ট্যাক্টিকাল বিশ্লেষনঃ গার্দিওলার পুরোনো দুর্বলতায় ক্লপের শক্ত আঘাত

ট্যাক্টিকাল বিশ্লেষনঃ গার্দিওলার পুরোনো দুর্বলতায় ক্লপের শক্ত আঘাত

ইপিএল ক্যারিয়ারে নিজের প্রথম দিনগুলোতে পেপ গার্দিওলার 'সেকেন্ড বল' নিয়ে করা সেই অভিযোগগুলো মনে আছে? কিংবা বায়ার্নে থাকতে ক্লপের ডর্টমুন্ডের বিপক্ষে সংগ্রাম করার দিনগুলো? এনফিল্ডে লিভারপুলের বিপক্ষে ম্যানচেস্টার সিটির ৪-৩ গোলের হার আসলে লিভারপুল কোচ ক্লপের পেপ গার্দিওলার কিছু পুরোনো দুর্বলতাকে সফলভাবে আঘাত করার ফলাফল। সবমিলিয়ে আসলে কিভাবে এই মৌসুমে নিজেদের প্রথম লীগ হারের স্বাদ পেলো ম্যানচেস্টার সিটি তা নিয়ে আলোচনা হয়ে যাক।

ফর্মেশনঃ


দুই দলই ৪-৩-৩ ফর্মেশনে দল সাজায়। ফিলিপে কৌতিনহোর জায়গায় লিভারপূল কোচ মিডফিল্ডে নামান আলেক্স অক্সলেইড চেম্বারলিনকে। ম্যান সিটির মিডফিল্ডে ডেভিড সিলভার জায়গায় ছিলেন গুন্ডোগান। ফর্মেশন একই হলেও দুই দলের খেলার ধরনে ছিলো ভিন্নতা।

খেলার ধরনঃ 

ইপিএলে এই মৌসুমে অপরাজেয় ম্যান সিটির বিপক্ষে খেলার আগে বেশিরভাগ দলই সমীহের ভঙ্গিতে থাকবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দলের অন্যতম মূল তারকা কৌতিনহোর বার্সায় দলবদল কিংবা নতুন সাইনিং ভ্যান ডাইকের ইঞ্জুরি ঘরের মাঠে দমিয়ে দেয়নি ক্লপকে। নিজেদের দুর্বলতা পূর্ন আমলে নিয়েই ম্যানচেস্টার সিটির সাথে সমান তালে লড়তে থাকে লিভারপুল। এর পেছনে তাদের কিছু কৌশল ছিলো বেশ কার্যকর। 

প্রথমত বলতে হবে প্রেসিংয়ের কথা। পেপ গার্দিওলা আর জার্গেন ক্লপ দুজনই তাদের দলকে বল হারালে দ্রুত প্রেস করে বল আবার নিজেদের নিয়ন্ত্রনে নেয়ার তাগিদ দেন, যা কাউন্টার প্রেসিং বলে পরিচিত। তবে দুজনের প্রেসিংয়ের ধরনে কিছুটা ভিন্নতা আছে। পেপ গার্দিওলার দল প্রেস করার সময় মুলত বিপক্ষ দলের পাস দেয়ার রাস্তাগুলো বন্ধ করার দিকে বেশি মনযোগ দেন। জাভি সম্প্রতি এক সাক্ষাতকারে উল্লেখ করেন, পেপ গার্দিওলা সম্ভব হলে বিপক্ষ দলের থ্রো ইন করাকেও কষ্টসাধ্য করে দিতে চান। অন্য দিকে ক্লপের দলের প্রেসিং মুলত প্রতিপক্ষ দলের বল পায়ে থাকা খেলোয়াড়কে যতোটা সম্ভব কম সময় বল পায়ে রাখতে দেয়া। তবে সেটি কাগজে কলমের ম্যান মার্কিং নয়, ক্লপের প্রেসিং সিস্টেম অনেকটা ম্যান মার্কিং এবং জোনাল মার্কিংয়ের সমন্বয়।

প্রথমে ছবিতে ম্যানচেস্টার সিটির প্রেসিং দেখা যাকঃ 

                                                                    

লিভারপুলের দুই সেন্টারব্যাককে মার্কিংয়ে রেখেছেন আগুয়েরো এবং গুন্ডোগান। বল পায়ে থাকা লভ্রেনের কোনো পাসিং অপশন নেই। তিনি ব্যাক পাস দিচ্ছেন গোলরক্ষককে।

তবে ক্লপের এই প্রেসিং ধরন অজানা নয়। বুন্দেসলিগা আর পরবর্তীতে ইপিএলে দুইজনেরই ইতিমধ্যে হয়ে গেছে কয়েক চোট। ক্লপ সম্পুর্নভাবে ব্যাকলাইন থেকে আক্রমন তৈরীর চেষ্টা থেকে দলকে বিরত রাখেন। কারন ডিফেন্স থেকে ছোট পাস দিয়ে ম্যান সিটির কয়েক স্তরের ডিফেন্স ভাংগার মতোন বল প্লেয়িং ডিফেন্ডার মাতিপ কিংবা লভ্রেন কেউই নন। তাই তিনি আশ্রয় নেন ডিফেন্স থেকে লং বল পাঠানোর কৌশলের দিকে।

ছবিতে লভ্রেনের ব্যাক পাস থেকে পাওয়া বল গোলরক্ষক কারিউস তাই লম্বা করে উড়িয়ে মারেন লিভারপুলের ফরোয়ার্ড লাইনের উদ্দেশ্যে। যেখানে ‘ফার্স্ট বল’ (সালাহ বনাম ওটামেন্ডির হেডার জেতার লড়াই) , ‘সেকেন্ড বল’ (পরে যাওয়া বলটি জেতার লড়াইয়ে ফিরমিনো বনাম ডেলফ) এবং ‘থার্ড বল’ যেটি দখল করে নেন চেম্বারলেইন। (ইপিএলের এই সেকেন্ড বল, থার্ড বল নিয়ে গার্দিওলার অভিযোগ ছিলো আগে থেকেই। ক্লপও সিটির এই দুর্বলতা কাজে লাগাতে প্রস্তুত রেখেছিলেন দলকে।)

                                                                      

ছবিতে দেখা যাচ্ছে ম্যান সিটি লেফটব্যাক ডেলফ সেকেন্ড বলের লড়াই শেষে তার নির্ধারিত পজিশনে নেই। তাই ওটামেন্ডি রাইট উইংয়ে থাকা সালাহকে নিয়ে বিভ্রান্ত হয়ে কিছুটা ডানে সরে আসলেই তার আর স্টোন্সের মাঝখানে কিছুটা গ্যাপের সৃষ্টি হয়, যা চমতকারভাবে কাজে লাগিয়ে লিভারপুলকে এগিয়ে দেন চেম্বারলেইন।

পুরোম্যাচেই লিভারপুল প্রেস করে খেললেও প্রথমার্ধে ম্যান সিটি নিজেদের মতোন করে কয়েকটি আক্রমন সানাতে সক্ষম হয়। ম্যানচেস্টার সিটির এই মৌসুমে আক্রমনের একটি ধরন আছে যা ডি ব্রুইনকে দিয়ে তারা অনেক ব্যবহার করে থাকে। তাদের দুই উইংগার সানে এবং স্টারলিং একদম টাচলাইনে নিজেদের পজিশন নিয়ে প্রতিপক্ষে ফুলব্যাককে ডিফেন্সলাইন থেকে আলাদা করে দেয়ার চেষ্টা করে, তখন ফুলব্যাক এবং সেন্টারব্যাকের মধ্যে তৈরী হওয়া ফাকা জায়গাটি ব্যবহার করে বিপদজনক আক্রমনে নিজেকে সঁপে দেন ডি ব্রুইন।

                                                                   

ছবিতে ম্যানচেস্টার সিটির প্রথম গোলটিতে সানে এইরকম একটি পরিস্থিতিই তৈরি করেছিলেন লিভারপুল রাইটব্যাক গোমেজকে সরিয়ে এনে। কিন্তু পরে ডি ব্রুইনের জন্য তৈরি করা জায়গা একক দক্ষতায় নিজের জন্যই কাজে লাগিয়ে ফেলেন জো গোমেজের ভূলের সুযোগ নিয়ে এবং ম্যান সিটিকে সমতায় ফেরান।

দ্বিতীয়ার্ধে ক্লপ লিভারপুলের প্রেসিং অন্যমাত্রায় নিয়ে যান। তিনি বুঝতে পারেন, ম্যান সিটিকে মিডফিল্ডে আরো কম জায়গা দিতে হবে এবং তার ডিফেন্সকে তিনি ম্যান সিটির আক্রমনভাগের সাথে সরাসরি লড়াইয়ে যতোটা পারেন কম সময় মুখোমুখি করাবেন। তাই তিনি দলকে মিডফিল্ডে প্রেসিংয়ে আরো আগ্রাসী হওয়ার নির্দেশ দেন।

লিভারপুলের ‘ফলস নাইন’ ফিরমিনোকে বলা হয় ক্লপের সিস্টেম। ফিরমিনোর মূল দ্বায়িত্ব ছিলো প্রতিপক্ষের পায়ে বল থাকলে দুই সেন্টারব্যাক আর ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার ফার্নান্দিনহোকে চাপা রাখা। দলকে ২-১ গোলে এগিয়ে দেয়ার গোলটি ছিলো স্টোন্সকে সফলভাবে প্রেস করে বল কেড়ে নেয়ার ফসল, যা থেকে দৃষ্টিনন্দন এক গোল করেন।

এবার একটু ভালোমতোন দেখা যাক লিভারপুলের প্রেসিং। আগেই বলা হয়েছে তাদের প্রেসিং ম্যান প্রেসিং এবং জোনাল মার্কিংয়ে একটি সমন্বয়। তারা জানতো ম্যান সিটি যেকোনো পরিস্থিতেই চেষ্টা করবে ব্যাক লাইন থেকে আক্রমন করার। তাই তাদের ৩ ফরোয়ার্ড ফিরমিনো, মানে এবং সালাহ সর্বক্ষনিক ব্যাক লাইনকে চাপে রাখেন, সাথে ৩ সেন্টার মিডফিল্ডার চেম্বারলেইন, এমরে চান কিংবা উইনালদামের কেউ একজন উপরে উঠে লিভারপুলকে ৪-২-৩-১ আকারে প্রেস এবং কাউন্টার এটাকে সহায়তা করতে থাকেন।

               

ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে ম্যানচেস্টার সিটির ব্যাক লাইনকে পুরোপুরি বাকি দল থেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে লিভারপুল। ফার্নান্দিনহো আর গুন্ডোগান এই দমবন্ধ করে দেয়া প্রেসিংয়েই মাথা গরম করে দুটি ভুল পাস দিয়ে বসেন, যেখান থেকে দুটি বিপজ্জনক কাউন্টার এটাক করে লিভারপুল। ফিরমিনোর গোলের পরেই মানের দুটি শটের একটি বারে লাগে এবং একটি গোল হয়। সবই ছিলো এইরকম প্রেস এবং কাউন্টার এটাকের ফসল।

৩-১ এ পিছিয়ে পড়ে ম্যানচেস্টার সিটিও আরেকটু আগ্রাসী হওয়ার চেস্টার করে।

নিচের ছবিতে দেখা যাচ্ছে, লিভারপুলের মতোনই ম্যানচেস্টার সিটির চার খেলোয়াড় উইনালদামকে ঘিরে রেখেছে কিন্তু এইদিন লিভারপুলকে এইসব কিছুই থামাতে পারেনি। প্রথমত ম্যান সিটির প্রেসিংয়ে ছিলোনা লিভারপুলের আগ্রাসন। দ্বিতীয়তঃ লিভারপুলের খেলোয়াড়দের পজিশনিং এই পরিস্থিতে ম্যান সিটির খেলোয়াড়দের থেকে অনেক বেশি গোছানো ছিলো। উইনালদামও তাই সঠিকভাবে বল বের করে দিতে সক্ষম হন।

                                                      

ম্যানচেস্টার সিটির হাই ডিফেন্স লাইনের পেছনে মানের জন্য বাড়ানো থ্রু বল বিপদ বুঝতে পেরে ক্লিয়ার করতে এগিয়ে আসেন এদারসন। কিন্তু তার বামপায়ের পাসিং দক্ষতার তুলনায় তার ডান পা যে দুর্বল তা আরেকবার বুঝিয়ে দেন দুর্বল ক্লিয়ারেন্সে। যা থেকে সালাহ গোল করে নিজের জাত চেনাতে ভূল করেননি।

                                                                          

৪-১ এ এগিয়ে থেকে লিভারপুল মিডফিল্ডে তাদের আগ্রাসন কিছুটা কমিয়ে দেয়। তখন লিভারপুলের ব্যাক লাইন আবার বুঝিয়ে দেয় তাদের দুর্বলতা। পেপ গার্দিওলা ফাইনাল থার্ডে তার খেলোয়াড়দের পজিশন পরিবর্তন করে খেলার পূর্ন স্বাধীনতা দেন এবং সেটি যে ম্যান সিটিকে ফাইনাল থার্ডে কতোটা ভয়ংকর করে তোলে তার প্রমান সিটির শেষ দুটি গোল। পজিশনিং পরিবর্তন, কম্বিনেশনে বার্নার্দো সিলভা গোল করে সিটির হয়ে ব্যবধান কমান। কিছুক্ষন পরে ৪ জনের মাঝখানে থেকেও একা বল রিসিভ করে গুন্দোগানের দেয়া গোলটি যেন লিভারপুলের রক্ষনভাগের দুর্বলতা আবার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়।

                                                                       


আমরা যা বুঝলামঃ

- ম্যানচেস্টার সিটি ক্রিস্টাল প্যালেসের বিপক্ষে ম্যাচের পর আবার সেকেন্ড বল নিয়ে নিজেদের দুর্বলতা প্রকাশ করলো।

- যে পেপ গার্দিওলাকে আমরা পুরো ম্যাচে সাধারনত বিভিন্ন সিস্টেম পরীক্ষা করতে দেখি, তার কিছুই এই ম্যাচে দেখা যায়নি।

- কৌতিনহোর বিদায়ে লিভারপুলের আক্রমনের ঝলক কমে গেলেও, পরিশ্রমী মিডফিল্ডার দিয়ে লিভারপুলকে সেটি তাদের একটি দল হয়ে খেলতে আরো সহায়তা করতে পারে।

- ক্লপের সাফল্যের মূল চাবিকাঠি একটি দলের চরম আগ্রাসী প্রেসিং। যা একটি লম্বা সময়ের সমাধান নাও হতে পারে। কারন এতে করে খেলোয়াড়দের ইঞ্জুরি প্রবনতা বেড়ে যায়। তবে এই স্টাইল লিভারপুল ভক্তদের আরো আগ্রহী করে তুলতে পারে নাবি কেইতার আগমনের ব্যপারে। কারন সে যে একেবারে খাপে খাবে মিলে যায় এমন সিস্টেমের সাথে।   

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন