স্মৃতিতে ঘেরা বিশ্বকাপ এবং একজন 'কাকা'র গল্প

২০১০ বিশ্বকাপের আমেজ তখন তুঙ্গে। বাড়ির ছাদে ছাদে পতাকার ছড়াছড়ি। এলাকার আবুল-বকুলরা তখন নিজেদের মাঝে প্রতিযোগিতা চালাচ্ছে, কাদের পাড়ায় আর কোন দলের পতাকা সবচেয়ে বড়। এলাকার রেলগেটে বিশাল বড় ব্যানার-পোস্টার লাগানো হয়েছে, ডান পাশে কাকা-ব্রাজিলের, আর বাম পাশের খাম্বায় মেসি-আর্জেন্টিনার। যারা লাগিয়েছে তারা নিজেদের সাপোর্টের দলের জন্য ভালোবাসা দেখাতে লাগালেও, রাইভাল গ্রুপ আছে তক্কেতক্কে। যেদিন যেই দল হারবে, তখনই ঢিল-কাদা ছুড়ে হয় নষ্ট করবে তাদের ব্যানারটা আর নয়ত খাম্বা থেকে নামিয়ে ছিঁড়ে-কুটে ফেলবে। এরপর তাদের আত্মা পাবে শান্তি!

যাই হোক, ২০১০ বিশ্বকাপ ছিল এই প্রজন্মের বেশিরভাগ তরুণদের টিন-এজার থাকাকালীন বিশ্বকাপ। সবার গা গরম- রক্ত গরম, নিজের সাপোর্টের দল নিয়ে কিছু বললেই একদম মারামারি শুয়ে হয়ে যায়। অন্ততপক্ষে, মফঃস্বল এলাকা গুলোতে আরকি। কারণ, ওখানে তখনো ক্লাব ফুটবলের ঝনঝনানি এতটা পৌঁছায় নাই। সবচেয়ে ফুটবল পিয়াসু ছেলেটাও খোঁজ রাখত শুধু পেপার-পত্রিকার মাধ্যমে। তখন আবার কালের কণ্ঠ্য পেপার নতুন এসেছে বাংলাদেশে। সেখানে খেলার খবর থাকত চার পৃষ্ঠা, তার মাঝে দু পৃষ্ঠা থাকত ফুটবল নিয়ে, আবার বিশ্বকাপের বিশেষ লিখালিখি-ছবি তো ছিলই। তখন সেখানে এখনকার মত ইন্টারনেট ছিল না। ইন্টারনেট চালায় শুনলেই বাপ-মা ভাবত, "ছেলে গেলো বলে উচ্ছন্নে!" 
এলাকার ইন্টারনেট-মাল্টিমিডিয়ার দোকান গুলো তখন প্রতি মেইল পাঠাতে ৫০ টাকা করে নিত, আর যাদের নিজে হাতে ইন্টারনেট চালাতে ইচ্ছে করত, তারা গিয়ে ঢুকত সাইবার ক্যাফেতে, তাও গুরুজনদের থেকে লুকিয়ে। কারণ, গুজব আছে, "কে জানি কবে, বড়দের সিনেমা দেখতে গিয়ে ধরা খেয়েছে এসব যায়গায়!"

যাই হোক, ফুটবল প্রসঙ্গে আসি, এলাকার ৭ম-৮ম শ্রেণীতে পড়া আঁতেল ছেলেটাও তখন চোখে চশমা পড়া অবস্থায় কাঁদা-পানিতে নেমে যায় ফুটবল খেলতে, নামার আগে হাতে মার্কার কলম দিয়ে কি সব লিখছিল মনোযোগ দিয়ে। এতটা মনোযোগ দিয়ে হয়ত পরীক্ষার খাতায়ও সে লিখেনা। 


কেউ যদি জিজ্ঞেস করত, "কিরে হাতে কি লিখছিস এগুলো?" সগর্বে তার জবাব দিত সে, "ricardo izecson dos santos leite," যত কঠিন নাম বলবে, এলাকার মূর্খ গুলো তত ভাববে ছেলেটার মাথা আছে ফুটবলে।
মাথা চুলকিয়ে কেউ কেউ জিজ্ঞেস করত, "এটা আবার কে?"
তখন আঁতেল ছেলেটা সিনেমার নায়কদের মত ডায়লগ ছোঁড়ার ভঙ্গিমায় বলে উঠত, "কাকা!"
এর মাঝে কিছু আর্জেন্টাইন ত্যাঁদড় সাপোর্টার ছিল, যারা একটা গল্প বানিয়েছিল কাকাকে নিয়ে। গল্পটা এরকম যে, "ছোট বেলায়, রিকার্ডিনহো নামের এক ছেলের প্রতিবেশী সকল বাচ্চা-কাচ্চাদের পোষা কিছু না কিছু ছিল। কারো কুকুর, কারো বিড়াল! কিন্তু রিকার্ডিনহোর কিছুই ছিলোনা। একদিন সেই রিকার্ডিনহো বিষণ্ণ বদনে বসে ছিল বাড়ির ছাদে, তখন হুট করে একটা কাক উড়ে এসে বসল বাড়ির টিভি- এন্টেনায়। খা-খা রোদ, আশে পাশে কেউ নেই তখন। এমন এক অবস্থায়, কাকটি ডেকে উঠল, 'কা...কা...', আর তা শুনে নিঃসঙ্গ ছোট্ট রিকার্ডিনহো ভেবে বসল, কাকটি তাকেই ডাকছে, আবার নতুন নামও দিয়েছে। এরপর থেকে সে সবাইকে বলে বেড়াতে লাগল, তার একটি পোষা কাক আছে, 
যে তাকে 'কাকা' বলে ডাকে। এভাবে তার নাম হয়ে গেলো 'কাকা'।"
তো একবার সেই বোকাসোকা ছেলের সামনে এক ঠ্যাটা আর্জেন্টাইন সমবয়সী এসে এই গল্পটা বলছিল। যে ছেলে জীবনে কারো গায়ে হাত তোলে নাই ভুল করেও, সে রাগের চোটে কষে এক ঘুষি দিয়ে দিল সেই ঠ্যাটা ছেলের নাকে-মুখে। তার প্রিয় খেলোয়াড় 'কাকা' কে নিয়ে মশকারি?

যাই হোক, কাকার নামকরণের ইতিহাস মোটেও এমন ছিল না। ছোট বেলায় তাকে ডাকা হত রিকার্ডিনহো অর্থাৎ ছোট রিকার্ডো বলে। কিন্তু তার ভাই সেই রিকার্ডিনহো উচ্চারণ করতে গিয়ে 'কাকা' উচ্চারণ করে ফেলত। সেই থেকে তার নাম হয়ে যায় 'কাকা'। সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বাবা আর স্কুল টিচার মা এর ঘরে সোনার চামচ নিয়েই জন্মেছিলেন কাকা, যা আর দশটা ব্রাজিলিয়ান খেলোয়াড়ের জোটে না। বাবা- মা, এমনকি স্কুলের টিচারদের আশা ছিল কাকা বড় হয়ে ডাক্তার হবেন, এর বাইরে শখের খেলা হিসেবে টেনিসটা চালালেও চালাতে পারেন, সেটা তার নিজের ব্যাপার। যদিও আট বছর বয়সের দিকে আর সব এলাকার ছেলে পেলের মত নাম লিখিয়েছিলেন এলাকার ফুটবল একাডেমীতে!


সেই শুরু, আর পেছনে ফিরতে হয়নি। ১৫ বছর বয়সে সাইন করেন সেই সাও পাওলোর ইউথ একাডেমীর কন্ট্রাক্ট। এরপর সে বছরই ক্লাবের ইউথ একাডেমীকে করেন তরুণদের প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন, যার ফলে ডাক আসে সাও পাওলোর মূল একাদশে খেলার জন্য।

এতদূর পর্যন্ত কাকার আসাটা খুব স্মুথ ছিল, কোথাওই আটকাননি। না ছোট বেলায় বস্তিতে ফুটবল খেলে বড় হতে হয়েছে পেটে ক্ষুধা নিয়ে, না অভাব ছিল কোন সাফল্যের। কাকার উচ্চতা এখন ৬ ফুট ১ ইঞ্চি। কিন্তু যখন কাকা ছোট ছিলেন, তখন ছিলেন একদম গাট্টা গোট্টা, বয়সের তুলনায় বাড় হয়নি একদমই। সমবয়সীদের তুলনায় পায়ের ধাপ ছিল ছোট, গতিও ছিল কম। এই সমস্যা কাটিয়ে উঠতে গতি বাড়াতে প্রচন্ড পরিশ্রম করতেন কাকা। ফলে বয়সের সাথে যেমন তার উচ্চতা অনেক বেড়ে গিয়েছে, সাথে বেড়েছে গতিও। এর সাথে যোগ করুন ব্রাজিলিয়ানদের সহজাত ড্রিবলিং আর ক্ষুরধার পাস।
যাইহোক, মূল দলে ডাক পাওয়ার পর সুইমিং পুলে বসে চিল করছিলেন কাকা। হঠাৎই সেখানে পিছলে পরে ভেঙ্গে বসলেন মেরুদণ্ডের এক কশেরুকা। ডাক্তাররা ঘোষণা দিলেন 'ঈশ্বরকে ডাকুন, কিচ্ছু করার নেই। হয়ত পঙ্গু হয়ে যাবেন চিরতরে।"
ছোট বেলা থেকে কাকা এবং তার পরিবার প্রবল ধর্মানুরাগী ছিলেন। একবার এক শো তে তার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে নানান প্রশ্নের উত্তরে বলেছিলেন, তার প্রিয় বই হলো বাইবেল। আর তার স্ত্রী, যিনি কিনা ছিলেন তার ছোটবেলার বান্ধবী, তাকে কাকার প্রপোজ করা এবং ভালোবাসার একটিই কারণ, তা হলো ধর্মের প্রতি অনুরাগ! উল্লেখ্য যে, তারা দুজনই নাকি বিয়ের আগ অব্দি ভার্জিনও ছিল।
যাই হোক, ঈশ্বর হয়ত চান নাই, কাকার ফুটবল জীবন এখানেই থেমে যাক, চার সপ্তাহের মাঝে ট্রেনিং এ ফিরে আসলেন কাকা, যা আজও তিনি মনে করেন অলৌকিক কিছু হবে! শুধু ট্রেনিং এ ফিরেন নাই, সে সিজনে ব্রাজিলিয়ান পত্রিকা 'বোলা ডি ওরো' এর মতে সিজনের সেরা প্লেয়ারও হয়ে দেখালেন, সাথে চলে এলেন ইউরোপিয়ান বড় বড় দলের র‍্যাডারে। একই সাথে ডাক এলো তারকাখচিত সেই ২০০২ ব্রাজিল দলে খেলার। যারা ২০০২ বিশ্বকাপ দেখেছে, তারা বলতে পারবে ভালো, কাফুর হাতে বিশ্বকাপ কিংবা অলিভার কানকে কাটিয়ে রোনালদোর দুই গোলের সাথে দর্শকদের মনে এক তরুন ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের 'I Belong to Jesus' লিখা টি-শার্টের কথাও ভালো দাগ কেটেছিল। এই একই কথা লিখা টি-শার্ট গায়ে কাকাকে আরো একবার দেখা গিয়েছিল, তা হলো এসি মিলানকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিতিয়ে। উল্লেখ্য যে, এত কিছুর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছিল সিজনের শেষ ম্যাচটি। রিও-সাও পাওলোর মাঝের ফাইনাল ম্যাচটিতে ১-০ এ হারতে বসেছিল সাও পাওলো। কিন্তু স্টেডিয়ামে উপস্থিত ৭১,০০০ দর্শককে নিশ্চুপ বানিয়ে শেষ দুই মিনিটে দুই গোল করে কাকা সাও পাওলোকে জেতান ট্রফি, সাথে নিজে তৈরি করেন তার বিশ্ব জয়ের মঞ্চ।


এক সাক্ষাতকারে কাকা বলেছিলেন, ছোট বেলায় তার স্বপ্ন ছিল নাকি এসি মিলানের জার্সি গায়ে খেলার। কথাটি কতটা সত্য জানিনা, কিন্তু তরুণ কাকার সাফল্য আর খেলা দেখে ২০০৩ সালে তার স্বপ্নের ক্লাব এসি মিলান তাকে ব্রাজিল থেকে উড়িয়ে ইতালিতে নিয়ে গেলেন। সেখানে তার মত এটাকিং মিডফিল্ড পজিশনে ইতিমধ্যে পাকাপোক্ত ভাবে বসে আছেন রুই কস্তা। এক মাসের মাঝে রুই কস্তাকে বেঞ্চের টিকিট কেটে দিয়ে সেই স্থান দখল করেন তরুণ কাকা। সিজনে ৩০ ম্যাচে করেন দশ গোল, সাথে বেশ কিছু ইম্পর্ট্যান্ট এসিস্ট, যার মাঝে অন্যতম হচ্ছে আন্দ্রে শেভচেঙ্কোর উদ্দেশ্যে বাড়ানো ইতালিয়ান লীগ ট্রফি, স্কুদেত্তো উইনিং বলটি। প্রথম সিজনেই এমন পার্ফরমেন্সের জন্য ২০০৪ সালে কাকা নির্বাচিত হন সিরিএ এর সেরা প্লেয়ার, একই সাথে নমিনেশন পান ব্যালন ডি অর (১৬ তম) এবং ফিফা বেস্ট ফুটবলার (৯ম) আওয়ার্ড এর জন্য।
২০০৫ সালে পিরলো- গাত্তুসু- সিডর্ফ সাথে কাকা, আর সামনে শেভচেঙ্কো মিলে স্বপ্নের দল গড়ে ওঠে এসি মিলান। চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালেও পৌছে গিয়েছিলেন ছুঁটতে ছুঁটতে। ফাইনালে তৃতীয় গোলে কাকা করে সুন্দর একটি এসিস্ট, এছাড়া পুরো প্রথম অর্ধ লিভারপুলকে নিজের গতি,ড্রিবলিং, থ্রু দিয়ে নাচিয়ে ছেড়েছিলেন। যদিও দ্বিতীয় অর্ধে মিরাকল ঘটায় লিভারপুল। ৩-৩ গোলে ড্র হওয়া ইস্তানবুল ফাইনাল পেনাল্টিতে ২-৩ গোলে জিতে যায় তারা। এ বছর কাকা নির্বাচিত হন উইয়েফা বেস্ট মিডফিল্ডার হিসেবে।