রিয়াল মাদ্রিদ বনাম পিএসজিঃ ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস

রিয়াল মাদ্রিদ বনাম পিএসজিঃ ট্যাক্টিকাল এনালাইসিস

চ্যাম্পিয়নস লীগের এই মৌসুমের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে আকর্ষণীয়, উত্তেজনাপুর্ণ ম্যাচে শেষ ষোলর প্রথম লেগে সান্তিয়াগো বার্নাবুতে মুখোমুখি হয়েছিল বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রিয়াল মাদ্রিদ এবং প্যারিস সেইন্ট জার্মেই। পিছিয়ে পড়েও শেষ পর্যন্ত ৩-১ গোলের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বর্তমান চ্যাম্পিয়নরা।

দুই দলের কোচই তাদের সম্ভাব্য শক্তিশালী স্টার্টিং লাইনআপ ঘোষণা করে। তবুও দুই দলেই কিছু গুরুত্তপুর্ণ প্লেয়ারের অনুপস্থিতি ছিল। রিয়াল যেমন সাসপেনশন এর জন্য কার্ভাহাল কে মিস করেছে, ঠিক তেমনি পিএসজিতেও ডি মারিয়া, সিলভা, ড্রাক্সলারদের ছাড়াই একাদশ সাজিয়েছে। সবচেয়ে অবাক করা ডিসিশন ছিল ২১ বছর বয়সী মিডফিল্ডার জিওভানি লে সেলসোর স্টার্টিং এলিভেন এ থাকা।

স্টার্টিং লাইনআপঃ

রিয়াল মাদ্রিদঃ (৪-৩-১-২) নাভাস, রামোস, ভারানে, নাচো, মার্সেলো, ক্যাসেমিরো, ক্রুস, মড্রিচ, ইস্কো, রোনালদো, বেনজেমা।

প্যারিস সেইন্ট জার্মেইঃ (৪-৩-৩) আরিয়োলা, আলভেস, মারকুইনহোস, কিমপেমবে, ইউরি, ভেরাত্তি, রাবিওট, লো সেলসো, এমবাপ্পে, কাভানি, নেইমার।


কিকঅফ এর সাথে সাথেই রিয়াল মাদ্রিদ অতিথিদের উপর প্রেসিং শুরু করে অপনেন্ট এর ভুল করার জন্য। নিজেদের কৌশল কাজে লাগিয়ে মাত্র ৪০ সেকেন্ডের ভিতরেই কর্ণার আদায় করে নেয় রিয়াল।

ম্যাচে পিএসজি লেফটব্যাক ইউরির ডিফেন্সের সাথে ঠিকমত কোঅপারেট করতে না পারার দূর্বলতাকেই মূলত টার্গেট করে রিয়াল। পিএসজি ডিফেন্ডারদের মধ্যে ম্যাচের সবচেয়ে কম পাস কমপ্লিশন রেট ছিল ইউরির।

ম্যাচের শুরু থেকেই করা ম্যান অরিয়েন্টেড হাই প্রেসিং এবং পিএসজির উপর প্রেশার ক্রিয়েট করার ফলে মাদ্রিদ খেলায় ডমিনেট করতে থাকে। মাদ্রিদ যখনই বল হারায় তখনই পিএসজির নিজেদের অর্ধেও প্রেসিং করে বল দখলের চেস্টা চালায় মাদ্রিদ।

মাদ্রিদ খেলার শুরু থেকেই হাই ডিফেন্সিভ লাইন মেইন্টেইনের চেষ্টা করছিল এবং পিএসজির জন্য পিচকে ন্যারো করার চেষ্টা চালাচ্ছিল। খেয়াল করলে দেখবেন মাদ্রিদের সেন্টারব্যাকরা প্রায় হাফলাইনের কাছাকাছি ছিল বেশিরভাগ সময় এবং ফুলব্যাকরা পিচের উপরে উঠে প্রেসিং করায় মনযোগী ছিল।

ফলাফল হাতেনাতে পাওয়া যায়। হাই লাইন ডিফেন্সের ফলে এবং পিচকে ন্যারো করে দেয়ায় পিএসজি পিচের আরো ডিপে চলে যেতে বাধ্য হয়। প্রথম ১৫-২০ মিনিট মাদ্রিদ এভাবেই চাপ সৃষ্টি করতে থাকে এবং খেলার শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা চালায়।


২০ মিনিট পরই মাদ্রিদ তাদের পরিকল্পনা থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। পিএসজি আবিষ্কার করে এই হাইলাইন ডিফেন্সের পিছেই এক বিশাল গ্যাপ রয়ে গেছে যেখানে নিজেদের অর্ধ থেকে লং বল দিয়ে এই গ্যাপকে ব্যবহার করে গোলের সুযোগ তৈরি করা যায়। মাদ্রিদের হাই লাইন ডিফেন্সের মাঝে এ বিশাল গ্যাপ দিয়েই নিজেদের অর্ধ থেকে একের পর এক লং বল এবং নেইমার দূর্দান্ত ওয়েল টাইমড রানিং গোলের সুযোগ তৈরি করতে থাকে। আস্তে আস্তে মাদ্রিদ তাদের মূল ফোকাস থেকে সরে যায় এবং পিএসজি ম্যাচের দখল নিতে থাকে।


কিছুক্ষণ পরই রিয়াল ৪-৪-২ ফরমেশনে শিফট করে যেখানে ডিফেন্ডাররা ডিবক্স এর কাছাকাছি অবস্থান নেয়। পিএসজিও ঠিক একই সময়ে ৪-২-৩-১ ফরমেশনে শিফট করে যেখানে রাবিওটকে সিএএম পজিশন এ আরো এ্যাটাকিং জোনে পাঠানো হয়।

সেই ম্যাচে পিএসজি বেশির ভাগ আক্রমণই লেফট সাইড থেকে শুরু হয়। নাচো মূলত সেন্টারব্যাক হলেও কার্ভার অনুপস্থিতিতে সে ম্যাচে রাইটব্যাকের দায়িত্ব পালন করে। নেইমার পুরো ম্যাচে নাচোকে সমস্যায় ফেললেও সে ম্যাচে নাচো এবং সকল ডিফেন্ডাররা মিডফিল্ডের পুর্ন সহযোগীতা পেয়েছিল। নেইমার বারবার চেস্টা করছিল নাচোকে সিবিদের থেকে আলাদা করে ফেলতে। কিন্তু মাদ্রিদ মিডফিল্ড এবং ডিফেন্সের মধ্যে বলতে গেলে খুব অল্পই জায়গা রেখেছিল। এ অল্প জায়গার ফলেই মিডফিল্ডারা বারবার নিচে নেমে খুব দ্রুত ডিফেন্স কে সাহায্য করতে পেরেছে।


যখনই নেইমার নাচোকে আলাদা করে স্পেস তৈরি করতে চেয়েছে তখনই মড্রিচ মিড থেকে ডিফেন্স লাইনে এসে সেই স্পেস কভার দিয়েছে। রাইট সাইডে ঠিক একটু পরেই এমবা্পপেও ঠিক একই কাজ করছিল। মার্সেলোকে যখন কভার দিয়ে স্পেস তৈরি করছিল তখন ক্যাসেমিরো এসে সেই স্পেস কভার দেয়। দুই ক্ষেত্রেই বাকি তিনজন মিলে মিডফিল্ড লাইন বজায় রাখছিলেন।


 মাদ্রিদ যেমন তাদের ডিফেন্সের গ্যাপ খুব সুন্দরভাবে কভার দিয়েছে, উল্টোদিকে পিএসজি ঠিক এই স্পেসগুলোই খোলা রেখেছিল। তাদের ডিফেন্স এবং মিডফিল্ডের মধ্যে যে বড় গ্যাপ ছিল তা তারা কভার দিতে পারেনি সবসময়। এর ফলে বেশ কিছু গোলের সুযোগও পায় মাদ্রিদ কিন্তু কাজে লাগাতে পারেনি।

এর ভিতরেই পিএসজি তাদের প্রথম গোল পেয়ে যায়। রাবিওট কিন্তু ফরমেশন চেঞ্জ এর পরই সিএএম পজিশনে পাঠানো হয়। এমবাপ্পে যখন বল নিয়ে দৌড় শুরু করে তখন সে রিয়ালের দুইজন মিডের পিছনে ছিল। ঠিক এই সুযোগকেই কাজে লাগানো হয়। মদ্রিচ প্রথমেই ঘাড় ঘুরিয়ে রাবিওটকে দেখে নেয় এবং এরপরই বলের দিকে সামনে আগায়ঠিক এই সুযোগেই রাবিওট গোলের দিকে রানিং শুরু করে। মদ্রিচ যতক্ষণে খেয়াল করে ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। এমবাপ্পের পাস কাভানি ডামি করে নেইমারের কাছে পাঠায়। নেইমারের ব্যাকহিল করা পাসে রাবিওটের শট আগেই নিচু হয়ে যাওয়া নাভাস ফেরাতে পারেননি।


প্রথমার্ধোর শেষদিকে ক্রুস কে সেলসো ডিবক্সে ফাউল করায় পেনাল্টি দেন রেফারি।পেনাল্টি থেকে রোনালদো গোল করে দলকে ১-১ গোলের সমতায় ফেরান।

২য় অর্ধের মাঝামাঝি সময়ে উনাই এমরি কাভানিকে উঠিয়ে দানি আলভেসকে উইংগার পজিশনে পাঠিয়ে রাইটব্যাক মুনিয়েরকে নামান। নেঈমার এবং এম্বাপ্পে চলে যান লিডিং পজিশনে। জিদানও বেনজেমাকে উঠিয়ে বেলকে নামান। দুই দলই ৪-৪-২ ফরমেশনে চলে যায় এক অর্থে।

 খেলার ১০ মিনিট বাকি থাকতে জিদান তার আসল খেলাটা খেললেন। ক্যাসেমিরো এবং ইস্কোর জায়গায় নামালেন এসেন্সিও এবং ভাস্কুয়েজ কে। শেষদিকে আলভেস খানিকটা সেন্টারে চলে যান ফলে পিএসজির ফরমেশন দাড়ায় ৪-৩-১-২, যেখানে নেইমার ভিতরে চলে যায় এমবাপ্পের সাথে। পিএসজির এ পরিবর্তন দেখে  জিদান দ্রুত ৪-৪-২ ফ্ল্যাট বানিয়ে ওয়াইডে ২ vs ১ আউটনাম্বারিং সিচুয়েশন তৈরী করেন এসেন্সিও আর ভাস্কুয়েজের মাধ্যমে। এসেন্সিও বোধহয় মুনিয়েরের জন্য অতিরিক্ত হয়ে গিয়েছিল। তাকে থামাতে না পেরে কার্ডও দেখতে হয় তাকে। এই এসেন্সিওর পাসেই রোনালদো গোল করে স্কোর করেন ২-১।

২য় অর্ধেও পিএসজি তাদের ১ম অর্ধের ভুল শোধরাতে পারেনি। যে গ্যাপ তারা রেখেছিল ডিফেন্সের এবং মিডের মাঝে সেটিই তাদের কাল হয়ে দাড়ায়।


মার্সেলো পিএসজির দুই প্লেয়ারকে ফোর্স করায় বড়সড় গ্যাপ তৈরি হয়। ঠিক সেই সময় বেল গ্যাপ এর দিকে দৌড় দেয় এবং বলের জন্য সাড়া দেয়। বেল যখন পা্সিং লেনে চলে গেল তখনও পিএসজির একজন মিডফিল্ডারও পা্সিং লেন ব্লক করার চেষ্টাও করেনি। আবার মার্সেলো যখন ডিবক্স এর দিকে দৌড় দিচ্ছিলেন তখন কোন মিডফিল্ডার এমনকি সেন্টারব্যাকও তাকে ব্লক করেনি।

কি আর এমন হবে ব্লক না করলে......

মার্সেলোর ফিনিশ। রিয়াল ৩-১ পিএসজি।

পুরো ম্যাচ জুড়েই রিয়াল পিএসজির ভুলের কারণে অনেকবার ওপেন স্পেস পেয়েছে। একটি এমন ক্যালিবারের টীম কিভাবে ফুটবলের বেসিক ভুলগুলো করে এমন আসরে তা আসলেও বোধগম্য নয়। 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন