ট্রান্সফারের খুঁটিনাটি

ট্রান্সফারের খুঁটিনাটি

ট্রান্সফার মৌসুম চলছে এখন। একটা ফুটবল ক্লাব থেকে অন্য ফুটবল ক্লাবে একটা প্লেয়ারের ট্রান্সফার কিভাবে হয় এই জিনিষটা জানতে আমরা অনেকেই আগ্রহী। এই ট্রান্সফার বিষয়টা অনেক জটিল। একটা প্লেয়ারের ট্রান্সফারের সাথে প্লেয়ার নিজে, দুইটা ক্লাব, তাদের এজেন্ট সহ অনেক কিছু জড়িত। সাথে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের হিসাব নিকাশ ও বিভিন্ন রকমের ট্রান্সফার সিস্টেম। ট্রান্সফার নিয়ে কিছু প্রাথমিক ধারনা ও একটা ট্রান্সফারের ভিতর কি কি থাকে সেগুলো দেখে আসা যাক।

গত ২০-২৫ বছর ধরে ফুটবলের ট্রান্সফার সিস্টেমটা পুরোপুরিভাবে বদলে গেছে বলতে গেলে। আর এই বদলে যাওয়ার একটা বড় কারন হলো এজেন্টদের বিশাল ভূমিকা। আগে একটা ক্লাব যদি অন্য একটা ক্লাব থেকে কোন প্লেয়ার সাইন করাতে চাইতো সেক্ষেত্রে সবার প্রথমে তারা ওই ক্লাবের সাথে যোগাযোগ করতো। একটা নির্দিষ্ট ট্রান্সফার ফি দুটি ক্লাবের মাঝে ঠিক হওয়ার পর প্লেয়ারের সাথে পার্সোনাল টার্ম তারপর এগ্রি হইলে ট্রান্সফারের কাজ শুরু হতো। এবং তারপর মেডিকেল করার পরে ক্লাব দুটোর মাঝে ফাইনাল কন্ট্রাক্ট সাইন হতো। ক্লাব গুলো তারপর ট্রান্সফার নিউজটা দিবে এবং তারা চাইলে ট্রান্সফার ফি বলতে পারবে অথবা নাও বলতে পারে। এইটা নির্ভর করে তাদের এগ্রিমেন্ট এর উপরে। এখনকার সময়ে ট্রান্সফারের প্রথমেই যে ক্লাব প্লেয়ার কিনতে চায় তারা একজন এজেন্ট নিয়োগ করে এবং ওই এজেন্ট প্লেয়ারের এজেন্টের সাথে প্রথমে যোগাযোগ করে। প্লেয়ার যদি রাজি থাকে তাহলে তার এজেন্ট জানিয়ে দিবে যে এই প্লেয়ারকে পেতে হলে কি করতে হবে। নরমালী এখনকার সময়ে ক্লাবগুলো সবার শেষে জানে যে তাদের প্লেয়ারের জন্যে একটা বিড আসছে। একটা প্লেয়ারকে সাইন করাতে হবে ট্রান্সফার উইন্ডো ওপেন হওয়ার পর থেকে। বেশীরভাগ ইউরোপিয়ান লীগের ক্ষেত্রে ট্রান্সফার উইন্ডো ওপেন থাকে ১ম জুলাই থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত। এবং শীতকালীন উইন্ডো ওপেন থাকে পহেলা জানুয়ারি থেকে ৩১শে জানুয়ারি পর্যন্ত।

কেন এজেন্ট প্রয়োজন এবং তার ভূমিকা কি হয়? 

একটা ট্রান্সফারে এজেন্ট অনেক বড় ভূমিকা পালন করে থাকে। ধরা যাক, আপনি একজন ফুটবল প্লেয়ার এবং আপনি অনেক ভালো খেলছেন নিয়মিতভাবে। ভালো খেলার ফলে আপনি ভালো দলের এটেনশন পাবেন। কিন্তু আপনি যদি একটা দলের বদলে অনেকগুলো দলের এটেনশন পান ও তারা আপনাকে অফার করে থাকে তখন কি করবেন। সেক্ষেত্রে আপনার প্রয়োজন একজন এজেন্ট। যে কিনা আপনার হয়ে কথা বলবে এবং আপনি আপনার খেলাটা চালিয়ে যেতে পারবেন। আপনি যদি ভালো প্লেয়ার হয়ে থাকেন সেক্ষত্রে শুধু দলগুলো না, অনেক মার্কেটিং কোম্পানিও আপনার প্রতি আগ্রহ দেখাবে। এই মার্কেটিং কোম্পানির সাথে কন্ট্রাক্ট এর ব্যাপারে আলোচনা করা ও আপনার জন্যে সর্ব্বোচ্চ সুবিধা এনে দেওয়াই হলো আপনার এজেন্টের কাজ। এজন্টের এই কাজ গুলো করার ফলে আপনার খেলায় কোন প্রভাব পড়বে না সাথে আপনার কাজও হয়ে যাবে। এবং এইসব কাজের জন্যে আপনি আপনার এজেন্টকে পে করতে হবে।

ট্রান্সফারের ব্যপারটা কি? এবং একটা ট্রান্সফারের মাঝে কি কি জিনিশ থেকে থাকে? 

একটা প্লেয়ারকে যদি অন্য একটি ক্লাব তাদের ক্লাবে নিতে চায় সেক্ষত্রে তারা সবার প্রথমে ওই প্লেয়ারের এজেন্ট ও ওই ক্লাবের সাথে যোগযোগ করে। তাদের এই ইচ্ছার কথা উক্ত প্লেয়ারকে জানালে সে যদি রাজি না থাকে সেক্ষত্রে জানিয়ে দেওয়া হয় প্লেয়ার রাজি না। কিন্তু যদি প্লেয়ার রাজি থাকে তাহলেই শুরু হয় ক্লাব ও প্লেয়ারের এজেন্টের মাঝে আলোচনা। সবার প্রথমেই আলোচনা হয় ট্রান্সফার ফি নিয়ে। সাথে প্লেয়ারের এজেন্ট প্লেয়ারের বেসিক বেতন, পারফর্মেন্স বোনাস, রিলিজ ক্লস, ম্যাচ প্লেয়িং বোনাস, ইমেজ রাইটস সহ আরো অনেক কিছু নিয়ে আলোচনা করে ও সর্ব্বোচ্চ আদায়ের চেষ্টা চালায়। একটা ট্রান্সফারের মাঝে প্লেয়ারের বেসিক বেতন কিংবা পারফর্মেন্স বোনাসের সাথেও আরো দুইটি গুরুত্বপূর্ণ জিনিশ হলো রিলিজ ক্লজ ও ইমেজ রাইটস।

রিলিজ ক্লজ

 কন্ট্রাক্টের ব্যাপারে আলোচনা চলাকালে হয় ক্লাব অথবা প্লেয়ার তাদের এগ্রিমেন্টে এই রিলিজ ক্লজ বিষয়টা চেয়ে থাকে। এবং তারা একটা ফিক্সড এমাউন্টের রিলিজ ক্লজ এগ্রিমেন্টে বসিয়ে থাকে (বছরে বছরে এই টাকার পরিমাণ পরিবর্তন হতে পারে)। এই রিলিজ ক্লজের প্রধান কারন হলো, যদি কোন প্লেয়ারকে অন্য একটি ক্লাব চায় এবং প্লেয়ারও যদি রাজি থাকে কিন্তু বর্তমান ক্লাবটি যদি ওই প্লেয়ারকে ছাড়তে রাজি না হয় তখন চাইলে উক্ত প্লেয়ার তার নিজের ক্লজ এক্টিভেট করতে পারবেন রিলিজ ক্লজের পুরো টাকা আদায়ের মাধ্যমে সাথে তখন তিনি একজন ফ্রি এজেন্ট হয়ে যাবেন। অথবা চাইলে যেই ক্লাবটি তাকে নিতে চাচ্ছে তারাও রিলিজ ক্লজের টাকা আদায় করতে পারবে। তারপর যদি ক্লাবটি প্লেয়ার ছাড়তে রাজি না হয় সেক্ষেত্রে চাইলে অন্য ক্লাব যারা প্লেয়ার পেতে চায় তারা লিগাল একশনে যেতে পারে কোর্টের মাধ্যমে।

ইমেজ রাইটস

 প্লেয়ার ট্রান্সফারের সময়কার একটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিষ হলো এই ইমেজ রাইটস। আপনি সময়ের সেরা প্লেয়ারদের আপনার দলে ভিড়াতে চান তাহলে একটা জিনিষ মাথায় থাকতে হবে তারা শুধু ভালো প্লেয়ারই না সাথে সবচেয়ে মার্কেট ভ্যালুয়েবল এথলেট। তারা আপনাকে এনে দিবে অনেক ভালো ভালো স্পন্সর এবং সেই সাথে আপনার টি-শার্ট থেকে শুরু করে অনেক মার্চেনডাইস আইটেমের সেইল বাড়িয়ে দিবে। আপনি তাদের আবার বিভিন্নভাবে ব্যবহার করবেন। যেমন, আপনার সাইটে কিংবা বিভিন্ন এপ্লিকেশন অথবা ভিডিওতে। আবার আপনার দলের কীট রিলিজের সময় তাদের চেহারা আপনি সামনে ইউজ করবেন। এই সবকিছুই আপনার প্রফিট অনেক বাড়িয়ে দিবে এবং এই টোটাল জিনিশটাই হলো ইমেজ রাইটস। একজন প্লেয়ার কন্ট্রাক্ট সাইনের সময় স্পষ্টভাবে লিখা থাকে আপনি একজন প্লেয়ারের ঠিক কত পার্সেন্ট ইমেজ রাইটস ইউজ করতে পারবেন। কখনো কখনো সেটা ১০০ ভাগ হয় আবার কখনো ০ ভাগও হয়। তবে একটা দল চায় প্লেয়ারের ম্যাক্সিমাম ইমেজ রাইটস ইউজ করতে। ঠিক এই জায়গাতে অনেক সময় অনেক সাইনিং এ প্রব্লেম দেখা দেয়। যেমন ধরুন, ব্যাকহামের রিয়াল মাদ্রিদ ক্লাব থেকে লা-গ্যালাক্সিতে যাওয়ার পিছনে এই ইমেজ রাইটসের একটা প্রব্লেম রয়েছে বলে জানা যায়। একজন প্লেয়ারের ট্রান্সফারের মাঝে আরো অনেক ধরনের টার্ম রয়েছে। তার মধ্যে কয়েকটার কথা তুলে ধরা হলো। বাই ব্যাক ক্লজ- বড় ক্লাব কোন প্লেয়ারকে সেইল করার সময় তার কন্ট্রাক্টে একটা বাই ব্যাক ক্লজ রেখে দেয়। অর্থাৎ, পরে যদি ওই প্লেয়ারের পারফর্মেন্স যেই ক্লাবে সেইল করা হলো সেখানে গিয়ে অনেক ভালো হয় তাহলে তার বাই ব্যাক ক্লজের ওই ফি দিয়ে যেটা কিনা প্লেয়ার সেইলের সময় এগ্রিমেন্টে উল্লেখ ছিলো ওটা দিয়ে প্লেয়ারকে আবার নিয়ে আসে। এই ফি অবশ্য প্রত্যেক বছরে বছরে রিলেটিভলি বাড়তে থাকে।

লোন ডিল

লোন ডিল হচ্ছে এমন একটা ডিল যেখানে একটা ক্লাব তার প্লেয়ারকে অন্য একটা ক্লাবে লোনে পাঠিয়ে দেয়। এবং এইটার পিছনে বেশীরভাগ ক্ষেত্রে ক্লাবের ইয়াং প্লেয়ারদের পাঠানো হয় যাতে তারা অন্য দলে গিয়ে এনাফ গেইম টাইম পেয়ে খেলতে পারে। নরমালি লোন ডিলগুলোতে প্লেয়ার কয়েক সপ্তাহ থেকে শুরু করে পুরো সিজন ব্যাপী অথবা কয়েক সিজনের জন্যেও অন্য দলে খেলতে যায়। লোন ডিল গুলোতে ফি শুণ্য থেকে শুরু করে দুই ডিজিটের মিলিয়ন পাউন্ডের মাঝে থাকে। এবং প্লেয়ারের বেতন হয় যেই দল তাকে লোনে নিয়েছে তারা দেয় আবার ওউনার দলও অনেক সময় দিয়ে থাকে। কখনো কখনো দুই ক্লাব মিলে প্লেয়ারের বেতন দিয়ে থাকে। অনেক লোন ডিলে একটা ক্লজ তাকে যেটা হলো তুমি চাইলে এই প্লেয়ারকে পরে কিনে নিতে পারবে তার নির্দিষ্ট ফি দিয়ে। যেমন, রিয়েল মাদ্রিদের হামেস রদ্রিগেজকে দুই বছরের লোন ডিলে বায়ার্ন মিউনিখে পাঠানো হয়েছে সম্প্রতি কিন্তু সেখানে রয়েছে যে বায়ার্ন চাইলে পরে হামেসকে কিনে নিতে পারবে। আবার, ২০০৯ সালের ইব্রাহিমোভিচের এসি মিলানের সাথে লোন ডিলটায়ও এইরকম ঘটতে দেখা যায়। লোন ডিলে আবার অনেক সময় এইরকম থাকে যে প্লেয়ার তার প্যারেন্ট দলের বিপক্ষে খেলতে পারবে না, যদি খেলতে হয় তাহলে একটা নির্দিষ্ট ফি যা কিনা কন্ট্রাক্ট এ ছিলো তা দিয়ে খেলতে হবে। কো-ওয়নারশীপ ডিল- এইরকমের ডিলে একজন প্লেয়ারের দুটি ক্লাব ওউনার থাকে কিন্তু প্লেয়ার যে কোন একটি ক্লাবের হয়ে খেলতে পারবে। এই ডিলটা সবদেশের লীগে থাকে না। ইতালি, চিলি, উরুগুয়ে এবং আর্জেন্টিনাতে এই সিস্টেম রয়েছে।

প্রফিট অন সেইলিং

অনেক সময় ক্লাব তার প্লেয়ারকে সেইল করার সময় একটা টার্ম জুড়ে দেয় যে যেই ক্লাব প্লেয়ারটিকে কিনছে সে যদি পরে ওই প্লেয়ারকে অন্য কোন ক্লাবে সেইল করে তাহলে একটা নির্দিষ্ট ট্রান্সফার ফি তাদের দিতে হবে। এইটাই হচ্ছে প্রফিট অন সেইলিং। ফ্রি এজেন্ট - যে প্লেয়ার কোন ক্লাবের কন্ট্রাক্ট এর মাঝে আর নেই তাকে ফ্রি এজেন্ট বলা হয়। যে কোন ক্লাব তাকে সাইন করাতে পারবে কোন ফি ছাড়াই যদি না প্লেয়ারের এজেন্ট কোন কিছু দাবি করে। নরমালি প্লেয়ার ফ্রি এজেন্ট হয় তখন যখন তার আগের ক্লাব তাকে ছেড়ে দেয় মিউচুয়াল এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে তার কন্ট্রাক্ট শেষ হওয়ার আগে অথবা প্লেয়ারের কন্ট্রাক্ট যদি শেষ হওয়ার পর আর রিনিউ না করা হয়। ফ্রি এজেন্টদের ট্রান্সফার উইন্ডোতে সাইন করাতে হবে এমন কোন নিয়ম নেই কিছু দেশের লীগ ছাড়া। তাদের যে কোন সময় সাইন করানো যায়।

ফুটবলে ট্রান্সফার সিস্টেম অনেক বিশাল ও জটিল একটা বিষয়। এখানে অনেক ধরনের নিয়ম কানুন ও বিধি নিষেধ রয়েছে। কখনো কখনো প্লেয়ার ও ক্লাবের মাঝে মিল না হওয়াতে যেমন ট্রান্সফার সম্পন্ন হয় না আবার কখনো কখনো এজেন্টদের ভুলেও ট্রান্সফার হয় না। ফুটবল ট্রান্সফারের কিছু দিক তুলে ধরা হয়েছে এই লেখায়। আশা করি ভালো লাগবে সবার।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন