ফুটবলকে বিদায় ভিক্টর ভালদেসের

ফুটবলকে বিদায় ভিক্টর ভালদেসের
Mahfuz Reza Chowdhury August 19, 2017, 2:06 pm Articles

বার্সেলোনার জুনিয়র দলের হয়ে ফুটবল জীবন শুরু হতে না হতেই পরিবারের সাথে বার্সেলোনা ছেড়ে চলে যেতে হয় ভিক্টর ভালদেসকে। তিন বছর ক্যানারি আইল্যান্ডের সবচেয়ে বড় শহর ট্যানেরিফে থাকার পর ১৯৯৫ সালে ফিরে এসে আবার বার্সেলোনার জুনিয়র দলে যোগ দিয়ে টানা ১৯ বছর ছিলেন বার্সেলোনায়। লা-মাসিয়া থেকে উঠে আসা এই বার্সেলোনা লিজেন্ড তার ফুটবল ক্যারিয়ারের বেশীরভাগ সময়ই খেলেছেন বার্সেলোনা মেইন দলের হয়ে। ২০০২ সাল থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনার হয়ে ৫৩৫ ম্যাচ খেলা ভালদেস ছিলেন বার্সেলোনার সব সোনালি সময়ের সাক্ষ্যী। পেপ গার্দিওলার ড্রিম টিমের সেই ভালদেস একে একে জিতেছেন ফুটবল দুনিয়ার প্রায় সবকিছুই। বার্সেলোনার গোল পোস্টের অতন্দ্র প্রহরী ভালদেস তারপর একে একে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড, মিডেলসবার্গ ঘুরে অতপর ঘোষণা দিয়েছেন ফুটবল মাঠে আর গ্লাভস হাতে দেখা যাবে না তাকে।

ভালদেসের ইয়ুথ ক্যারিয়ার শুরু মাত্র ১০ বছর বয়সে বার্সেলোনার জুনিয়র দলের হয়ে। তারপর ১৯৯২ সালে ট্যানেরিফে যাওয়ার পর যোগ দেন ট্যানেরিফ ফুটবল একাডেমীতে। ৩ বছর ট্যানেরিফ একাডেমীতে খেলার সময় তার অসাধারন প্রতিভার কারণে অফার পান লা-মাসিয়াতে যোগ দেওয়ার।১৯৯৫ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত বার্সেলোনার ইয়ুথ টীমের হয়ে খেলার সময় ভিক্টর ভালদেস ছিলেন তাদের একজন সেরা গোলকিপার। বার্সেলোনা সি ও বার্সেলোনা বি টীমের গোলকিপার হয়ে তার উজ্জ্বল পারর্ফমেন্সই ভীত গড়ে দেয় পরবর্তীতে তার মেইন টীমের হয়ে খেলার সম্ভাবনা। পুরোপুরিভাবে বার্সেলোনার মেইন দলের সাথে খেলার জন্যে উপযুক্ত না হওয়াতে ২০০০ সালে বার্সেলোনা বি টীমের জন্যে তাকে চুক্তিবদ্ধ করা হয়। তারপর বি টীমের হয়ে খেলেন ৭৭ টি ম্যাচ। চ্যাম্পীয়ান্স লীগ কোয়ালিফায়িং এ লেজিয়া ওয়ারসোর বিপক্ষে প্রথম ডাক পান বার্সেলোনা মেইন দলের হয়ে খেলার জন্যে। দলের মেইন গোলকিপারের ইঞ্জুরীর সুযোগ নিয়ে চান্স পাওয়া ভালদেস নিজের অসাধারণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে ২০০৩ সাল থেকে হয়ে উঠেন বার্সেলোনা টীমের মেইন গোলকিপার।

২০০২ সালে বার্সেলোনা দলের হয়ে অভিষেক হওয়া ভালদেস তারপর একে একে ২০১৪ সাল পর্যন্ত খেলেন ৫৩৫ টি ম্যাচ। বার্সেলোনার হয়ে এইসময় প্রায় সব রকমের ট্রফিই জিতেন তিনি। বার্সেলোনা লিজেন্ড রামালেটস এর সাথে মিলিতভাবে রেকর্ড ৫ বার জিতেন জামোরা ট্রফি। লীগে সবচেয়েভালো গোলকিপিং করার জন্যে তিনি এই ট্রফি জিতেছিলেন। ২০০৬ সালের চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জয়ী বার্সেলোনার ফাইনালের হিরো ভালদেস খুব সহজেই পড়তে পারতেন বিপক্ষ দলকে এবং সেই সাথে ছিলেন খুবই ঠান্ডা মাথার একজন মানুষ। ওয়ান-ওয়ান পজিশনে তার নার্ভ ধরে রাখারা ক্ষমতা সত্যিই ছিলো প্রশংসনীয়। ২০০৯ সালের ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে চ্যাম্পীয়ান্স লীগ ফাইনালে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর একটি ফ্রি-কিক ও একটি শট ঠেকিয়ে বার্সেলোনাকে চ্যাম্পিয়ন্স লীগ জিততে বিশাল অবদান রেখেছিলেন এই বার্সা লিজেন্ড। বার্সেলোনার হয়ে ৫৩৫ ম্যাচে গোলকিপিং করার সময় মাত্র ৪৪১ গোল জালে জড়াতে পেরেছিলো বিপক্ষ দলের খেলোয়াড়রা। ২০০৭ সালে একটানা ৪৬৬ মিনিট আনবিটেন থেকে গড়েছিলেন ক্লাব রের্কড। এবং তার রেশ ধরেই ২০০৯-১০ ও ১০-১১ মৌসুমে স্পেন জতীয় দলের প্রথম চয়েজ গোলকিপার ইকার ক্যাসিয়াসকে পিছনে ফেলে জিতে নেন লা-লীগার সেরা গোলকিপারের খেতাব। বার্সেলোনার হয়ে সবচেয়ে বেশী গোলকিপিং করা এই বার্সেলোনা লিজেন্ড দলের হয়ে জিতেছেন ২৬টি ট্রফি। তার মধ্যে রয়েছে ২ বার ফিফা ক্লাব ওয়ার্ল্ড কাপ, ৩টা চ্যাম্পীয়ানস লীগ, ৬ টা লা-লীগা, ২ টা ইউরোপিয়ান সুপারকাপ সহ আরো অনেক অর্জন। ২০১৩-১৪ চ্যাম্পিয়ন্স লীগ সেমি-ফাইনালে বায়ার্ন মিউনিখের সাথে ৩-০ তে বার্সেলোনা হেরে যাওয়ার এক মাস পরেই ভালদেস বার্সেলোনা থেকে বিদায় নেওয়ার কথা জানিয়ে দেন। মৌসুমের শেষে কন্ট্রাক্ট শেষ হয়ে গেলে আর নতুন কন্ট্রাক্ট করবেন না বলে জানিয়ে দেওয়া ভালদেস আগে আগেই এই ঘোষণা দেওয়ার কারণ ছিলো, তার প্রিয় দল যাতে আগে থেকেই একজন রিপ্লেসমেন্ট খুঁজে বের করে। ন্যু ক্যাম্পে সেল্টা ভিগোর সাথে ভালদেসের বার্সেলোনার হয়ে ছিলো শেষ ম্যাচ। ২২ মিনিটের সময় লিগাম্যান্টের ইঞ্জুরীতে পড়ে মাঠ থেকে বের হতে হয় তাকে, সেই সাথে শেষ হয়ে যায় তার বার্সেলোনার ক্যারিয়ার।

বার্সেলোনার সাথে কন্ট্রাক্টের শেষের দিকে মোনাকোর সাথে প্রি-কন্ট্রাক্ট করেছিলেন ভালদেস। কিন্তু, ইঞ্জুরীর কারনে পরবর্তীতে মোনাকে সেই কন্ট্রাক্ট তুলে নিলে ২০১৫ তে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেডের সাথে চুক্তিবদ্ধ হন ভালদেস। ইউনাইটেডের সাথে ১৮ মাসের সেই চুক্তিতে দলের হয়ে খেলেছিলেন মাত্র দুইটি ম্যাচ। তারপর ভ্যান গালের সেই ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড দলে তার জায়গা না হলে বেলজিয়ান ক্লাব স্টের্ন্ডাড লিগেতে ছয় মাসের লোনে পাঠানো হয় তাকে। লোন থেকে ফিরে ক্লাব কন্ট্রাক্ট রি-নিউ না করাতে ফ্রি ট্রান্সফারে মিডলসর্বাগ দলে ভিড়ায় তাকে। ২০১৬ তে দুই বছরের জন্যে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর ক্লাবের হয়ে ২৮ টি ম্যাচ খেলেন তিনি। অতপর মিডলসর্বাগ রিলিগেশনে পড়লে এই জুলাইয়ে ঘোষনা দেন ক্লাব ছাড়ার। সেই সাথে গত ১৭ই আগস্ট বিদায় জানান ফুটবল দুনিয়াকে।

ইকার ক্যাসিয়াসের যুগে স্পেনের হয়ে তেমন সুবিধা করতে পারেননি ভালদেস। ২০১০ এ স্পেনের হয়ে অভিষেকের পর সব মিলিয়ে খেলেছেন ২০টির মত ম্যাচ। ছিলেন স্পেনের ২০১০ ওয়ার্ল্ডকাপ জয়ী দল ও ২০১২ এর ইউরোপিয়ান চ্যাম্পিয়ান দলের সদস্য। ব্যক্তিজীবনে ভালদেস ভালোবেসে বিয়ে করেন কলম্বিয়ান মডেল অলান্ডা কারডোনাকে। তাদের রয়েছে দুই ছেলে ও এক মেয়ে। শুনা যাচ্ছে ফুটবলকে বিদায় জানানোর পর এখন সময় দিবেন নিজের টিভি প্রোডাকশন কোম্পানীতে। ক্যাসিয়াসের যুগে স্পেনের হয়ে এই গোল কিপার তেমন সুবিধা করতে না পারলেও বার্সেলোনার ইতিহাসে থেকে যাবেন সারা জীবন। বার্সেলোনার এই লিজেন্ড হয়ত অবসরে ঠিকই অতীত খুঁড়ে বের করবেন বার্সেলোনার হয়ে পার করা তার সেই সোনালি সময়কে। আর তখন খুব স্বাভাবিক ভাবেই মিস করবেন ফুটবল দুনিয়াকে। বিদায় ভিক্টর ভালদেস আরিবাস!





Similar Post You May Like

জনপ্রিয় খেলার সংবাদ

Find us on Facebook