কিভাবে ঘুরে দাড়াচ্ছে ইউনাইটেড

কিভাবে ঘুরে দাড়াচ্ছে ইউনাইটেড
Shihab Rahman August 27, 2017, 8:35 pm English premier league

৩ ম্যাচে ১০ গোল। ৯ পয়েন্ট। আছে লীগ টেবিলের শীর্ষে। এখন পর্যন্ত গোল খায়নি একবারও। বেশ দাপটের সাথেই প্রেমিয়ার লীগে আগাচ্ছে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড। গত মৌসুমে যেখানে গোলের দেখা পাওয়া ছিল ভার সেখানে এ মৌসুমে গোলের পর গোল করে যাচ্ছে জোসে মোরিনহোর শিষ্যরা। আগে যেখানে ১-১ গোলে ড্র করত সেখানে এখন ৪-০ গোলে জিতছে। তবে কিইবা এমন পরিবর্তন এল যাতে পুরোই ভিন্ন রুপ ধারন করল ইউনাইটেড?

১) পল পগবার ফর্মে ফেরা

গত মউসুমে ম্যান ইউনাইটেড নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচিত বিষয় ছিল পল পগবার ফর্ম। জুভন্তাস থেকে ৮৯ মিলিয়ন পাউন্ড দিয়ে বিসব রেকর্ডের বিনিময়ে তাকে দলে ভেরায় ইউনাইটেড। জুভের হয়ে সিরিয়াতে সবচেয়ে বেশী এসিস্ট করেছিলেন পগবা। পর পর ৩ বার সিরিয়ার টিম অফ দা সীজনে স্থান পেয়েছিলেন। নমিনেশন পেয়েছিলেন ফিফপ্রো, ইউয়েফা ও ইএসএম (ESM) টিম অফ দা সীজনে। আর তাই বেশ উচ্চ আকাংখাই ছিল ম্যান ইউনাইটেড ভক্তদের। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত প্রত্যাশা অনুযায়ী ঠিক পারফর্ম করতে পারেননি পগবা। নতুন টিম, নতুন লীগ, নতুন কোচ, নতুন সিস্টেম। মানিয়ে নিতে সময় লাগবে এটাই স্বাভাবিক। তার ওপর প্রাক-মৌসুমে দলে ছিলেননা তিনি। ইউরোর দায়িত্বে থাকায় খুব একটা বিশ্রামও পাননি। আর তার ওপর তার কাধে ছিল বিশ্বের সব থেকে দামি ফুটবলার হবার তকমা। তাই নিজেকে প্রমাণ করতে স্বাভাবিকের থেকেও বেশী কিছু করে দেখাতে হবে এমনই ছিল প্রত্যাশাটা।

মূলত এই কারনেই পগবার শুরুটা মনমত হয়নি ম্যানচেস্টারে। শুরুতে প্রায়ই দেখা যেত নিজেকে প্রমাণ করতে প্রয়োজন থেকেও বেশী লং শট নিচ্ছেন বা ফুটওয়ার্ক করছেন। যদিও তার পায়ের কারুকাজ কিংবা শট গুলোয় একজন বিশ্বমানের খেলোয়াড়ের গ্লিম্পস বা আভাস পাওয়া যেত, অধিকাংশ সময়ই দেখা যেত নিজেকে প্রমাণ করতে গিয়ে বল হারিয়ে বসেছেন তিনি কিংবা শট লক্ষ্যমাত্রা থেকে বেশ দূরে গিয়ে পরল। কিংবা দেখা যেত মিডফিল্ডে তার পজিশন ছেড়ে আক্রমনে যোগ দিতেন তিনি আর এই সুযোগে প্রতিপক্ষ পালটা আক্রমনে গোল দিয়ে বসল যা ঘটেছিল ম্যান সিটির বিপক্ষে। তবে এদিকে কিছুটা ভাগ্যও সহায় ছিলনা। কেননা গত মৌসুম ৭ বার তার শট গোল পোস্টে লেগে ফিরে আসে যা লীগে সবচেয়ে বেশী। আবার চান্স তৈরি করলেও গত মৌসুমে গোল পোস্টের সামনে ইউনাটেড ছিল পুরোই নিষ্প্রভ। তাছাড়া মৌসুমের দ্বিতীয়ার্ধে তার খেলার বেশ উন্নতি লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে ইউরোপা লীগে যার ফাইনালেও গোল দিয়ে দলকে জিতিয়েছেন তিনি। তবে এতদাসত্ত্বেও দোষ তাকে দিতেই হবে। তার পারফর্মেন্স খারাপ না হলেও মোটেও ৮৯ মিলিয়ন পাউন্ডে কেনা প্লেয়ারের মত ছিলনা।

তবে এই মৌসুমে পুরোই ভিন্ন চিত্র আকছেন পগবা। প্রাক-মৌসুমে আবারও সেই পুরনো পগবার ঝলকানি দেখিয়েছেন। সেই ফর্ম ধরে রেখেছেন লীগেও। ৩ ম্যাচে করেছেন ২ গোল ও ১ এসিস্ট। একই সাথে করছেন ডিফেন্ড। কন্ট্রোল করছেন মিডফিল্ড। শুধু পগবাই নয় পুরো ইউনাইটেড দলই সম্পূর্ণভাবে ঘুরে গেছে। তাদের মধ্যে আবারও দেখা যাচ্ছে আত্মবিশ্বাস। গতবার অনেকেই নিজেকে মোরিনহোর সাথে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে সময় নিয়েছেন। মোরিনহো নিজেও বেশ সময় নিয়েছেন তার সেরা দলটি বেছে নিতে। আর এবার তারই প্রতিফলন দেখছে ইউনাইটেড ফ্যানরা।

২) লুকাকু - মাতিচের আগমন

বিগত ২-৩ মৌসুমে যদি ইউনাইটেডের একটা দুর্বলতা থেকে থাকে তা হল ডিফেন্সিভ মিডফিল্ড। ক্যারিকের বয়স ৩৬ এ পৌঁছেছে কিন্তু এতদিনেও তার সঠিক রিপ্লেসমেন্ট খুজে পায়নি ইউনাইটেড। ফেলাইনি, স্নাইডারলিন, শোয়াইন্সটাইগারকে কিনলেও কোচের প্রত্যাশা পূর্ণ করতে পারেননি কেউই। তার এবার জোসে ঠিক করেছেন ঝামেলা সমাধানে দলে ভেরাবলন তার অতিপরিচিত ও বিশ্বাসযোগ্য মুখ - নেমানইয়া মাতিচকে। আগেই বলেছি পগবা দলের মেইন ম্যান। তাই স্বভাবতই দলের স্ট্র্যাটেজি ঠিক করা হবে পগবাকে কেন্দ্র করে। গত মৌসুমে পগবার মিডফিল্ডে জুটি বেধেছিলেন এন্ডার হেরেরার সঙ্গে। হেরেরা অসাধারণ খেললেও তাদের জুটিতে একটা আপত্তি ছিল। তা হল এন্ডার হেরেরা কখনই হোল্ডিং মিডফিল্ডার ছিলেননা। তাই পগবাকেই মিডফিল্ডে নেমে ম্যাচ কন্ট্রোল করতে হত। আর হেরেরা দাপিয়ে বেরাতেন পুরো মিডফিল্ড জুড়ে। এতে পগবার স্বাধীনতা কিছুটা সীমাবদ্ধ হয়ে আসত। কিন্তু এবার দলে আছেন মাতিচ। উনি খালি একজন ট্যাকলারই নয় একজন ভাল মানের হোল্ডিং মিডও বটে। কিভাবে ম্যাচ কন্ট্রোল করতে হবে, কখন কোন পাসটি দিতে হবে বা কোথায় জায়গা খালি হবে সেই ক্ষমতা ও বিচক্ষনতা তার মাঝে আছে। মাতিচকে দলে আনার মূল উদ্দেশ্যই ছিল পগবাকে আরও স্বাধীনভাবে খেলতে দেওয়া। সে কাজ তিনি বেশ ভাল ভাবেই করছেন আর পগবাও বেশ ভালই প্রতিদান দিচ্ছেন।

এই গ্রীষ্মে প্রেমিয়ার লীগে সবচেয়ে দামি ট্রান্সফার এখন পর্যন্ত রোমেলু লুকাকুর। গত মৌসুমের শেষের দিকে ইব্রাহিমোভিচ ইনজুরিতে পড়েন। ফিরবেননা জানুয়ারির আগে। তাই একজন গোল স্কোরারের ভীষণ প্রয়োজন ছিল ইউনাইটেডের। আর একাজে লুকাকুর চেয়ে ভাল কে হতে পারে? মাত্র ২৪ বছর বয়স কিন্তু প্রেমিয়ার লীগে খেলছেন ৬ বছর হল। গত মৌসুমে করেছেন ২৫ গোল। এ মৌসুমেও এখন পর্যন্ত করেছেন ৪ ম্যাচে ৪ গোল।

তবে লুকাকুর আগমনে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক দিক হল তার ক্ষিপ্রতা ও দ্রুতি। ইউনাইটেডের অধিকাংশ প্লেয়ারই হাই-টেম্পো অর্থাৎ দ্রুত গতিতে ফুটবল খেলতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। মারশিয়াল-র‍্যাশফোর্ড-মিখিতারিয়ানরা তাদের গতিকে কাজে লাগিয়ে পালটা আক্রমনে প্রতিপক্ষ ডিফেন্সকে বেক করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু বয়স ৩৫ এর কোঠায় হওয়ায় ইব্রাহিমোভিচ তাদের গতির সাথে নিজেকে সবসময় মানিয়ে নিতে পারতেননা। বাধ্য হয়েই কিঞ্চিৎ ধীর গতিতে খেলতে হত। কিন্তু লুকাকুর গতি কোন একজন টার্গেট ম্যানের জন্য যথেষ্ট থেকেও বেশী। তাই মিখিতারিয়ান্দের সাথে কাউন্টার এটাকে তাল মিলিয়ে সহজেই গোল দিতে পারেন তিনি। ম্যান সিটির সাথে প্রাক মৌসুমের গোল কিংবা ওয়েস্ট হ্যাম ম্যাচের প্রথম গোল তারই উদাহরণ। সহজ কথায় মাতিচ ও লুকাকুর আগমন ইউনাইটেডের খেলার গতি প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে যা আটকান প্রতিপক্ষের ডিফেন্সের জন্যও দ্বিগুণ কষ্টকর।

৩) টিম কেমিস্ট্রি

সার এলেক্স ফারগুসন অবসর গ্রহণ করার পর থেকে বিগত ৪ মৌসুমে এসেছেন ৩ জন কোচ। তাদের প্রত্যেকেই নিজেদের চাহিদা মত প্লেয়ার কিনেছেন বা বেচেছেন। ফার্ডিন্যান্ড, ভিডিচ, এভ্রা, রাফায়েল, ক্লেভারলি, ওয়েল্বেক, কাগাওয়া, রুনি ভ্যান পার্সিদের কেউই আর দলে নেই। এমনকি লুই ভ্যান গালের সাইন করা প্লেয়ারদের মধ্যেকেও অধিকাংশই নেই। ডি মারিয়া, ফাল্কাও, ভালদেস গিয়েছিলেন আগেই। স্নাইডারলিন, মেম্ফিস ও শোয়াইন্সটাইগারও দল ছেড়েছেন গত জানুয়ারিতে। দলের অধিকাংশ প্লেয়ারই নতুন। সহজ ভাষায় বললে পুরোপুরি সেটেল্ড দল নয়। তার ওপর এসেছেন নতুন কোচ। তাই প্লেয়ারদের মধ্যে যেমনি একদিকে আন্ডারস্ট্যান্ডিং হচ্ছিলনা, একই সাথে নতুন কোচেরও নিজেকে মানিয়ে নিতে সময় লাগছিল। তবে গতমৌসুমের পর এবার প্লেয়ারদের মধ্যে একত্ববোধ তুলনামূলক বৃদ্ধি পাচ্ছে যা খেলার মধ্যেও দেখা যাচ্ছে। কোচের চাহিদার সাথেও সহজেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে তারা। তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে মারশিয়াল ও মিখিতারিয়ানের ফর্ম।

মিখিতারিয়ান ২০১৫-২০১৬ মৌসুমে জার্মান বুন্ডেসলীগার অন্যতম সেরা খেলোয়াড় ছিলেন। লীগে সর্বচ্চ ২০ এসিস্ট ও ১১ টি গোল করেন। কিন্তু গতমৌসুমে প্রেমিয়ার লীগে তার এসিস্ট মাত্র ১ টি!! গোল করেন ৪ টি। এমনকি প্রথম ২ মাসে তাকে প্রায়ই খেলাননি মোরিনহো। অন্যদিকে ভ্যান গালের শেষ সাইনিং মারশিয়াল প্রথম ম্যাচেই তার ক্ষমতার ঝলকানি দেখান লিভারপুলের সাথে গোল দিয়ে। ২০১৫-২০১৬ মৌসুমে তিনি ১১ গোল ও ৪ এসিস্ট করেন লীগে। ইউনাইটেডের আক্রমণকে প্রায় একাই সামাল দেন। ইউরোপের গোল্ডেন বয় খেতাবও জিতেন। তবে নানা কারনে গত মৌসুমে শুরুটা ভাল হয়নি তার। কোচের আশানুযায়ী খেলতে না পারায় র‍্যাশফোর্ডের কাছে তার জায়গা হারিয়েছিলেন। ফিরে পাননি আর।

তবে এবার শুরু থেকেই অগ্নিঝড়া ফর্মে আছেন দুজন। প্রথম ৩ ম্যাচে মিখি করেছেন ৫ এসিস্ট যা কিনা প্রেমিয়ার লীগ ইতিহাসে রেকর্ড। বেঞ্চ থেকে এসে ২ ম্যাচে মারশিয়াল করেছেন ২ গোল ও ১ এসিস্ট। লেস্টারের সাথে আবারও নিজের করে নিয়েছেন লেফট উইঙ্গের স্থানটি। গতবারের মত এবার প্রাক-মৌসুমে না থাকা কিংবা কোচ বা লীগের সাথে নিজেকে খাপ খাইয়ে নেবার ঝামেলা আর নেই। তাই নিজের সেরাটাই ঢেলে দিচ্ছেন মাঠে। শুধু এই দুজনই নয় বরং দলের প্রতিটি খেলোয়াড়ের জন্যই এটি প্রযোজ্য।

৪) মোরিনহোর দ্বিতীয় মৌসুম

স্পেশাল ওয়ান হবার পাশাপাশি আরেকটি খেতাবে প্রায়ই মোরিনহোকে সম্বোধন করা হয় - সেকেন্ড সীজন স্পেশিয়ালিস্ট। মোরিনহো ক্যারিয়ারে যেখানেই গেছেন, দ্বিতীয় মৌসুমে তিনি লীগ জিতেছেন। প্রথম মৌসুমে তিনি সময় নিয়ে দল গোছান। পরবর্তী মৌসুমে তার গোছান দল নিয়ে লীগ জিতেন। এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি এতই ঘটেছে যে এই সূত্র আইনস্টাইনের বিখ্যাত e=mc^2 এর মতই চিরন্তন সুত্রে পরিণত হয়েছে। তবেকি আমারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি আবারও ঘটতে যাচ্ছে? এখন পর্যন্ত লীগে শীর্ষে আছে ইউনাইটেড। তাই লীগ জিতলেও অবাক হবার কিছুই থাকবেনা। কারন মোরিনহো যে স্পেশাল ওয়ান। আর নিজেকে বার বার প্রমাণিত করেই অর্জন করেছেন খেতাবটি।





Similar Post You May Like

জনপ্রিয় খেলার সংবাদ

Find us on Facebook