রাহুল দ্রাবিড়৷ শুভ জন্মদিন, দ্যা ওয়াল৷

রাহুল দ্রাবিড়৷ শুভ জন্মদিন, দ্যা ওয়াল৷

শচীন নাকি ক্রিকেটের ঈশ্বর, অফসাইডে নাকি ঠিক তার পরেই সৌরভের স্থান আর ফোর্থ ইনিংস? সে তো লক্ষনের ব্যক্তিগত সম্পত্তি৷

কিন্তু যখন মন্দিরের সব দুয়ার বন্ধ হয়ে যায়? মুক্তির পথ যখন আরষ্ট হয়ে যায় তখন?


তখন ভারতীয় ক্রিকেটের পান্ডবরাও আশ্রয় নিতেন ওয়ালের পিছনে৷ দেয়াল হয়ে প্রতিরোধ গড়তেন তিনি ঐ রাবনদের বিপক্ষে৷ তিনি রাহুল দ্রাবিড়, দ্যা ওয়াল৷


জুন ২০, ১৯৯৬, লর্ডস৷ ক্রিস লুইস তখনও আবেদন করে যাচ্ছেন আম্পায়ারের দিকে তাকিয়ে৷ আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত তোয়াক্কা না করেই প্যাভিলিয়নের পথ ধরলেন অভিষিক্ত দ্রাবিড়৷ ইতিহাস থেকে মাত্র পাঁচ রান দূরে ছিলেন তিনি৷ অভিষেকে ৯৫ রানে যখন উইকেটের পেছনে ক্যাচ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন ততক্ষনে  ভারতীয় ক্রিকেটের নতুন আবিষ্কার বনে গিয়েছিলেন তিনি৷ আর পেছনে  ফিরে তাকাতে হয়নি দ্রাবিড়কে৷ ৬২ গড়ে অভিষকে সিরিজে রান করেছিলেন প্রায় দুইশ'র উপরে৷ এরপরে ঘরের মাঠে অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ এ সিরিজ হারানোয় ছিল ছোট তবে গুরুত্বপূর্ন অবদান৷ তবে দ্রাবিড়ের জাত তখনও চিনতে পারেনি বিশ্বক্রিকেট৷ 

দ্রাবিড় তার আসল জাত  চিনিয়েছিলেন আফ্রিকায়৷ অ্যানাল ডোনাল্ডদের তোপে টিম ইন্ডিয়া যখন ৬৬ অলআউট, উইকেটে তখন দ্রাবিড় ২৭ নটআউট! পরের ম্যাচটা প্রায় জিতিয়ে এনেছিলেন দ্রাবিড়৷ প্রথম ইনিংসে ১৪৮ আর দ্বিতীয় ইনিংসে তার ৮১ যথেষ্ট ছিল ভারতের ম্যাচ জয়ে, যদিনা বাধা হতো ওয়ান্ডার্সের বৃষ্টি৷ 

১৯৯৬/৯৭ মৌসুমে ১২ টেস্টে ৫০ গড়ে তুলেছিলেন ৮৫২ রান৷ হয়েছিলেন ঐ বছরের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহকও৷ 

টেস্টের শুরুটা যতটা দারুন ছিলো,ওয়ানডে ছিল বিপরীত৷ কিছুটা মন্থর, খোলস ছেরে বের হতে না পারা, নিজ দেশে ওয়ানডের শুরুটা তার মানদন্ডে কিছুটা দৃষ্টিকটুই ছিল৷ তবে নির্বাচকদের আস্থা ছিল, না রেখেও বা উপায় কি! পুরো ভারতীয় দলই তখন ক্রান্তিকালে৷ বিদেশের সিরিজগুলোতে দল খাবি খাচ্ছে, তরুন হিসেবে দ্রাবিড়কে তো আর ফেলে দিতে  পারতেন না! তারওপর বিদেশে যে জয়গুলো আসছে তাও ঐ দ্রাবিড় কিংবা শচীনের হাত ধরেই৷ দক্ষিন আফ্রিকায় পুরো ভরাডুবিতে টিম ইন্ডিয়া! কিন্তু অটল,অবিচল দ্রাবিড়৷ সিরিজ হেরেছে দল তবে তিনি দলের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক, করেছিলেন ২৮০ রান৷ এরপরের স্বাধীনতা কাপ? চার দেশের ঐ টুর্নামেন্টে দ্রাবিড় তিনম্যাচে ৯৪ অ্যাভারেজে করেছিলেন ১৮৯ রান! তবে দল ব্যর্থ ফাইনালে যেতে৷ ওয়ানডের শুরুটা অনেকটা এমনই ছিলো দ্রাবিড়ের৷ পারফর্ম করছেন, তবে পাদপ্রদীপের আলোয় আসছেন না দলের ব্যর্থতায়৷ দল হেরেছে, তবে দ্রাবিড় আবারও ম্যান অব দ্যা ম্যাচ৷ মঞ্চ এবার নিউজিল্যান্ড৷ ৭৭ অ্যাভারেজে রান করেছিলেন ৩০৯৷ যা পুরো সিরিজে আর যে কারও চেয়ে বেশি! 

নব্বইয়ের দশক কিংবা একবিংশ শতাব্দীতেও বিদেশের মাটিতে দ্রাবিড়ের চেয়ে সফল ভারতীয় ব্যাটসম্যান পাওয়া দুষ্কর৷ বিদেশে ব্যক্তিগত দারুন পারফর্মেন্স কিন্তু  দলীয় ব্যর্থতায় যখন দ্রাবিড় বিচলিত, খুজছন পাদপ্রদীপের আলো,তখন আলোকবর্তিতা হয়ে এসছিল ১৯৯৯ বিশ্বকাপ৷ 

এই বিশ্বকাপে দ্রাবিড় যা করেছিলেন,সত্যিকার অর্থে তিনি তার যথার্থ মূল্যায়ন পেয়েছিলেন কিনা তা নিয়ে খোদ ভারতীয় ক্রিকেটের পাড় সমর্থকটিও হয়ত সন্দিহান৷ 

প্রথম ম্যাচে আফ্রিকার বিপক্ষে হাফসেঞ্চুরি, কিন্তু দল হারলো আবারও৷ পরের ম্যাচ জিম্বাবুয়ের বিপক্ষেও হারলো ভারত৷ টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় রাউন্ডে যেতে সমীকরন তখন তিন ম্যাচে তিন জয়৷ একটাতে হারলেও বিদায় নিবে ভারত৷ 

ঐ সমীকরনে তিন ম্যাচে তিন রেকর্ডের সাক্ষী দ্রাবিড়৷ তিন ম্যাচে দুই রেকর্ড জুটি৷ ব্রিস্টলে শচীনের সাথে ২৩৭ রানের জুটি৷ বিশ্বকাপে ঐ ম্যাচ পর্যন্ত সর্বকালের সর্বোচ্চ জুটি ওয়ানডেতে৷ দল জিতল ৯৪ রানে৷ 

পরের ম্যাচে আবারও রেকর্ড ৩১৮ রানের জুটি৷ ওয়ানডে ক্রিকেটে তিনশত রানের প্রথম জুটিও সেটা৷ দ্রাবিড়ের ১৪৫ রানে ভর করে শ্রীলঙ্কাকে হারিয়ে দ্বিতীয় রাউন্ডের দোরগরায় তখন ভারত৷ গ্রুপ পর্বের শেষম্যাচেও তার ফিফটিতে ইংল্যান্ডকে হারায় ভারত৷ সেকেন্ড রাউন্ডে পাকিস্তানের বিপক্ষে স্মরনীয় জয়ে করেছিলেন ৬১৷ তবে শেষম্যাচে তার ২৯ যথেষ্ট ছিলনা দলের সেমিফাইনালে ওঠার জন্য৷ 

তবে ৬৫ অ্যাভারেজে ৪৬১ রান করে ৯৯ বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক হয়েছিলেন তিনিই৷ বিশ্বকাপে পাদপ্রদীপের আলোয় আসা দ্রাবিড়কে আর পেছনে তাকাতে হয়নি কখনও৷ 

একবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে যারা ক্রিকেট অনুসরন করতেন , তারা হয়ত জেনে থাকবেন ইডেনে দ্রাবিড় এবং লক্ষনের বীরত্বগাঁথা৷ অস্ট্রেলিয়ার ৪৪৫ রানের জবাবে প্রথম ইনিংসে ১৭১ এ অলআউট ভারত৷ ৮২ বলে ২৫ রানে আউট দ্রাবিড় নিজেও৷ ফলো অন করালেন স্টিভ ওয়াহ৷ হয়ত তার নিজের অন্যতম সিদ্ধান্ত যা তিনি ভুলে যেতে চাইবেন৷ দ্বিতীয় ইনিংসে দ্রাবিড় যখন মাঠে নামেন ভারত তখন ২৩২/৪ এবং যখন মাঠ ছাড়েন তখন ভারত ৬৫৭/৭৷ মহাকাব্যিক রাহুল  দ্রাবিড়  এবং ধৈর্য্যের মূর্ত প্রতীক লক্ষন ব্যাট করেছিলেন পুরো চতুর্থ দিন৷ হিসেব করলে  দ্রাবিড় ঐ ইনিংসে ব্যাট হাতে ছিলেন তৃতীয়,চতুর্থ এবং পঞ্চম দিনেও৷ লক্ষন আর দ্রাবিড় বীরত্বে তখন ইনিংস হার থেকে ভারতের হাতে লিড ৩৮৪ রানের৷ গাঙ্গুলীর হাতে ওভার ৭৫টি৷ অস্ট্রেলিয়া টিকেছিল সাকুল্যে ৬৮ পর্যন্ত৷ ইডেনে সেবার যে ইতিহাস লিখেছিলেন দ্রাবিড়,বর্তমান ক্রিকেটে ওমনটা কি আসলেই বিরল নয়? 

তবে ঐ ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি তিনি করেছিলেন আরও একবার৷ এবার মঞ্চটা অ্যাডিলেড৷ অস্ট্রেলিয়ার প্রথম ইনিংসে ৫৫৬ রানের জবাবে টিম ইন্ডিয়া ৮৫/৪৷ দ্রাবিড় আবারও প্রতিরোধ গরলেন, দ্যা ওয়ালের পেছনে আবারও আশ্রয় নিল টিম ইন্ডিয়া৷ 

শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন দ্রাবিড় আউট, ভারত তখন ৮৫/৪ থেকে ৫২৩৷ দ্বিতীয় ইনিংসে আগারকারের তোপে ১৯৬ তে প্যাকেট অস্ট্রেলিয়া৷ চতুর্থ ইনিংসে ভারতের জিততে দরকার ২৩৩৷ দ্রাবিড়ের অপরাজিত ৭২ রানে অ্যাডিলেডে জিততে পারে এশিয়ানরা, প্রমান করেই ছাড়ল সেবার ভারত৷


দল হেরেছে কিন্তু দ্রাবিড় ম্যান অফ দ্যা ম্যাচ, এমন পরিস্থিতি অসংখ্যবার দেখেছে ক্রিকেট দুনিয়া৷ কিন্তু দল হোয়াইট ওয়াশ অথচ দ্রাবিড় ম্যান অফ দ্যা সিরিজ! এমনটাই হয়েছিল ভারতের লজ্জ্বার ইংল্যান্ড সফরে৷ পুরো ইনিংসে ব্যাট ক্যারি থেকে শুরু করে তিন সেঞ্চুরি সহ ৪ ম্যাচে ৪৬১ রান! দ্যা ওয়াল তকমা তো আর শুধু শুধু দেয়া হয়নি তাকে! 

ঐ সিরিজেই ওয়ানডে এবং টি টুয়েন্টি থেকে অবসর নেন তিনি৷ বিদায়ী ওয়ানডেতে করেছিলেন ৬৯ রান৷ টুপিখোলা সম্মান দিয়েছিল পুরো ইংলিশ শিবির৷ 


রেকর্ড বইয়ে দ্রাবিড়ের টেস্ট রান সংখ্যা ১৩,২৮৮ আর ওয়ানডে রান ১০,৮৮৯৷ প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে ২০০৪ সালে জিতেছিলেন আইসিসি ক্রিকেটার অফ দ্যা ইয়ার, সেবার জিতেছিলেন বর্ষসেরা টেস্ট ক্রিকেটারের মর্যাদাও৷ 

দ্রাবিড় ক্রিজে থাকাকালীন অপরপ্রান্তে ৪৫৩ বার সতীর্থদের আউট হতে দেখেছেন৷ যা বিশ্বরেকর্ড৷ 

৪৪১৫২ মিনিট তিনি ব্যাটিং করেছেন টেস্টে৷ যা বিশ্বরেকর্ড৷ 

৩১,২৫৮ বল তিনি টেস্টে মোকাবিলা করেছেন৷ যা বিশ্বরেকর্ড৷ 

তিনি টেস্টে সর্বোচ্চ ২১০ টি ক্যাচ ধরেছেন ফিল্ডার হিসেবে৷ যা বিশ্বরেকর্ড৷ 

তিনি ৮৮ বার ১০০+ রানের জুটিতে সংযুক্ত ছিলেন৷ যা বিশ্বরেকর্ড৷ 

তিনি ২৪ টি অ্যাওয়ে টেস্ট জিতেছেন, যা ভারতীয় রেকর্ড৷ বাংলাদেশ এবং জিম্বাবুয়ে বাদে জেতা ১৫ টি টেস্টে তিনি দলের পক্ষে সর্বোচ্চ রানসংগ্রাহক ছিলেন, ১৫৭৭ রান৷ 


তিন নম্বরে ব্যাট করে তিনি ১০,০০০ রান করা একমাত্র ক্রিকেটার৷ 

তিনি একমাত্র ব্যাটসম্যান যিনি দশটি টেস্ট প্লেয়িং টিমের বিপক্ষেই টেস্টে সেঞ্চুরি করেছেন৷ 


তিনি ওয়ানডেতে দুইবার তিনশতাধিক রানের জুটি করেছেন৷ যার মধ্যে ৩২২ রানের রেকর্ডটি বিশ্বরেকর্ড এবং অপরটি ৩১৮৷ দুইবারই অপর প্রান্তের ব়্যাটসম্যান আউট হয়েছেন৷ 

ঘরের চেয়ে তার অ্যাওয়ে অ্যাভারেজ বেশি (৫৩·৫২)৷ 

তার ওয়ানডেতে দ্বিতীয় সর্বাধিক ৮৯টি হাফসেঞ্চুরি রয়েছে৷ 

তিনি একমাত্র ভারতীয় যিনি বিদেশের মাটিতে ৪ বার ম্যান অফ দ্যা সিরিজ হয়েছেন৷ ২ বার ইংল্যান্ডে, ১ বার অস্ট্রেলিয়া এবং ১ বার ওয়েস্ট ইন্ডিজে৷ 


রেকর্ডের পাতায় রাহুল দ্রাবিড়ের আরও অসংখ্য কীর্তিগাঁথা রয়েছে৷ কিন্তু ব্যাকরনসমৃদ্ধ শুদ্ধ ক্রিকেটে তার অবদান হার মানায় সব পরিসংখ্যানকেও৷ 

স্টিভ ওয়াহ একবার বলেছিলেন,

"যদি রাহুলকে প্রথম ১৫ মিনিটে আউট করতে না পারো তবে হাল ছেড়ে দাও এবং অপরপ্রান্তের ব্যাটসম্যানকে আউট করার চেষ্টা করো"৷

তবে সবচেয়ে গুনমুগ্ধ ছিলেন বোধহয় ব্রায়ান লারা৷ তিনি তো রীতিমত ঘোষনাই দিয়েছিলেন, তার হয়ে কাউকে ব্যাট করবার সুযোগ যদি কাউকে দিতেন, তবে তিনি হতেন দ্রাবিড়৷


মি· ডিপেন্ডবল কিংবা দ্যা ওয়াল, ক্রিকেট ইতিহাসে তার অবদান লেখা থাকবে সোনালী অক্ষরে৷ ক্রিকেটে যার এত অবদান তাকে কিভাবে ভুলবেন আপনি, তাও আবার জন্মদিনে! 

হ্যাঁ, ১৯৭৩ সালের ঠিক আজকের দিনেই জন্মগ্রহন করেছিলেন রাহুল৷ 

শুভ জন্মদিন কিংবদন্তী৷ দলের প্রয়োজনে যিনি কিনা  হাটঁতে জানেন কাচেঁর ওপর থেকেও৷ 


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন