ক্লদ ম্যাকালেলে: ফুটবলের ব্লাক ডায়মন্ড।

ক্লদ ম্যাকালেলে: ফুটবলের ব্লাক ডায়মন্ড।

বিশ্ব ফুটবলে দুই জন মাত্র প্লেয়ার আছে যাদের নামে ফুটবলের পজিশন বা কৌশলের সাথে মেশাতে পেরেছেন। ইয়োহান ক্রুইফ বিখ্যাত হয়ে আছেন তার ক্রুইফ টার্ন দিয়ে এবং ক্লদ ম্যাকালেলে অবশ্য কোন কৌশল বের করতে পারেন নি, তিনি যে পজিশনে খেলতেন সে পজিশনের নামই পরিবর্তন করে দিয়েছেন। "দ্যা ম্যাকালেলে রোল" ফুটবল সম্পর্কে একটু জানাশোনা মানুষ অবশ্যই যে রোলের নাম জানে। অথচ ম্যাকালেলে ছিলেন না কোন বিশেষ ক্যাটাগরির প্লেয়ার, খেলার মধ্যে তেমন শৈল্পিক সৌন্দর্য ছিলো না, ছিলো না কোন নিজস্ব স্কিল এমনকি লং পাসেও তার সমস্যা ছিলো। সাধারনত ডিফেন্সিফ মিডফিল্ডার পজিশনে খেলা প্লেয়ারদের মাঠে খাটতে হয় কলুর বলদের মত। একজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলা প্লেয়ারকে যেমন নিতে হয় দলের রক্ষনের দায়িত্ব তেমনি মাঝমাঠ থেকে প্রতিপক্ষের আক্রমণ নষ্ট করা একইসাথে উপরে বল পাঠানোর মত কাজগুলো তাকেই করতে হয়। খেলায় না থাকে জৌলুস না থাকে চোখ ধাঁধানোর ফুটবল। তবে ক্লদ ম্যাকালেলে এই পজিশনে এমনটাই প্রভাব ফেলেছিলেন যার কারনে এখনো এই পজিশনের ফুটবলার লাইমলাইটে আসে।


ম্যাকালেলের ক্যারিয়ার শুরু হয় ফ্রেঞ্চ ক্লাব নঁতে তে। সেখানে পাঁচ বছর খেলে নঁতের হয়ে যেমন লীগ শিরোপা জেতেন তেমনি দলকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগের সেমিতে নিয়ে গিয়েছিলেন, তবে সেবার জুভেন্টাসের কাছে হেরে  বিদায় নেবার পর ম্যাকলেলে পাড়ি জমান স্পেনের ক্লাব সেল্টা ভিগোতে। সেল্টা ভিগোর মত ক্লাবে এসে বড় মঞ্চে নিজেকে প্রমান করার সুযোগটা ফেলে দেননি ম্যাকলেলে। সেভিয়া ও লিভারপুলকে হারানো ম্যাচগুলোতেই মুলত তাকে জনপ্রিয় করে তোলে। তখনকার সময়ে রিয়াল মাদ্রিদের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজ মাদ্রিদকে ভয়াল রুপ ধারন করাতে ব্যস্ত। তার চোখ যায় ম্যাকালেলের প্রতি। যদিও প্রথমে সেল্টা ভিগোর সভাপতি ম্যাকালেলেকে না বিক্রি করাতে বদ্ধপরিকর, কিন্ত একটা কথা আছে পেরেজের নজর যার উপর পরে সে মাদ্রিদে আসেই। মাত্র ১৪ মিলিয়ন ইউরোর বিনিময়ে ম্যাকালেলে রিয়াল মাদ্রিদে আসেন ২০০০ সালে। 

তৎকালীন সময়ে রিয়াল মাদ্রিদে চলছে গ্যালাক্টিকোস যুগ। কিন্ত তাদের দলে প্রধান সমস্যা ছিলো তারা প্রত্যেক ম্যাচেই গোল হজম করতো, তাই ভিসেন্তে দেল বক্সের কপালে ছিলো চিন্তার ভাঁজ। কিন্ত ম্যাকালেলে মাদ্রিদে যোগ দিলে দেল বক্সের চিন্তা নিমিষেই দুর হয়ে যায়। দেল বক্সের অধীনে ম্যাকলেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডের নতুন এক রুপ দেখালেন। তার লং শর্ট খেলার স্কিল কম ছিলো, কিন্ত মাঝমাঠে ছোট ছোট পাসে পাসিং ফুটবল খেলে প্রতিপক্ষের প্লেয়ারদের অস্থির করে তুলতেন। তার কাজ ছিলো শুধু মাদ্রিদকে গোল থেকে বাচাঁনো। তাই সবাই যখন উপরে গিয়ে আক্রমনের সাহায্য করতো ম্যাকালেলে মাঝমাঠ অতন্দ্র প্রহরীর মত পাহারা দিতো যাতে বিপক্ষ দল পাল্টা আক্রমন করলে সেটা মাঝমাঠেই নষ্ট করা সম্ভব হয়। 

২০০৩ সালে যখন রোনালদো, গুতিরা নিজেদের বেতন এবং সাথে কন্ট্রাক্ট বাড়িয়ে নেয়, ম্যাকালেলেও এমনটা চেয়েছিলেন। কিন্ত টিপিক্যাল ব্যবসাটা ঠিক রকম বোঝা পেরেজ এতে রাজি হন নি। সেবার বিক্রি করে দেন চেলসির কাছে। ম্যাকালেলের ট্রান্সফারের পর জিদান দুঃখ করে তার  সম্পর্কে বলেছিলেন," আপনার বেন্টলি গাড়িতে আরেক পড়ত সোনালী রং লাগিয়ে লাভ কি যদি আপনি পুরো ইঞ্জিনটাই হারান"।

চেলসিতে যাবার পর প্রথম সিজনে ম্যাকালেলে তেমন সুবিধা করতে পারেন নি। পরের সিজনে মোরিনহো আসলে তার ছোঁয়াতে চেলসির মিডফিল্ড যেন ভোজবাজির মত পাল্টে যায়। ল্যাম্পার্ড, বালাকা ও ম্যাকালেলেকে নিয়ে গড়ে তোলের তৎকালীন অন্যতম সেরা মিডফিল্ডত্রয়ী যেখানে দুর্দান্ত টিম বানিয়ে ম্যাকালেলের বিদায়ের পর রিয়াল মাদ্রিদ কোন শিরোপাই জেতে নি। চেলসিতে ছিলেন পাঁচ বছর, জিতেছেন লীগ শিরোপা, চ্যাম্পিয়নস লীগের ফাইনালেও একবার পৌছেছিলেন কিন্ত সেবারও শিরোপা স্পর্শ করা সম্ভব হয় নি।  ২০০৮ থেকে ২০১০ পর্যন্ত পিএসজিতে খেলে ম্যাকালেলে তার কিংবদন্তী ক্যারিয়ারের ইতি টানেন।


শুধু ক্লাব ফুটবলের সাথে নয়। ফ্রান্সে জাতীয় দলের হয়েও তার পারর্ফমেন্স ছিলো ক্লাবের মতই ধারাবাহিক। ১৯৯৮ বিশ্বকাপ ও ২০০০ সালের ইউরো জিতেছেন ফ্রান্সের হয়ে। ২০০৪ সালে একবার অবসর নিলেও ২০০৬ সালের বিশ্বকাপের জন্য ফিরে আসেন এবং ফ্রান্সকে ফাইনালে তুলতে গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা পালন করেন। যদিও সেবার ইতালির কাছে ফাইনালে ফ্রান্স হেরে যায় এর দুইবছর পর ইউরো গ্রুপ পর্ব থেকে ফ্রান্স বিদায় নেবার পর জাতীয় দল থেকে তিনি পাকাপাকিভাবে বিদায় নেন। 

 ম্যাকলেলে মোরিনহোর সাথে চেলসিতেই মুলত তার ক্যারিয়ারের সেরা সময় পার করেছেন। এখানেই আবিষ্কৃত হয়েছে বিখ্যাত "দ্যা ম্যাকালেলে রোল"। এ পজিশন সবথেকে বেশি কাজে দেয় ৪-৩-৩ ফর্মেশনে। যেখানে দুজন মিডফিল্ডার সেন্ট্রাল মিডফিল্ডের দায়িত্বে থাকেন এবং বাকিজন থাকেন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার পজিশনে এবং মোরিনহোর টিমে এই রোলই প্লো করতেন ফরাসী কিংবদন্তীকে দিয়ে। ৪-৪-২ ফর্মেশনে বুঁদ হয়ে থাকা মোরিনহোর ৪-৩-৩ ফর্মেশন ছিলো যেমন চমকপ্রদ তেমনি ফলপ্রুস। যার কারনে অর্ধশত যুগ পরে চেলসি জেতে প্রিমিয়ার লীগ। ম্যাকলেলে তার ক্যারিয়রের কখনোই গোল করার দিকে মনযোগ দেন নি, প্রতিপক্ষের আক্রমনের সময় তাদের পা থেকে বল কেড়ে নেওয়া এবং জিদান,ফিগো অথবা দ্রগবা,ল্যাম্পার্ড কে পাস দেওয়াই ছিলো তার প্রধান কাজ। প্লেয়াররা এক তরফা এ্যাটার্কে গেলে তিনি মাঝমাঠে চীনের প্রাচীর তুলে পাহারা দিতেন। চেলসির আসল রক্ষনের আগেই যেন আরেক দুর্ভেদ্য পার করতে হতো প্রতিপক্ষকে। তিনি আক্রমন এবং রক্ষন সবসময়ই গভীরে গিয়ে খেলতে পছন্দ করতেন তাই মার্কিং এর শিকার না হয়ে মাঠের যেখানে ইচ্ছা সেখানে গিয়ে গেম বিল্ডআপ করতে পারতেন। যার কারনে শুধু মিডফিল্ডার নয় দলের ফুলব্যাকেরা বনে যেতেন উইংগার কারন সবাই জানতেন বিপদে রক্ষনে তাদের একজন "ম্যাকা" আছেন।

তার গতি ছিলো না, ড্রিবল, হেডিং পাওয়ার এবং লং পাসের মত স্কিল ছিলো না তার। তবে তার দারুন বুদ্ধিদীপ্ত কৌশলের ফুটবল দিয়ে যেমন তিনি ডিফেন্সিফ মিডফিল্ড পজিশনকে বানিয়ে গেছেন অার্কষনীয় তেমনি নিজে বনে গেছেন একজন "মিডফিল্ডা জেনারেল"। সার্জিও বুসকেক্টস, এনগোলো কান্তে, ক্যাসেমিরো আজ যে ডিফেন্সিফ মিডফিল্ডে আলো ছড়াচ্ছে তার পেছনে ম্যাকালেলের ভুমিকা তুলনাহীন। বর্তমান ফুটবলে কান্তেকে তার সাথে তুলনা করা হলেও গোল এসিস্টের অবহেলিত ইতিহাসের খাতায় উপরের দিকে নাম লেখানো ক্লদ ম্যাকালেলে সকল ডিফেন্সিফ পজিশনে খেলা ফুটবলারদের অবিসংবাদী গুরু।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন