আতা ভাইঃ ৫০ বছর ধরে ফুটবল এর বিরামহীন পথিক (বাংলাদেশ এর ফুটবল ইতিহাস - পর্ব ২)

আতা ভাইঃ ৫০ বছর ধরে ফুটবল এর বিরামহীন পথিক (বাংলাদেশ এর ফুটবল ইতিহাস - পর্ব ২)

আমার প্রথম বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম এ দেখা ফুটবল ম্যাচ হল প্রথম সুপা্র কাপ ফাইনাল। কোটি টাকার ফাইনাল। উত্তেজনাই ছিল আলাদা।  তা্র উপর যদি দল দুটি হয় আবাহনী আর মোহা্মেডান তাহলে তো কথাই নেই। এখন আমরা প্রায় ই বলি ফুটবল এ নাকি দর্শক নাই । কিন্তু সেই ২০০৭-২০০৮ এর দিকের ফুটবলের জনপ্রিয়তা ও যদি এখন ভাবি , আর এখনকার জনপ্রিয়তা দেখি নিজের ই খুব কষ্ট হয় । বিকাল ৩ টার দিকেই মাঠে চলে যাই। উত্তর গ্যালারী আর দক্ষিণ গ্যালারীর  টিকেটের দাম ছিল ৫০টাকা । গেলাম টিকেট শেষ । পরে দুইটা টিকেট ১২০ টাকায় কিনি বাহির থেকে । ৪ টার সময় মাঠে ঢুকি । তখন ৩য় স্থান নিরধা্রনি ম্যাচ শুরু হয়। ব্রাদার্স আার কার ছিল মনে নেই। সন্ধ্যার আগেই পুরো স্টেডিয়াম ভরতি। মানুষ দাড়ানোর জায়গা নেই। আবাহনী আর মোহামেডান ম্যাচ এর উত্তেজনা সেদিন টের পেয়েছিলা্ম।

সন্ধ্যা ৭ টায় ফাইনাল শুরু হয়। প্রথম সুপার কাপের হাতছানি আর দুই দলের সম্মানের লড়াই , দুই দল ই শুরু থেকে মরিয়া গোল আদায়ের জন্য । আবাহনী যখন আক্রমণ এ যায় উত্তর গ্যালারী থেকে মুহুর্মুহু গর্জন মোহামেডান যখন আক্রমণ এ দক্ষিণ গ্যালারী থেকে গর্জন । কেন প্রাণের খেলা বলা হয় ফুটবল কে সেদিন একটু হলেও উপলব্ধি করতে পেরেছিলা্ম । দুই দলের ঐতিহ্যের ম্রিয়মাণ উত্তাপ সেদিন টের পাই।২১ মিনিটে মোহামেডানের নাইজেরিয়ান স্ট্রাইকার জন গুডউইনের একমাত্র গোলে আবাহনীকে হারিয়ে কোটি টাকা জিতে নিয়েছিল মোহামেডান। এরপর থেকে যতবার মোহামেডান আক্রমন এ গিয়েছে একজন বুড়ো মানুষকে সবার চেয়ে বেশি গলা ফাটাতে দেখেছি।। সেই বুড়ো কে মনে গেথে যায়। খোজ নিয়ে জানি , তিনি আর কেও নন সবা্র পরিচিত মাঠের পরিচিত মুখ, এ দেশের ঘরোয়া ফুটবলের জীবন্ত ডিকশনারী, বহু উত্থান পতন এর সাক্ষী আতা ভাই। নাম আতাউর রহমান, সবাই আতা ভাই বলেই ডাকেন ।

পাকিস্তানের ক্রিকেটে যেমন ‘জলিল চাচা’, ঠিক তেমনি বাংলাদেশের ফুটবলে ‘আতা ভাই’। ঘরোয়া ফুটবল আসরে পতাকা হাতে গ্যালারি মাতানো সত্তরোর্ধ্ব বৃদ্ধা সমর্থক আতা ভাইয়ের জীবন অনেকটাই রহস্যাবৃত। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়াম আঙিনায় তিনি পরিচিত ‘আতা ভাই’ হিসেবে। সবার প্রিয় আতা ভাই। বায়তুল মোকাররম-সংলগ্ন গ্যালারিই যেন তাঁর দ্বিতীয় বাড়ি। স্টেডিয়াম পাড়ার প্রচলিত কৌতুক, ‘কোনো দিন ভুল করে ম্যাচের রেফারি নাও আসতে পারে, কিন্তু আতা ভাইয়ের মিস নাই।’ দর্শকশূন্য, খাঁ খাঁ গ্যালারির শূন্যতা যেন একাই পূর্ণ করতে চান পুরো ৯০ মিনিট গলা চড়িয়ে। নিজ বাড়িতেই নাকি আজ তিনি পরবাসী। বিপত্নীক সংসারে চালচুলোহীন আতা ভাইয়ের জীবনে ফুটবলই সব।

                      

মৃত প্রায় ফুটবলে দর্শক নেই। খাঁ খাঁ করে গ্যালারি। চৈত্রের প্রচণ্ড তাপদাহে, আষাঢ়ে বর্ষায় কিংবা মাঘের হাড় কাঁপানো শীত- বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দর্শকের কলতান। ফাঁকা গ্যালারি যেন ফুটবলের সোনালি অতীতকে বিদ্রূপ করে। কিন্তু চৈত্রের খরতাপে, বর্ষার বাদল দিনে কিংবা মাঘের হাড় কাঁপানো শীতে গ্যালারিতে একজনকে চোখে পড়বেই। ফুটবল অন্তঃপ্রাণ আতাউর রহমান ওরফে আতা ভাই। ঘরোয়া আসরে মোহামেডানের সাদা-কালো এবং আন্তর্জাতিক ম্যাচে লাল-সবুজের পতাকা হাতে সরব কেবল এই আতা ভাই। সত্তরোর্ধ্ব এই বৃদ্ধ সমর্থক একাই গলা ফাটিয়ে যান। সব সময় স্টেডিয়ামের পশ্চিম দিকে মোহামেডানের গ্যালারিতে পতাকা হাতে দেশের ফুটবলারদের উৎসাহ জুগিয়ে থাকেন আমাদের ‘আতা ভাই’।

আতা ভাইয়ের জন্ম দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের দুই বছর আগে, ১৯৪৫ সালে রাজধানীর টিকাটুলিতে। ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছেন। বাংলার চেয়ে তার কণ্ঠে ইংরেজিই বেশি চোস্ত। স্কুল, কলেজ ঘুরে ভার্সিটির পাঠ চুকিয়েছেন সেই ষাটের দশকেই। কিশোর বয়সে শরীর গঠনে ঝোঁক ছিল। ফুটবলে একসময় টিকাটুলি গোলাপবাগ ক্লাবে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেছেন, বাদ যায়নি ক্রিকেটও।

ফুটবলের ভরা যৌবনে গা ভাসিয়েছেন খেলাটির উন্মাদনায়। মুগ্ধ হয়ে দেখেছেন মোহামেডানের দোর্দণ্ড প্রতাপ। বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামে প্রথম ম্যাচ উপভোগ ১৭ বছর বয়সে, সেটা ১৯৬২ সালের কথা। এসএসসি রোল (৪৫১৫) নাম্বারের মতো মনে আছে গ্যালারি থেকে প্রথম ম্যাচের স্মৃতি— ‘ওটা ছিল ওয়ান্ডারার্স-আজাদ ক্লাবের ম্যাচ।’ নিয়মিত মাঠে আসায় মোহামেডানের প্রেমে পড়েছিলেন আতা ভাই। তার পর থেকে মোহামেডান ও আতা ভাই যেন ‘একই বৃন্তের দুটি কুসুম!’ আতা ভাইয়ের দাবি, ষাটের দশক থেকে এখন পর্যন্ত মোহামেডানের কোনো ম্যাচই মিস করেননি। এমনকি দুবার জন্ডিস ও হার্নিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার পরও!

আতা ভাইয়ের কাছে মাঠ একই সঙ্গে আবেগ-উচ্ছ্বাসের, হতাশারও। পড়াশোনার পাট চুকিয়ে একসময় টঙ্গীতে ন্যাশনাল ফ্যান কারখানার হিসাব বিভাগে চাকরি নেন। ঘরোয়া ফুটবলে বড় ম্যাচের আগে তার হঠাত্ অসুস্থ হয়ে যাওয়াটা ছিল নিত্য ঘটনা। আসলে তা ছিল ম্যাচ দেখতে অসুস্থতার বাহানা। সেই বাহানাই খেয়ে নেয় তার চাকরি। এর পর থেকেই আপাদমস্তক এ ক্রীড়াপাগল বেকার, পরিষ্কার করে বললে ভবঘুরে!

তার দাদা হাজি শেখ আবদুল্লাহ ছিলেন জমিদার গোছের মানুষ। সেই প্রাচুর্য এখন অবশ্য নেই। অধিকাংশ সম্পত্তি বিক্রি করে তার চাচাতো ভাই ভারতের বেঙ্গালুরুতে পাড়ি জমিয়েছেন। টিকাটুলিতে বাকি যেটুকু আছে, ওটাই এখন আতা ভাইয়ের মাথা গোঁজার ঠাঁই।

আতা ভাই দিনের অধিকাংশ সময় স্টেডিয়াম এলাকায় কাটিয়ে রাতে মায়ের ঘরে গিয়ে ঘুমান। বাসায় রান্নাবান্নার ব্যবস্থা নেই। কেউ দুমুঠো খাবার দিলেই কেবল পেটপূজা চলে। খেয়ে আলহামদুলিল্লাহ বলে নিদ্রা, সকালে উঠেই আবার স্টেডিয়ামের পথ ধরা।

মা-বাবাকে আগেই হারিয়েছেন আতা ভাই। সংসারে ছিলেন তিন ভাই, এক বোন। চার ভাইবোনের মধ্যে আতা ভাই ও ছোট ভাই শফিকুর রহমান আছেন। বাকিরা মা-বাবার মতো অনন্তলোকের পথে হেঁটেছেন। কাজিন জামিল আহমেদ ওসমানী এখন আতা ভাইয়ের অভিভাবক। বাড়িভাড়া বাবদ যে অর্থ পান, তা কাজিনের হাতে তুলে দেন। তার স্ত্রী শাহীনা আঞ্জুম দুনিয়ার মায়া ছেড়েছেন ২০০৩ সালে। বউয়ের একমাত্র স্মৃতিচিহ্ন মেয়ে নাসরা। তাকে বিয়ে দিয়েছেন। জামাই ইব্রাহিম হাসান মিটুল বিকাশের জেনারেল ম্যানেজার। নাতনি আফনান ও নাতি ইউশরাকে নিয়ে আতা ভাইয়ের সংসার।

ফুটবল উন্মাদনার মাঝেই কাউকে পেলে গল্প করেন, ‘আমার নানা হামিদ হাসান নোমানী পশ্চিমবঙ্গের শিয়ালদায় ম্যাজিস্ট্রেট ছিলেন। যশোরের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। সিলেটের ডেপুটি কমিশনার ও বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তার দায়িত্বও পালন করেন। পূর্বপুরুষ ও আত্মীয়রা বনেদি ছিলেন। খেলার প্রেমে না মজলে আতা ভাইয়ের জীবনটাও হয়তো সে পথেই প্রবাহিত হতো। কিন্তু ধনুক থেকে তীর ছুটে যাওয়ার পর কি আক্ষেপ চলে! বরং মাঠে-ময়দানের সুখস্মৃতি হাতড়ে বেড়ানোতেই পরিতৃপ্ত আতা ভাই, ‘১৫-২০ বছর আগে আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের আগের রাত ছিল আমাদের কাছে চাঁদরাতের চেয়েও বড় উত্সবের উপলক্ষ। সেই স্মৃতি আজো অম্লান।

ষাটের দশকে ঢাকা মাঠের ফুটবলারদের দাপট নিজের চোখে দেখা। দেখেছেন দেশের ফুটবলের বিভিন্ন প্রজন্মকে। স্মৃতি হাতড়াতে হয় না। এমনিতেই মনে পড়ে। বলেন, ‘কালা গফুরের মতো খেলোয়াড়ের খেলা দেখেছি। মারী, আশরাফ, গজনবী, তাজুল ইসলাম মান্না, আলী নেওয়াজ কিংবা নবী চৌধুরীদের খেলা দেখে মুগ্ধ হয়েছি। মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্স, আজাদ, ভিক্টোরিয়া ও ইপিআইডিসির মতো ক্লাবগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা প্রাণভরে উপভোগ করেছি। দেশের ফুটবলে ষাটের দশকের সেই দিনগুলো হারিয়ে গেছে। কিন্তু আল্লাহর রহমতে আমি এখনো আছি। সালাউদ্দিন, চুন্নু, আসলাম, ওয়াসিম, আশীষ, জনি, মোনেম মুন্না, কায়সার হামিদ, সাব্বিরদের খেলাও দেখেছি, আবার জুয়েল রানা, আলফাজ, আরমানদের পর দেখছি মামুনুল, এমিলিদের খেলা।’

                      

শুরু থেকেই মোহামেডানের পাঁড় সমর্থক। সাদা-কালো রং তাঁর জীবনের অংশ। ষাটের দশকে একবার মোহামেডান-ওয়ান্ডারার্স ম্যাচ দেখতে গিয়ে মার খেয়েছিলেন। সেই স্মৃতিও ভুলতে পারেননি, ‘পঁয়ষট্টি কি ছেষট্টি সালের কথা। তখন তো আর আবাহনী ছিল না। ঢাকার ফুটবলে মোহামেডান, ওয়ান্ডারার্স বড় দল। একদিন মোহামেডান-ওয়ান্ডারার্স ম্যাচে ওয়ান্ডারার্স হেরে গেছে। স্টেডিয়ামের বাইরে আনন্দ-উল্লাস করছি আর এসব ওয়ান্ডারার্সের কিছু দাঙ্গাবাজ সমর্থক আমাদের দলটার ওপর হামলা করে। লাঠির বাড়ি খেয়েছিলাম বেশ কিছু। বাড়ি ফেরার আগে ডাক্তারের চেম্বারে যেতে হয়েছিল।

আবাহনী-মোহামেডান উত্তেজনার স্মৃতি তাঁর হৃদয়ে চির-জাগরূক। স্মরণীয় বহু ম্যাচ দেখেছেন এই দুই দলের মধ্যে। গোলযোগের মধ্যেও পড়েছেন বহুবার। তাঁর কষ্ট হয়, এই প্রজন্ম সেই রোমাঞ্চের স্বাদ পেল না, ‘এরা রিয়াল-বার্সেলোনা নিয়ে বাহাস করে। ইউরোপীয় ফুটবলের দুর্দান্ত সব খেলা দেখে। কিন্তু এরা আবাহনী-মোহামেডানকে জানল না। আবাহনী-মোহামেডান ম্যাচের সেই উত্তেজনা উপভোগ করতে পারল না। খুব আফসোস লাগে।’

নিজের গোটা জীবনটাই দেশের ফুটবলকে দিয়ে গেলেন আতা ভাই। বিনিময়ে খুব বেশি কিছু কি পেয়েছেন? আতা ভাই ধমকে উঠেন, ‘মিয়া, ফুটবল দেখে গত ৫৩ বছরে যে মজা পাইসি, সেটার কোনো মূল্য হয়? মনের আনন্দেই খেলা দেখতে আসি। যেদিন এই আনন্দ পাব না, সেদিনই আমার মৃত্যু। তার আগে দেখে যেতে চাই দেশের ফুটবলটা একটা জায়গায় অন্তত গেছে।’

গত ১ জানুয়ারী ছিল বঙ্গবন্ধু স্টেডিয়ামের ৬০ বছর জন্মদিন। ফলে এই স্টেডিয়ামের সাথে তার পথচলা দীর্ঘ ৫০ বছর ধরে! এখন প্রশ্ন বাংলাদেশ বলেই কি এ ধরনের একজন ফুটবল পাগল সমর্থকের জন্য আমরা নূন্যতম সম্মান দেখাতে কার্পণ্য বোধ করি!


গত পর্বের লিংক

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন