাপ্লাই দিচ্ছিল একজন প্রোপার ফিজিকাল নাম্বার নাইনের অভাবে বারবার পজেশন হারাচ্ছিল। ফলস্বরূপ বার্সা যখন পজেশন, মিডফিল্ড কন্ট্রোলে রেখে আক্রমন করছিল চেলসি সেই সময় নিজেদের ডিফেন্সিভ শেপ বজায় রাখার দিকে নজর দেয়।



এ ম্যাচে অফ দ্যা বল চেলসির ফরমেশন হয়ে যায় ৫-৪-১ যেখানে পেদ্রো এবং উইলিয়ানকে নিচে ড্রপ করা হয়। মিডফিল্ড লাইনকে ন্যারো করে দুই উইংব্যাককে দিয়ে প্রেসিং শুরু হয়। ৫-৪-১ ফর্মেশনে মিডফিল্ড ক্রাউডেড রেখে আবার দুই দিকেও স্পেস দেয়া হয় বার্সাকে।



এখন কথা হল মিডফিল্ডকে ক্রাউডেড রেখে আবার দুই পাশে স্পেস দেয়ার কারণটাই বা কি?

বার্সার প্রধান শক্তিই হচ্ছে তাদের ডায়মন্ড শেপ মিডফিল্ড এবং মেসি এই দুইয়ের সমন্বয়। তাদের দলে বর্তমানে এমন কোন কোয়ালিটি উইংগার নেই বা ইনজুরির কারণে দলে নেই যারা দুই উইং এ এই বিশাল স্পেসের ফায়দা নিতে পারবে। বার্সা স্বভাবতই মাঝমাঠ দখল করে স্পেস ক্রিয়েট করতে চেয়েছে দুইদিকেই গ্যাপ থাকা সত্তেও।

কন্তে বেচারা আর কি করবে এ্যাটাক না করলে। শিষ্যদের হুকুম দিলেন, “যাও বাপু মিডফিল্ড সামলাও। বাকি জায়গা উইংব্যাকরা দেখছে। “



এবার ট্যাকটিশিয়ানের আরেক ট্যাক্টিক্স দেখি। মেসি পৃথিবীর যে কোন ডিফেন্স, যে কোন দলের জন্য ডি-বক্স এর কাছে হুমকি। মেসির ক্ষেত্রেও পরিকল্পনা করলেন তাকে ডিপে খেলাতে বাধ্য করার। চেলসির ন্যারো মিডফিল্ড বার্সার ডায়মন্ড মিডফিল্ডকে কভার দেয়ার পাশাপাশি মেসিকেও কভা্র দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। আর সেই ম্যাচে মেসিকে ম্যান মার্কিংয়ের পরিবর্তে জোনাল মার্কিংয়ে রাখা হয়। এত ন্যারো মিডফিল্ডের জন্য স্পেস না পেয়ে বাধ্য হয়ে মেসিকে বারবার ডিপে চলে যেতে হয় বল রিসিভের জন্য।




বাধ্য হয়ে প্ল্যান এ বদল আনে বার্সা। নিজেদের ন্যারো মিডফিল্ড লাইনকে আরো ছড়িয়ে দেয় তারা। তখন তাদের মিডফিল্ড শেপ ন্যারো ডায়মন্ডের থেকে ওয়াইড ডায়মন্ডের মত দেখায়। তাদের প্ল্যান ছিল তাদের মিডফিল্ডের কারণে যেন চেলসি তাদের মিডফিল্ড লাইন কে আরো প্রসারিত করে, যাতে সহজে আরো গ্যাপ এবং পাসিং লেন তৈরি করা যায়।




এ পরিবর্তনও কোন কাজে দেয়নি বলাই যায়। চেলসি তাদের ন্যারো মিডফিল্ডকে প্রসারিত না করে বার্সার কোন  প্লেয়ারের কাছে বল গেলেই অথবা বার্সা পজেশন পেলেই যে সাইডে পজেশন সে সাইডে একসাথে জোনাল ডিফেন্ডিং শুরু করে। এর ফলে অপর পাশে থাকা ফ্রি প্লেয়ার সামনে আগানোর সুযোগ পেয়ে যায়।

এতক্ষণে যা দেখা গেল, অন্য সাইডে কুইক শিফট ছাড়া বার্সার গোলমুখ খোলার উপায় ছিলনা। আর চেলসির ডিফেন্সিভ অর্গানাইজেশন...... অসাধারণ।

বার্সা যেমন চেলসির অর্গানাইজড ডিফেন্সের জন্য গোলের জন্য হাহুতাশ করেছে, পক্ষান্তরে চেলসির জন্যই বেশি সুযোগ ছিল গোল করার। অবশ্য দূর্ভাগ্যও তাদের সঙ্গী ছিল। উইলিয়ানের দুই দুইটি শট পোস্ট এ লেগে ফিরে আসে।

 

ভালভার্দের বার্সার একটা দূর্বলতা হল যখন অপজিশন টীম ডিফেন্স থেকে এ্যাটাকে কোন কুইক মুভ করে কাউন্টার করে সে এ্যাটাক গুলো থামাতে বার্সা হিমশিম খায়। এবং চেলসি এই ডিফেন্স থেকে এ্যাটাকে এ কুইক মুভগুলোই কাজে লাগিয়ে গোলের সুযোগ গুলো তৈরি করেছে। যতবারই ডিপ থেকে পাস দিয়ে ১ vs ১ সিচুয়েশন তৈরি হয়েছে ততবারই চেলসি গোলের জন্য বড় ধরনের স্পেস তৈরি করেছে। এ জন্যই ফ্রন্ট থ্রি হিসেবে পেদ্রো, হ্যাজার্ড এবং উইলিয়ানকে ব্যবহার করা হয় কারণ তারা তাদের স্পিডের সাথে গ্যাপকে ব্যবহার করে ডিফেন্সকে খুব দ্রুত ভাঙতে পারে।

এখন প্রশ্ন আসতে পারে পেদ্রো এবং উইলিয়ান কেন দলে?

আপনি যদি একজন প্রোপার নাম্বার নাইনকে খেলান সে কখনোই আপনার ডিফেন্সিভ রোলই সবসময় পারফর্ম করতে পারবেনা। যদি কন্তে একজন প্রোপার নাম্বার নাইন খেলাতেন ফরমেশন হত ৫-৩-২। তার মানে মিডফিল্ড হয়ে যাচ্ছে ৩ জনের। ফ্যাব্রিগাস, কান্তে, উইলিয়ান। ফল হত বার্সার মিডফিল্ড ডমিনেশন।

হ্যাজার্ডকে উপরে খেলানোর ফলে চেলসি প্রয়োজনমত ৪ জনের মিডফিল্ডও তৈরি করতে পারছে এবং পেদ্রো, উইলিয়ানও ডিফেন্সিভ রোলও প্লে করছে।

যার ফল দুইবার পোস্টে হিট করার পর ৬২ মিনিটে উইলিয়ানের গোল।

কর্নার পেল চেলসি। শর্ট কর্নার হল। উইলিয়ান ওই সময় ফুল আনমার্ক দাড়িয়ে ছিলেন। কেউ যেন খেয়ালও করেনি তিনি আনমার্ক। চেলসি প্রায়শই এমন কর্নার নেয়। কিন্তু সেখান্র থাকে সাধারণত পেদ্রো।



যেহেতু উইলিয়ান আনমার্ক, যথেষ্ট সময় নিয়ে করা বাকানো দূর্দান্ত শট......

চেলসি ১-০ বার্সা।


শেষ অবধি অবশ্য জয় নিয়ে ফেরা হয়নি চেলসির। চেলসির পুরো ম্যাচে বড় ভুল বলতে ওই একটিই ছিল। ক্রিস্টেন্সেনের সেই ভুলে মেসির লং রেঞ্জ শট এবং স্কোরলাইন ১-১।

শেষ বাশি বাজার পর স্কোর, চেলসি ১-১ বার্সেলোনা। এমন ম্যাচের পর তারা একটি মহামূল্যবান অ্যাওয়ে গোল ঝুলিতে পুরে খুশি মনেই বাড়ি ফিরবে নিশ্চিত করে বলাই যায়। কিন্তু আপনার কন্তেকে ধন্যবাদ জানাাতেই হবে এমন সুন্দর ট্যাক্টিক্স উপহার দিয়ে ভালভার্দের প্ল্যান এবং বার্সার মিডফিল্ডকে নিষ্ক্রিয় করে রাখার জন্য।

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন