বিদায় মাশ্চেরানোঃ দ্যা লিটল চিফ অফ বার্সা

বিদায় মাশ্চেরানোঃ দ্যা লিটল চিফ অফ বার্সা

৩০ আগস্ট ২০১০ এর এক পড়ন্ত বিকেল ক্যাম্প ন্যু-তে প্রথম পা রাখলেন ২৭ বছর বয়সী মাশ্চেরানো। মন বোধহয় একটু খারাপই ছিলো তার সেদিন, নিজের স্বপ্ন পূরণের হিসাব নিকাশ ছাপিয়ে লিভারপুল সমর্থকদের মনে কষ্ট দিয়ে বার্সেলোনাতে পাড়ি জমানো কিছুটা যেন তাকেও তাড়িয়ে ফিরছেলো। ম্যানেজার রয় হডসনের সেই জবাব না দেওয়া কল কিংবা মার্সিসাইড সমর্থকদের আঘাত দিয়ে আশা মাশ্চে, পুরনো সেই তাড়িয়ে বেড়ানো কষ্ট কিছুটা হলেও যেন হালকা করতে চেয়েছিলেন '১১-তে বার্সেলোনার হয়ে চ্যাম্পীয়ন্স লীগ জিতে। ঠিক নয় মাস পর যখন চ্যাম্পয়ীন্স লীগ জিতে তার এই জয়কে একইসাথে বার্সেলোনা এবং লিভারপুল সমর্থকদের উৎসর্গ করনে, তখন কি চোখে মুখে এক প্রশান্তি খেলা করেছিলো এই আর্ম ব্যান্ডহীন বার্সেলোনা যোদ্ধার? 


অবশ্য, প্রশান্তি খেলা যাওয়া চেহারাতে যেন সেদিন ছিলো নিজেকে আবারো প্রমাণ করারও এক দৃঢ় সংকল্প। লিভারপুল থেকে এসে ছয় মাসের মাথায় মনে করেছিলেন বার্সেলোনার হয়ে হয়ত আর বেশীদিন থাকা হবে না। মাশ্চের সেই চিন্তা তার অবস্থান থেকে অনেকটা ঠিকই ছিলো বলতে গেলে। মিডফিল্ডার হিসেবে খেলা আসা এই খেলোয়াড় যখন বার্সাতে আসেন তখন তার জায়গাতে সার্জিও বুস্কেটসের মত বার্সেলোনা ইঞ্জিনের পদচারনা। ক্লাবে জয়েনের পরে বেশীরভাগ সময় বেঞ্চে কাটানো এই যোদ্ধার কপাল খুলে দিয়েছিলো চ্যাম্পীয়ন্স লীগের শেষ ১৬ এর আর্সেনালের বিপক্ষের সেই ম্যাচ। দ্বিতীয় ল্যাগের সেই ম্যাচে নিকোলাস বেন্ডটনার যখন ১-১ পজিশনে ভালদেসের সামনে, তখন মাশ্চের করা ট্যাকল যেমন বাঁচিয়ে দিয়েছিলো দলের নিশ্চিত গোল খাওয়াকে এবং একই সাথে ভাগ্য দেবতা যেন তার ভাগ্য লিখেছিলেন নতুন করে। ট্যাকেলের পর আর্সেন ওয়েঙ্গারের সেই হাঁটুঘেড়ে বসা মূহূর্ত কিংবা পেপের উল্লাস বলে দিচ্ছিলো কঠিন সময়ের সাথে লড়াই করা এই যোদ্ধা অনেকটা ভাগ্য দেবতার অনীহার বিপরীতেই সুসময় নিয়ে আসতে বদ্ধ পরিকর!

সময়ের সাথে অসংখ্য চিন্তা ভর করলেও, নিজের উপর থেকে কখনোই আস্থা হারাননি মাশ্চে। সহজেই হাল ছেড়ে না দেওয়া এই মানুষ যখন ওয়েস্টহাম থেকে লিভারপুল আসেন তখন সেখানে জেরার্ড-জাবি আলেন্সোর মত প্লেয়ার। আবার যখন লিভারপুল থেকে বার্সেলোনা আসেন তখন সেখানে বার্সেলোনার অক্টোপাস খ্যাত বুস্কেটস! সবকিছুকেই চ্যালেঞ্জ হিসেবেই নিয়েছিলেন তিনি। আর্সেনালের সাথে চ্যাম্পীয়ন্স লীগের ম্যাচে ডিফেন্সিভ মিড হিসেবে নেমে বেন্ডটনারকে করা ট্যাকেল তাকে এক নতুন পজিশনে খেলার আহবান জানিয়েছিলো সেদিন থেকে। কিন্তু, আশাহত যেমন করেননি নিজেকে, ঠিক তেমনি ভাবে প্রতিদান দিয়েছেন ম্যানেজার কিংবা সমর্থকদের ভরসার। বার্সেলোনার সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে নতুন পজিশনে চ্যালেঞ্জ নিয়ে খেলতে থাকা মাশ্চে তারপর একে একে খেলে গিয়েছেন দীর্ঘ ৭ বছরেরও উপর। খেই হারাননি কখনো, কিংবা তার উপর থেকে বিশ্বাসে ঘাটতিও পড়েনি কোন সমর্থকের। ছায়ার মত করে বার্সেলোনার রুক্ষণ ভাগ আগলে থাকা মাশ্চে নামক 'গাছ' অবশেষে বিদায় নিচ্ছেন। উমতিতি কিংবা মিনাদের যুগে ক্লাব বার্সেলোনা কখনো রক্ষণ ভাগে রোদের আঁচ অনুভব করলে, মাশ্চের ছায়াকে স্মরণ করে মন খারাপ করবে? হয়ত, মন খারাপ হবে কিংবা সব ছাপিয়ে মাথায় ভর করবে একজন আর্ম ব্যান্ডহীন ক্যাপ্টেনের গূরুত্ব। 


২০১৭ এর ২৬'শে এপ্রিল, লীগের শেষের দিককার ম্যাচ। ৬৭ মিনিটের দিকে ওসাসুনার বিপক্ষে পেনাল্টি নিতে প্রস্তুত মাশ্চেরানো। ক্যাম্প ন্যু-তে তখন মাশ্চের পেনাল্টি নিয়ে বাধ ভাঙ্গা উত্তেজনা। সাইড লাইনে বসে থাকা মেসি, ইনিয়েস্তা, সুয়ারেজ কিংবা ম্যনেজার এনরিকের চোখে মুখেও যেন অস্থিরতা খেলা করছে। পেনাল্টি থেকে মাশ্চে যখ্ন গোল দিলেন, তখন বার্সেলোনার হয়ে লেখা হয়ে গেল তার প্রথম গোল। উল্লাসে ফেটে পড়লো ক্যাম্প ন্যু এবং বার্সেলোনার সাইড বেঞ্চ। ক্লাবের হয়ে প্রথম গোল করা মাশ্চে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিলেন না কিভাবে উদযাপন করবেন। তাকে ঘিরে গোলাকার হয়ে দাঁড়ানো সতীর্থদের সাথে হাত মিলাতে মিলাতে যখন নিজের করা গোল উদযাপন করছিলেন, একটা অন্যরকম লজ্জ্বা খেলা করছিলো তার চেহারাতে। ৬ বছরেরও বেশী সময় পরে প্রথম গোল করা মাশ্চেরানোকে ক্যাম্প ন্যু এর সমর্থকরা যেন বুঝিয়ে দিচ্ছিলেন সে তাদের গর্ব!

একজন মাশেচারানোকে গোল কিংবা স্ট্যাট দিয়ে প্রমাণ করাটা নিতান্তই বোকামি হবে। ২০১০ এ বার্সেলোনা জয়েন করার পর নিজের স্বভাবত জায়গাতে ডাক পাওয়ার কোন সুযোগ ছিলো না তার সেটা তিনি নিজেই আন্দাজ করতে পেরেছিলেন। তাই, সব সুযোগই কাজে লাগানোর জন্যে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ ছিলেন। ২০১১ তে, গার্দিওলা মিলিটোসের পেইস কম থাকা এবং ফন্টোসের অভিজ্ঞতাহীনতার জন্যে বুস্কেটসকে সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে কয়েক ম্যাচ পরীক্ষা করে নিরাশ হন। কিন্তু, মাশ্চেরানো তার স্বভাজাত পজিশন থেকে সরে গিয়ে  সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে খেলা শুরু করে হতাশ করেননি গার্দিওলাকে। একজন মাশ্চের ভূমিকা দলের জন্যে ঠিক কতটা গুরূত্বপূর্ণ হয়ে উঠে তা বুঝা যায় যখন বার্সেলোনা দলের ম্যানেজার পরিবর্তন হলেও তার অবস্থান ঠিকই থেকে যায়। ভার্মালেন কিংবা ম্যাথিউ সবাইকে কিনা হয়েছিলো মাশ্চেরানোর ব্যাকআপ হিসেবে। একজন মিডফিল্ডার তার পজিশন থেকে সরে গিয়ে ঠিক কি মাপের খেলার জন্যে বার্সেলোনার মত দলের ফার্স্ট চয়েজ সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার হিসেবে নিজের জায়গা করেন তা অনুমান করা খুবই সহজ। তবুও, রিয়েল বেটিসের স্ট্রাইকার লিওনের বিপক্ষে করা ট্যাকেল অথবা আর্সেনালের বেন্ডটনারের বিপক্ষে করা ট্যাকেল সহ এইরকম অসংখ্য পিন পয়েন্ট ট্যাকেল তাকে আলাদা করে দিবে অন্য সবার থেকে খুব সহজেই। বার্সেলোনার হয়ে বুস্কেটসের পর সবচেয়ে বেশী ট্যাকেল করা কিংবা সবচেয়ে বেশী ইন্টারসেপশন করা এই লিজেন্ড তার প্রয়োজনীয়তা সবসময়ই বুঝিয়ে গিয়েছেন দলকে। 

২০১০ থেকে শুরু হওয়া পথচলাতে বার্সেলোনার হয়ে জিতেছেন প্রায় সবকিছুই। দুই চ্যাম্পীয়ন্স লীগের  বিপরীতে জিতেছেন চারটি লা-লীগা। রয়েছে দুটি করে উয়েফা সুপার কাপ ও ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ। ১৩-১৪ তে বার্সেলোনার প্লেয়ার অফ দ্যা সিজন জিতেছেন, ছিলেন ১৪-১৫ এর চ্যাম্পীয়ন্স লীগ টীম অফ দ্যা সিজনেও। লিভারপুলে রেখে আসা ম্যানেজার রয় হডসন যখন অতীতের সব কষ্ট ভুলে গিয়ে মাশ্চেরানোকে ২০১৪ এর ব্যালন ডি'অর এর তার তিনটি ভোটের একটি দেন তখনই প্রমাণ হয়ে যায় তার স্বার্থকতা। 


উমতিতি কিংবা ইয়েরি মিনারা জায়গা করে নিবেন অথবা নিচ্ছেন মাশ্চের শূণ্যস্থান। বার্সেলোনার রক্ষণভাগে নতুনদের দেখে কোন সমর্থকই হয়ত সহজে ভুলে যেতে পারবেন নাহ হাভিয়ের মাশ্চেরানোকে। বরং, ক্যাম্প ন্যু এর উত্তাল সমর্থকরা উমতিতির কোন এক পিন পয়েন্ট ট্যাকেলে নিজেদের অজান্তেই মাশ্চের ছাঁয়া খুঁজে বেড়াবেন তার মাঝে। "মাশ্চে মাশ্চে" বলে স্লোগান ধরতে যাওয়ার আগ মুহূর্তেই নিজেদের ভুল বুঝতে পেরে মুচকি হাসবেন তারা। সুদূর চায়না থেকে তখন প্রিয় ক্লাবের খেলা দেখা মাশ্চেও হয়ত খুব করে অনুভব করবেন ব্যাপারটা!  

বুধবারের আবারো এক পড়ন্ত বিকেলে দীর্ঘ সাড়ে সাত বছরের যাত্রা শেষে শেষবারের মত প্রিয় ন্যু ক্যাম্পে উপস্থিত হয়েছেন মাশ্চেরানো। মুহূর্তের মধ্যেই উত্তান-পতনের এই পথচলার হাজারো স্মৃতি এসে ঝেঁকে ধরেছে তাকে, তার মাঝ থেকে নিজের শ্রেষ্ঠ সময় বের করতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন নিশ্চয়ই। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর প্রেমিকাকে উদ্দেশ্য করে লেখা,  "চলে যাওয়া মানে প্রস্থান নয়- বিচ্ছেদ নয়, চলে যাওয়া মানে নয় বন্ধন ছিন্ন-করা আর্দ্র রজনী। চলে গেলে আমারও অধিক কিছু থেকে যাবে, আমার না-থাকা জুড়ে।" এর মত করে হয়ত মাশ্চে তখন নিজের ভালোবাসার ক্লাবকে উদ্দেশ্য করে কবিতা আওড়াচ্ছেন মনে মনে! আর বার্সেলোনা সমর্থকরা তখন, একজন মাশ্চেরানোর চলে যাওয়া কখনোই যে প্রস্থান হতে পারে না এবং তার সব স্মৃতিই যে তার না থাকা সময়ে সবসময় থেকে যাবে তা অনুভব করতে ব্যস্ত! 

বিদায় হাভিয়ের মাশ্চেরানো, বিদায় দ্যা 'ক্যাপ্টেন উইদাউট আর্মব্যান্ড'!

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন