বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস (পর্ব- ৪): উপমহাদেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রা

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস (পর্ব- ৪): উপমহাদেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রা

ফুটবল এর প্রতি ভারতীয়দের ছিল অন্য রকম আগ্রহ। সেজন্য এর জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়তে থাকে। এখন থেকে ১৫০-১৬০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা ফুটবলের সঙ্গে পরিচিত ছিলেন। অনেকেই ফুটবল খেলেছেন, ফুটবল দেখতেন। বর্তমানে বিশ্ব ফুটবল দাপিয়ে বেড়ানো  দেশগুলোর অনেকেরই তখনো ফুটবল পরিচিতি ঘটেনি। আমাদের পূর্বপুরুষরা যখন মাঠে খালি পায়ে ফুটবল খেলেছেন, তখন ব্রাজিলের মানুষরা ফুটবল খেলার সঙ্গে পরিচিত ছিল না। ১৮৯৪ সালে চার্লস মিলার নামে একজন ইংরেজ যুবক ব্রাজিলে ফুটবল শুরু করেন। ১৯৯৪ সালে ব্রাজিলিয়ানরা তাদের ফুটবলের শত বছরপূর্তি পালন করেছে। আর্জেন্টিনা তো ফুটবল খেলতে শুরু করেছে আমাদের পরে। ফিফার জন্ম কিংবা বিশ্বকাপ ফুটবল শুরুর অনেক আগে থেকেই ফুটবল খেলেছে বাঙালি।

স্বভাবগতভাবে আবেগপ্রবণ ও হুজুগে বাঙালি কোনোরকম সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ ছাড়া নেহায়েতই ভালো লাগা এবং অবসরের বিনোদনের মাধ্যম হিসেবে প্রথমে ফুটবলকে গ্রহণ করেছে, ভালোবেসেছে ও উৎসাহ দেখিয়েছে। একসময় তারা ফুটবলের মধ্যে খুঁজে পেয়েছে আস্থা, আত্মবিশ্বাস, জাতিগত ঐক্য, স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রেরণা।

১৮৮৯ সালে পাঁচশত টাকা দিয়ে একটি কাপ বানিয়ে তারা শুরু হয় ‘ট্রেভস কাপ’ প্রতিযোগিতা। অবশ্য এ প্রতিযোগিতা বলতে গেলে সাদা চামড়াদের মাঝেই সীমাবদ্ধ ছিলো। কেননা একমাত্র শোভাবাজার ছাড়া এ আয়োজনে আর কোনো বাঙালী ক্লাব খেলার অনুমতি পায়নি। ট্রেভস কাপ-এর প্রথম শিরোপা জয় করে ডালহৌসী ক্লাব। এরপর ১৮৯৬ সাল পর্যন্ত পর্যায়ক্রমে সেন্ট জেভিয়াস কলেজ, মেডিকেল কলেজ ও শিবপুর কলেজ এই কাপ জয় করে। কুচবিহারের মহারাজার উদ্যোগে ১৮৯৩ সালে চালু হয় ‘কুচবিহার কাপ’। এর পরের বছর ইংলিশ ছাত্রদের জন্য ‘ক্যাডেট কাপ’ আর বাঙালী ছাত্রদের জন্য ‘এলিয়ট শিল্ড’ প্রবর্তিত হয়। ১৮৯৮ সালে প্রথম বিভাগ লীগ চালু হলেও ১৯১৬ সাল পর্যন্ত এ লীগে কোনো ভারতীয় দল খেলার সুযোগ পায়নি। তবে সেকেন্ড ডিভিশনে দু’টি বাঙালী দল মোহনবাগান ও এরিয়ান ক্লাব খেলার সুযোগ পেতো।

‘ইন্ডিয়ান ফুটবল এসোসিয়েশন’ ১৯৯৪ সালে শুরু করে ‘আইএফএ শিল্ড’ প্রতিযোগিতা। বলে রাখা ভাল,এই আইএফএ শিল্ড হল পৃথিবীর ৪র্থ প্রাচীন প্রতিযোগিতা।এই প্রতিযোগিতার উদ্যোক্তা ছিলেন জার্মান সাহেব স্যার এ.এ আপকার, ইংরেজ সাহেব জে সাদারল্যান্ড এবং কুচবিহার ও পাতিয়ালয়ের দুই মহারাজ। শিল্ডটি তৈরী করে কলকাতার ওয়াল্টার লক কোম্পানীর মাধ্যমে লন্ডনের বিখ্যাত এলকিংটন কোম্পানী।এ শিল্ডের গোড়ার দিকে ইংল্যান্ডের বিভিন্ন ক্লাব, গোরা সৈন্যদের দল এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটি একচেটিয়া আধিপত্য বিস্তার করে।

মোহনবাগান প্রথম ভারতীয় ক্লাব যারা আইএফএ শিল্ড এর ট্রফি জয় করে। ফাইনালে তারা ইস্ট ইয়র্কশায়ার রেজিমেন্ট কে ২-১ গোলে পরাজিত করে। সে ম্যাচের মোহনবাগান দলের ক্যাপ্টেন ছিলেন শিবদাস ভাদুড়ি। তিনি ও তার বড় ভাই বিজয়দাস ভাদুড়ী এ ম্যাচে একসাথে ফরওয়ার্ড হিসেবে খেলেছিলেন। শিবদাস সে ম্যাচে সমতাসূচক গোলের পাশাপাশি অভিলাস ঘোস কে দিয়ে উইনিং গোল করান। এ একটি জয় ই উপমহাদেশের ফুটবলের অগ্রযাত্রায় যোগ করে নতুন পালক।

                             

শিবদাস ভাদুড়ির জন্ম ১৯৮৭ সালে। ১৯৩২ সালে মাত্র ৪৪ বছর বয়সে ম্যালেরিয়ায় মারা যান তিনি।
মোহনবাগান তথা এশিয়ার যে কোন দলের প্রথম আইএফএ শিল্ড জয়ের নায়কের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এ পর্ব এখানেই শেষ করছি।

 আগের পর্বের লিংক

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন