ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের ইতিহাস- পর্বঃ ২

ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের ইতিহাস- পর্বঃ ২
Arnob M Mohsin September 24, 2017, 9:12 pm Articles

১৮৯৪ সালে ক্লাব তাদের নাম আর্ডউইক এসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাব থেকে পরিবর্তন করে ম্যানচেষ্টার সিটি ফুটবল ক্লাব রাখে। আর এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় নতুন যুগের। এ সময়টাতে ক্লাব হিসেবে সিটি অনেক অনেক সাপোটার পেতে থাকে। যদিও মাঠের পারফর্মেন্স তেমন ভালো ছিলো না, তবুও সিটি তাদের খেলা গুলিতে নিয়মিত ভাবেই বিশ হাজারের বেশি দর্শক পাচ্ছিলো। এমনকি ১৮৯৫ এর একটা ম্যাচে দর্শক সংখ্যা ত্রিশ হাজার ছাড়িয়ে যায়। বর্তমান বার্মি আর্মির সাথেই তখনকার সিটি ফ্যানদের তুলনা করা যায়।

১৮৯৯ সালে সিটি ডিভিশন টু’র চ্যাম্পিয়ন হয় এবং ডিভিশন ওয়ান (বর্তমানে প্রিমিয়ার লীগ) এ উঠে আসে। ১৯০৪ সালে সিটি তাদের প্রথম মেজর শিরোপা জেতে। সেটা ছিলো এফ.এ কাপ। একই বছর সিটি লীগেও রানারআপ হয়। বলা রাখা ভালো, ম্যানচেস্টারে এটা ছিলো প্রথম বড় কোন শিরোপা।

১৯০৫ সালটা সিটির জন্য একটা বিরাট ধাক্কা হয়ে আসে। লীগের শেষ ম্যাচে সিটি এস্টন ভিলার কাছে ৩-২ গোলে হেরে যায়। শেষ ম্যাচটার আগে সিটি এবং নিউক্যাসেল সমান পয়েন্ট নিয়ে লীগের শীর্ষে ছিলো। কিন্তু হার সিটিকে ৩য় স্থানে নামিয়ে দেয়। তবে বড় ধাক্কা আসে যখন ভিলার ক্যাপটেন দাবি করে সিটির ক্যাপ্টেন তাকে হেরে যাবার জন্য ঘুষ অফার করেছিলো। পরে তদন্তে এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও, এর সাথে ক্লাবের কোন স্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। এ সময়ই ক্লাব ঘোষনা দেয় যে সে তার প্লেয়ারদের সাপ্তাহিক ৪ পাউন্ডের বেশি পারিশ্রমিক দেয় না। সাপ্তাহিক ৪ পাউন্ড পারিশ্রমিক আইডিয়া ফুটবল এসোসিয়েশন গ্রহন করে এবং প্রতিটি ক্লাবের জন্য তা বাধ্যতা মূলক করে। যদিও প্রতিটি ক্লাবই প্লেয়ারদের ৪ পাউন্ডের বেশিই পারিশ্রমিক দিতো, এবং সবাই তা জানতও তবুও ফুটবল এসোসিয়েশন শুধু সিটিকেই বেশি পারিশ্রমিক দেবার অপরাধে জরিমানা করে। ক্লাবের ১৭ জন প্লেয়ারকে ১৯০৭ সাল পর্যন্ত ব্যান করা হয়। এবং বাধ্য করা হয় ক্লাবের সেরা সেরা প্লেয়ারদেরকে নিলামে বিক্রি করতে। নিলাম থেকে ম্যানচেষ্টার ইউনাডেট সিটির ৪ জন প্লেয়ারকে কিনে নেয়। এরাই ১৯০৭ সালে ডিভিশন ওয়ান জয়ী ইউনাইটেড দলের কোর মেম্বার ছিলো। এই আনফেয়ার ব্যান বরং সিটির জন্য আশির্বাদ হয়ে আসে। এর ফলে সিটি তরুন এবং প্রতিভাবান খেলোয়ার নিয়ে নতুন করে দল তৈরী করে, যা সে সময় অনেক সাফ্যলের জন্ম দেয়।

লন্ডনের বাইরে হাইড রোড স্টেডিয়ামই প্রথম স্টেডিয়াম যেটাতে ইংল্যান্ডের রাজ পরিবারের কেউ খেলা দেখতে যান। ম্যাচটা হয়েছিলো সিটি আর লিভারপুলের মাঝে ১৯২০ সালে । একই বছর সিগারেট থেকে হওয়া আগুনে স্টেডিয়ামের মূল অংশ পুড়ে যায়। তখন থেকেই সিটি নতুন স্টেডিয়ামে সরে আসার চিন্তা ভাবনা শুরু করে। আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ মাঠে খেলার বদলে সিটি ইউনাইটেডের ওল্ড ট্র্যাফডে কিছুদিন খেলতে চেয়েছিলো। কিন্তু ইউনাইটেডের দাবি করা অবাস্তব অংকের ফি’র জন্য তা আর হয়নি। সিটি ১৯২২ সাল পর্যন্ত হাইড রোডে খেলে, এবং ১৯২২-২৩ সেশনে মেইন রোড স্টেডিয়ামে সরে আসে। এর ধারন ক্ষমতা ছিলো ৮০০০০। যা তখনকার সময়ে ইংল্যান্ডে সর্বোচ্চ ছিলো। বর্তমানে হাইড রোডেই মাঠটা সিটি বাস ডিপো হিসেবে ব্যবহার করা হয়। স্টেডিয়াম ৪০ এর দশকের সরিয়ে ফেলা হয়।

সিটি ১৯২৬ এর এফ.এ কাপের ৫ ম্যাচে ৩১ গোল দিয়ে ফাইনালে উঠে। কিন্তু হেরে যায় বোল্টনের কাছে ১-০ তে। শুধু তাই না, একই সেশনে সিটি ডিভিশন ওয়ান থেকে রেলিগেটেডও হয়। পরের সেশনে সিটি আর পোর্টসমাউথ ডিভিশন ওয়ানে প্রমোশনের জন্য শেষ ম্যাচ পর্যন্ত লড়াই চালায়। শেষ পর্যন্ত সিটি গোল ব্যবধানে পিছে থাকার দ্ররুন ডিভিশন টু তেই থেকে যায়। কিন্তু এটা মাত্র এক সেশনের জন্য ছিলো, পরের সেশনেই সিটি ফিরে আসে ডিভিশন ওয়ানে।

১৯৩০ এর দশকটা ক্লাবের জন্য বৈচিত্র্যময় ঘটনায় ভরপুর। ১৯২৬ সালে রেলিগেটেড হবার পর ১৯২৮-২৯ সেশনে ক্লাব ডিভিশন ওয়ানে ফিরে আসে। এবং পরের বছর লীগে ৩য় হয়। ১৯৩২ এ সিটি এফ.এ কাপের সেমিতে আর্সেনালের কাছে হেরে যায়। ১৯৩৩ সালে সিটি এফ.এ কাপের ফাইনালে ইভারটনের কাছে হেরে যায়। কাউন্ট অফ ইয়র্ক এর কাছ থেকে রানারআপ মেডাল নেবার সময় তখনকার সিটি ক্যাপ্টেন কওয়ান কাউন্টকে সবার সামনে বলে বসেন, তিনি সামনের বছর ওয়েম্বলিতে ফিরে আসবেন এবং সেবার তিনি জিতবেন। আর সিটি সত্যিই ১৯৩৪ সালে এফ.এ এর ফাইনালে উঠে যায়। ফাইনালে পোর্টসমাউথকে ২-১ গোলে হারিয়ে সিটি কাপ জিতে নেয়। সেবারই এফ.এ কাপের কোয়াটার ফাইনালে স্টোক সিটির বিপক্ষের ম্যাচে মেইন রোডে দর্শক সংখ্যা হয় ৮৪৫৫৯ জন। যা এখনো হোম এটেন্ডেন্স হিসেবে রেকর্ড। মজার বিষয় হচ্ছে ২য় স্থানেও মেইন রোড স্টেডিয়ামই আছে। আর্সেলানের বিপক্ষে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডের ম্যাচে দর্শক হয়েছিলো ৮৩২৬০ জন। অনেকেই কিন্তু জানে না এই ইউনাইটেড ১৯৪৫-১৯৪৯ পর্যন্ত আমাদের মাঠ ব্যবহার করেছিলো।

সিটি ১৯৩৭ সালে প্রথমবারের মত ডিভিশন ওয়ান জেতে। সে বছর সিটি লীগে ২২ ম্যাচ অপরাজিত থাকে এবং ১০০ এর উপরে গোল দেয়। এবং পরের বছরই রেলিগেটড হয়ে যায়!!

১৯৩৯ সালে বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়ে যায়। এতে লীগ ১৯৪৫ পর্যন্ত বন্ধ থাকে। ২য় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হবার পর ১৯৪৬ সালে প্রফেশনাল লীগ আবার শুরু হয়। ১৯৩৪ সালের এফ.এ কাপ জয়ী ক্যাপ্টেন কওয়ান ম্যানেজারের দায়িত্ব নেন। ম্যানেজারিয়াল দায়িত্বের প্রথম ২০ ম্যাচ কওয়ান অপরাজিত ছিলেন। প্রথম বছরেই সিটি ডিভিশন টুয়ের শিরোপা জিতে নেয় আর ডিভিশন ওয়ানে ফিরে আসে। কিন্তু প্রথম বছর এতো সাফল্য পাবার পরও কওয়ান ১৯৪৭ সালে পদত্যাগ করেন। তার ব্যক্তিগত ব্যবসা (যা ব্রাইটনে ছিলো) আর ক্লাবের প্রতি দায়িত্ব এই দুয়ের সাথে যোগ হয়েছিলো ক্লাব অফিশিয়ালদের সাথে দূরত্ব। এসবের কারনে তিনি পদত্যাগ করেন। যদিও সিটি ম্যানেজার হিসেবে তার সাফল্য আজো রেকর্ড বইয়ের অংশ।

সিটি ১৯৫০-৫১ সালে আবারো রেলিগেটেড হয়ে যায়। কিন্তু ফিরে আসে পরের বছরেই। ১৯৬০ সাল পর্যন্ত সিটি ডিভিশন ওয়ানে বলার মত তেমন কোন সাফল্যই পায়নি। রেজাল্টের তেমন কোন ধারাবাহিকতাও ছিলো না। এই সেশনে ৪থ তো পরের সেশনেই প্রায় রেলিগেটেড। এমনই ছিলো সিটির পার্ফমেন্স। এফ.এ কাপেও সিটি বেশির ভাগ সময় ৩য় বা ৪থ রাউন্ড পর্যন্ত যেতে পেরেছিলো। তবে ব্যতক্রম হয়ে আসে ১৯৫৪-৫৫ আর ৫৫-৫৬ সেশন। দুই বার সিটি ফাইনালে পৌছে। এবং ঠিক আগের মতই প্রথমটা হেরে পরেরটা জেতে। ১৯৫৫-৫৬ সালের ফাইনাল বিখ্যাত হয়ে আছে সিটি গোলকিপার ব্রেট ট্রুটম্যানের কারনে। ফাইনালে সিটি বার্মিংহামকে ৩-১ গোলে হারায়। তবে খেলা শেষ হবার মিনিট ১৫ আগে বার্মিংহামের একটা আক্রমণ প্রতিহত করতে গিয়ে ট্রুটম্যান মারাত্বকভাবে আহত হন। ইন ফ্যাক্ট তিনি কিছুটা সময় মাঠে অজ্ঞান ছিলেন। আর তখন বদলি খেলোয়ারের নিয়মও ছিলো না। তো তখন যদি ট্রুটম্যান না খেলতেন তবে সিটিকে ১০ নিয়ে খেলতে হতো। তবে তিনি তা করেননি। আহত অবস্থায় তিনি খেলে যান। শেষ ১৫ মিনিটে করেন ২টা ভাইটাল সেভ। যার একটা করতে গিয়ে তিনি আবারো অজ্ঞান হয়ে যান। ৩ দিন পর পরীক্ষা থেকে জানা যায় তার ঘাড়ের একটা হাড় ভেঙ্গে গেছে। অর্থাৎ ভাঙ্গা ঘাড় নিয়েই তিনি সেদিন ম্যাচটা শেষ করেন।

পড়ুনঃ ম্যানচেস্টার সিটি ফুটবল ক্লাবের ইতিহাস- পর্বঃ ১ 

 




Similar Post You May Like

Find us on Facebook