ক্রুইফের সেরা হওয়ার গল্প (পর্ব- ১)

ক্রুইফের সেরা হওয়ার গল্প (পর্ব- ১)

"জোহান ক্রুইফ" নাম টা প্রায় সকল ফুটবল প্রেমিদের কাছেই পরিচিত। জোহান ক্রুইফ ফুটবলে একজন ইতিহাসের সেরা খেলোয়াড়দের মধ্যে তো আছেনই। ইতিহাসের সেরা কোচদের মধ্যেও তিনি আলোড়ন ছড়িয়েছেন। তিনি খেলোয়াড়ী জীবনে ১৯৭১, ১৯৭৩ এবং ১৯৭৪  সালে মোট তিন বার ব্যালন ডি'অর পেয়েছেন। আবার তিনি উয়েফার সেরা ১০ জন কোচদের মধ্যেও আছেন। ফুটবলে তার "টোটাল ফুটবল" শাস্ত্রের জন্য তিনি বিখ্যাত। কেউ কেউ তাকে টোটাল ফুটবলের জনক বলে থাকেন। ক্রুইফ তার খেলোয়াড়ী জীবনে আয়াক্স, বার্সেলোনা, লস এঞ্জেলস এযটেক্স, ওয়াশিংটন ডিপলম্যাটস, লেভান্তে, ফেয়েনুর্ড এই সব ক্লাবের হয়ে খেলেছিলেন।

খেলোয়াড় হিসেবে ক্লাবে ক্রুইফ

আয়াক্স

ক্রুইফ আয়াক্সের হয়ে খেলেন ১৯৫৭ থেকে ১৯৭৩ সাল এবং ১৯৮১-১৯৮৩ সাল পর্যন্ত। ক্রুইফ ১০ বছর বয়সে আয়াক্সের যুব দলের একাডেমিতে অংশগ্রহণ করেন। আয়াক্সের যুব দলের কোচ জেনি ভ্যান ডার ভিন তার প্রতিভা দেখে কোনো ট্রায়াল না নিয়েই তিনি তাকে আয়াক্সের মূল দলে দিয়ে দেন। কিন্তু তিনি প্রথমে বেসবলের বিভাগে খেলেন। ১৫ বছর বয়সে তিনি ফুটবলে মনযোগ দেন। তিনি ১৯৬৪ সালের ১৫ নভেম্বর নেদারল্যান্ডের লিগে প্রথম ম্যাচে নামেন। যে ম্যাচটি আয়াক্স ৩-১ এ হারে এবং এক মাত্র গোলটি করেন ক্রুইফ। ওই মৌসুমটি আয়াক্সের জন্মের পর থেকে সবচেয়ে খারাপ মৌসুম ছিল। আয়াক্স পয়েন্ট টেবিলে ১৩ তে থেকে মৌসুম শেষ করে।


১৯৬৫-১৯৬৬ মৌসুম থেকে ক্রুইফ ভালো খেলতে শুরু করেন। তিনি লীগে ২৩ ম্যাচে ২৫ টি গোল করেন। আয়াক্স সে বছর লীগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে। ১৯৬৬-৬৭ মৌসুমে আয়াক্স আবার লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে এবং আয়াক্স কেএনভিবি কাপ জিতে। যার কারণে ক্রুইফ প্রথমবার ডাবল জিতেন। তিনি নেদারল্যান্ডের লিগে ৩৩ গোল করে সর্বোচ্চ গোল করেন। সে বছর তিনি বছরের সেরা ডাচ ফুটবলার নির্বাচিত হন। ১৯৬৯ সালে প্রথম ইউরোপিয়ান কাপ ফাইনাল খেলেন কিন্তু আয়াক্স সেই ম্যাচ মিলানের কাছে হারে ৪-১ গোলে। ১৯৬৯-৭০ মৌসুমে তিনি দ্বিতীয়বার ডাবল জিতেন। ১৯৭০-৭১ মৌসুম থেকে তিনি পিএসভির সাথে একটি ম্যাচ থেকে তিনি ৯ নম্বর জার্সির বদলে ১৪ নম্বর জার্সি পড়া শুরু করেন। এক ডাচ ফুটবলের সাংবাদিকের মতে ক্রুইফ সে সময় নতুন খেলার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন যা টোটাল ফুটবল নামে পরিচিত এবং তিনি টোটাল ফুটবলের জনক ছিলেন।

১৯৭১ সালে ক্রুইফ ডাচ ও উয়েফা বর্ষসেরা খেলোয়াড়ের পুরষ্কার পান। ১৯৭২ সালে ইতালিয়ান ক্লাব ইন্টার মিলান কে ২-০ তে হারিয়ে তিনি ২য় ইউরোপিয়ান কাপ জিতেন যেখানে ২ টি গোলই ক্রুইফের ছিল। সে ম্যাচটি ইতালিয়ান ডিফেন্সিভ খেলার টোটাল ফুটবলের কাছে হারের জন্য বিখ্যাত ছিল। ১৯৭২-৭৩ মৌসুমে আয়াক্স আবার আরেক ইতালিয়ান দল জুভেন্টাসকে হারিয়ে ৩য় ইউরোপিয়ান কাপ জিতে যে ম্যাচটির ২০ মিনিট অনেকের মতে ফুটবলের সেরা ২০ মিনিট ছিল।

বার্সেলোনা

জার্মান কিংবদন্তী ফ্রাঞ্জ বেকেনবাওয়ার ক্রুইফের দলবদলের মূল্য সম্পর্কে বলেন,

"যখন ক্রিস্টিয়ানো এবং বেলের মূল্য ১০০ মিলিয়ন পর্যন্ত যেতে পারে, ক্রুইফের মূল্য বিলিয়ন পর্যন্ত যেতে পারে।"


১৯৭৩ সালের মধ্য মৌসুমে ক্রুইফ এফ সি বার্সেলোনায় ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে চুক্তি করেন। ক্রুইফ তার ছেলের নাম কাতালান নামে রাখেন জর্ডি। তিনি রিয়াল মাদ্রিদের ঘরের মাঠ সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে মাদ্রিদ কে ৫-০ গোলে হারিয়ে বার্সেলোনাকে ১৯৬০ সালের পর প্রথমবার লিগ শিরোপা জিততে সাহায্য করেন। মার্কিন দৈনিক পত্রিকা নিউইয়র্ক টাইমস বলে ক্রুইফ ৯০ মিনিটে কাতালান মানুষদের মধ্যে যে উৎসাহ-উদ্দীপনা তৈরি করেন তা কাতালান রাজনীতিবীদরাও পারেননি। ১৯৭৪ সালে ক্রুইফ ইউরোপিয়ান বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন। ক্রুইফ বার্সেলোনায় থাকা কালে এটলেটিকো মাদ্রিদের সাথে তিনি তার একটি বিখ্যাত গোল করার পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। যাকে বলা হয় "দি ফ্যানটম গোল"। তিনি ১৯৭৮ সালে লাস পালমাস কে হারিয়ে কোপা দেল রে জিতেন। তিনি ১৯৭৫ সালে প্যারিস-সেন্ট --জার্মেই এর হয়ে ২ বার খেলেন কারণ তিনি প্যারিসের প্রেসিডেন্ট  ড্যানিয়েল হেচারের একজন ভক্ত ছিলেন।

অবসরের আগে

ক্রুইফ অবসর নেয়ার আগে তিনি শূকরের ফার্ম করেন যেখানে তার মিলিয়ন মিলিয়ন টাকা খরচ হয় তাই তিনি আমেরিকার ক্লাবে খেলতে যান। তিনি আমেরিকায় লস এঞ্জেলস এজটেক্স এবং ওয়াশিংটন ডিপ্লোম্যাটস এই ক্লাব গুলোতে খেলেন। ক্রুইফ আমেরিকায় খেলার ব্যাপারে বলেন,

"এটা একটা ভুল সিদ্ধান্ত ছিল ৩১ বছর বয়সেই আমার ফুটবল ক্যারিয়ার শেষ করা,আমেরিকায় একেবারে শূণ্য থেকে শুরু করা এবং আমার অতীত থেকে অনেক দূরে।এটা আমার জন্য সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত ছিল।সেখানে আমি আমার অনিয়ন্ত্রিত আকাঙ্ক্ষা গুলো কিভাবে উন্নত করতে হয় তা শিখেছিলাম,একজন কোচের মতো চিন্তা করতে এবং স্পন্সরশিপের ব্যাপারে জানতে পারি"।

লেভান্তের হয়ে স্পেনে ফেরা

ক্রুইফ ১৯৮১ সালে লেভান্তের হয়ে খেলা শুরু করেন সেহুন্দা বিভাগে কিন্তু তিনি ইঞ্জুরি এবং বিভিন্ন কারণে লেভান্তের হয়ে মাত্র ১০ টি ম্যাচ খেলেন এবং মাত্র ২ টি গোল করেন। প্রথম বিভাগে খেলতে না পারায় লেভান্তের সাথে তার চুক্তি ঐ মৌসুমেই শেষ হয়।

নেদারল্যান্ডে ফেরা এবং চূড়ান্ত অবসর

আয়াক্স

ক্রুইফ আয়াক্সের হয়ে ১৯৮১-৮২ মৌসুমে ফেরেন। ১৯৮২-৮৩ মৌসুমে তিনি আয়াক্সের হয়ে আবারো ডাচ লিগ শিরোপা জিতেন এবং ডাচ কাপ কেএনভিবি কাপ জিতেন। ১৯৮২ সালে তিনি একটি বিখ্যাত গোল করেন। আয়াক্স একটি পেনাল্টি পায় এবং সে পেনাল্টি ক্রুইফ নেয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু তিনি বল জালের দিকে মারার বদলে তার দলের আরেক খেলোয়াড় জেসপার ওলসেন কে দেন।জেসপার ওলসেন ক্রুইফকেই পাস ফিরিয়ে দেন এবং ক্রুইফ বল আস্তে করে জালে ভেড়ান।

ফেয়েনুর্ড

১৯৮২-৮৩ মৌসুম শেষে আয়াক্স ক্রুইফকে নতুন চুক্তির প্রস্তাব না দিলে তিনি বেশ রাগান্বিত হন এবং আয়াক্সের প্রতিদ্বন্দ্বী ফেয়েনুর্ডের সাথে চুক্তি করেন।


ফেয়েনুর্ডে তিনি একটি সফলতা পূর্ণ ক্যারিয়ার কাটান। তিনি ফেয়েনুর্ডকে এক দশক পর প্রথমবার লিগ শিরোপা জিততে সাহায্য করেন এবং ডাচ লিগ কাপও জিতেন। ক্রুইফ সে বছর ডাবল জিতেন এবং ডাচ বর্ষসেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হন।তিনি ১৯৮৪ সালের ১৩ মে তারিখে ডাচ লিগের শেষ ম্যাচ খেলেন এবং একটু গোল করেন। তিনি ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচ ফেয়েনুর্ডের হয়ে সৌদি আরবে খেলেন আল আহলির সাথে যেখানে তিনি ফেয়েনুর্ডকে ম্যাচে ফেরান গোল করে।


নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন