এরিক ব্রুক- ম্যানসিটির আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

এরিক ব্রুক- ম্যানসিটির আকাশের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র

"আমার মনে হয় ও সব সময় ই আমার ইঞ্জুরির জন্য প্রার্থনা করতো। চেলসির সাথে তখনো আমাকে স্ট্রেচারে সাইডলাইনের বাইরে নেয়া হয় নি। ব্রুক দৌড়ে আসলো, তার দ্বিগুন সাইজের আমার পরিহিত জার্সিটা নিয়ে গোল বারে দাঁড়িয়ে গেল। ব্রুকি সেই দিন গোল কিপিং টা  উপভোগ করতে পারেনি কারণ ওর কাছে বল আসার আগেই আমি মাঠে চলে এসেছিলাম। ব্রুকি আমার দেখা সবচেয়ে আশ্চর্যের খেলোয়াড়।"

সিটি লিজেন্ড এরিক ব্রুক কে এভাবেই প্রশংসায় ভাসালেন সাবেক সিটি গোল কিপার ফ্র‍্যাঙ্ক সুইফট। ম্যানচেস্টার সিটি ও ইংলিশ ফরওয়ার্ড এরিক ব্রুক (Eric Brook)। ৩২ বছর বয়সে অবসর নেওয়ার আগে কিংবদন্তিদের খাতায় নাম লেখানো এই ফুটবলারের জন্ম ইয়র্কশায়ার এ। ১৯০৭ সালের ২৭ নভেম্বর জন্ম নেন সিটির হয়ে এখন পর্যন্ত সর্বাধিক ১৭৭ গোল করা ব্রুক।

২১ বছর বয়সে বন্ধু ফ্রেড টিলসনের সাথে ৬০০০ ব্রিটিশ পাউন্ডের বিনিময়ে সিটিতে যোগদানের পূর্বে ব্রুক তার প্রফেশনাল ক্যারিয়ার শুরু করেন বার্নসলে তে। জীবনের প্রথম ক্লাবে ৩ সিজনে ১৮ গোল করে আলোচনায় আসেন ব্রুক। ১৯২৮ সালে সিটিতে যোগ দেওয়া ব্রুকের ডেব্যু হয় ১৭ ই মার্চে গ্রিমসবি টাওনের বিপক্ষে, তবে তার পা থেকে প্রথম গোল টি আসে ক্ল্যাপ্টন অরিয়েন্ট এর বিপক্ষে। অভিষেক সিজনেই ব্রুক ১২ ম্যাচ খেলে দুই গোল দেয় এবং সিটি প্রথম ডিভিশন ফুটবলে উপনিত হয়।

আউট সাইড লেফট পজিশনে খেলা ও সরে এসে মিডেলে গোল করা, এমন এক ভিন্ন ধাচের প্লেইং স্টাইলের কারনে তাকে বলা হত "unorthodox" লেফট উইংগার। সিটি ও ইংল্যান্ডের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই ফুটবলার নিজের জাত চেনানো শুরু করেন ১৯২৮-১৯২৯ সিজন থেকে। সেই সিজনে ৪১ ম্যাচ খেলে ব্রুক ১৪ বার বল জালে ঢোকান। তার সতীর্থ সিটিজেন টমি জনসন সে সিজনে এক সিজনের ক্লাব রেকর্ড ৩৮ গোল করলেও ব্রুক সবার নজরে আসেন অন্য ভাবে। পরের বছরই পুরস্কার স্বরূপ গায়ে তোলেন ইংলিশ জার্সি। আইরিসদের সাথে সেই অভিষেক ম্যাচে ব্রুক কোন গোল না পেলেও ইংল্যান্ড পায় ৩-০ গোলের জয়। তার পর ইংল্যান্ডের হয় মোট ১৮ বার মাঠে নেমে ১০ বার বল জালে জড়াতে সক্ষম হন ব্রুক।

জাতীয় দলের হয়ে আরও অনেক ম্যাচ খেলতে পারতেন ব্রুক। তবে তার সাথে কম্পিটিশন ছিল আর্সেনাল প্লেয়ার ক্লিফ বাস্টিনের। ইনসাইড লেফট এ খেলা বাস্টিন পরবর্তীতে ব্রুকের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হয়ে যায় এবং তারা একসাথে জাতীয় দলের হয়ে খেলে বিজয়ও অর্জন করেন। ব্রুক কে বলা হত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পূর্ববর্তী ইংল্যান্ডের সেরা প্যানাল্টি টেকার।

ব্রুকের পাসিং এবিলিটি ভাল থাকায় অনেক সময়ই ব্রুককে রোটেশন করে খেলানো হত। দলের প্রয়োজনে সেন্টার ফরোয়ার্ডও পজিশনেও খেলতে পারতেন এই কিংবদন্তি ফুটবলার। ৩১-৩২ ও ৩৫-৩৬ দুই সিজনে সিটির হয়ে সর্বাধিক গোল করেন এই ওইংগার। ৩১-৩২ সিজনে এফ এ কাপের সেমিতে ওঠা সিটির হয়ে ৪র্থ রাওন্ডের ম্যাচে ২ গোল করে দলকে বিজয়ী করতে সাহায্য করেন ব্রুক। যদিও সিটি সে বছর আর্সেনালের কাছে সেমিতে ১-০ গোলে পরাজয় বরণ করে বিদায় নেয় । ১৯৩৩ ও ১৯৩৪ সালে সিটি পরাপর দুইবার এফ এ কাপের ফাইনালে উঠে। প্রথম বারের চেষ্টায় এভার্টন কে না হারাতে পারলেও ৩৪ সালে এই কিংবদন্তীর এসিস্টেই ফ্রেড টলিসনের গোলে এভার্টন কে হারিয়ে এফ এ কাপ জয় করে সিটি। সেই এফ কাপেই ৮৪,৫৬৯ জন দর্শকের সামনে মেইন রোডের ইতিহাসের সব চেয়ে দৃষ্টিনন্দন গোল টি আসে ব্রুকের পা থেকেই। ৩৬-৩৭ মৌসমে সিটি প্রথম বারের মত লিগ চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে যেখানেও ব্রুক অতী গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা পালন করেন।

৩৯-৪০ সিজনই ব্রুকের জন্য শেষ সিজনে পরিণত হয়। তার করা শেষ গোলের ম্যাচেও সিটি ৬-১ গোলে জয় অর্জন করে। এরিক সিটির হয়ে মোট ১৭৮ বার লক্ষভেদ করে টমি জনসন (১৬৬ গোল) ও কলিং বেল (১৫২ গোল) এর করা রেকর্ড নিজের নামে লিখিয়ে নেন। সিটির হয়ে ১০ সিজন খেলা এই কিংবদন্তি ৫ম সর্বাধিক বার সিটির জার্সি গায়ে তোলেন। দ্বিতীয় যুদ্ধের বিভীষিকায় দংশীত হওয়ার আগেই মোট ৪৯৪ ম্যাচ খেলেন ব্রুক।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মাথায় আঘাত পেয়ে কিংবদন্তি এরিক ব্রুক মাতে ৩১ বছর বয়েসেই ক্যারিয়ারের ইতি টানতে বাধ্য হন।

৭৭ বছর অক্ষত থাকার পর ব্রুকের রেকর্ডে ভাগ বসাতে যাচ্ছেন আর্জেন্টাইন ফরওয়ার্ড কুন এগুয়েরো। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি এখানেও!  আবার সেই সড়ক দুর্ঘটনা। তবে এইবার ক্যারিয়ারের ইতি নয়, যেন এক নতুন অধ্যায়। ফিরে এসেই ভাগ বসালেন এরিক ব্রুকের রেকর্ডে। হয়তো সামনের ম্যাচেই ভেঙে যাবে ব্রুকের ৭৭ বছর অক্ষত থাকা রেকর্ড। তবে সিটিজেনসদের মনে কিংবদন্তীর আসনে অবিশিষ্ট ব্রুকের প্রতি ভালবাসা কোন দিনই সামান্যও কমবে না।
 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন