থ্রি ম্যান ডিফেন্সঃ অতীত ও আধুনিকতার মিশেল

থ্রি ম্যান ডিফেন্সঃ অতীত ও আধুনিকতার মিশেল

ফর্মেশন, ফুটবল খেলার একটি অপরিহার্য ও অতি গুরুত্বপুর্ণ অংশ। একটা টিমে ১১ জন কোন পজিশনে কিভাবে খেলবে তা নির্ভর করে এই ফর্মেশন এর উপর। ক্লাব লেভেল কিংবা ইন্টারন্যাশনাল লেভেলে বিভিন্ন কোচ নিজেদের নির্বাচিত কিংবা ক্লাবের হয়ে খেলা খেলোয়াড় অনুযায়ী ভিন্ন ভিন্ন ফর্মেশনে তাদের ট্যাকটিক্স সাজান। কিন্তু সবসময় সকম ফর্মেশন সব পরিস্থিতিতে খাটেনা, সেটা হোক প্লেয়ারদের কোনো পজিশনে দূর্বলতার কারনে কিংবা প্লেয়ারদের ওইসব পজিশনে মুভমেন্ট করতে অস্বস্থি বোধের কারনে। এ কারণে ফর্মেশন চয়েজ ফুটবলে অত্যন্ত "সেনসিটিভ কেস"।

সঠিক ফর্মেশন অনুযায়ী দল সাজাতে না পারলে আপনি আপনার দলের প্লেয়ারদের কাছ থেকে সঠিক রেসপন্স পাবেননা। ফলাফল- খারাপ খেলা, বাজে ডিসপ্লে অনফিল্ড এবং ম্যাচ হারা বা প্রত্যাশা অনুযায়ী ফল না পাওয়া। এজন্যই ফর্মেশন সবসময় খেলাতে একটা আলাদা প্রভাব বজায় রাখে। আধুনিক ফুটবল অবশ্যই গতির খেলা। বডি মুভমেন্টে গতি না থাকলেও সমস্যা নেই খুব একটা, তবে মাথায় গতি এখানে সব থেকে বড় ব্যাপার। দলের ১১ জন প্লেয়ারকে প্রতিটা সময় চোখ-কান খোলা রাখতে হয় বলটা ঠিক কোনদিকে যাচ্ছে, কিংবা বলটা নিজেদের হাফে থ্রেট তৈরি করছে কিনা কিংবা ফরওয়ার্ডে খেলা প্লেয়ারগুলো তাদের চাহিদা অনুযায়ী বলের যোগান পাচ্ছে কিনা। এর মধ্যে আপনি যদি হন দলের একজন অপরিহার্য মিডফিল্ডার কিংবা ডিফেন্ডার, আপনার উপর প্রেশারটা আরও বেশি কাজ করে।

তবে আপনার প্রেশার কমানোর সুযোগ একমাত্র তখনই যখন আপনি আপনার অন্যান্য প্লেয়ার থেকে ফুল সাপোর্ট পান। থ্রি ম্যান ডিফেন্সকে এই মৌসুমে আমরা নতুনভাবে আবিষ্কার করেছি। মূলত থ্রি মান ডিফেন্স এর কথা শুনলেই আমাদের মনে খটকা লাগে, মাত্র ৩ জন ডিফেন্স, দলতো জায়ান্ট অপোনেন্ট এর আক্রমণ সামলাতে পারবেনা, কাউন্টার অ্যাটাকে গোল খেয়ে যাবে ইত্যাদি। কিন্তু, বর্তমানের থ্রি ম্যান ডিফেন্স যে ট্যাকটিক্যালি ৩ জন ডিফেন্স থেকেও অনেক বেশি প্রোভাইড করে তার কিছু নমুনা দেখানো যাক।

প্রথমেই এই মৌসুমে চেলসির কথা চিন্তা করি। গত সিজনে দুর্দান্ত খেলে তারা হয়েছে প্রিমিয়ার লীগ চ্যাম্পিয়ন। তো চেলসির এবারে এমন দুর্দান্ত ফর্ম থাকার কারন? কন্তে ব্যবহৃত থ্রি ম্যান ডিফেন্স এবং অসাধারন ট্যাকটিক্স। একটা দলে যখন থ্রি ম্যান ডিফেন্স সাজানো হয়, তখন শুধু সেটা এট্যাকে জোর দেওয়ার উপর চিন্তা করেই করা হয়না, বরং নিচে থাকা ৩ টা ডিফেন্ডারের কথাও চিন্তা করে করা হয়। সে দিক থেকে আদর্শ থ্রি ম্যান ডিফেন্স হলো ৩-৪-৩ ফর্মেশন টা। এই ফর্মেশন থেকে যেকোনো সময়, যেকোনো সিচুয়েশনে ফর্মেশন চেঞ্জ করা যায়,উপরন্তু এট্যাক ডিফেন্স দুটোতেই সাপোর্ট দেওয়া যায় যখন যেটা ইচ্ছা।

মূলত ৩ জন পিওর ডিফেন্ডারই নিচের ডিফেন্স লাইনে থাকে। এরপরে এখানকার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ পজিশন হলো দুইপাশের উইংব্যাক যারা মূলত মিডফিল্ড পজিশনে খেলেন। উইং ব্যাকদের মূলত কাজ কি? সোজা কথায়, একই সাথে এট্যাক এবং ডিফেন্সে সাপোর্ট দেওয়া। মূলত বেশিরভাগ সময়ে ক্রসিং এর কাজ করলেও দলের দরকারের সময় ওভারল্যাপ কিংবা কাট ইন করতেও এই উইং ব্যাকদের ভূমিকা অনেক বেশি। তাই বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায় যে, ভালো কোনো উইংব্যাক নিয়মিত গোল কিংবা এসিস্ট পাচ্ছেন ( এভারটনের কোলম্যান, চেলসির মার্কোস এলোনসো, রিয়াল মাদ্রিদ এর মার্সেলো ইত্যাদি)।

মিডফিল্ডার হিসেবে থাকে ২ জন যাদের ভিশনটা হতে হয় ইউনিক। কারন দলের বেশিরভাগ চান্স ক্রিয়েট কিংবা এটেম্পট আসে এই পজিশন থেকে। এই জোনের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ রোল প্লে করেন মাঝের ২ জন মিডফিল্ডার। একই সাথে চান্স ক্রিয়েট, বক্স টু বক্স প্লে, হোল্ডিং রোল প্লে করা কিংবা দরকারি মুহূর্তে ডিফেন্সে সাপোর্ট দেওয়া- সবগুলো কাজই একই সাথে করতে হয়। তাই তাদের হতে হয় এনার্জেটিক এবং বুদ্ধিমান। বাকি ২ জন হয় ওই উইংব্যাক। দলের এট্যাকিং এর জন্য উপরে দুই উইং এ থাকেন দুইজন ও মাঝে সেন্টার ফরওয়ার্ড কিংবা স্ট্রাইকার এর রোল প্লে করেন একজন। 

এখন খেলার কথায় আসি। ৩-৪-৩ এমন একটা ফর্মেশন যেটা দলের পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে হয়ে যায় ৩-৫-২, ৩-৬-১, ৩-১-৩-৩, ৩-২-২-৩, আবার ৫-৪-১,৫-২-৩,৫-৩-২ কিংবা ৪-৪-২,৪-৫-১ ইত্যাদি ফর্মেশনে। ফর্মেশন চেঞ্জ খেলার সময় কোচের ট্যাকটিক্স কিংবা প্লেয়ারদের অনফিল্ড পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে। ৩-৪-৩ দিয়ে খেলা শুরু করে অপনেন্ট কে প্রেশার দিতে ৩-৬-১ এ যাওয়া যায় এখান থেকে। এক্ষেত্রে দলের স্ট্রাইকের প্লেয়ারটা মাঝ থেকে এবং উইংব্যাক সহ উংগার গুলো থ্রেট ক্রিয়েট করতে পারে। ফলে গোল হওয়ার চান্সটা বেড়ে যায় রাতারাতি। এখন, অবস্থা এমন দেখা গেল যে, টিমটার মিড কন্ট্রোল এর প্রয়োজন সেক্ষেত্রে সেন্টার ফরওয়ার্ড প্লেয়ারটি নিচে নেমে এসে মিডে সাপোর্ট দিতে পারেন। সেক্ষেত্রে উইংগাররা ক্লোজ হয়ে রাইট আর লেফট ফরোয়ার্ডের কাজ করেন। এক্ষেত্রে ফর্মেশনটা ৩-৫-২ এর কাজ করে। এছাড়াও ফর্মেশনটা ডায়মন্ডও বানানো যায়, যখন মাঝের দুই সেন্ট্রাল মিডের একজন হয়ে যায় ডিফেন্সিভ মিড, আরেকজন এটাকিং মিড। তাহলে, এটাকিং এর সময় যেকোনো ফর্মেশনই বানানো সম্ভব।

এবার আসি ডিফেন্স এর কথায়। আগেই বলেছি ৩ জনকে আলাদা করে নিরাপত্তা দেওয়ার প্রয়োজন হয়। তাই ডিফেন্সের সময়ে দুই উইংব্যাক নিচে নেমে এসে ডিফেন্স লাইনকে অতিরিক্ত শক্ত করার কাজ করে এ ক্ষেত্রে ফর্মেশনটা ৫-২-৩ এর কাজ করে। কিংবা একটা কুইক কাউন্টার এট্যাকের প্রয়োজন পড়ার কারনে সেন্টার ফরওয়ার্ড টা হালকা নিচে নেমে আসে ও দুই উইংগার লেফট ও রাইট স্ট্রাইক পজিশনে চলে যায় যেটা আরকি ৫-২-১-২ বা ৫-৩-২ এর কাজ করে। কিংবা এক্সট্রা ডিফেন্সিভ সাপোর্টের জন্য ৫-৪-১ ও হয় এই ফর্মেশন দ্বারা। এখন এ ফর্মেশনটা ফোর ম্যান ডিফেন্সে পরিনত হতে গেলে ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কে একটু বেশি ডেফেন্সিভ মাইন্ডেড হতে হয় যিনি মোটামুটি ডিফেন্ড করতে পারেন ( টটেনহাম এর এরিক ডায়ার,বার্সেলনার সার্জিও বুস্কেটস )। সেক্ষেত্রে দুই উইংব্যাক রাইট আর লেফট মিড প্লে করেন আর ৩ জন ডিফেন্সের পাশের দুইজন যথাক্রমে রাইট ও লেফট ব্যাকের রোল প্লে করেন। মূলত সব ফর্মেশন এ এই ফর্মেশনটা পরিনত হতে পারে।

তাই মূলত ঠিক কে কোন পজিশনে আছে কিংবা তাদের মতিগতি বুঝা অপোনেন্ট এর জন্য কঠিনই হয়ে দাড়ায় বটে। এজন্যই বর্তমানের এই "থ্রি ম্যান ডিফেন্স" এর কদর বাড়ছে। প্রিমিয়ার লীগে গত সিজনে বেশ অনেক টিমকেই এসব ফর্মেশনে খেলতে দেখা যাচ্ছে, লুইস এনরিকের বার্সাকেও দেখা গিয়েছে এই ফর্মেশনে, ইতালিতে জুভেন্টাস এই ফর্মেশনে দীর্ঘদিন ধরে খেলছে এবং অতীতে একসময় কিছু ম্যাচে বায়ার্ন কেও এই ফর্মেশনে দেখা গিয়েছে।

 মূলত সত্তর দশকে কিংবা আশির দশকেও পুরো ইউরোপ জুড়ে এই "থ্রি ম্যান ডিফেন্স " এর প্রচুর কদর ছিলো। এখন বিভিন্ন কোচের নতুন ট্যাকটিক্স এবং প্লেয়ার পটেনশিয়ালের উপর ভিত্তি করে এইসব ফর্মেশন পেয়েছে নতুন মাত্রা। এই ফর্মেশনে খেলাটা যেমন রিস্কি তেমনি ইফেক্টিভ। দলের ডিফেন্ডার দের ডিফেন্সিভ স্টাইল ঠিক থাকা, টিম ক্যামিস্ট্রি ঠিক থাকা, সঠিক মুহূর্তে উইংব্যাকদের ওভারল্যাপিং কিংবা কাট ইন করা, সঠিক পজিশনিং সহ আরও অনেক বিষয়ের উপরে নজর রাখা ছাড়া এই "থ্রি ম্যান ডিফেন্স" খেলানোর প্রধান উদ্দেশ্যটাই অকেজো হয়ে পড়ে। তবে দর্শকদের চমৎকার খেলা উপহার দিতে এবং গোল করতে ফর্মেশনটা বর্তমানে বেশ ব্যবহৃত হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে এর কদর বাড়বে বলে আমরা আশা করতেই পারি।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন