রন্ডোঃ শুধুই কি একটি অনুশীলন পদ্ধতি নাকি তার চেয়ে বেশী কিছু?

রন্ডোঃ শুধুই কি একটি অনুশীলন পদ্ধতি নাকি তার চেয়ে বেশী কিছু?

রন্ডো এমনই একটি অনুশীলন পদ্ধতি, যা আমরা সবাই কমবেশী দেখে থাকি কোন ফুটবল ম্যাচের আগে মাঠে খেলোয়াড়দের করে থাকতে। এই পদ্ধতি হচ্ছে এমন, যেখানে একটা গ্রুপের খেলোয়াড়রা যারা সংখ্যায় বেশী তাদের দখলে বল থাকে এবং অন্য গ্রুপের খেলোয়াড়রা যারা সংখ্যায় কম তারা ওই বল দখলে নেওয়ার চেষ্টা চালায়। যদি সহজ করে বলি, তাহলে রন্ডো হচ্ছে এমন যেখানে কিছু প্লেয়ার যারা সংখ্যায় বেশী এবং তারা হয়ত গোল কিংবা অন্য কোন শেইপে দাঁড়ায় থেকে বল একজন আরেকজনকে একটা স্পর্শে পাস করতে থাকে আর তাদের কাছ থেকে সেই বল নেওয়ার  চেষ্টা করে সংখ্যায় কম একটি দল, যারা বড় দলের মাঝে থেকে এই কাজটি করতে হয়। রন্ডো নামক এই অনুশীলন পদ্ধতিতে সাধারণত যেই দুটি গ্রুপ থাকে তাদের সংখ্যাটা হয়ে থাকে কখনো ৩ জনের বিপরীতে ১ জন (3v1) কিংবা ৪-২, ৫-২, ৬-৩, ৮-২। 

রন্ডো নামক এই অনুশীলনের সবচেয়ে বেশী জনপ্রিয়তা এসেছিলো মূলত বার্সেলোনার ২০০৯ থেকে একটানা সাফ্যলের কারণ খুঁজতে গিয়ে রন্ডোর নাম শুনে। অবশ্য এই অনুশীলন পদ্ধতি আয়াক্স কিংবা বার্সেলোনার মত সেরা একাডেমী গুলোতে অনেকদিন যাবতই চলে আসছিলো। শুধু কয়েকজন খেলোয়াড় গোল হয়ে ভিতরে আরো কিছু খেলোয়াড় রেখে বল একজন থেকে আরেকজনকে পাস করাটাই রন্ডোর সবকিছু নয়, বরং এই অনুশীলনটা তার থেকে বেশী কিছু। এবং এই অনুশীলনের প্রয়োগ পদ্ধতি সহজ হওয়াতে সেই সাথে এই অনুশীলনের ফলে সাফল্য আসা ও এর সিম্পলিসিটির কারণে তা পরবর্তীতে সাধারণ সকল কোচের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠে। গার্দিওলার সময়ে বার্সেলোনার সাফল্যের মূল কারণ ছিলো বল ধরে রেখে ফুটবল খেলা অর্থাৎ পজেশন বেইজড ফুটবল খেলা। আর এই বল ধরে রেখে খেলার পিছনের সবচেয়ে সাহায্যকারী অনুশীলন ছিলো এই রন্ডো। রন্ডো সবচেয়ে উপকারি একটা অনুশীলন হওয়ার কারন হচ্ছে এইটা করা হয় একটা সীমিত পরিসরের মাঝে। যার ফলে, খেলোয়াড়রা একটা ফুল সাইজড মাঠে গেলে এই অনুশীলন তাদের ফোর্স করে যাতে সে তার সবটুকু দিয়ে মাঠে খেলতে পারে। রন্ডো অনুশীলনটা করার সময় একটা সীমিত পরিসরের মাঝে থেকে খেলোয়াড়দের এইটা করতে হয়, যার ফলে তাদের খুব অল্প সময়ের ভিতর নিতে হয় ডিসিশন। কারণ, অল্প সময়ের ভিতরে ডিসিশন নিয়ে সঠিক পাস না দিতে পারলে আপনাকে চলে যেতে হবে মাঝে। এই অল্প সময়ের ভিতর বল পাস করার ডিসিশন সাথে সঠিকভাবে নিজের দলের খেলোয়াড়কে বল পাস করা এই অনুশীলনগুলো একটা খেলোয়াড়কে ফুল সাইজের পিচে সময় নিয়ে ডিসিশন কিংবা জায়গা বড় করে সঠিক পাস দেওয়ার মত কাজ থেকে বিরত রাখে। যারা ফলে খুব সহজেই একটি দল রন্ডো অনুশীলনকে কাজে লাগিয়ে অন্য দলকে হয়রান করে দিতে পারে। রন্ডো অনুশীলনের ফলে একজন খেলোয়াড় আরেকজনকে বুঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, যার ফলে মাঠে কম সময়ে ডিসিশন, বোঝার ক্ষমতা এবং সঠিক পাসিং কাজে লাগিয়ে একটা দল ডিফেন্সিভলি ও এটাকিং দুটোতেই হয়ে উঠে অপ্রতিরোধ্য। এক কথায় বলতে গেলে রন্ডো অনুশীলন একটা খেলোয়াড়ের যেই দিকগুলো উন্নত করে তা হলো- খুব জলদি পাস করা, কম জায়গার ভিতর অল্প সময়ে দৌড়ানো, স্ট্যামিনা বৃদ্ধি, মুভমেন্ট করার চিন্তা ভাবনা ভালো করা এবং চিন্তা ভাবনা করার সময় অর্থাৎ খুব জলদি ডিসিশন নেওয়া।

বার্সেলোনাতে সর্বপ্রথম রন্ডোর পরিচয় ঘঠান ইয়োহান ক্রইফ। পরবর্তিকালে গার্দিওলা বার্সেলোনার ম্যানেজার হয়ে আসার পর পজেশন বেইজড ফুটবল খেলার জন্যে রন্ডো অনুশীলনের উপর জোর দেন এবং সব লেভেলেই তা ফিরিয়ে নিয়ে আসেন নতুন করে। টিকি-টাকা ফুটবলের সাফল্যের পিছনের প্রধান একটা কারিগর হচ্ছে এই রন্ডো। বার্সেলোনা কোচ থাকাকালীন গার্দিওলা তার এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, বল পায়ে না থাকলে বার্সেলোনা দল হিসেবে খুবই হরিবল। কারন, বার্সেলোনার ইয়ুথ লেভেল থেকেই শিখানো হয় কিভাবে বল পায়ে রেখে খেলতে হয় অন্যদিকে বার্সেলোনা খেলোয়াড়রা ফিজিকাল দিক থেকে চিন্তা করলে অন্যান্য দল থেকেও পিছিয়ে থাকবে। সেই ক্ষেত্রে বল ধরে রাখা বিশেষ করে ফিজিকাল দিক দিয়ে বেশী ক্ষমতার কোন দলের বিপক্ষে তা অনেক কঠিন একটা ব্যাপার। আর তার পজেশন বেইজড ফুটবল খেলে এই কাজটা করতে গেলে রন্ডো নামক অনুশীলন ছিলো একটা বিশাল বড় সহায়ক। রন্ডো সম্পর্কে বলতে গিয়ে সাবেক বার্সেলোনা মিডফিল্ডার জাভি বলেন,

" Our model was imposed by [Johan] Cruyff; it’s an Ajax model. It’s all about rondos. Rondo, rondo, rondo. Every single day. It’s the best exercise there is. You learn responsibility and not to lose the ball. If you lose the ball, you go in the middle. Pum-pum-pum-pum, always one touch. If you go in the middle, it’s humiliating, the rest applaud and laugh at you."

জাভির এই কথা থেকেই বুঝা যায় রন্ডো ঠিক কতটা জড়িয়ে ছিলো সেই সময়কার বার্সেলোনা দলের সাথে। বার্সেলোনার সাথে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের ২০১১ এর চ্যাম্পিয়ান্স লীগ ফাইনালের ম্যাচই হতে পারে রন্ডোর সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ওয়ান টাচ পাসিং এর মাধ্যমে বার্সেলোনা ওই ম্যাচে ইউনাইটেডের খেলোয়াড়দের যেন ছায়ার পিছিনে দৌড়াতে বাধ্য করেছিলো। ম্যাচ পরবর্তি সংবাদ সম্মেলনে স্যার আলেক্স ফার্গুসনের কথায়ও উঠে আসে এটি। তিনি বলেন,

“(We were) well beaten, there’s no other way to address the situation,”  “They do mesmerise you with their passing.”

বার্সেলোনার এই ওয়ান টাচ ফুটবল এবং এইরকম পাসিং এর পিছনের মূল কারিগর ছিলো এই রন্ডো। লা-মাসিয়া থেকে শিখে আসতে আসতে এই অনুশীলনটা একসময় তাদের রক্তে ঢুকে যায। বার্সেলোনা তাদের এই রন্ডো অনুশীলনের সময় ৩-১ কিংবা ৪-২ এইরকম হয়ে খুব কমই করতে দেখা যায় তারা বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ৬-২, ৮-২ এইরকম গ্রুপে হয়ে অনুশীলন করতে দেখা যায়। কারণ হলো, ৫-২ কিংবা ৮-২ এইরকম আসলে গেইমে এঙ্গেল রেপ্লিকেট করে অনেক সময় এবং খেলোয়াড়দের জন্যে এইটা বেশী কষ্টের ৬ জন কিংবা ৮ জনের বিপক্ষে বল দখল নেওয়া। 

রন্ডোর যেই বিষয়গুলোর উন্নতি করে একজন প্লেয়ারের তা নিচে দেওয়া হলো- 
১/ একজন খেলোয়াড়ের প্রতিপক্ষ কিংবা নিজের খেলোয়াড়দের বোঝার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে। 
২/ অল্প সময়ের মধ্যে ডিসিশন নিতে হয় তাই একজন খেলোয়াড়ের ট্যাকনিকাল ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৩/ একজন খেলোয়াড়ের ক্রিয়েটিভিটি এবং তা প্রকাশ করার ক্ষমতা বৃদ্ধি।
৪/ দলীয়ভাবে সমান চিন্তা ভাবনা নিয়ে খেলার ক্ষমতা বৃদ্ধি করে।
৫/ একজন খেলোয়াড়ের স্ট্যামিনা বৃদ্ধি করে। 

পরিশেষে, রন্ডো নিয়ে করা ইয়োহান ক্রইফের একটা উক্তি দিয়ে লেখা শেষ করছি,

“Everything that goes on in a match, except shooting, you can do in a rondo. The competitive aspect, fighting to make space, 
what to do when in possession and what to do when you haven’t got the ball, how to play ‘one touch’ soccer, how to counteract the tight marking and how to win the ball back.”

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন