ফুটবলের ফেনোমেনোন(প্রথম অংশ)

ফুটবলের ফেনোমেনোন(প্রথম অংশ)
Sadman Taha October 3, 2017, 7:03 pm Articles

ব্রাজিলীয় সিরিএ, ১৯৯৩ এর ক্রুজেইরো বনাম বাহিয়া ম্যাচ। খুব বেশি আলোচনা হবার মত ম্যাচ ছিল না কোন। তাও দিনশেষে লীগের অন্য ম্যাচগুলো ছাপিয়ে ব্রাজিলীয় মিডিয়ার আলোচনার কেন্দ্রে এই ক্রুজেইরো-বাহিয়া ম্যাচ। কারণ এক ওয়ান্ডার বয়। করে বসেছে এক অতিমানবীয় কীর্তি। বাহিয়াকে একাই গোল বন্যায় ভাসিয়েছে ৫ গোল করে। ১৭ বছর বয়সী একজন টিনেজারের একই ম্যাচে ৫ গোলের রেকর্ড! ভাবা যায়? এমন অভাবনীয় কীর্তিই করে বসেছিল সেই ওয়ান্ডার বয় সেদিন, যার নাম "রোনাল্ডো নাজারিও ডি লিমা"।

ফুটবলের গ্রেটেস্ট টাকলু বললে যার অবয়ব চোখের সামনে ভেসে উঠে তিনি আর কেউ নন, এই রোনাল্ডো নাজারিও। পুরো নাম রোনাল্ডো নাজারিও ডি লিমা। সর্বকালের সের স্ট্রাইকার বলা হয় তাঁকে। অনেকের চোখে সর্বকালের সেরা এবং সবচেয়ে পরিপূর্ণ ফুটবলারও তিনিই। আমরা সর্বকালের সেরা ফুটবলার বিষয়ে তর্কে জড়াই "পেলে বা ম্যারাডোনা" টপিকে। তবে, বারবার ইঞ্জুরি ছোবল না দিলে আজ এ বিষয়ে তর্কের অবকাশই থাকত না। তর্কাতীতভাবেই সর্বকালের সেরা ফুটবলার হবার সব রসদেই যে পরিপূর্ণ রোনাল্ডো। ক্যারিয়ারের অনেক গুরুত্বপূর্ণ সময়ই যে কাটিয়েছেন মাঠের বাইরে ইঞ্জুরির স্বীকার হয়েই। এরপরও প্লেয়িং ক্যারিয়ারে যা করেছেন, তার জন্য অনেকের কাছেই সর্বকালের সেরা এই ব্রাজিলিয়ান লেজেন্ড, যিনি "ফেনোমেনো" নামে পরিচিত বিশ্বে। ব্রাজিল, বার্সেলোনা, রিয়াল মাদ্রিদ, এসি মিলানের, ইন্টার মিলান, পিএসভির জার্সিতে মাতিয়েছেন সমগ্র বিশ্ব। ডিফেন্ডারদের চোখের ঘুম কেড়ে নিতে "রোনাল্ডো" নামটাই যে যথেষ্ট ছিল। অনেক বাঘাবাঘা ডিফেন্ডারদের কাছেই দুঃস্বপ্নে পরিণত করেছিলেন নিজেকে তিনি। সেই বাঘাবাঘা ডিফেন্ডারদের তালিকায় যারা আছেন তাদেরকেই আমরা সর্বকালের সেরা ডিফেন্ডার হিসেবে জানি। এটুকুই বল পায়ে তার ভয়াবহতা বোঝাতে যথেষ্ট। বুফন, কানদের মত গোলকিপারদের কাঁপুনির কারণ ছিলেন এই ব্রাজিলীয় স্ট্রাইকার। প্রতিপক্ষের শেষ ডিফেন্ডারকে পরাস্ত করেও ক্ষান্ত না হয়ে গোলকিপারকেও মাটিতে ভূপাতিত করে বল জালে জড়ানোই ছিল ফেনোমেনোর ট্রেডমার্ক। বাঙালীর তিনবেলা ভাত খাওয়ার মতই যে রুটিনজব বানিয়ে ফেলেছিলেন এই গোলকিপারকে ভূপাতিত করে স্কোর করার ব্যাপারটি।

টাকলুর সমকালীন সবচেয়ে লাকি ডিফেন্ডার ছিলেন তাঁরাই, যাদের পুরো ক্যারিয়ারে একবারও টাকলুর ভয়াবহতার সামনে পড়তে হয়নি। কেইবা হিউমিলেশনের সম্মুখীন হতে চায় বলুন! আবার তারাই একদিক থেকে আনলাকিও কিন্তু! কিভাবে? কখনও সর্বকালের সেরা এই স্ট্রাইকার এবং অন্যতম সেরা এই ফুটবলারকে ফেস করতে পারেননি, একই সময়ের ফুটবলার হয়েও - এজন্যেই! হয়তো তাঁরা কখনও আফসোস করেন এই সুযোগটি পাননি ভেবে, জীবনের সেরা অভিজ্ঞতা হতে পারত যা। আবার পরমুহূর্তেই স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন টাকলুর সামনে দম ফেলারও সময়টুকু না পাওয়া মুহূর্তের সম্মুখীন না হওয়ায়! অসাধারণ ড্রিবলিং, পেসে প্রতিপক্ষকে ধ্বংসস্তূপে ফেলা যে একেবারে ছোটবেলা থেকেই রপ্ত করে নিয়েছিলেন ঈশ্বরপ্রদত্ত ট্যালেন্টকে কাজে লাগিয়েই। রোনাল্ডো ছিলেন অত্যন্ত ক্ষিপ্রতা, দ্রুতগামীতা সম্পন্ন এবং দুর্দান্ত একজন ড্রিবলার। গতি, ক্ষিপ্রতা, ড্রিবলিংয়ে মুহূর্তের মধ্যে প্রতিপক্ষকে হিউমিলেট করাটা নিত্যনৈমিত্তিক কাজ ছিল যেন তাঁর। তার খেলার ধরণ সম্পর্কে থিঁয়েরি হেনরির উক্তি - "Ronaldo did things nobody had seen before. He, together with Romário and George Weah, reinvented the centre-forward position. They were the first to drop from the penalty box to pick up the ball in midfield, switch to the flanks, attract and disorientate the central defenders with their runs, their accelerations, their dribbling." এএস রোমা ডিফেন্ডার সিজার গোমেজ রোনাল্ডোকে ফেস করার অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এভাবে - "If he gets on the ball and there’s even a metre of space for him to burst into...you’re lost. Let that happen, and he’ll start dribbling round defenders as if it’s a kick-about in the playground. He’ll be off. Unstoppable." একই অভিজ্ঞতা নেস্তা প্রকাশ করেন এভাবে - "Ronaldo is the hardest attacker I've ever had to face. He was impossible to stop." বল পায়ে রোনাল্ডোর দক্ষতা, ভয়াবহতা বোঝাতে এবং তাঁর খেলার ধরণ অনুধাবণ করতে এটুকুই যথেষ্ট বৈকি!

ইউথ ক্যারিয়ারে তিনি খেলেন সাও ক্রিস্টভাও এর হয়ে। মোটকু টাকলুর সিনিয়র ক্যারিয়ার যখন শুরু হয় ১৯৯৩ সালে ক্রুজেইরোর হয়ে সেদিকে একটু আলোকপাত করি, আসুন। ছোটবেলার প্রিয় ক্লাব ফ্ল্যামেঙ্গোতে যেতে পারতেন সেসময়। কিন্তু সেলেসাও লেজেন্ড জর্জিনহো তাঁকে নিয়ে এসে ক্রুজেইরোতে সাইন করান,যাকে সাইনিং হাইজ্যাক বলা যায় অনেকটাই। জর্জিনহো যে নাজারিওর মধ্যে তখনই বিশ্বসেরা হবার পটেনশিয়াল দেখে ফেলেছিলেন। দলের পক্ষে অভিষিক্ত হন ২৫মে, ১৯৯৩ এ, বয়স তখন মাত্রই ১৬ । একজন বিশ্বসেরার গল্পের শুরুটাও এখানেই এদিনেই শুরু হয়ে যায়। ক্রুজেইরোতে নিজের প্রথম মৌসুমেই হইচই ফেলে দেন এক ম্যাচেই পাঁচ গোল করে। "বাহিয়া"র বিরুদ্ধে '৯৩ এর ৭ই নভেম্বর এই কীর্তি করেন তিনি। ১৯৯৪-৯৪ এ ক্রুজেইরোর পক্ষে ৪৭ ম্যাচ খেলে গোল করেন ৪৪টি। দলকে জেতান ক্লাব ইতিহাসের প্রথম "কোপা দ ব্রাজিল" চ্যাম্পিয়নশিপ এবং প্রথম "মিনেস গেরাইস স্টেট চ্যাম্পিয়নশিপ" । ১৬-১৭ বছরের একজন টিনেজারের কীর্তি এটি। ভাবা যায়? ১৭ বছরের রোনাল্ডোকে নিয়ে সর্বকালের সেরা রাইটব্যাক কাফুর একটি মন্তব্য তুলে ধরলাম নিচে - "The first time I saw him play was at Cruzeiro. He was still a kid. It was in a game where he scored 5 goals. From that point on he showed he was truly a PHENOMENON. " [উইকি]

ক্রুজেইরোর হয়ে এমন দুর্দান্ত পারফর্মেন্সে ডাক পান ব্রাজিলের ১৯৯৪ বিশ্বকাপ দলে। যদিও খেলার সুযোগ পাননি সে বিশ্বকাপে তবুও ব্রাজিল দল জিতে নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া সে বিশ্বকাপ যা ছিল ব্রাজিলের ইতিহাসের ৪র্থ বিশ্বকাপ।

বিশ্বকাপের পর পিএসভিতে পাড়ি জমান রোনাল্ডো। ১৯৮৮-৯৩ পর্যন্ত পিএসভিতে খেলে যাওয়া রোমারিওর পরামর্শেই নিজের ইউরোপিয়ান ক্যারিয়ারের শুরুতে বেছে নেন পিএসভিকে। নেদারল্যান্ডসে নিজের প্রথম সিজনেই করেন ৩০ গোল। দ্বিতীয় সিজনে যখন আরো সেট হয়ে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে মেলে ধরার সময় এল, তখনই ইঞ্জুরি ছোবল দিল। মৌসুমের প্রায় পুরোটা সময়ই ছিলেন মাঠের বাইরে। তবুও যে কয়টি ম্যাচ খেলেছিলেন তাতে গোলসংখ্যা প্রায় ম্যাচসংখ্যার সমান। ১৩ ম্যাচে গোল করেন ১২ টি। বর্তমানে মেসি রোনাল্ডোকেই দেখা যায় এমন ম্যাচসংখ্যার সাথে পাল্লা দিয়ে গোল করতে। এ কাজটাই ফেনোমেনো করেন আরো দুই যুগ প্রায় আগে। অন্যদের জন্য যা অকল্পনীয় প্রায় ছিল সেসময়। পিএসভির হয়ে ৯৬ এ ডাচ কাপ জেতেন নাজারিও রোনাল্ডো, ৯৫ এ লীগে হন টপ স্কোরার। পিএসভির হয়ে খেলা এ দু'সিজনে ৫৮ ম্যাচ খেলে গোল সংখ্যা ছিল তাঁর ৫৪টি। চোখ কপালে তোলার মত স্ট্যাটিস্টিক তৈরি করেন ; তাও আবার ক্যারিয়ারের শুরুতেই।

পিএসভির হয়ে এমন দুর্ধর্ষ পারফর্মেন্সে ইন্টার মিলান এবং বার্সেলোনা ফেনোমেনোকে দলে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। বার্সাই তার রিলিজ ক্লস ১৯.৫ মিলিয়ন পরিশোধ করে তাকে দলে ভেড়ায় ১৯৯৬ সনে । এটাই ছিল সে সময়ের ওয়ার্ল্ড রেকর্ড ব্রেকিং ট্রান্সফার। বার্সার হয়ে নতুন মৌসুমের শুরু থেকেই উত্তাপ ছড়াতে শুরু করেন ফেনোমেনো, যেন নিজের মূল্য বোঝাতে শুরু করে দিয়েছিলেন সেদিনই যেদিন বার্সার হয়ে প্রথম মাঠে নামেন। ৯৬-৯৭ মৌসুমের সবচেয়ে পরিচিত দৃশ্য ছিল রোনাল্ডোর স্ট্যাচুর মত হাত উপরে তোলা সেই সেলিব্রেশন। প্রতিপক্ষকে গোল বন্যায় ভাসাচ্ছিলেন আর সেলিব্রেট করে যাচ্ছিলেন। লীগে ৩৭ ম্যাচে ৩৪ গোল করে টপ স্কোরার হন, যা লা লিগায় সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড হিসেবে টিকেছিল ২০০৮-০৯ মৌসুম পর্যন্ত। ০৮-০৯ মৌসুমের আগ পর্যন্ত লীগায় একমাত্র ফুটবলার হিসেবে ৩০+ গোলের রেকর্ড হোল্ডার ছিলেন ফেনোমেনো। কাতালান ক্লাবটিকে জেতান উয়েফা কাপ উইনার্স কাপ, উইনিং পেনাল্টি কিকটি জালে জড়িয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন তিনি। একই মৌসুমে বার্সা জেতে কোপা দেল রে এবং স্প্যানিশ সুপার কাপ ট্রফি। বার্সার হয়ে অতিমানবীয় পার্ফরমেন্সের পুরস্কারস্বরুপ রোনাল্ডো ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু অ্যাওয়ার্ড জিতে নেন। ৯৬-৯৭ এ অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদে খেলা সাউথ আফ্রিকান মিডফিল্ডার কুইন্টন ফরচুন সে মৌসুমের রোনাল্ডো সম্বন্ধে রিসেন্টলি বলেন - "He was physical perfection, and he seemed like a mythical figure. I love [Lionel] Messi, I played many times with Cristiano [Ronaldo] and I adore him, Neymar is outstanding, Ronaldinho was exceptional—but if you put all of them together, you might get what RONALDO was that season." [উইকি]

লা লীগায় সে বছর গোল উৎসবে মাতা রোনাল্ডো কম্পস্তেলার বিরুদ্ধে করেন ক্যারিয়ারের এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল,যেটি তাকে আলোচনার শীর্ষে তুলে আনে। নিজেদের ডিবক্সের কিছুটা বাইরে বল রিসিভ করে প্রতিপক্ষের প্রথম ট্যাকল অ্যাভয়েড করেন সামান্য পিছনে গিয়ে, সেখান থেকে দৌড় শুরু করেন প্রতিপক্ষ গোলপোস্ট লক্ষ করে, দৌড়েই অসাধারণ ক্লোজ কন্ট্রোল স্কিলে পরাস্ত করেন আরো দুজন প্রতিপক্ষের ডিফেন্সিভ প্লেয়ারকে এবং পেছনে তাদেরকে ভূপাতিত অবস্থায় রেখেই বল জড়ান একেবারে নেটের টপ কর্নারে। গোলটি দেখে ততকালীন বার্সা ম্যানেজার ববি রবসনের রিএকশন ছিল এমন যে তিনি যেন বিশ্বাস করতে পারছিলেন না ; অবিশ্বাসের দৃষ্টিতে মাথা নাড়ছিলেন তিনি সাইডলাইনে! এই অসাধারণ গোলটির পর স্প্যানিশ দৈনিক এএস শিরোনাম করে - " PELE RETURNS". শিরোনাম জেনেই সেই গোলের অসাধারণত্ব বোঝা যাচ্ছে নিশ্চয়ই। এই গোলের ফুটেজ পরে নাইকির বিজ্ঞাপনে ব্যবহার করা হয় যাতে গোলটি সম্পর্কে বলা হয় "Imagine you asked god to be the best player and he listened to you." রোনাল্ডোকে সেসময়ে প্রতিপক্ষকে এমন নাজেহাল করতে দেখে রাইভাল রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড জর্জ ভালদানো বলেছিলেন - "He is not a man, he's a herd." [উইকি] '৯৬ এ এমন অতিমানবীয় পারফর্মেন্সের জন্য বছরের শেষে রোনাল্ডো সর্বকনিষ্ঠ ফুটবলার হিসেবে জিতে নেন ফিফা প্লেয়ার অফ দ্যা অ্যাওয়ার্ড। বার্সাকে একটি মাত্র সিজনে এতকিছু দেয়া রোনাল্ডোকে দুর্ভাগা বার্সা ফ্যানেরা একটি মাত্র সিজনের বেশি নিজেদের জার্সি গায়ে মাঠে দেখতে পারেনি। বোর্ডের সাথে অন্তর্দ্বন্দে জড়িয়ে ৯৬-৯৭ মৌসুমের শেষে বার্সা ছাড়েন তিনি, যাতে সম্পূর্ণ দোষই বার্সা বোর্ডের বলা যায়।

১৯৯৭ সালে রেকর্ড ২৭ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফি পরিশোধ করে ফেনোমেনোকে দলে ভেড়ায় ইন্টার মিলান, যারা আগে থেকেই তাঁকে দলে নিতে আগ্রহী ছিল। বার্সা বোর্ডের সাথে রোনাল্ডোর অন্তর্দ্বন্দের সুযোগ নিয়ে তাঁকে কনভিন্স করে, তারা তাঁর রিলিজ ক্লজ পরিশোধ করে দেয়। ইন্টার মিলানের ইতিহাসের সেরা সাইনিং এখনও রোনাল্ডোর সাইনিং। প্রথম সিজনেই ইতালিয়ান ফুটবলের সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে লীগে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতা হন তিনি। ইন্টার মিলানে আসার পর থেকে নিজেকে পরিপূর্ণ একজন ফরোয়ার্ডে পরিণত করতে অ্যাসিস্ট সংখ্যা বাড়াতে থাকেন, নিয়মিত পেনাল্টি, ফ্রিকিক নেয়া এবং সেগুলো থেকে স্কোর করা শুরু করেন। ডার্বিতে নগর প্রতিদ্বন্দ্বী এসি মিলানের বিরুদ্ধে নিয়মিত গোল করেন ইন্টারে থাকাকালীন সময়ে। মালদিনি - নেস্তাদের নাজেহাল করে তোলেন সে সময় এই ব্রাজিলিয়ান। ১৯৯৭ সালে তিনি দ্বিতীয় বারের মত ফিফা প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার অ্যাওয়ার্ড জেতেন। সেবছর তিনি ব্যালন ডি'অরকেও নিজের অর্জনের খাতায় তুলেন। ৯৭ এ উয়েফা কাপের ফাইনালে ল্যাজিওর বিপক্ষে অসাধারণ এক ট্রেডমার্ক গোল করেন তিনি ইন্টারের জার্সিতে। ল্যাজিও ডিফেন্স লাইনকে পেছনে ফেলে এসে গোলকিপারের সাথে ওয়ান অন ওয়ানে বডি ফেইন্ট ইউজ করে ছিটকে দেন তাকেও এবং বল জালে জড়ান। ১৯৯৮ সালে বিশ্বকাপে দারুণ পারফর্ম করে ফিফা বেস্ট প্লেয়ার লিস্টে দ্বিতীয় হন, বিশ্বকাপজয়ী ফ্রান্স দলের জিনেদিন জিদানের পেছনে থেকে। ১৯৯৮-৯৯ মৌসুম শেষে ইন্টার মিলান তাঁকে দলের অধিনায়ক হিসেবে অ্যাপয়েন্ট করে। ইন্টারের রোনাল্ডো নাজারিওকে দু'মৌসুম ফেস করে ইতালিয়ান ডিফেন্ডার, যাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ডিফেন্ডার বল হয় সেই পাওলো মালদিনি ম্যারাডোনার সাথে রোনাল্ডোর নাম নেন এবং বলেন এরা দুজনই তাঁর ফেস করা সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবলার। ইন্টার মিলানে প্রথম দুই সিজনের রোনাল্ডোর সম্বন্ধে মালদিনি বলেন - "Ronaldo during his first two years at Inter Milan was PHENOMENON. " ১৯৯৯ এর ২১ নভেম্বর লেচের বিরুদ্ধে সিরিএ এর ম্যাচে ইঞ্জুরিতে পড়েন এবিং ২০০০ সালের এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ পর্যন্ত মাঠের বাইরে কাটান ফেনোমেনো। এ ইঞ্জুরি রোনাল্ডোর ভয়াবহতা বেশ প্রকট ছিল। এতটাই যে রোনাল্ডোর স্বভাবসুলভ বলপায়ে ধ্বংসাত্মকতাকে একরকম কেড়েই নেয়, যেটা এরপর আর অতটা নিখুঁতভাবে দেখা যায়নি, যেভাবে ইঞ্জুরীপূর্বে দেখা যেত নিয়মিত; যা ছিঁড়েখুঁড়ে খেত প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে। দ্যা গার্ডিয়ানের জার্নালিস্ট রব স্মিথ এ ব্যাপারে বলেন - "The knee injuries suffered at Inter Milan took away the explosiveness that made him possibly the greatest young footballer of all time, a futuristic fusion of speed, strength and skill. That is not to belittle Ronaldo’s achievements in the second half of his career, when he scored eight goals in a single World Cup [in 2002] and became the first Ronaldo to receive a standing ovation at Old Trafford [in 2003], but it is the memory of the early years that puts mist in the eyes of grown men."

 

১২ এপ্রিল ২০০০ সালে ল্যাজিওর বিপক্ষে কোপা ইতালিয়ার ফাইনালের প্রথম লেগে ইঞ্জুরি থেকে প্রথমবার কামব্যাক করেন রোনাল্ডো। কিন্তু মাঠে থাকতে পারেননি ৭ মিনিটের বেশি! আবারো ইঞ্জুর্ড হয়ে পড়েন, যা তাঁকে ভোগায় পুরো সিজন। এরজন্যেই পুরো সিজনে আর মাঠে নামতে পারেননি তিনি। জানেত্তি টিম ক্যাপ্টেন হিসেবে তাঁকে রিপ্লেস করেন সেসময়। আবারও কয়েকদফা সার্জারির পর রোনাল্ডো কামব্যাক করেন ফুটবলে ২০০২ বিশ্বকাপের মাধ্যমে এবং ফিরেই ব্রাজিলকে পঞ্চম বিশ্বকাপ শিরোপা জিততে গুরুত্বপূর্ণ ভুমিকা রাখেন। ইঞ্জুরি ফেরত রোনাল্ডো জিতে নেন ২০০২ এর ফিফা প্লেয়ার অফ দ্যা ইয়ার অ্যাওয়ার্ড তৃতীয়বারের মত। ২০০২ সাল পর্যন্তই ইন্টারের হয়ে খেলেছিলেন তিনি । এসময়ই ইতালিয়ান প্রেস তাঁকে "ফেনোমেনো" নাম দেয়, তাদের ভালবাসার নিদর্শন হিসেবে। ইন্টারের ইতিহাসের ২০তম সেরা ফুটবলার হিসেবে পরিচিত হন ইতালিয়ান প্রেসের প্রকাশিত একটি তালিকায়। সেই রিপোর্টে এটাও বলা হয় যে, ইঞ্জুরি এতটা বাজেভাবে ছোবল না হানলে সেরা তিনজনের একজন হয়েই ইন্টার মিলান ক্যারিয়ারের ইতি টানতেন তিনি। ইঞ্জুরি এভাবে ক্যারিয়ারের প্রাইমটাইম কেড়ে নেয়ার পরও নেরাজ্জুরিদের হয়ে ৯৯ বার মাঠে নেমে ৫৯ বার বল জালে জড়ান ফেনোমেনো নামে পরিচিত হওয়া রোনাল্ডো নাজারিও ডি লিমা।

২০০২ এ ইন্টার মিলান ছেড়ে রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দেন। তাঁরই সাবেক ক্লাব বার্সেলোনার আর্চ রাইভাল ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ। এমন ক্লাবে যোগদানের পরও দু'ক্লাবের ফ্যানেরাই তাঁকে সমান ভালবাসে। এটাই ফেনোমেনোকে অনেকের থেকে আলাদা করেছে। বার্সা-মাদ্রিদ, ইন্টার মিলান- এসি মিলানের মত পরস্পর রাইভাল ক্লাবগুলোতে খেলেও সবার দ্বারাই সমান ভালবাসা পেয়ে এসেছেন সবসময়। যাই হোক, রিয়ালে যোগ দেন ৪৬ মিলিয়নের বিনিময়ে ২০০২ সালে। রিয়ালে যোগ দেয়ার প্রথম দিনেই তাঁর জার্সি সেলিং আগের সব রেকর্ড ভেঙে এক আকাশছোঁয়া রেকর্ড গড়ে, যা ফ্যানদের তাঁকে ঘিরে ভালবাসা, অবসেশন, হাইপ প্রকাশ করে। রিয়ালে গ্যালাক্টিকোস এরার অন্তর্ভুক্ত হন তিনি জিদান, কার্লোস, ফিগো, বেকহাম, রাউলদের সাথে। '০২ এর অক্টোবর পর্যন্ত ইঞ্জুরির কারণে মাঠের বাইরে থাকলেও স্টেডিয়ামে তাঁর নামে চ্যান্ট করতে থাকে ফ্যানেরা। রিয়ালের জার্সিতে ডেব্যুতেই দুইবার স্কোরশীটে দুইবার নিজের নাম তোলেন নাজারিও। ম্যাচ শেষে পান স্ট্যান্ডিং অভেশন। সিজনের শেষ ম্যাচে বিলবাওয়ের অ্যাগাইন্সটে ম্যাচের পরও তিনি স্ট্যান্ডিং অভেশন পান গ্যালারি থেকে। এ ম্যাচের মাধ্যমেই রিয়ালের লীগ শিরোপা নিশ্চিত হয় এবং নাজারিও করেন লীগে নিজের ২৩তম গোল। ইন্টারকন্টিনেন্টাল কাপ ট্রফিও ঘরে তোলেন রিয়ালের জার্সিতে সে বছর এবং ২০০৩ এ স্প্যানিশ সুপার কাপ জেতেন। ০২-০৩ মৌসুমেই উচলের কোয়ার্টারের দ্বিতীয় লেগে ওল্ড ট্রাফোর্ডে ইউনাইটেডের বিরুদ্ধে হ্যাট্রিক করেন তিনি, যা ইংলিশ জায়ান্টদের উচল থেকে ছিটকে দেয়। ৮০ মিনিটে সাবস্টিটিউটেড হওয়ার সময় দু'দলের ফ্যানদের থেকেই একইসাথে পান স্ট্যান্ডিং অভেশন। ২০০৩-০৪ সিজনে মাদ্রিদ নিজেদের ইতহাসের একমাত্র অধরা অর্জন ট্রেবল জয়ের পথে বেশ ভাল ভাবেই ছিল। ছিটকে যায় রোনাল্ডোর ইঞ্জুরির পরপরই! দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সেনানীকে হারিয়ে ছিটকে পড়াটাই যে স্বাভাবিক ছিল। রোনাল্ডোর ইঞ্জুরির পরই রিয়াল কোপা দেল রে থেকে ছিটকে পড়ে এবং উচল কোয়ার্টার ফাইনাল থেকেও এলিমিনেটেড হয়। লীগেও তার ভুক্তভোগী হয় রিয়াল। রোনাল্ডো ২০০৩ সালের ৩ ডিসেম্বর রিয়ালের ইতিহাসের দ্রুততম গোলটি করেন অ্যাটলেটিকো মাদ্রিদের বিরুদ্ধে ম্যাচের ১৫ সেকেন্ড সময়ে, সান্তিয়াগো বার্নাব্যুতে। ০৩-০৪ সিজনে লীগায় সর্বোচ্চ গোল স্কোর করে পিচিচি অ্যাওয়ার্ড জেতেন ফেনোমেনো, এ সিজনে লীগে তিনি গোল করেন ২৫টি, যদিও ভ্যালেন্সিয়ার কাছে সেবার লীগ শিরোপা খোয়ায় তাঁরা। রিয়ালে তাঁর শেষ দুই সিজনে ইঞ্জুরি এবং ওজনজনিত সমস্যায় বেশ বড় সংখ্যক ম্যাচ মাঠের বাইরে বসেই দেখেন মোটকু রোনাল্ডো। এসময়ে ম্যানেজার ফ্যাবিও ক্যাপেলোর উপেক্ষারও স্বীকার হন কিছু সমস্যায়। রিয়ালে কাটানো সাড়ে ৪ সিজনে রোনাল্ডো ১৭৭ ম্যাচে ১০৪ গোল করেন। রিয়ালের ইতিহাসের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবেও মনোনীত হন তিনি। রিয়ালের সর্বকালের সেরা বিদেশী ফুটবলারদের সমন্বয়ে গঠিত একাদশেও জায়গা করে নেন নাজারিও ডি লিমা রোনাল্ডো।

(চলবে)





Similar Post You May Like

Find us on Facebook