কেমন আছে অ-১৭ বিশ্বকাপের তারকারা?

কেমন আছে অ-১৭ বিশ্বকাপের তারকারা?
Md. Shohag Ali October 28, 2017, 11:04 pm National Team

১৯৭৭ সালে সিঙ্গাপুর ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন “লায়ন সিটি কাপ” নামে অ-১৬ বয়সী ফুটবল টুর্নামেন্ট চালু করে। ফিফার সভাপতি সেপ ব্ল্যাটার এর আদলে বৈশ্বিক টুর্নামেন্ট আয়োজনের পরামর্শ দিলে ১৯৮৫ সালে চালু হয় ফিফা অ-১৬ বিশ্ব চ্যাম্পিয়নশীপ। পরবর্তীতে ১৯৯১ সালে বয়সসীমা বাড়িয়ে অ-১৭ বিশ্ব বিশ্বচ্যাম্পিয়নশীপ, সর্বশেষ ২০০৭ সালের সাউথ কোরিয়ায় অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতাটি ফিফা অ-১৭ ওয়ার্ল্ড কাপ নামে পরিচিত হয়ে আসছে।

২০১৭ সালে ১৭তম বিশ্বকাপের স্বাগতিক হিসেবে প্রথমবারের ফিফার কোনো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার আয়োজক হল ভারত। প্রতিবারের ন্যায় উত্থান ঘটছে নতুন তারকা কিংবা বিস্ময় বালকের। ফাইনালিস্ট ইংল্যান্ডের ৭ গোল করা স্ট্রাইকার আর. ব্রিউস্টার নিয়ে উন্মাদনা তুঙ্গে। স্পেনের রুইজ, তরেস, ব্রাজিলের লিঙ্কন, পাউলিনহো, ব্রেনারদের নিয়েও স্বপ্ন দেখা শুরু সমর্থকদের। কিনতু কেমন হবে এসব তারকাদের ভবিষ্যত। ভবিষ্যত বলা কঠিন। কিনতু আগের প্রতিযোগিতাগুলোর সেরাদের বর্তমান চোখের সামনে আছে। তাদের উত্থান-পতনের চিত্রই এক্ষেত্রে পথপ্রদর্শক হতে পারে।

ফিফা অ-১৭ বিশ্বকাপ নাম হওয়ার পর এ পর্যন্ত ৫টি পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে। বল ও সিলভার ক্যাটাগরিতে মোট ৬জনকে পুরস্কার দেওয়া হয়। শুরু হয় উন্মাদনা কোন ক্লাব কোন তারকাকে আগে ভেড়াতে পারে নিজেদের দলে। তারপর কারও মসৃণ পথচলা, কারও থেমে যাওয়া। ২০১৩ সালে অনুষ্ঠিত ৩য় প্রতিযোগিতার তারকাদের বয়স এখন ২৩। টিনএজের ইয়ংস্টার তকমা হারিয়ে এখন শুধুই খেলোয়াড়। এই তিনটি প্রতিযোগিতার তারকাদের নিয়ে এবারের পর্ব।

                                                 

  • ২০০৭: সাউথ কোরিয়া

স্পেনকে পেনাল্টিতে ৩-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জিতেছিল বয়সভিত্তিক প্রতিযোগিতার অন্যতম সেরা দল নাইজেরিয়া। ঘানাকে ২-১ হারিয়ে ৩য় হয় জার্মানি। শিরোপা না জিতলেও জার্মানি দেখেছিল আজকের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার টনি ক্রুসের উত্থান। ৫ গোল করে গোল্ডেন বল ও ব্রোঞ্জ শ্যু জয়ী ক্রুস টুর্নামেন্ট শেষে বার্য়ান মিউনিখের সিনিয়র টিমে অভিষেক ঘটে। তারপরের ইতিহাস সবারই জানা। মিউনিখ ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদেও সফল ক্রুস এখন ক্লাব ও জাতীয় দলের অন্যতম সেরা মিডফিল্ডার বলে বিবেচিত।

৭ গোল করে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ গোলদাতা, গোল্ডেন শ্যু, সিলভার বল জিতেছিল নাইজেরিয়ার ম্যাকাউলি ক্রিস্যান্টাস। স্বভাবতই ইউরোপের ক্লাবগুলো আগ্রহী হয়ে ওঠে। জার্মান ক্লাব হ্যামবার্গার এসভি দলে ভেড়ায় ক্রিস্যান্টাসকে। একাডেমী টিমে ভালো শুরু করলেও ২বার লোন, স্পেন, তুরস্ক, গ্রীস ঘুরে এখন খেলেন সদ্য গ্রীস সুপার লিগে প্রমোশনপ্রাপ্ত লামিয়া ক্লাবে। অ-১৭ বিশ্বকাপের পর নাইজেরিয়া দলে আর কখনও না খেলা ক্রিস্যান্টাস হারিয়ে গেছেন স্মৃতির অতলে।

ফাইনালিস্ট স্পেনের সেরা খেলোয়াড় ছিলেন বোজান কিরকিচ। ৫ গোল নিয়ে ব্রোঞ্জ বল ও শ্যু জয়ী কিরকিচ অনেকদিন পর্যন্ত বার্সার ভবিষ্যত বলে বিবেচিত ছিলেন। কিনতু বার্সার ফ্রন্টলাইনে জায়গা করে নিতে ব্যর্থ বোজান ইতালি, নেদারল্যান্ড, ইংল্যান্ড ঘুরে স্প্যানিশ ক্লাব আলাভেসে লোনে খেলছেন, মূল ক্লাব স্টোক সিটি। স্পেনের মূল দলের হয়ে ১টি ম্যাচ খেলা ২৭ বছর বয়সী ফরোয়ার্ড এখন ক্যারিয়ারে মধ্যগগনের, কিনতু ভাল কিছুর আশা নেই বললেই চলে।

                                         

ঘানার র‍্যান্সফোর্ড ওসেই ৬ গোল করে ২য় সর্বোচ্চ গোলদাতা ও সিলভার শ্যু জিতলে পোল্যান্ডের লেগিয়া ওয়ারশের আগ্রহ সত্ত্বেও ওয়ার্ক পারমিটের কারণে সাইন করতে পারেনি। পরবর্তীতে ইসরাইলের ম্যাকাবি হাইফাতে সাইন করলেও ক্যারিয়ারে উল্লেখ করার মত নই। বর্তমানে ফিনল্যান্ডের এফসি সান্টা ক্লাউস ক্লাবে খেলছেন ঘানার হয়ে ২টি ম্যাচ খেলা স্ট্রাইকার র‍্যান্সফোর্ড।

টুর্নামেন্টের উল্লেখযোগ্য খেলোয়াড় ছিলেন- ফ্যাবিও (ব্রাজিল), ভিক্টর মোসেস, হেনরি ল্যান্সবুরি, ড্যানি ওয়েলবেক (ইংল্যান্ড), ইলারামেন্দি, ফ্রান মেরিদা, ডেভিড ডি গিয়া (স্পেন) অথচ স্পেনের নং-১ ছিল ইয়েলকো রামোস (যার উইকি পেজই নাই)।

  • ২০০৯: নাইজেরিয়া

স্বাগতিক ১-০ গোলে হারিয়ে শিরোপা জয় করে সুইজারল্যান্ড। কলম্বিয়াকে ১-০ গোলে হারিয়ে ৩য় স্পেন। ৫ গোল করে যৌথভাবে সর্বোচ্চ গোলদাতা ৪ জন, নাইজেরিয়ার সানি ইমানুয়েল, সুইজারল্যান্ডের হারিস সেফেরোভিচ, উরুগুয়ের সেবাস্টিয়েন গ্যালেগস ও স্পেনের বোর্জা বাস্তোন।

গোল্ডেন বল, সিলভার শ্যু প্রাপ্ত সানি ইমানুয়েলকে নিয়ে টানাটানি পড়ে যায় ক্লাবগুলোতে। চেলসি ও স্পার্সে ট্রায়াল দিয়ে শেষ পর্যন্ত ল্যাজিওতে হয়ে সাইন করা ইমানুয়েল এখন সু্‌ইডেনের দাঁতভাঙা উচ্চারণের ক্লাবের খেলোয়াড়। নাইজেরিয়ার অ-২০ এর হয়ে ২টি ম্যাচ খেললেও সিনিয়র টিমের খাতা শূন্য।

                                  

সুইজারল্যান্ড হারিস সেফেরোভিচ খেলেন বেনফিকায়, ১২ ম্যাচে ৬ গোল করেছেন মৌসুমে। জাতীয় দলেও নিয়মিত মুখ। অথচ টুর্নামেন্টের সিলভার বল জেতা স্বদেশী নাসিম বেন খলিফা এফসি সেন্ট গ্যালেনের বেঞ্চ খেলোয়াড়, জাতীয় দলে মাত্র ৪বার খেলেছেন।

উরুগুয়ের সেবাস্টিয়েনকে স্পেনের অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ নিজেদের দলে ভেড়ায়, কিন্তু ৩ বছর পরে ছেড়ে দিলে পরবর্তীতে উরুগুয়ের বিভিন্ন ক্লাবে নামমাত্র খেলতে থাকা সেবাস্টিয়েন অ-২০ এরপর জাতীয় দলের মুখ দেখেননি।

গোল্ডেন শ্যু জয়ী স্পেনের বোর্জা বাস্তোনকে অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদ একাডেমীর অন্যতম সেরা ভাবা হত। ভিন্ন ক্লাবে লোনে খেলতে থাকা বাস্তোন জারাগোজা ও এইবারের হয়ে পরপর ২টি সেরা মৌসুম কাটালেও ২০১৬ সালে ক্লাব রেকর্ড ফিতে যোগ দেন সোয়ানসি সিটি। কিনতু ১৮ ম্যাচে ১টি গোলের ব্যর্থতায় লোনে আছেন মালাগাতে। স্পেন অ-১৭ হয়ে ২২ ম্যাচে ১২ গোল করা বাস্তোন পরবর্তীতে অ-১৯ এর হয়ে ২টি ম্যাচ খেললেও আর কখনো নামে আসেনি। একই টুর্নামেন্টে ৩ গোল করা ইস্কো এবং ২ গোল মোরাতা এখন জাতীয় দল ও নিজ নিজ দলের অপরিহার্য অংশ উঠছেন। ভাগ্য!

                                       

গ্রুপপর্বে বাদপড়া ব্রাজিলের হয়ে মাত্র ১টি গোল নেইমার বর্তমানে অন্যতম সেরা তারকা। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য – সার্জি রবার্তো (স্পেন/বার্সেলোনা), মারিও গোটজে (জার্মানি/ব. ডর্টমুন্ড), রিকার্ডো রদ্রিগেজ (সুইজাল্যান্ড/এসি মিলান), সন (দ. কোরিয়া/স্পার্স) – প্রত্যেকে ২ গোল।

  • ২০১১: মেক্সিকো

মেক্সিকোতে অনুষ্ঠিত প্রতিযোগিতায় উরুগুরুকে ০-২ গোলে পরাজিত শিরোপা ঘরে রাখে স্বাগতিকরা। ব্রাজিল-জার্মানির ৩-৪ গোলের থ্রিলারে জয়ী হয়ে ৩য় জার্মানি। সর্বদা সকালের সূর্য যে দিনের পূর্বভাস দিবে এমন কোন কথা নেই। ঠিক এরূপই ঘটেছে এ পর্বের তারকাদের ভাগ্যে।

৭ ম্যাচের সবকয়টিতে জয়, ১৭ গোল করা মেক্সিকো দুর্দান্ত পারফরমেন্সের স্বরূপ গোল্ডেন, সিলভার, ব্রোঞ্জ বল যায় মেক্সিকোর ঘরে যথাক্রমে জুলিও গোমেজ, জোনাথন এসপেরিকুয়েতা, কার্লোস ফিয়েরো। যদিও কেউ এদের নিয়ে স্বপ্ন দেখে থাকে তবে দোষ দেওয়া যায় না। কিনতু বর্তমানের প্রেক্ষাপট অসম্পূর্ণ উল্টো। ৩জনের কেউ ক্লাব ফুটবলের প্রতিষ্ঠিত নাম নয়, খেলেন মেক্সিকান লিগে, ২৩ বছরে পা রাখলেও, পা পড়েনি জাতীয় দলে। সে সম্ভাবনা নিকটকালে দেখা যাচ্ছে না।

৯ গোল করে গোল্ডেন শ্যু জয়ী আইভরি কোস্টের সুলেমানে বিশ্বকাপ শেষে নাম লেখান স্পার্সে। ইয়ুথ লেভেলে নাম ছড়ালেও ইংল্যান্ড, সুইজারল্যান্ড, ইতালি, স্কটল্যান্ড ঘুরে এখন খেলছেন মিশরের আল-আহলি ক্লাবে। ৮ ম্যাচে করেছেন ৬ গোল। বয়স মাত্র ২২। অ-১৭ এর পরে আইভরি কোস্টের হয়ে না খেলা সুলেমানের এখনও সময় আছে বলা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত হতাশাজনক।

                                   

টুর্নামেন্টে ২৪ গোল জার্মানির সর্বোচ্চ গোলদাতা লেভারকুসেনের সামিদ ইয়েসিল পান সিলভার শ্যু। লেভারকুসেন একাডেমীর হয়ে ৭১ ম্যাচে ৫৭ গোল করা ইয়েসিল সিনিয়র টিমে অভিষেক ঘটে ২০১১-১২ মৌসুমে। কিনতু ২০১২ সালে ১ মিলিয়নের ট্রান্সফারে পাড়ি জমান ইংলিশ ক্লাব লিভারপুলে। উজ্জ্বল ভবিষ্যত বুঝি এখানেই থেমে গিয়েছিল ইয়েসিলের। লিভারপুলের হয়ে ২টি লিগ কাপ ম্যাচ খেলা আর কখনো নিজেকে মেলে ধরতে পারেনি। লুর্জানের লোন শেষে এখন গ্রীসের প্যানিওনিওস খেলছেন ২৩ বছর বয়সী স্ট্রাইকার। জার্মান জাতীয় দলে অ-১৯ এরপর আর ডাক পাননি।

টুনার্মেন্টে ৫ গোল করা ব্রাজিলের অ্যাডেমিলসন, আদ্রিয়ান কিংবা ফ্রান্সের ইয়াসিন বেনজিয়ারাও নিজেদের পরবর্তীতে মেলে ধরতে পারেননি। সাড়াজাগানো ইয়ংস্টার লুকাস পিয়াজন, ওয়ালেস, ওয়েলিংটন, ভিক্টর ফিশারও এখন নিভু নিভু।

তাহলে কি নিস্ফলা টুর্নামেন্টই গেছে। না, ইংলিশ উইঙ্গার রহিম স্টালিংও খেলেছিলেন, নামের পাশে ছিল ২ গোল। দিনকে দিন তার পারফরমেন্স পেপের অধীনে উন্নতির দিকে।

পরবর্তী থাকবে অন্য কোন টুর্নামেন্টে, লীগে বা ক্লাবের ইয়ংস্টারদের কাহিনী।





Similar Post You May Like

জনপ্রিয় খেলার সংবাদ

Find us on Facebook