ফুলব্যাক পজিশনে আর্জেন্টিনার দুর্ভাগ্য নাকি প্লেয়ার তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা।

ফুলব্যাক পজিশনে আর্জেন্টিনার দুর্ভাগ্য নাকি প্লেয়ার তৈরি করতে না পারার ব্যর্থতা।

২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনাল, ২০১৫ কোপা আমেরিকা, ২০১৬ শতবর্ষী কোপা আমেরিকা। আর্জেন্টিনার ব্যর্থতা। হ্যাঁ, এটা সত্য যে ফাইনাল ম্যাচ খেলতে আসলেই আর্জেন্টিনার বর্তমান টিম স্নায়ু চাপে নুয়ে পরে। ২০১৪ বিশ্বকাপের ফাইনালে আর্জেন্টিনা বেশ কিছু বাজে ভুলে গোল মিস করলেও তাদের টিম পারফর্মেন্স কিন্ত ভালো ছিলো না। আর পরবর্তী দুই কোপা আমেরিকার ফাইনালে আরো ভয়ংকর রকমের বাজে ফুটবল। এমন পারফর্মেন্সের জন্য স্নায়ুচাপ অন্যতম কারন এটা অবশ্য ঠিক। তবে স্টাইকারদের ব্যার্থতার মাঝে আরেকটা শুন্যতা আছে বর্তমান আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে। সেটা একজন পারফেক্ট ফুলব্যাকের অভাব।

বর্তমান ফুটবলে ফুলব্যাক অন্যতম গুরুত্বপুর্ন একটি পজিশন। বর্তমান ক্লাব বা জাতীয় দলের কোচেরা সাধারনত ৪-৩-৩,  ৪-৪-২ বা ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে খেলাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। এবং ৪ জন ডিফেন্ডার এর ফর্মেশনে ফুলব্যাক অন্যতম বিশেষ ভুমিকা পালন করে। বর্তমান ফুটবলে সুইপারব্যাক পজিশন না থাকার কারনে ফুলব্যাক দেখা যায় দুই ধরনের। লেফটব্যাক এবং রাইটব্যাক। ফুলব্যাকরা মাঠের প্রশস্ত অংশের দুইপাশে থেকে দলকে পাহারা দেয়। তাদের মূল কাজ বিপক্ষ দলের খেলোয়াড় যাতে ক্রস বা কাটিং এর মাধ্যমে বলকে পেনাল্টি সীমানার মধ্যে না নিতে পারে সে চেষ্টা করা। কোন কোন রক্ষণ ব্যবস্থায় ফুলব্যাকে থাকা প্লেয়াররা ম্যান মার্কিং এর কাজও করে থাকেন। অধিকাংশ ফুলব্যাকের কাছেই প্রত্যাশা করা হয় তারা উইং এর মাধ্যমে বল নিয়ে আক্রমণে যেতে পারে এবং আক্রমণভাগের খেলোয়াড়কে ক্রস বা পাস দিতে পারেন।

উইং এ যেমন প্লেয়ারদের জটলা বা হার্ড ট্যাকল করতে হয় না তেমনি প্রায় সময় উইং থাকে ফাঁকা। তাই উইং দিয়ে আক্রমন তৈরি হয় অনেকটাই সহজ। প্রত্যেক ফুটবল ম্যাচেই দেখা যায় কোন প্লেয়ার ডিফেন্সে রক্ষনে সহায়তা করে মুহুর্তেই উইং দিয়ে বল নিয়ে এসে ডি বক্সে ক্রস করছে বা গোল মুখে শর্ট করার জন্য স্টাইকারকে বল বানিয়ে দিচ্ছে। আবার পরমুহুর্তেই সে ডিফেন্সের রক্ষনের দায়িত্বে। ফুলব্যাকের শুধু ব্যাকে গিয়ে ডিফেন্ডার হিসেবে নয় উইং এর অঞ্চলে ক্রস, পাস, লং শর্ট, চান্স ক্রিয়েশন, কাট-ইন করে তাকে বেশ একটিভ থাকতে হবে। কারন একজন ফুলব্যাক ফুটবলার শুধু  ডান বা বাম পাশের দায়িত্বে থাকা ডিফেন্ডার নয় বরং সে রীতিমতো দলের সেকেন্ডারি উইংগার। আর ডিফেন্ডার বলে সাধারনত ফুলব্যাকদের তেমন পাত্তা দেওয়া হয় না এবং এই সুযোগেই একজন দ্রুত পাসিং সেন্স এবং দ্রুত মগজ ব্যবহার করতে পারা ফুলব্যাক ম্যাচের ভাগ্য পরিবর্তন করে দিতে পারে। এবং গত ৮ বছর আর্জেন্টিনা দলে যে সুবিধার সবথেকে বড় অভাব। 

আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে একসময় রাইটব্যাকের দায়িত্বে ছিলো হাভিয়ে জানেত্তি। তার আমলে আর্জেন্টিনা কখনোই একজন প্রোপার ফুলব্যাকের অভাবে ভুগে নি। লেফটব্যাকে কেউ কখনো নিয়মিত ছিলো না। লেফটে খেলেছেন হুয়ান পাবলো সোরিন, গ্যাব্রিয়েল হেইঞ্জে। কিন্ত এদের অবসরের পর প্রোপার ফুলব্যাক হিসেবে পাবলো জাতালাতাকে পাওয়া গেলেও এখন পর্যন্ত লেফটে খেলার জন্য একজন ইফেক্টিভ লেফটব্যাক আর্জেন্টিনা আজো আবিষ্কার করতে পারে নি। একের পর এক ম্যাচ গেছে নতুন একজন লেফটব্যাক খেলেছে কিন্ত কেউই স্থায়ী হতে পারে নি। মাঝে খেলেছে ক্রিশ্চিয়ান আনসালদী, সেন্ট্রারব্যাক পজিশনে খেলা রামিয়ো ফুনেস মৌরিকেও লেফটে তালি মেরে চালানোর চেষ্টা করা হয়েছে, ডানপাশে ফাকুন্দো রনকাগলিকাকে এনে বামপাশে পাবলো জাবালাতাকে খেলানো হয়েছে। তবে বিশেষ কোন লাভ হয় নি। পরবর্তীতে সেন্ট্রালব্যাক পজিশনে খেলা মার্কোস রোহো তুলনামুলক ভালো পারফর্ম করায় আর্জেন্টিনার ডিফেন্সে মুখস্ত চারজন( জাবালাতা, ডেমিচেলিস, ওটামেন্ডি, রোহো) স্থায়ী হয়ে গেল। বিশ্বকাপের পর যখন জাবালাতা বয়সে কারনে ফর্ম হারিয়ে দলে অস্থায়ী হয়ে গেল এবং মার্কোস রোহো ইঞ্জুরিতে জর্জরিত হয়ে ফর্ম হারিয়ে পরার পর আর্জেন্টিনা যেন শতাব্দীর সেরা সমস্যার মুখোমুখি হলো। দলের প্রোপার কোন ফুলব্যাক নেই, টানা তিনটি ফাইনাল হার, দলের স্টাফ বা কোচের বেতন বাকি, কোচের পদত্যাগ, মেসির অবসর ওভারঅল ২০১৬ তে সবমিলিয়ে আর্জেন্টিনার অবস্থা ছিলো বেগতিক।

জাবালাতার ফর্মহীনতা ও বয়স সমস্যার কারনে ২০১৬ সালে হুট করে দৃশ্যপটে আগমন হয় গ্যাব্রিয়েল মার্কাডো। ৩০ বছর বয়সি ফুলব্যাক পজিশনে খেলা মার্কাডো ডানপাশে হারানো প্রান ফিরিয়ে এনেছিলেন। কিন্ত গত বছর তার অফফর্মের কারনে আর্জেন্টিনা ও সেভিয়াতে যেমন বাজে ফুটবল খেলেছেন। রাশিয়া বিশ্বকাপের ডান পাশের দায়িত্ব তার থাকুক এমনটা কেউ চাইবে না। কিন্ত কষ্টকর হলেও সত্য যে বুড়ো পাবলো জাবালাতা, নিজেকে হারিয়ে খোজা গ্যাব্রিয়েল মার্কাডো ও লানুসের তরুন ফুলব্যাক হোসে লুইজ গিমেনেজ বাদে আর্জেন্টিনার কোন প্রোপার রাইটব্যাকই নেই বিশ্বকাপের জন্য।

কোপা আমেরিকা ১৫ তে মার্কোস রোহোর ইঞ্জুরির কারনে টাটা মার্টিনো লেফটব্যাকে খেলিয়েছিলেন বোকা জুনিয়র্সের ফুলব্যাক এমানুয়েল মাস'কে। ১৬ ও ১৭ সালে লেফটব্যাকে দায়িত্বে অনেকটা সময় খেলেছে স্পোর্টিং লিসবনের লেফট মিডফিল্ডার মার্কোস আকুনা। এমানুয়েল মাস বামপাশে রক্ষনে ঠিকঠাক মতো দায়িত্ব পালন করলেও উইং এ প্রভাব ফেলবার কোন এ্যাবিলিটি তার ছিলো না। তেমনি দারুন স্প্রিড ও ক্রস করার দক্ষতা থাকলেও মার্কোস আকুনা উইং এ সাহায্য করলেও  ব্যাকে এসে ডিফেন্সে সহায়তা করার এ্যাবিলিটি তার নেই। আর আর্জেন্টিনা এমন ফুটবল খেলে না যে কারো পজিশনের শুন্যতা অন্য কেউ পুরন করবে।

হোর্হে সাম্পাওলির খেলার ধরনে ফুলব্যাকে থাকা প্লেয়ারদের গুরুত্বপুর্ন ভুমিকা থাকে। কিন্ত আমাদের বিগত বছরেও কোন প্রোপার ফুলব্যাক ছিলো না আসন্ন বিশ্বকাপেও হয়তো থাকবে না। উইং দিয়ে আক্রমনের জন্য সবসময় স্ট্রেন্থ ও আর স্প্রিড লাগে না। কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে গতি ও শক্তির চেয়ে মগজ খাটানোটারই দরকার হয় বেশি। কিন্ত বর্তমান আর্জেন্টিনা জাতীয় দলে এমন একজন গুরুত্বপুর্ন খেলোয়াড়ের প্রচন্ড অভাব। প্লেয়ার বাছাই এর দিক থেকে ভাবলে, রাইটব্যাকের জন্য গ্যাব্রিয়েল মার্কাডো ছাড়া আর্জেন্টিনার কোন অপশন নেই। লেফটব্যাকে মার্কোস রোহো থাকার পর আর আয়াক্সের নিকোলাস ট্যাগলিয়াফিকো ও স্টুর্টগার্ডের এমিলিয়ানো ইনসুয়া  মত দুজন প্রমিজিং প্লেয়ার বাকি থাকে। আর আনফরচুনেটলি আর্জেন্টিনায় উইং দিয়ে যেমন আক্রমন হয় না তেমনি মধ্য মাঠ থেকে বল তৈরি করার মত কোন প্লেয়ার নেই। হ্যাঁ, ডি বক্সের বাইরে থেকে বল বানানোর জন্য লিওনেল মেসি আছে কিন্ত মেসিকে মার্ক করে রাখলেই আর্জেন্টিনার ইঞ্জিন বন্ধ। 

আর্জেন্টিনার উইং দিয়ে কখনোই জোড়ালো আক্রমন হয় না। মেসি যখন তার ডান পাশ ছেড়ে মধ্যমাঠে এসে আক্রমনের সুযোগ তৈরি করার দায়িত্ব নেন তখন তার পজিশনের শুন্যতা কোন ফুলব্যাক এসে পূরন করে না। কারন আর্জেন্টিনার কোচ বরাবরই জেনে এসেছে বর্তমানে যে সকল আর্জেন্টাইন ফুলব্যাক আছে তাদের কারোরই এমন স্ট্রেন্থ নেই যে উইং এ এসে এ্যাটাকিং এ এসে পরক্ষনে রক্ষনের দায়িত্ব নিতে পারবে। তাই আর্জেন্টিনার ফুলব্যাকের দায়িত্ব শুধু রক্ষনের। মারাকানা স্টেডিয়ামেও এমনটাই হচ্ছিল। গোৎজে যে গোলটা শেষমুহুর্তে করছিলো তার সুচনা হয়েছিলো জার্মানির উইং পজিশন থেকেই, আন্দ্রে শুরলে যে সলো রান দিয়ে এসিস্ট করেছিলো গোৎজেকে সেটাও উইং পজিশন থেকেই।

বিশ্বকাপের আর বেশি দিন বাকি নেই। হোর্হে সাম্পাওলি ইউরোপের এ মাথা থেকে ও মাথা খুজে যাচ্ছেন প্লেয়ার, দেখা করছেন তার প্ল্যানে থাকা আর্জেন্টাইন প্লেয়ারদের সাথে। তবে তিনিও হয়তো বাকিসবার মতই ভাবছেন, "ইসস! এই সময়ে আর্জেন্টিনার যদি একজন সিজার এ্যাজপিলিকুয়েতা অথবা জর্দি আলবা অথবা এ্যান্থনি ভ্যালেন্সিয়ার মত একজন প্রোপার ফুলব্যাক থাকতো!


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন