একনায়কতন্ত্র এবং ফুটবলঃ হিটলার এবং নাৎসিবাদ

একনায়কতন্ত্র এবং ফুটবলঃ হিটলার এবং নাৎসিবাদ

7 অগাস্ট, ১৯৩৬ সালের ঘটনা। বার্লিন অলিম্পিক, ১৯৩৬ এ মুখোমুখি জার্মানি আর নরওয়ে। নরওয়ের বিপক্ষে গত ৮ ম্যাচে জার্মানি ছিল অপরাজিত। ম্যাচটি নিয়ে উত্তেজনার তবুও শেষ নেই, কারণ স্বয়ং নাৎসি সম্রাট এডলফ হিটলার গ্যালারিতে বসে থাকছেন, তার দেখা প্রথম ফুটবল ম্যাচ হতে যাচ্ছে এটা। পুরো স্টেডিয়াম নাৎসি লগো আর সাজসজ্জাতে ঢাকা, নাৎসিবাদের শ্রেষ্ঠত প্রমাণের জন্যই হিটলারের এই আয়োজন।

জার্মানিতে নাৎসি শাসন ব্যবস্থা তথা হিটলার আসেন ১৯৩৪ সালে। এরপর জাতিকে দুভাগে ভাগ করেন, আর্য(aryan) আর অনার্য। এর মাঝে পিউর জার্মানদের বলা হত আর্য, আর জিপসি (মিশর বা প্রাচীণ ভারত থেকে আগত কিছু জনগন) কিংবা আংশিক ইহুদী বা জন্মসুত্রে পুরো ইহুদী যারা, এদের বলা হত অনার্য।
এদের মাঝে খেলাধুলা থেকে রাজনীতি সব খানে আর্যতে উপরে তোলার জন্য বেশি বেশি ট্রেনিং, সুযোগ সুবিধা দেওয়া হতে থাকে। অন্যদিকে অনার্যরা হতে থাকে বঞ্চিত। এই প্রক্রিয়ার মূল উদ্দেশ্য ছিল, জার্মান শাসনব্যবস্থা থেকে অন্য জাতিকে তুলে দেওয়া।

ফুটবলে মুসোলিনির প্রভাব তখন পুরোদমে চলছিল। (ফুটবলে ফ্যাসিবাদ এবং মুসোলিনি অধ্যায় নিয়ে পড়তে ক্লিক করুন। এটা দেখে নাৎসি প্রোপাগান্ডার জনক হিটলার অনুপ্রাণিত হন, "কিভাবে নাৎসিবাদ পুরো বিশ্বে ছড়িয়ে দেওয়া যায়?"
কিন্তু কপাল খারাপ ছিল হিটলারের, ইতালিয়ান ফুটবলের মত এত সমৃদ্ধ ছিল না জার্মান দলটি। কিন্তু হিটলার তো ছেড়ে দেবার পাত্র নয়, যা চাইবেন, তাই ছিনিয়ে নেওয়া স্বভাব তার। খুঁজতে শুরু করলেন বিকল্প রাস্তা।

হিটলার প্ল্যান বের করলেন, একদম গোড়া থেকে জার্মান ফুটবলে নাৎসিবাদ ঢুকিয়ে দেওয়ার। এজন্য জার্মানির ফুটবলের ডিরেক্টর বানিয়ে দিলেন লিন্নেম্যানকে। তাকে ব্যবহার করে সমস্ত চার্চ চালিত ক্লাব আর শ্রমিক শ্রেনীর ক্লাব গুলোকে বাতিলের খাতায় তুলে দেন। সব ক্লাবের জার্সি হয় নাৎসি শাসন ব্যবস্থার আদলে।
১৯৩৫ সালে ইংল্যান্ডে খেলতে যায় নাৎসি ফুটবল দল। সে ম্যাচে ৩-০ গোলে হেরে যায় জার্মানি, কিন্তু হিটলার যা চেয়েছিলেন, তাই পেয়েছিলেন। বৃটিশ মিডিয়ায় প্রচার করা হয় জার্মানির জয় গান, তারা যে ভদ্রলোকের খেলা ফুটবলকে গ্রহণ করেছে সে জন্য সাধুবাদ জানায়। এর উপর খেলায় একটা বিতর্কিত অফসাইড গোল হয়। কিন্তু জার্মানির সাপোর্টারস আর খেলোয়াড় কেউই তার প্রতিবাদ করেনাই সে ম্যাচে। যা দেখে মুগ্ধ হয় বৃটিশরা।
যার জন্য বলা হয়ে থাকে, জার্মান ফুটবলাররা হেরে গেলেও, হিটলারের প্রোপাগান্ডা ঠিকই জিতে যায়, দর্শকদের স্যালুট পেয়ে।

এরপর আসে ১৯৩৬ অলিম্পিক। প্রথম ম্যাচে হিটলারের চোখের সামনে সব দিক দিয়ে দূর্বল নরওয়ের কাছে হেরে যায় জার্মানরা। অত্যাধিক ক্রোধ নিয়ে গ্যালারি ছেড়ে যায় নাকি হিটলার বলা হয়ে থাকে। সে অলিম্পিকে জার্মানির ব্যর্থতা যেমন ছিল, তেমনই তাদেরই অধীনে থাকা অস্ট্রিয়া ছিল সেরা দল গুলোর কাতারে। তাদের দলে ছিল মাথিয়াস সিন্ডেলার, যাকে অস্ট্রিয়ার সর্বকালের সেরা প্লেয়ার ধরা হয়।
১৯৩৮ এর দিকে, অস্ট্রিয়াকে জার্মানিতে খেলতে ডাকে নাৎসিরা। ইতালি যেমন ল্যাতিন প্লেয়ারদের নিয়ে দল বেঁধেছিল, ঠিক সেভাবেই অস্ট্রিয়ান প্লেয়ারদের নিয়ে দল ভারী করার চেষ্টা চালান হিটলার, ম্যাথিয়াস সিন্ডেলারকে দলে ভিড়াতে চান। যদিও সিন্ডেলার, জানিয়ে দেন, তিনি খেলবেন একমাত্র অস্ট্রিয়ার হয়েই। নানান,হুমকি ধুমকির পরও ম্যাচে অস্ট্রিয়া জিতে যায়, আর অধিনায়ক সিন্ডেলার করের জয়সূচক দুইটি গোল। হিটলারের ইগো তে বিষয়টি মারাত্বক ভাবে আঘাত করে। 
পরের খবরটি অনেক দুঃখের, ৩৬ বছর বয়সে মারা যান সিন্ডেলার কিছুদিনের মাঝেই। ধারণা করা হয়, নাৎসি বাহিনী তাকে কার্বন মনোক্সাইড দিয়ে মেরে ফেলেছে। যদিও নথিতে তার মৃত্যু নিয়ে লিখা আছে দূর্ঘটনা। এছাড়াও বলা হয় সেখানে, সিন্ডেলার একজন ইহুদীপ্রেমী এবং গণতন্ত্র কামনাকারী। আবার অনেকে বলে থাকেন, অস্ট্রিয়ার হয়ে খেলতে বাধা দেওয়ায় আত্মহত্যা করেন সিন্ডেলার।

অগাস্ট ৯,১৯৪২, ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম কুখ্যাত তথা নিকৃষ্টতম ঘটনার সূত্রপাত হয় নাৎসিদের হাতে। ইউক্রেনের দল FC Start, যারা প্রায় সব সমসাময়িক দলকে উড়িয়ে দিয়ে আসছিল, তাদের সাথে জার্মানির সেনা এবং আর্য গোত্রদের নিয়ে গড়া দল খেলার আহবান জানায়। এই দলের নাম ছিল, Flakelf। আর এই ম্যাচকে পরবর্তিতে নাম দেওয়া হয় "ডেথ ম্যাচ" হিসেবে। দুই দলের মাঝে প্রথম ম্যাচটি হয় এই ডেথ ম্যাচের তিন দিন আগে। যেখানে ৫-১ গোলে জয় পায় FC Start. সোভিয়েতের স্থানীয় মানুষদের নিয়ে বানানো একটা দল এভাবে নাৎসি সৈন্য এবং পার্ফেক্ট জার্মানদের নিয়ে গড়া দলকে মাটিতে মিশিয়ে দিল, এটা হিটলার আর নাৎসিদের জন্য ছিল চরম অপমানের। ফলে নাৎসিরা একটি রিপ্লে ম্যাচ খেলার আহবান জানায় FC Start কে। 
রিপ্লে ম্যাচের আগ মুহুর্তে এক নাৎসি প্যারামিলিটারি অফিসার FC Start এর ড্রেসিং রুমে প্রবেশ করে। জানিয়ে দেয় দলটির মেম্বারদের, যে তাদের প্রতিপক্ষ দলের পৃষ্ঠপোষক স্বয়ং হিটলার, এবং সেই দলকে যাতে সন্মানের সাথে তারা দেখে এবং ম্যাচটি হেরে যায়। সেই সাথে আরো যোগ করা হয়, নাৎসি স্যালুট দিতে হবে "Hail Hitler" বলে জার্মানির জাতীয় সঙ্গীত শুরু হবা মাত্রই। উল্লেখ্য যে, ওই প্যারা মিলিটারি অফিসারটিই ছিলেন ওই ম্যাচের রেফারি। 


যথারীতি ম্যাচটি মাঠে গড়ালো, এবং FC Start এর প্লেয়াররা জাতীয় সঙ্গীতের সময় বুকে হাত রেখে বলে ওঠেন, “Fizcult Hura!” যার অর্থ “Fitness, culture, hoorah.” এটি ছিল সোভিয়েতের স্পোর্টিং স্যালুট।
যদিও ম্যাচ শুরুর পর FC Start ৩-১ এ পিছিয়ে ছিল হাফ টাইম অব্দি। কিন্তু হাফ টাইমের সময়, আরেক নাৎসি অফিসার তাদের ড্রেসিং রুমে প্রবেশ করে, আর ম্যাচটি হেরে যেতে বলে সরাসরি। এতেই যেন দেশপ্রেম জেগে ওঠে কিয়েভের দলটির। গুনে গুনে চার গোল করে ৫-৩ এ জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে FC Start.
FC Start এর এই দুঃসাহস এর পরিণতি ছিল ভয়াবহ। ম্যাচের কদিনের মাথায় নাৎসি পুলিশরা(gestapo) ধরে নিয়ে যায় দলটির পাঁচ ছ জন প্লেয়ারকে। তারা আর কখনো ফেরেন নাই। আবার দলটির স্ট্রাইকার Nikolai Korotkykh কে টর্চার করতে করতে মেরে ফেলে নাৎসি বাহিনী। বাকি কিছু মেম্বারকে আমরণ অত্যাচারের জন্য পাঠিয়ে দেওয়া হয় আরেক ডেথ ক্যাম্পে।

শুধু আন্তর্জাতিক ফুটবল নয়, ক্লাব ফুটবলকেও প্রভাবিত করেছিল নাৎসিরা। ধারণা করা হয়, হিটলার নিজে ছিলেন শালকে সাপোর্টার। যদিও শালকে পরবর্তিতে বার বার এটা অস্বীকার করেছে। কিন্তু হিটলারের রাজত্ব চলা কালে ১০ বছরের মাঝে ৭ বার লীগ শিরোপা জেতে শালকে। অবশ্য এর একটি কারণ হতে পারে শালকের ওই দলের বেশিরভাগ প্লেয়ার একসাথে খেলে আসছিল অনেকদিন ধরে, যারা কিনা ছিল স্থানীয় শ্রমিক।
ওই সময়ের নুরেনবার্গ দলকে বলা হত Der club, হিটলারের প্রতি প্রকাশ্য সমর্থন দিয়েছিল ক্লাবটি। অন্যদিকে বায়ার্ন মিউনিখ তখন মাত্র বড় শক্তিতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু তাদের বেশিরভাগ সাপোর্টার ইহুদি, এমনকি প্রেসিডেন্টও। যার ফলে ভালো ভুগতে হয় ক্লাবটিকে। একদিকে শালকে আর নুরেনবার্গ রাজত্ব চালাচ্ছে, অন্যদিকে তারা লীগ পেয়েছে ১৯৩২ সালে একবার। এর পরও, বায়ার্ন মিউনিখ ক্লাবটি তাদের ইহুদি সমর্থকদের মাথার উপর ছায়া হয়ে দাঁড়ায়, সরকার কে যতখানি সম্ভব আটকিয়ে হলেও তাদের ফ্যানবেস রক্ষা করবে জানিয়ে দেয়। এসবের জন্যই কিনা, নাৎসিরা ১৮৬০ মিউনিখকে বেশি সাহায্য করেছিল, যাতে তারা নগর প্রতিদ্বন্দ্বীদের চেয়ে বেশি সাফল্য পায়।


এ ছিল ফুটবলে নাৎসিবাদের প্রভাব নিয়ে লিখা, এ বিষয়ে পরবর্তি লিখা থাকছে ফ্রাঙ্কো এবং স্পেনের একনায়কতন্ত্র নিয়ে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন