শুভ জন্মদিন, কালো মানিক

শুভ জন্মদিন, কালো মানিক

একজন ফুটবলারকে দেশের জাতীয় সম্পত্তি বলে ঘোষনা করলেন সে দেশের প্রেসিডেন্ট স্বয়ং, যাতে সংশ্লিষ্ট ফুটবলার ইউরোপ থেকে আসা সব লোভনীয় প্রস্তাবগুলো উপেক্ষা করে নিজের দেশেই থেকে যান। একজন ফুটবলারের ক্যারিয়ারের ১০০০তম গোল উদযাপন করতে নভেম্বরের ১৯ তারিখ তাঁর দেশে তাঁরই নামে দিবস পালন করা হয়। এই একই ফুটবলারকে একনজর খেলতে দেখতে নাইজেরীয় সিভিল ওয়ারে লড়তে থাকা দুপক্ষই যুদ্ধবিরতির সিদ্ধান্ত নেয়।

১৯৯৯ সালে আন্তর্জাতিক অলিম্পিক কমিটি ভুষিত করে "অ্যাথলেট অফ দ্যা সেঞ্চুরি" ভুষনে। ২০০০ সালে ফুটবল নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফার জুরি বোর্ডের নির্বাচনে "সর্বকালের সেরা ফুটবলার" নির্বাচিত হন।

এতক্ষন যেসব অর্জন, সম্মাননার কথা বলছিলাম, সবই এডসন আরান্তেঁস ডো নাসিমেন্তোর ব্যাপারে। ১৯৪০ সালের ২৩ অক্টোবর জন্ম নিয়েছিলেন ব্রাজিলের ট্রেস করাকোসে। তাঁর বাবা টমাস আলভা এডিসনের নামে ছেলের নাম রাখেন। এডিসন থেকে 'আই(I)' বাদ দিয়ে রাখেন এডসন। এডসন ছোটবেলা থেকেই ফুটবলকে নিজের শ্বাস প্রশ্বাসের সাথেই মিশিয়ে ফেলেন ব্রাজিলের আলো বাতাসে। বাবা ডন্ডিনহোও ছিলেন একজন ফুটবলার, খেলতেন ব্রাজিলীয় মাইনর লীগে। পারিবারিক অস্বচ্ছলতা সেই ছোটবেলায়ই জীবন সংগ্রামে নামিয়ে দেয় এডসনকে, যাকে ডিকো বলে ডাকত মা -বাবা, বন্ধুরা। তাও, যেটুকু সময়ই পেতেন পড়ে থাকতেন ফুটবল নিয়েই। বাবার থেকেই ফুটবল দীক্ষা নিতেন তখন, বিভিন্ন অ্যামেচার ফুটবল ক্লাবেও খেলতেন। স্রষ্টা প্রদত্ত মেধায় পরিপূর্ণ ছিলেন, পারফর্মেন্সেও করতেন তারই অনুবাদ। এভাবেই চোখে পড়ে যান ভালদেমার ডি ব্রাইটোর (Waldemar de Brito), যিনি ছিলেন বাউড়ু অ্যাথলেটিক ক্লাবের কোচ। বাউড়ু অ্যাথলেটিকোর জুনিয়র টিমে ১৯৫৪ থেকে ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত খেলার পর ব্রাইটো নিজেই ডিকোকে নিয়ে যান সান্তোসে, ডিকোর স্বপ্নের ক্লাব। স্কাউটদের মুগ্ধ করে নিজেকে প্রমানও করেন এবং সাক্ষর করেন কন্ট্রাক্ট। '৫৬ এর ডিসেম্বরে সান্তোসের হয়ে নিজের ডেব্যু ম্যাচেই প্রফেশনাল ক্যারিয়ারের প্রথম গোলটি করেন তিনি। খুব দ্রুতই হয়ে ওঠেন দলের অপরিহার্য সদস্য এবং লীগের সর্বোচ্চ গোলদাতা। সান্তোসের হয়ে দুর্দান্ত পারফর্মেন্সে ১৯৫৭ সালেই ১৬ বছর বয়সে ডাক পান ব্রাজিল জাতীয় দলে। অভিষেক ম্যাচে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোল করার রেকর্ড করেন এডসন নাসিমেন্তো। ১৯৫৮ সালটা ছিল তাঁর জন্য সোনায় সোহাগা, নিজের অসাধারণ নৈপুণ্যে সান্তোসকে লীগ জেতান। জায়গা করে নেন ব্রাজিলের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে। ব্রাজিল জেতে নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ, যাতে এডসনের অবদান ৪ ম্যাচে ৬ গোল - এক কথায় অতিমানবীয়। এরপরে তাঁর পথচলা চলেছে আরো অনেক দিন, যে পথচলা সারাবিশ্ব মনে রেখেছে এবং পৃথিবীর অস্তিত্ব বিলীন হবার আগ পর্যন্তও মনে রাখবে। ১৯৫৮ পরবর্তী তাঁর অর্জনগুলো তাঁর সর্বাধিক প্রচলিত নামটি জানলেই মনে পড়ে যাবে।

সে নামটি হচ্ছে "পেলে"। ফুটবলের কালো মানিক বলা হয় তাঁকে। তো এই পেলে নামটি কিভাবে যুক্ত হল তাঁর জীবনে? ডিকোর ছেলেবেলায় ফিরে যাই, আসুন। ডিকোর প্রিয় ফুটবলার ছিলেন ভাস্কো দা গামা বিলি। "বিলি" নামটার উচ্চারণ ডিকো করতেন "পেলে"। এটা দেখেই বন্ধুরা তাঁর নাম রাখে "পেলে"। এভাবেই তাঁর জীবনের সাথে জুড়ে যায় নামটি।

১৯৫০ সালে বিশ্বকাপের আসল বসল ব্রাজিলে। স্বাগতিক দল টুর্নামেন্টের হট ফ্যাভারেট। যথারীতি ফাইনালেও পৌঁছে গেল প্রত্যাশানুযায়ী। মারাকানার ফাইনালে প্রতিপক্ষ আরেক লাতিন দল উরুগুয়ে। ব্রাজিল ফ্যানরা নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা জয় উদযাপনের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। কিন্তু, কে জানত বিধাতার হাতে লেখা চিত্রনাট্য ছিল অন্যরকম। সেদিন উরুগুয়ে জন্ম দিল অঘটনের। ব্রাজিলকে হারিয়ে জিতে নেয় নিজেদের দ্বিতীয় বিশ্বকাপ শিরোপা। পুরো ব্রাজিল কেঁদেছিল তখন, কেঁদেছিলেন পেলেও। সেদিন থেকেই ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জেতানোর স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন, যা পরবর্তীতে বাস্তবায়ন করে দেখিয়েছেন ফুটবল সম্রাট। ১৯৫৮-১৯৭০ পর্যন্ত খেলেছেন ৪টি বিশ্বকাপে। সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে জিতে নিয়েছেন এর মধ্যে ৩টিই। ১২ ম্যাচ খেলে করেছেন ১৪টি গোল। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে গোল, হ্যাট্রিক, সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে ফাইনাল খেলার কীর্তি গড়েছেন, অন্য যেকোন কারোর কাছেই যেগুলো স্বপ্ন। 

পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে খেল গেছেন ফরওয়ার্ড এবং অ্যাটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে। ক্যারিয়ারের একটা সময় প্লে মেকারের রোলও প্লে করেন তিনি। নিজের ইউনিক প্লেয়িং স্টাইলের জন্য সমাদৃত পেলে , যেমনটা তৎকালীন সময়ে দেখা যেত না একদমই। ড্রিবলিং, শুটিং, হেডিংয়ে দারুণ স্কিল তাঁকে পরিণত করে প্রতিপক্ষের ত্রাসরুপে। দু'পায়ে সমান দক্ষতাসম্পন্ন ছিলেন পেলে। পুরো ক্যারিয়ারে কতটা বিধ্বংসী ছিলেন, তার প্রমান তাঁর ক্যারিয়ার স্ট্যাটিস্টিক্স। ক্যারিয়ারে ১৩৬৩ ম্যাচ খেলে গোলসংখ্যা ১২৮১। ব্রাজিলের জার্সিতে ৯২ ম্যাচে ৭৭ টি গোল পেলের।

১৯৫৬ সালে প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করা এডসন আঁরান্তেস ডো নাসিমেন্তো তাঁর ক্যারিয়ারের শেষ ম্যাচটি খেলেন ১৯৭৭ সালের ১লা অক্টোবর একটি এক্সিবিশন ম্যাচে। তাঁর ক্লাব নিউইয়র্ক কসমস এবং সাবেক ক্লাব সান্তোসের মধ্যে অনুষ্ঠিত হয় ম্যাচটি। ম্যাচে পেলে অর্ধেক সময় সান্তোসের জার্সিতে বাকি অর্ধেক সময় কসমসের জার্সিতে খেলেন। কসমসের হয়ে পেলের গোলেই কসমস সান্তোসকে হারায় সেদিন। এ ম্যাচের মাধ্যমেই ফুটবল ক্যারিয়ারকে বিদায় বলেন এ কিংবদন্তি।

তাঁকে সর্বকালের সেরা ফুটবলার বলা হয় কেন? কেন তিনি বাকি সব গ্রেট ফুটবলার থেকেও এক ধাপ উপরে? উত্তর হবে - তাঁর ব্যক্তিগত এবং দলগত অর্জনের প্রাচুর্যই তাঁকে আলাদা করে রেখেছে সবার থেকে। ফুটবলকে "দ্যা বিউটিফুল গেইম" নামে আখ্যায়িত করা হয় আজ, তারও সুচনা পেলের হাত ধরেই। আজ ২৩ অক্টোবর। শুভ জন্মদিন, পেলে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন