নেইমার বিতর্ক এবং ঘরের শত্রু বিভীষণ

নেইমার বিতর্ক এবং ঘরের শত্রু বিভীষণ

নেইমার টু পিএসজি নাটক বর্তমানে সম্ভবত সারা পৃথিবীর ফুটবল ফ্যানদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। আলোচনা সমালোচনা চলছেই। কেউ নেইমারের পক্ষে তো কেউ বিপক্ষে। বার্সা ফ্যানদের আবার বহুমুখী বিপদ। একে তো প্রিয় প্লেয়ারকে হারানোর শঙ্কা, তার উপর নেইমারের পক্ষে নাকি বিপক্ষে থাকবে,তা নিয়ে মনস্তাত্ত্বিক টানাপোড়েন। এই নাটক যত আগাচ্ছে,টানাপোড়েন ততই বাড়ছে। কেউ কেউ এখনো ধৈর্য্য ধরে আছেন, তবে বেশিরভাগ ভক্তই আবেগের বশে নেইমারকে নিয়ে অনেক কিছুই বলছেন। এটা ঠিক বাংলাদেশে বার্সেলোনা ফ্যানবেজের বেশিরভাগ ই আর্জেন্টিনা সমর্থক, এই ওপেন সিক্রেটের কারণে নেইমার ইস্যুতে বার্সেলোনা ফ্যানদের সমালোচনা চলছে সমানে। অনেকেরই দাবী নেইমার ব্রাজিলিয়ান বলেই নাকি তার এত সমালোচনা করছে বার্সা ফ্যানরা। কিন্তু এক্ষেত্রে খোদ নেইমারের নিজের ঘর ব্রাজিলের মিডিয়ার হলুদ সাংবাদিকতার ব্যাপারটি আলোচনায় আসছেনা তেমন।

নেইমার ইস্যুতে মূলত বিদ্বেষের বীজ ছড়াচ্ছে কারা? উত্তরটা হলো দুনিয়ার সবচেয়ে ডাইহার্ড ব্রাজিল ফ্যানরা। অর্থাৎ খোদ ব্রাজিলিয়ানরাই। কিভাবে? শুরু থেকে দেখা যাক। নেইমার টু পিএসজি যখন প্রথম শোনা যায়, কেউ সেটাকে পাত্তা দেননি। বার্সা ফ্যানদেরও ব্যাপারটাকে ভীষণ হালকাভাবে নিতে দেখি আমরা। কিন্তু যখন নির্ভরযোগ্য কাতালান সোর্সগুলোও এই সম্পর্কে বলতে শুরু করলো, সবার একটু টনক নড়লো। তাও বার্সা ফ্যানরা ভালোভাবেই বিশ্বাস করছিলো যে নেইমার তাদের ছেড়ে যাবেনা। মূল গণ্ডগোলটা লাগলো কখন? যখন ব্রাজিলিয়ান সোর্সগুলা গণহারে প্রোপাগ্যান্ডা ছড়ানো শুরু করলো। নির্ভরযোগ্য ব্রাজিলিয়ান সোর্স গ্লোবো এস্পোর্তে যখন বললো যে লুকাস লিমা, পাউলিনহো, কৌটিনহোকে বার্সায় না আনায় নেইমার অসন্তুষ্ট, তখন স্বাভাবিকভাবে নেইমারের প্রতি ফ্যানদের বিরূপ মনোভাব দেখা দিলো। কারণ গ্লোবো এবং আরো কিছু ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম ব্যাপারটাকে এমনভাবে দেখাতে লাগলো যেন নেইমার প্রভাব খাটিয়ে ব্রাজিলিয়ান সতীর্থদের বার্সায় ঢুকাতে চাইছে। ব্রাজিলের সেরা নিউজ সোর্সগুলো এসব নিউজ ছড়ানোয় বার্সা ফ্যানদের মধ্যে এর প্রভাব অনেক বেশি পড়ে। এরপর বার্সেলোনা কৌটিনহোর জন্য বিড করলে আবারো সেই ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যম খবর বের করলো যে, বার্সা নেইমারের কথামতো কৌটিনহোকে সাইন করাচ্ছে। এসব নিউজ দেখে সমর্থকদের রাগ করাটাই স্বাভাবিক। আপনি বলতে পারেন মেসি অমুক তমুক খেলোয়াড়কে চায় এসব খবরও তো দেখা যায়। কথা হলো এসব খবর অতীতে যেসব সোর্সে দেখা গিয়েছে, সেগুলার কোনটারই গ্রহণযোগ্যতা ছিলোনা। কিন্তু নেইমারের ক্ষেত্রে এসব নিউজ আসলো এমন সব সোর্স থেকে, যেগুলোকে মানুষ ব্রাজিলিয়ান প্লেয়ারদের খবরের জন্য চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করে।

কিছুদিন আগেও গ্লোবোর জরিপে ৭০% ব্রাজিলিয়ান মত দিয়েছে, যে নেইমারের পিএসজি চলে যাওয়া উচিত। তাই ব্রাজিলিয়ান গণমাধ্যমগুলো যে নেইমারের পিএসজি যাওয়ার গুজবে ঘি ঢালতে যথাসাধ্য চেষ্টা করে যাবে, সেটাই তো স্বাভাবিক! কিন্তু কয়জনই বা ভিতরের এই খবর রাখে? তারা তো এই সোর্সগুলোকে ভীষণ নির্ভরযোগ্য হিসাবেই জানে ও বিশ্বাস করে! এখন প্রশ্ন হলো দুনিয়াব্যাপী বার্সা সমর্থকগোষ্ঠীতে কি নেইমার হেটার নাই? আছে অবশ্যই। কাতালান বেশ কিছু জনপ্রিয় মাধ্যম নেইমার বিষয়ে সবসময়ই উসখুশ করে গেছে। কিছুদিন আগে তারা একটা কথা রটায় যে,বার্সায় থাকাকালীন প্রতি সিজনেই নেইমার তার বোনের জন্মদিনের সময় ইনজুরড ছিলো ও ব্রাজিলে ছিলো। গুরুতর অভিযোগ। কিন্তু এসব খবরকে বার্সা ফ্যানরা কেউ পাত্তাও দেয়নি। বার্সা ফ্যানদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় মুখ সদ্য সাবেক সহকারী কোচ হুয়ান কার্লোস উনজুয়ের সাথে বিরোধ নিয়েও ফ্যানরা নেইমারের পক্ষই নেয়। কাতালান কিছু মাধ্যম এটা নিয়ে ঝামেলা করতে চাইলেও কেউ পাত্তা দেয়নি। এমনকি ইয়োহান ক্রুইফ যখন নেইমারের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন,তখনও ফ্যানরা নেইমারের সমর্থনে সবসময়ই ছিলো। কিন্তু এবার বিভিন্ন নির্ভরযোগ্য সোর্সের খবরের পর ব্রাজিলিয়ান মিডিয়া শুরু করলো এক নোংরা খেলা। কাতালান নেইমার হেটাররাও ব্রাজিলিয়ান মিডিয়ার বরাত দিয়ে নিউজগুলো ছড়িয়ে মুণ্ডুপাত শুরু করলো নেইমারের। ফ্যানরাও এবার তাদের কথা ফেলে দিতে পারলোনা, কারণ ব্রাজিলিয়ান সবচেয়ে শক্তিশালী সোর্সের খবর এগুলো।

এমনিতেই পিএসজি নিয়ে নেইমার চুপ থাকায় ফ্যানরা দুশ্চিন্তায়, বার্সার প্রেস কনফারেন্স থেকে নেইমারের চলে যাওয়ার ইচ্ছার ব্যাপারটা জানতে পারা, তার উপর একের পর এক গুজব, সবমিলিয়ে নেইমারের জনপ্রিয়তা শূণ্যের কোঠায় নেমে গেলো। ব্রাজিলিয়ানদের চেয়ে বড় ব্রাজিল সমর্থক দুনিয়ায় কেউ নেই। তারাই যখন বিদ্বেষের বিষবাষ্প ছড়াচ্ছে, তখন "ব্রাজিলিয়ান বলে নেইমার কিউলদের চোখের শূল, কারণ বেশিরভাগ কিউল আর্জেন্টিনা সমর্থক" এই তত্ত্ব খাটেনা। অনেকে বলতে চান, ঘরের ছেলে মেসি নেইমারের পারফরম্যান্সে আড়ালে পড়ে যাবে,এই ভয়ে বুঝি বার্সা ফ্যানরা নেইমার বিরোধী। কিন্তু সত্যি বলতে মেসি-রোনালদো যে লেভেলের প্লেয়ার, আর যেভাবে তারা খেলেন, তাতে তারা যেই দলেই থাকুক, লাইমলাইট তাদের উপরই থাকবে। বার্সা ফ্যানদের এক্ষেত্রে দোষারোপ করাও নিতান্ত হাস্যকর। অনেকে আবার বলতে চান, যে নেইমারের সব কৃতিত্ব মেসিকে দেয় বার্সা ফ্যানরা। নেইমার কৃতিত্ব পায়না। আসলে মেসি রোনালদোর মতো প্লেয়ারদেরকে নিয়ে হাইপটা বেশি থাকে (সেটা তারা ডিজার্ভ করে), কিন্তু তাই বলে নেইমারের কৃতিত্ব নেই, সব মেসি নিয়ে নিচ্ছে এরকম দাবি তোলাও অযৌক্তিক। প্লেয়ার হিসাবে নেইমার যা ছিলো, বার্সায় এসে সে আরো অনেক বেশি পরিপক্ব হয়েছে। বার্সায় এসেই সে বিশ্বসেরাদের কাতারে নিজেকে শক্তভাবে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, বার্সা সাপোর্টাররা কি ঘরের ছেলেদের প্রতি তুলনামূলক বেশি দূর্বল? অবশ্যই। মেসি, ইনিয়েস্তা, বুসকেটসরা বার্সার ঘরের ছেলে। এতবছর ধরে টানা সার্ভিস দিয়ে যাচ্ছে, তাদের প্রতি বেশি ভালোবাসা থাকাটাই স্বাভাবিক। তার মানে এই না যে বার্সা সমর্থকরা নেইমারকে পছন্দ করেনা। বরং এই কয়েক বছরেই বার্সা সমর্থকরা নেইমারকে অনেক আপন করে নিয়েছে। তাকে ভালোবেসেছে। আবেগগুলো ভালোবাসা থেকেই আসে। কিন্তু হলুদ সাংবাদিকতার দুনিয়ায় আবেগ ভালোবাসার মূল্য কোথায়?

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন