মিনো রায়োলাঃ দা গডফাদার অফ ট্রান্সফার

মিনো রায়োলাঃ দা গডফাদার অফ ট্রান্সফার

কর্মজীবন শুরু করেছিলেন পারিবারিক পিজার দোকানে ওয়েটার হিসাবে। কিন্তু আজ ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত, বিতর্কিত ও প্রভাবশালী ব্যাক্তিদের একজন। তার অধীনে রয়েছে ফুটবল বিশ্বের নাম করা সব তারকারা। স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কিভাবে পিজা দোকানের সেই মিনো রায়োলা হয়ে উঠলেন ফুটবল ট্রান্সফারের গডফাদার?

 

রায়োলা জন্মগতভাবে ইতালিয়ান। ১৯৬৭ সালে ইতালির নচেরা ইনফেরিওরে শহরে তার জন্ম। কিন্তু জন্মের ১ বছর পরেই তার পরিবার ইতালি থেকে নেদারল্যান্ডে চলে যায়। গড়ে ওঠা সেই নেদারল্যান্ডেই। সেখানে পারিবারিক এক ইতালিয়ান রেস্তোরা খোলেন তার বাবা। ছোট বেলা থেকেই সেখানে কাজ করতেন রায়োলা। লেনদেনের হাতে খড়িও হয় এখানেই। শুধু লেনদেন নয়, কাস্টমারদের হ্যান্ডেল করার ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন বেশ দক্ষ। তাই কিশোর বয়সেই পারিবারিক ব্যাবসার দায়িত্ব দেওয়া হয় তার হাতে। এবং এতে নিরাশ করেননি মোটেও। লোন নিয়ে তিনি ব্যাবসা সম্প্রসারিত করতে থাকেন। এবং মাত্র ১৯ বছর বয়সেই হয়ে ওঠেন একজন মিলিওনেয়ার!!!

 

ব্যাবসায় দক্ষ হলেও এর পাশাপাশি পড়তেন তিনি ওকালতি। কিন্তু তার প্যাশন ছিল কেবলই ফুটবল। তাই ভারসিটি ছেড়ে দেন তিনি। ফুটবলেই ক্যারিয়ার গড়তে মনস্থির করেন। বাল্যাকালে স্থানীয় ক্লাব ইজ এফ সি হারলেমের ইয়ুথ টিমের হয়ে খেলেছেন। কিন্তু প্লেয়ার হিসাবে শৃঙ্গে পৌছাতে পারবেননা আগেই বুঝতে পেরেছিলেন। তাই মাত্র ১৮ বছর বয়সেই সেই ক্লাবের ইয়ুথ টিমের হেড হিসাবে যোগ দেন। নতুন রোলে তার কর্মনিষ্ঠা ও দক্ষতায় সকলকে মুগ্ধ করে তোলেন। একবার ডিনারে ক্লাবের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি বলে বসেন " ফুটবল নিয়ে আপনার কোনই ধারণা নেই।'' প্রেসিডেন্ট তাকে উত্তর দেন - " ঠিক আছে, তাহলে আমার দায়িত্বটা এখন থেকে তুমি সামলাবে।" আর এভাবেই অল্প সময়ের মধ্যেই রায়োলা হয়ে ওঠেন ক্লাবটির স্পোর্টিং ডিরেক্টর যা কিনা একটা ফুটবল ক্লাবের শীর্ষস্থানীয় পদগুলোর একটি।

 

হারলেমকে নিয়ে রায়োলার বেশ উচ্চভিলাসি পরিকল্পনা ছিল যা ক্লাবের পক্ষে পূরণ করা সম্ভব ছিলনা। ক্লাবের ডিরেকশন নিয়ে বোর্ডের সাথে বিবাদে লিপ্ত হয়ে পদত্যাগ করেন রায়োলা। হারলেমের ডিরেক্টর হবার আগেই তিনি ইন্টারমেৎজো নামের একটি ফুটবল এজেন্সি গঠন করেন। এখানেই এজেন্ট হিসাবে তার যাত্রা শুরু হয়। ইন্টারমেৎজো এজেন্সির স্পেশালিটি ছিল ডাচ প্লেয়ারদের ইতালিতে ট্রান্সফারে অন্যান্য এজেন্ট বা এজেন্সিকে সহযোগিতা করা। রায়োলা দ্বিভাষী হওয়ায় দুই পক্ষের ডিসকাশনগুলো তার মাধ্যমেই হত। এসময় তিনি ব্রায়ান রয়, মার্সিয়ানো ফিঙ্ক ও উইম ইয়ংকের মত ইন্টারন্যাশনাল ফুটবলারদের সিরিয়াতে আনতে সহযোগিতা করেন। ব্রায়ান রয়ের ট্রান্সফারে তার ভূমিকা দেখে তৎকালীন সময়ে নেদারল্যান্ডের অন্যতম নামকরা এজেন্ট রব ইয়্যান্সেন তার সাথে যোগাযোগ করেন। ইয়্যান্সেন তার একটি ক্লায়েন্টকে সিরিয়ায় আনতে রায়োলার সাহায্য চান। প্লেয়ারটির নাম? ডেনিস বার্গক্যাম্প।

 

রায়োলার সহযোগিতায় ১৯৯৩ সালে আয়্যাক্স থেকে ইন্টার মিলানে আসেন বার্গক্যাম্প। রব ইয়্যান্সেন রায়োলার কাজে মুগ্ধ হয়ে তার এজেন্সি স্পোর্টস প্রোমোশন্সে তাকে এজেন্ট হিসাবে নিয়োগ দেন। কিন্তু অল্প সময় পরেই সেই চাকরি ছেড়ে একা একাই ক্যারিয়ার গড়তে মনোনিবেশ করেন তিনি। সে সময়ে সিরিয়ার অন্যতম সেরা কোচ জিদেনেক জেমানের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলেন। জেমান তাকে বলেন একজন পার্ফেক্ট প্লেয়ার এনে দিতে। আর রায়োলা তাকে এনে দেন চেক প্রজাতন্ত্রের সেরা ট্যালেন্ট এবং ভবিষ্যৎ ব্যালন ডি'অর জয়ী পাভেল নেদভেদকে। নেদভেদই হন রায়োলার প্রথম হাই প্রোফাইল ক্লায়েন্ট।

 

পরবর্তীতে ২০০১ সালে লাৎসিও থেকে জুভেন্তাসে আসেন নেদভেদ। নেদভেন লাৎসিওতে বেশ খুশিই ছিলেন। কিন্তু রায়োলার প্রতি তার ছিল অগাধ আস্থা। রায়োলা তাকে জুভেন্তাসের প্রস্তাবনা দিলে তিনি জুভের সাথে আলোচনায় রাজি হন। যদিও গোপনে দেখা করার কথা, জুভের ডিরেক্ট্র মগি আগে থেকেই মিডিয়ার কাছে এই তথ্য ফাঁস করে দেন। তাই গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়ে যায় রাইভাল ক্লাবের সাথে গোপনে মিটিং এর কথা। জুভে ভেবেছিল এর মাধ্যমে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে অর্থের ব্যাপারটা কমে যাবে। কিন্তু হল তার ঠিক বিপরীত। রায়োলা দাবি করেন জিনেদিন জিদানের সমান বেতন দিতে হবে নেদভেদকে। জুভেন্তাসতো অবাক! মিটিং এর মাঝে নেদভেদ বলে উঠল " মিনো আমি বাড়ি যাচ্ছি। এই নাও আমার সই। তুমি আমার এজেন্ট। তুমি যদি চাও তাহলে ট্রান্সফার হবে, আর না চাইলে নাই। আমাকে পরে জানিয়ে দিয়। " জুভেন্তাসের মিডিয়া স্টান্টের কাছে পরাজিততো হলই না বরং থেকে রায়োলার দাবি না মানলে ট্রান্সফার বাতিল! এতে বরং তাদের নিজ ক্লাবেরই ইমেজ খারাপ হবে। এই ভেবে দাবি মানতে রাজি হল জুভে। আর তক্ষণে রায়োলা তার ডিমান্ড আরও বাড়িয়ে দেন। পরাস্ত হতে বাধ্য হয় স্বয়ং জুভেন্তাসই।

 

২০০১ সালে রায়োলা আরেক ভবিষ্যৎ সুপারস্টারকে তার অধীনে আনেন, আর সে হচ্ছে জলাতান ইব্রাহিমোভিচ। ইব্রাহিমোভিচের সাথে দেখা করার সময় ইব্রার পড়নে ছিল দামি স্যুট, হাতে গোল্ড ওয়াচ। আর রায়োলা যান টি-শার্ট ও জীন্স পড়ে। তাকে দেখে ইব্রা বেশ অবাকই হয়। ইব্রার তাচ্ছিল্ল দেখে রায়োলা বলেন " তুমি কি বিশ্বসেরা হতে চাও নাকি দামি জিনিষ নিয়ে শো-অফ করতে চাও? " তার এই কথায় ইব্রা বেশ বিস্মিত হন আর এভাবেই ইব্রার এজেন্ট হন রায়োলা।

 

 

শুধু নেদভেদ, ইব্রাই নয় রোমেরো, মিখিতারিয়ান,পগবা,বালোতেল্লি, লুকাকু, ভেরাত্তি, মাতুইদি, ডনারুমাকেও একে একে সাইন করিয়েছেন তিনি। তবে তার ক্লায়েন্টদেরকে কখনও ক্লায়েন্টের চোখে দেখেননা রায়োলা। বরং তার কাছে তারা সবাই যেন তার পরিবারেরই এক অংশ। তাই ক্লায়েন্টদের জন্য চেষ্টার কোন শেষ রাখেননা তিনি। রায়োলার সাথে তার ক্লায়েন্টরা এতই ঘনিষ্ঠ যে দৈনন্দিন জীবনের ক্ষুদ্রাতি ক্ষুদ্র বিষয় গুলো নিয়েও রায়োলা তাদের উপদেশ-পরামর্শ দিয়ে থাকেন। পগবাকে নিয়ে দুইবার বিতর্কের মুখাপেক্ষী হন তিনি। ম্যান ইউনাইটেডের একাডেমিতে থাকার সময়ই পগবার সাথে চুক্তি করেন তিনি। কিন্তু ইউনাইটেডের কন্ট্র্যাক্ট মেনে না নেওয়ায় স্যার এলেক্সের সাথে বিবাদ বাধে তার। ইউনাইটেডের কাছে নির্দিষ্ট গেমটাইম ও বেশি বেতনের দাবি করেন। না মানলে পগবাকে ফ্রী-তেই নিয়ে আসেন জুভেন্তাসে। আবার ৪ বছর পর সেই জুভেন্তাস থেকেই বিশ্ব রেকর্ডের বিনিময়ে আবারও ইউনাইটেডে ফিরিয়ে আনেন পগবাকে। মোরিনহো কোচ হবার পর একই গ্রীষ্মে ইব্রা, পগবা ও মিখিতারিয়ানকে ইউনাইটেডে নিয়ে আসেন রায়োলা। এই মৌসুমে এনেছেন লুকাকুকে। চেলসির মূল টার্গেট হলেও শেষ মুহুর্তে এসে লুকাকুর ইউনাইটেডের জার্সি বেছে নেওয়ার পিছে রায়োলার প্রভাব ছিল বেশ। আর একের পর এক হাই প্রোফাইল ট্রান্সফারের মাধ্যেমে পকেটও ভারি করেছেন বেশ। ২০১৬ তে আয় করেছেন ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো থেকেও বেশি। আমেরিকার মায়ামিতে বিখ্যাত গ্যাংস্টার আল কাপোনের বাড়িও কিনে নিয়েছেন সেই টাকায়।

 

বর্তমানে ফুটবল বিশ্বে এজেন্টদের ভূমিকা অতুলনীয়। আর মিনো রায়োলা তার শ্রেষ্ঠ উদাহরণ। ফুটবলাররা আজ চায় সাক্সেস, ট্রফি বা ব্ল্যাঙ্ক চেক। আর তা অর্জনে একজন মিনো রায়োলার থেকে ভাল কেউই হতে পারেনা। বিতর্ক যতই হোক, স্বার্থ হাসিল করতে চেষ্টার কোনই ত্রুটি রাখেননি কোনদিনও। আর তাইতো আজ ফুটবল ট্রান্সফারের সিংহাসনে বসেছেন তিনি। রাজার মতই দাপটের সাথে শাসন করছেন ফুটবল ট্রান্সফার মার্কেট।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন