এল ক্লাসিকো: ট্যাকটিকাল অ্যানালাইসিস

এল ক্লাসিকো: ট্যাকটিকাল অ্যানালাইসিস

বার্নাব্যুতে রিয়ালের লক্ষ্য ছিল জয়, তবে জয় না পেয়ে ড্র পেলেও চলত বার্সেলোনার৷ ট্যাক্টিকস আর প্লেয়িং স্টাইলের মারপ্যাচে ম্যাচশেষে ফলাফল  ছিল বার্সারই জয়৷ 


কেমন ছিল দুইদলের ট্যাক্টিকস:

বার্নাব্যুতে বার্সা এবং রিয়াল উভয়ই শুরু করেছিল ৪-৪-২ ফর্মেশনে৷ জিদান এই ম্যাচে মাতেও কোভাচিচকে চলতি সিজনে প্রথমবারের মত লা লীগায় ম্যাচের শুরু থেকে মাঠে নামান৷ এটা স্পষ্ট যে তার মূল উদ্দেশ্য ছিল মাঝমাঠে এমন কাউকে ব্যবহার করা যিনি প্রয়োজনে ডিফেন্স এবং অাক্রমন দুটোতেই পারদর্শী৷ অন্তত কোভাচিচের প্রথম হাফের পারফর্মেন্স জিদানের সিদ্ধান্তকে সঠিকই বলে৷ 


প্রথমার্ধ্ব ও মাদ্রিদের প্রভাব : নব্বই মিনিট  শেষে ফলাফল যতটা একপেশে ম্যাচের আবহ দিয়েছে সত্যি বলতে ম্যাচটা আদতে এমন ছিলইনা৷ বরঞ্চ প্রথমার্ধ্বে পারফর্মেন্সে এগিয়ে ছিল মাদ্রিদই৷ বার্সার বিপক্ষে মাদ্রিদ বরাবর কাউন্টার অ্যাটাকিং নির্ভর খেললেও এই ম্যাচে মাদ্রিদকে দেখা যায় হাই প্রেসিং করতে৷ সাধারনত কাউন্টার অ্যাটাকিং খেললে প্রতিপক্ষকে বিল্ড আপ করে নিজেদের অর্ধ্বে আসতে দেয়া হয় এবং এরপরে ট্যাকল কিংবা প্রেস থেকে কাউন্টারে যেতে হয়৷ কিন্তু এ ম্যাচে মাদ্রিদ বার্সাকে বিল্ড আপ করতে দেয়নি এবং নিজেরা পজেশন বেসড হাই প্রেসিং করতে থাকে৷ এক্ষেত্রে মাদ্রিদ ম্যান মার্কিংয়ের অবলম্বন করে৷ যেহেতু দুই দলই ৪-৪-২ তে শুরু করেছিল,ম্যান মার্কিং করাটা কঠিন কোন কাজ ছিলনা মাদ্রিদের জন্য৷ এক্ষেত্রে যেহেতু দুইদলেই কোন উইংগার ছিলনা, তাই দুই দলের ফুলব্যাকরা ওয়াইড অ্যারিয়াতে একে অপরকে হেড টু হেড মোকাবিলা করেছিল৷


প্রথম  হাফে মাদ্রিদের ম্যান মার্কিং এবং পজিশন কতটা সফল ছিল তা একটা পরিসংখ্যানেই প্রমান করে - টার স্টেগান চলতি সিজনে লা লীগায় ম্যাচ প্রতি ৬ টি লংপাস দিয়েছেন,সেখানে এল ক্লাসিকোতে তাকে ১৯টি লংপাস দিতে হয়েছে, কারন মাদ্রিদের হাইপ্রেসিং এবং ম্যান মার্কিংয়ের কারনে স্টেগানের কাছাকাছি থাকা শর্ট পাসিং জোন ( স্টেগান টু আলাবা/পিকে/ভারমালেন/সেমেদো) ব্লকড ছিল। কেননা এরা মার্কড ছিল এবং রোনালদো ও বেঞ্জামা অনবরত বার্সেলোনার ব্যাকফোরকে প্রেস করছিল৷ এ কারনে স্টেগানকে লংবল সাপ্লাই করতে হয়  এবং সবাই জানে বার্সেলোনা লংবল এবং এরিয়েল ডুয়েলে ঠিক ততটা দক্ষ নয়৷ যে কারনে বার্সেলোনা প্রথমার্ধ্বে বারবার পজেশন হারিয়েছে এবং তাদের বল পজিশন ছিল ৪৮%৷ 


হাইপ্রেসিং এবং ম্যানমার্কিংয়ের পাশাপাশি প্রথমার্ধ্বে মাদ্রিদ চান্স ক্রিয়েটেও ছিল  দারুন৷ কিন্তু তাদের অধিকাংশ সুযোগই ওয়াইড এরিয়াতে সৃষ্টি হয়েছিল৷ বার্সার স্বাভাবিক খেলা নষ্ট করে জিদান প্রথমার্ধ্বে যেভাবে প্রশংসার দাবিদার ঠিক তেমনি নিজেদের স্বাভাবিক খেলা নষ্ট করে এখানে সমালোচিতও হতে পারেন জিদান৷ একে তো তিনি কাউন্টার অ্যাটাকিং নির্ভর গেমপ্ল্যান করেননি তারওপর রোনালদো এবং বেঞ্জামাকে দিয়ে ওয়াইড অ্যারিয়াতে স্পেস সৃষ্টি করিয়েছেন এবং সেখান থেকে চান্স ক্রিয়েট করিয়েছেন৷ প্রশ্ন আসতে পারে ,যেহেতু দলে কোন উইংগার নেই , বিপরীতে দুজন স্ট্রাইকার রয়েছে,তারা যদি ওয়াইড অ্যারিয়াতে স্পেস সৃষ্টি করতে যায় তবে ডি বক্সে গোল করার জন্য কে থাকবেন ? কোন মিডফিল্ডারও বক্সে রান করতে পারবেন না কারন , মাদ্রিদ ম্যান মার্কিং অবলম্বন করছে, কেউ ডি বক্সে চলে আসলে তার মার্কড প্লেয়ার অানমার্কড হয়ে যাবে এবং ঠিক এখানেই দ্বিতীয়ার্ধ্বে সু়যোগ নেয় বার্সেলোনা৷ কারন , মাদ্রিদের লক্ষ্য ছিল জয় এবং বার্সার লক্ষ্য ছিল মাদ্রিদের ভুল কিংবা অল আউট অ্যাটাকের সুযোগ নেয়া৷ 


দ্বিতীয়ার্ধ্ব এবং বার্সার ফিরে আসা :

প্রথমার্ধ্বে মাদ্রিদের হাই প্রেশার এবং বার্সার চলতে থাকুক যেমন চলছে দিয়েই শুরু হয় দ্বিতীয়ার্ধ্ব৷ তবে বারো দিনের মাথায় চতুর্থ ম্যাচ , ইউরোপ থেকে এশিয়া যাত্রা এবং প্রথমার্ধ্বের হাই প্রেসিং৷ বড্ড ক্লান্ত লাগছিল দ্বিতীয়ার্ধ্বের মাদ্রিদকে৷ ছোট্ট একটা পরিসংখ্যান দেই, চলতি সিজনে লীগে বার্সার ৪৫ গোলের ৩১ টিই এসেছে দ্বিতীয়ার্ধ্বে৷ মাদ্রিদের বিপক্ষেও বার্সার এমন রূপই দেখা গিয়েছে৷সত্যি বলতে টপ লেভেলের প্লেয়ারদের নব্বই মিনিট পর্যন্ত ম্যান মার্ক করে রাখাটা অনেক বেশি কষ্টকর, তাতে ফর্মেশন যেমনই হোক না কেন! শারিরীক ক্লান্তি কিংবা মনযোগের সামান্য বিঘ্ন যথেষ্ট ম্যাচের রূপ বদলে দিতে৷ যেখানে বার্সার প্রথম গোলটি স্পষ্টভাবে মাদ্রিদের ক্লান্তিই চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয়৷



বার্সার প্রথম গোলে ক্রুসের পাস রবার্তো ইন্টারসেপটেড করে বুস্কেটসকে দিলে বার্সা নিজেদের মধ্যে কয়েকটা পাস দেয় এবং এরপর বল পায় রাকিটিচ৷ এখানে বলে রাখা ভাল, রাকিটিচ মাদ্রিদের মদ্রিচ(হলুদ বৃত্ত) এবং কার্ভাহাল(সবুজ বৃত্ত) এর চেয়ে ধীরগতির এবং তারা প্রথম গোলে রাকিটিচের রানের সময় একই স্থানে ছিল৷ কিন্তু দ্বিতীয় ছবিতে দেখুন ,রাকিটিচ এবং ঐ দুইজনের মধ্যে স্পষ্ট গ্যাপ৷ রাকিটিচ এদের চেয়ে ধীরগতির হলেও দুজনের ক্লান্তিকে কাজে লাগিয়ে বার্সার প্রথম গোলটা এনে দিয়েছে৷ এদিকে রাকিটিচ যখন বল নিয়ে ফ্রি জায়গায় এসে পরেছে তখন তাকে আটকাতে  কোভাচিচ আসতে পারছেনা কারন সে মেসিকে মার্ক করে রেখেছে৷ তার কাছাকাছি ছিল ভারান এবং কার্ভাহাল৷ ভারান ছিল সুয়ারেজের মার্কার, ভারান সুয়ারেজকে আনমার্ক করে  রাকিটিচকে ব্লক করতে আসলে সুয়ারেজ আনমার্কড হয়ে যায় কারন কার্ভাহাল সত্যিই ক্লান্ত ছিলেন এবং তিনি সেদিন সুয়ারেজকে গতিতে ধরতে পারেননি৷ ভারান রাকিটিচকে ব্লক করতে আসলে রাকিটিচ রবার্তোকে পাস দেয় এবং সেখান থেকে সম্পূর্ন আনমার্কড সুয়ারেজের গোল করতে কোন অসুবিধাই হয়নি৷ অবশ্য ম্যাচে স্টেগানের সেভগুলো দেখলে মাদ্রিদ ভক্তরা আফসোস করতেই পারে, ঠিক দিকেই ঝাপিয়ে ছিলেন নাভাস,ঐ শ্যুট সেভ করার  মত যোগ্যতা তার ছিল৷

দ্বিতীয়ার্ধ্বে কার্ভাহালের রেড কার্ডের আগে বল পজেশন ঘুরে বার্সার হয়ে যায় ৫৯%৷ ম্যাচের সময় যত আগাতে থাকে মাদ্রিদের প্রেসিং তত বাজে হয় ক্লান্তির কারনে৷ শেষদিকে বেল এবং এসেন্সিওকে নামালেও তা যথেষ্ট ছিলনা মাদ্রিদের জন্য কারন বার্সা তখন আর বিল্ড আপ কিংবা আক্রমন কোনটাইতেই যায়নি বরঞ্চ ডিফেন্সিভ মুডে চলে যায়৷ 

সমালোচনা কিংবা প্রশংসা দুটোরই দাবিদার জিদান এ ম্যাচে৷ তবে ম্যাচ মোটিভ এবং টেম্পো ধরে রাখায় ক্রেডিট আর ফল দুটোই ভালভার্দের পক্ষেই কথা বলে৷ বার্সার দূর্বল পয়েন্টে আঘাত করতে গিয়ে নিজেদের স্ট্রং জোনই(কাউন্টার অ্যাটাক) ব্যবহার করতে ভুলে গিয়েছিল মাদ্রিদ৷


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন