ক্রুইফ দর্শনে খেলোয়াড় রোনালদো৷

ক্রুইফ দর্শনে খেলোয়াড় রোনালদো৷

ইয়োহান ক্রুইফ । তার নাম শোনা যায় টোট্যাল ফুটবলের জনক হিসেবে। অন্তত ফুটবল দর্শনের দিক থেকে ঐ প্রয়াত ডাচ ভদ্রলোক থাকবেন উপরের সারিতেই। রোনালদো , ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আউট অ্যান্ড আউট ফ্রি রোমিং উইংগার , ড্যান্সার অন দ্যা বল থেকে ফক্স ইন দ্যা বক্স! আল্টিমেট পোচার , হাইব্রিড উইংগার সফল আর সেরা দু ক্ষেত্রেই। ফুটবলার রোনালদোর নতুন রূপে বিবর্তনের সাথে ইয়োহান ক্রুইফের কিছু ফুটবল দর্শনের সাদৃশ্য তুলে ধরা হলো।

১/ স্ট্যাটিস্টিক্যালি এটা প্রুভড যে, নব্বই মিনিটের একটা ম্যাচে আপনি অ্যাভারেজ ৩ মিনিট বল পায়ে রাখতে পারেন। বাকি ৮৭ মিনিট আপনাকে ছুটতে হয় বল ছাড়াই। ফুটবলে আপনি কতটা সফল হবেন তা নির্ভর করবে আপনার ঐ বাকি ৮৭ মিনিটের ওপর। বস্তুত এটা হলো আপনার " অফ দ্যা বল মুভমেন্ট "। আরও পরিস্কার করে বললে, সঠিক সময়ে সঠিক স্থানে থাকা। অন্তত বিগত ৩ বছরে এই অফ দ্যা বল মুভমেন্টকে রোনালদো অন্য লেভেলে নিয়ে গেছেন। অন্যান্য ন্যাচারল স্ট্রাইকারদের থেকে এক্ষেত্রে রোনালদোর সফল হবার কারন তার ক্ষিপ্রতা, গতি এবং স্ট্যামিনা। যে কারনে রোনালদো ডিফেন্ডারদের মার্কিং থেকে বের হয়ে আসতে পারেন। উদাহরণ স্বরূপ আপনি চ্যাম্পিয়ন্স লীগ (১৬-১৭) এর ফাইনালে রোনালদোর সেকেন্ড গোলটা দেখতে পারেন। রোনালদো ডি বক্সে ট্যাপ ইনের জন্য ওয়েট করতে ছিলেন না , তিনি মূলত বক্স থেকে বের হয়ে ছিলেন যাতে বক্সে তাকে অতিরিক্ত মার্কিংয়ে না পরতে হয়। উইথিন ফ্র্যাকশন অফ সেকেন্ডস মদ্রিচ যখন বল নিয়ে সিক্স ইয়ার্ডস বক্স ছাড়িয়ে যান, রোনালদো তখনই অপনেন্টের দুই সিবিকে বিট করে সম্পূর্ন ফাকাঁয় চলে যান এবং ট্যাপইনে গোল করেন। আপনি যখন রাতে ঘুমিয়ে থেকে সকালে কোন ফুটবল অ্যাপে স্কোর কিংবা হিটম্যাপ দেখবেন,তখন আপনার মনে হবে এ আর এমনকি! টিমমেট বল দিল, আমি পা ঠুকে গোল দিলাম। কিন্তুু এই ক্ষুদ্র সমীকরন মেলাতে সেদিন পুরো আসরের সেরা সেন্টার ব্যাক জুটি ব্যর্থ হয়েছিল। আপনি হয়ত রোনালদোর দ্বিতীয় গোলের পর কিয়েলিনি এবং বনুচ্চির একে অপরের দিকে অসহায় তাকিয়ে থাকাটা দেখতে পাননি। দুজনেই ছিলেন রোনালদোর মার্কার বাট আল্টিমেটলি গোলের মুহূর্তে রোনালদো থেকে দুজনের ন্যূনতম ৩ গজ দূরত্ব সৃষ্টি হয়ে যায়। কিভাবে? উত্তরটা হচ্ছে, ক্ষীপ্র গতি এবং দারুন অভিযোজন ক্ষমতা সম্পন্ন একজন উইংগারের অফ দ্যা বল মুভমেন্ট এবং পোচিং ইন দ্যা বক্স। 


২/ আপনি দেখবেন অনেকেই বল পায়ে দারুন কারিশমা দেখাতে পারে। একনাগারে ১০০০ বার বল জাগল করতে পারে। আমি একে অন্তত টেকনিক বলবোনা না, কারন আপনি ট্রেনিং গ্রাউন্ডে এমনটা চেস্টা করে সফল হতে পারেন ,কিন্তুু আপনার মুখ্য বিষয় হলো আপনি বল জাগল করে আপনার টিমমেটকে সঠিক জায়গায় সঠিক অবস্থানে পাস দিতে পারলেন কিনা। নিকট অতীতে রোনালদোকে সবথেকে বেশি যে সমালোচনা শোনা যায়, তা হলো রোনালদো কেন ড্রিবলিং কম করেন এবং তিনি গেম প্লেতে কম অংশ নেন। প্রথমত এক্ষেত্রে আপনাকে মাদ্রিদের স্কোয়াড ডেপথের দিকে তাকাতে হবে। দারুন ড্রিবলার এবং গেম বিল্ডার হবার পরও ইস্কো, জেমসরা কতটা উপেক্ষিত ছিলেন ম্যাচ বাই ম্যাচ। মাদ্রিদে আপনি কতটা ভাল ড্রিবলার কিংবা স্কিলফুল তার ওপর আপনার সফলতা নির্ভর করেনা, মাদ্রিদ ডাইরেক্ট প্লে তথা কাউন্টার অ্যাটাকে খেলতে পছন্দ করে। সেক্ষেত্রে ড্রিবলিং নয় রাইট মোমেন্টে রাইট টিমমেটকে তার রাইট প্লেসে পাস দেয়াটা মুখ্য। চলুন চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ফাইনালে রোনালদোর প্রথম গোলটা দেখে আসা যাক। রোনালদো ওদের সেকেন্ড হাফে বল পেয়েছিলেন। ডিসিশন তার ওপর ডিপেন্ড করছিল, তিনি চাইলে ওয়ান অন ওয়ান ড্রিবলিংয়ে যেতে পারতেন খেদিরার বিপক্ষে আবার সামনে থাকা কার্ভাহালকেও পাস দিতে পারবেন চাইলে। রোনালদো দ্বিতীয়টাই বেছে নিলেন, কার্ভাকে পাস দিলেন বক্সে ঢুকলেন এবং গোল করলেন। আদতে এখানেও রয়েছে ঐ অফ দ্যা বল মুভমেন্টের কারসাজি।

৩/ আপনি কোন কিছু জিতলেন এবং এর সাথে সাথেই আপনি আর জয়ের মুহূর্তের মত ১০০% নেই , ৯০% হয়ে গিয়েছেন , অনেকটা কোকের বোতলের মত৷ ক্যাপ খোলার পর যেমন খানিকটা গ্যাস বের হয়ে কিছুটা শূ্ন্য করে দেয়। আমরা যদি রোনালদোর ১৫ বছরের ফুটবল ক্যারিয়ারে তাকাই এবং সমসাময়িক অন্য যেকোন ফুটবলারের দিকে তাকাই , ইট ইজ রোনালদো যে কিনা কখনও সন্তুষ্ট ছিলেন না তিনি যা জিতেছেন তা নিয়ে। বরঞ্চ রোনালদোর জয়ের নেশা, সেরা হবার ক্ষুধা তাকে বরাবরের চেয়ে আরও সেরা করেছে। দল পাচঁ শূন্য গোলে এগিয়ে থাকার পরও গোল হবার সাথে সাথে বল নিয়ে ম্যাচ শুরু করার তাগিদ রোনালদোতেই আছে। তিনি উদ্ধত রোনালদো বলেই হয়ত হ্যাটট্রিক পূর্ন করার পর গোলের সুযোগ মিস করে ক্ষোভে শূন্যে থুঁ ফেলে থাকেন। নিজের শতভাগটা রোনালদো হয়ত ৯০ এ নামতে দেন, কিন্তুু আশির ঘরে কখনও নয়। 

৪/ ফুটবল খেলাটা সহজ, কিন্তুু সহজভাবে ফুটবল খেলতে পারাটা সবথেকে কঠিন। এক্ষেত্রে প্রশ্ন এবং প্রশ্নের উত্তরদাতা উভয়ই রোনালদোর নিন্দুকশ্রেনীর লোকজন। তারা যেভাবে রোনালদোর পেনাল্টি, ট্যাপইন,হেডারকে সহজ মনে করে আসলেই কি তা ততটা সহজ? একজন ফুটবলার সবথেকে প্রেশার ফিল করেন যখন তিনি গোলকিপারের সামনে ওয়ান অন ওয়ান সিচুয়েশনে থাকেন। ঐ মুহূর্তে তাকে উইথিন ন্যানো সেকেন্ড সিদ্ধান্ত নিতে হয় তিনি করবেন। ক্রুইফেরই আরও একটি মন্তব্য ছিল,

" ওরা বোকা যারা বলে ফুটবল পা দিয়ে খেলতে হয়" ৷

ইটস টোট্যালি এ্যা মাইন্ড গেম ঐ মুহূর্তে। দিক নির্নয়ের ভুল কিংবা চোকিং করে বসা ওয়ান অন ওয়ান কিংবা পেনাল্টি মিস করে বসা আপনাকে খলনায়কের চরিত্রে বসাতে পারে। যে কারও ক্ষেত্রে হতে পারে এমনটা৷।


৫/ সঠিক সময়ে পৌছানোর ক্ষেত্রে কেবল একটাই মুহূর্ত রয়েছে, এরচেয়ে এদিক ওদিক হলে আপনি হয় আগে না হয় পরে পৌছেছেন। ফার্গুসন কিংবা মোরিনহোর আউট এ্যন্ড আউট ফ্রি রোমিং উইংগার, প্লে মেকার কিংবা গোলস্কোরিং হাইব্রিড উইংগার থেকে জিদানের ফক্স ইন দ্যা বক্স, হাইব্রিড উইংগার। রোনালদো কি সঠিক সময়েই পৌছেছেন তার গন্তব্যে ? অন্তত পরিসংখ্যান বলে " পার্ফেক্ট "। আনচোলত্তির মাদ্রিদে আসার কিছুদিনের মধ্যেই রোনালদোর টোট্যাল প্লেয়িং স্টাইলে আমূল পরিবর্তন। আপনি সময়ের চাকাঁকে কখনও বেধে রাখতে পারবেন না , বয়স বাড়ছিল। একটা টাফ ইঞ্জুরি তাকে রোবেন,রিবেরির মত ত্রিশ পেরেনোর তালিকায় পাঠিয়ে দিতে পারতো। কিন্তুু রোনালদো সিদ্ধান্ত নিলেন এবং তা বাস্তবায়নও করলেন। কেউ যদি প্রশ্ন করে রোনালদো তার খেলার ধরনে এমন পরিবর্তন কেন আনলেন? উত্তর হবে, " কারন তিনি স্মার্ট এবং বুদ্ধিমান "। পজিশন কিংবা রোল চেঞ্জের সাথে সাথে আমরা অনেক প্রতিভাকে দারুন আফসোসের রবিনহো হতে দেখেছি, মাদ্রিদের দুঃখ ক্যাসানো হতে দেখেছি আমরা। কিন্তুু তিনি রোনালদো, তিনি বেশ ভালভাবেই টিকে গেলেন অভিযোজনের ঐ খেলায়। অনেকটা ষাটোর্ধ্ব বাজের মত, বেচেঁ থাকতে হলে নিজের পালক ছিড়তে হবে, টিকে থাকতে হলে নিজের ঠোকঁ ঠুকরে ভাঙ্গতে হবে,একবার টিকে গেলে তুমি আরও একবার নতুন জীবন পেয়ে গেলে। স্বাধীন, আগের চেয়ে আরও অভিজ্ঞতা নিয়ে।

ইনিই রোনালদো, হয়ত সর্বকালের সেরা উইংগার - সেরা পোচাঁর!

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন