মানে গারিঞ্চা বৃত্তান্ত

মানে গারিঞ্চা বৃত্তান্ত
Safat Al Mahdi Ayon August 10, 2017, 4:07 pm National Team

১৯৩৩ সালের রিও ডি জেনেইরোর একটি ছোট গ্রাম পাউ গ্রান্দেতে জন্ম বিশ্ব ফুটবলের কিংবদন্তি ম্যানুয়াল ফ্রান্সিস্কো দস সান্তোস ডাক নাম মানে গারিঞ্চার। যাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা ফুটবলার হিসেবে বিবেচিত করা হয়। অন্যসব ফুটবলার দের মতো ফিজিক্যাল দিক দিয়ে তিনি পিছিয়ে ছিলেন। যার কারনে ক্যারিয়ারের প্রথমদিকে কয়েকটি ক্লাব থেকে প্রত্যাখ্যাত হন। কিন্তু শেষমেশ ১৫ বছর বয়সে হোম টাউন ক্লাব পাউ গ্রান্দে তে ইয়ুথ ক্যারিয়ারের শুরু করতে পারেন। সেখানে ভালো পারফর্মেন্স এর সুবাদে ব্রাজিলের অন্যতম বড় ক্লাব বোটফোগো থেকে প্রস্তাব আসে ১৯৫২ তে। সেখানে তিনি তার প্রতিভার নিদর্শন দেখানো শুরু করেন। ধারাবাহিক পারফরমেন্স এর সুবাদে সেসময়ের ব্রাজিলিয়ান দিলে জায়গা নিয়ে নেন ১৯৫৮ সালের বিশ্বকাপেও নিজেকে ব্রাজিলিয়ান দলের সদস্য হিসেবে যোগ দেন। তার সাথে পেলেরও বিশ্বকাপে অভিষেক হয়।

অভিষেক ম্যাচে ততকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের বিপক্ষে তার পারফরমেন্স ছিল চোখ ধাঁধানো। বিরল প্রতিভা হিসেবে নিজেকে অন্যান্য ফুটবলার থেকে নিজেকে চেনাতে শুরু করেন। ড্রিবলিং, স্প্রিন্টিং, গোলবারের সামনে নিখুঁত ফিনিশিং কি ছিলোনা তার। পেলের সাথে জুটি গড়ে ব্রাজিল কে এনে দেন নিজেদের ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ। এরপর ক্লাব লেভেলেও সেই পারফরমেন্স ধরে রাখেন।

১৯৬২ সালের ব্রাজিল যায় তাদের ট্রফি ডিফেন্ড করার উদ্দেশ্য নিয়ে। সেবার পেলের সাথে তাদের প্রানভোমরা ছিলো গারিঞ্চা। কিন্তু ট্রফি ডিফেন্স এর প্রথম ধাপেই বড় সড় ধাক্কা খেতে হয় ব্রাজিলকে- ইঞ্জুরির কারণে দল থেকে ছিটকে যান পেলে। কিন্তু ব্রাজিল সমর্থকদের দুশ্চিন্তা দূর করে নিজের লিডারশীপ কোয়ালিটি + একক ভাবে ম্যাচ করার ক্ষমতা দেখিয়ে ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দেখান গারিঞ্চা। বিশ্বকাপের টপ স্কোরার হিসেবে গোল্ডেন বুট ও সেরা খেলোয়াড় হিসেবে গোল্ডেন বল জিতা তার একক প্রচেস্টার ব্রাজিলকে বিশ্বকাপ জিতানোর প্রমাণ দেখায়। সফল ভাবে বিশ্বকাপ জিতিয়ে দলকে সাফল্যের অন্যতম পর্যায়ে নিয়ে যান তিনি।

                           

ইতিমধ্যে পেলে থেকে তার জনপ্রিয়তা বেড়ে যায় ব্রাজিলে। ব্রাজিলের মানুষরা তাকে ফুটবল গড আইডল হিসেবে মানা শুরু করে। কিন্তু এসব ফেম জনপ্রিয়তা তাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করে। অন্যান্য ব্রাজিলিয়ানদের মতোই অতিরিক্ত ফেম ও জনপ্রিয়তা তাকে নারী আসক্তি ও নেশার দিকে উতসাহিত করে। এর মধ্যে বা পায়ের হাটুর ইঞ্জুরিতে পড়তে হয় তাকে। বড় ধরনের ইঞ্জুরিতে পড়ায় তাকে ফুটবল থেকে অনেক দূরে থাকতে হয়। অবসর সময় কাটানোর জন্য এলকোহলের নেশায় মত্ত হওয়া শুরু করেন। এর মাঝে ব্রাজিলিয়ান গায়িকা এলিজার সাথে নতুন সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। আগের ঘরের স্ত্রী ও সন্তান দের ত্যাগ করে নতুন সম্পর্কে জড়ান নিজেকে। ইঞ্জুরি ফেরত নিজের সেই আগের দক্ষতা দেখানো তার জন্য কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে বিধায় ১৯৬৬ সালে বোটাফোগো থেকে পাড়ি জমান সাউ পাওলোর ক্লাব করিন্থিয়ান্সে। এখান থেকে তার ক্যারিয়ারের অধ:পতন শুরু। সেখানেও ইঞ্জুরির ছোবল থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারেন নি। তাই পরের বছরেও নতুন ক্লাব খুজতে হয়েছিল তাকে। পর্তুগিজ কারিওকা ক্লাবে যোগদান করেন তিনি। কিন্তু সেখানেও তিনি ধারাবাহিক হতে পারেন নি নিজেকে খুজে ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করেন। এরপর যথারীতি অ্যাথলেটিকো জুনিয়র ফ্লামেংগো ক্লাবে খেললেও নিজের আগের সেই পারফরমেন্স দেখাতে পারেন নি।

                                       

পার্টি নেশা নারী আসক্তি তার ক্যারিয়ারের শেষ ডেকে এনেছিল। মোট ৬৯২ ক্লাব এপিরেন্স যার মধ্যে শুধুমাত্র বোটাফোগোতেই ৬১৪ টি ও ব্রাজিল দলে ৫০ টি ম্যাচ খেলার পর অবসর গ্রহণ করতে হয় তাকে। ক্লাবে মোট ১০৩ টি ও জাতীয় দলে ১২ টি গোল করেন তিনি। এরপর এলকোহলের মরণ নেশা তাকে পেয়ে বসে। এসব থেকে নিজেকে দূরে রাখা তার কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে। এর ফলে হাসপাতালের বিছানাতেই অনেক সময় ব্যয় করতে হতো তাকে। এর মধ্যে নতুন ঘরে তার একটি ছেলে সন্তান হয়। তবে তারসাথে নতুন স্ত্রীর সংসারেও ছিলো দ্বন্দ, অশান্তি। একদিন শাশুড়ি ও স্ত্রীর বোনকে নিয়ে গারিঞ্চা মাতাল অবস্থায় ড্রাইভ করার সময় বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা হয়। এতে ঘটনাস্থল এ শাশুড়ি প্রান হারান এবং তিনিসহ অন্যান্য রা মারাত্মক ভাবে আহত হন। এই ঘটনায় আদালত থেকে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার ফলে তাকে জেলেও যেতে হয়েছিল। পরবর্তীতে ছাড়া পাওয়ার কয়দিন পর স্ত্রীর সাথে বিচ্ছেদ করেন। তার জীবনের শেষ কয়টি বছর ছিল কষ্টদায়ক অতিরিক্ত এলকোহল পানের কারনে তার লিভার ড্যামেজ হয় মারাত্মক ভাবে। মৃত্যুর জন্য প্রহর গুনতে হয় তাকে। জীবনের শেষ তিনটি বছর তাকে বেশিরভাগ সময় হাসপাতালের বেডে শুয়ে থাকতে হয়। অত:পর সবাইকে কাদিয়ে ১৯৮৩ সালে মাত্র ৪৯ বছর বয়সে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে পরলোকগমন করতে হয়। তার জন্মস্থল পাউ গ্রান্দের একটি গির্জায় শেষকৃত্যানুসঠান হয় যেখানে তাকে শেষবারের মত দেখার জন্য ভক্তকুলের সমাগম গয়। এই ফুটবল জাদুকরের এমন অকাল মৃত্যু ফুটবল সমর্থকদের মেনে নিতে অনেকদিন লেগেছিলো।

দীর্ঘসময়ের ইঞ্জুরি ও নেশার আসক্তি তার ক্যারিয়ারের অর্জন দীর্ঘায়িত করতে দেয়নি। কিন্তু তিনি যা অর্জন করে গেছেন তা নেহায়েতই কম ছিলনা। তার খেলা দেখে ভক্তরা তাকে জালমা সান্তোস যার অনুবাদ 'জয় অফ দ্যা পিপল' নাম দিয়েছিল। তার স্মৃতির সাক্ষর হিসেবে ব্রাসিলিয়া তে তার নামকরনে স্টেডিয়ামের নাম রাখা হয় স্টাডিও মানে গারিঞ্চা। ১৯৯৪ সালে ফিফা কর্তৃক তাকে সর্বকালের সেরা একাদশে রাখা হয়। এছাড়াও ১৯৯৯ সালে ফিফার জুরি অনুসারে সর্বকালের সেরা ফুটবলার দের মধ্যে সপ্তম স্থানে তাকে নির্বাচিত করা হয় এবং ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের হল অফ ফেমে তাকে জায়গা দেয়া হয়। তাকে সর্বকালের সেরা ড্রিবলার হিসেবে এখনো অনেকে মেনে নেয়। তার মত এমন প্রতিভাবান ফুটবলার এর ক্যারিয়ার ছোট না হলে তাকে অনায়াসে সর্বকালের সেরা ফুটবলার হিসেবে মানা হত। কি ছিলনা তার মধ্যে স্কিল স্পিড গোলবারের সামনে নিখুঁত ফিনিশিং চান্স ক্রিয়েশন সেট পিস টেকিং এবিলিটি প্লেয়ার দের সাথে কম্বিনেশন। গারিঞ্চার মত ফুটবলারদের জন্মই হয় দর্শকদের আনন্দ দিতে। ফুটবলটাকে সৌন্দর্য মন্ডিত করতে। গারিঞ্চার মত ফুটবলাররা এসে ফুটবলের সৌন্দর্যটাকে আরো বাড়িয়ে দিবেন আমাদের মাঝে সেই প্রত্যাশা থাকলো।

                       





Similar Post You May Like

Find us on Facebook