ফুটবলে ট্যাক্টিস এর ইতিহাস এবং উৎপত্তিঃ কাউন্টার অ্যাটাকের সূত্রপাত

ফুটবলে ট্যাক্টিস এর ইতিহাস এবং উৎপত্তিঃ কাউন্টার অ্যাটাকের সূত্রপাত

উনবিংশ শতাব্দীর শেষ থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি পর্যন্ত এই পিরামিড ফরমেশন খুবই জনপ্রিয় ছিল। তবে বিপত্তি ছিল একটাই। ওই কঠিন অফসাইড নিয়ম। এর ফলে খুব সহজেই অপনেন্ট ডিফেন্ডাররা অ্যাটাকারদের অফসাইড ট্র্যাপে ফেলতে পারত। কেননা পিরামিড ফরমেশনে প্রধান ডিফেন্ডার ছিল মাত্র ২ জন, যার বিপক্ষে অ্যাটাকার ছিল ৫ জন। এতে করে ম্যাচগুলোতে গোলও খুব কম হত। যেটা একটা সময় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন এর নজরে আসে।

ফলশ্রুতিতে তারা ১৯২৫ সালে আগের অফসাইড নিয়ম পরিবর্তন করে নতুন নিয়ম প্রবর্তন করেন যেখানে গোলকিপার সহ ২ জন অপনেন্ট এর অধীনে কোন প্লেয়ার থাকলেই সে আর অফসাইড হবে না(বর্তমানেও একই নিয়ম চালু রয়েছে)।

ফলে নতুন অফসাইড নিয়মে প্রচুর গোল হওয়া শুরু করল ম্যাচগুলোতে।
ফুটবল জগতে ওই সময়ে সেরা ম্যানেজার ছিলেন হারবারট চ্যাপম্যান। সে ছিলেন হাডারসফিল্ড এর ম্যানেজার এবং তার দল ছিল খুবই শক্তিশালী ও সাফল্যমণ্ডিত। এরপর তিনি আর্সেনাল এর ম্যানেজার হন এবং তার অধীনে আর্সেনালও ছিল দুর্দান্ত। এই চ্যাপম্যান ফুটবলে নতুন কিছুর সূচনা ঘটান। কি ছিল সেটা?

সেটা হল ফুটবলের সর্বকালের সৌন্দর্য কাউন্টার অ্যাটাক।

সেই সময়ে যেই দলের কাছে বল বেশিক্ষণ থাকতো, সাধারণত ম্যাচের ফলাফল তাদের দিকেই যেত। কেননা যত বেশি বল আপনার পায়ে থাকবে আপনি ম্যাচ তত বেশি ডমিনেট করবেন যা খুবই সাধারণ কথা। কাউন্টার অ্যাটাক তখন ব্যবহার করা হত ভুল-ভবিষ্যৎ এ। এই হারবারট চ্যাপম্যানই প্রথম ম্যানেজার যিনি কাউন্টার এটাক কে ট্যাক্টিস হিসেবে খেলানোর সূচনা করেন।

নতুন অফসাইড নিয়ম এ ওই পিরামিড ফরমেশন বিরাজমান রেখে ডিফেন্ড করা অনেক টাফ ছিল। ফলে চ্যাপম্যান ওই পিরামিড ফরমেশনের সেন্টার হাফ কে ডিফেন্স লাইনে নামিয়ে দিলেন যার নাম দেয়া হল সেন্টার ব্যাক। এখন ডিফেন্স এ ৩ জন হবার কারণে তা আগের চেয়ে বেশ শক্ত হল। কিন্তু মিডফিল্ড এ সেন্টার হাফ এর অনুপস্থিতিতে ক্রিয়েটিভিটি এবং বল সাপ্লাই এ বেশ বড় রকমের ঝামেলায় পড়লেন চ্যাপম্যান। ফলে তিনি ওই সেন্টার ফরোয়ার্ড এর দুই পাশে খেলা দুজন ফরোয়ার্ড কে একটু নিচে নামিয়ে দিলেন। যাতে তারা দুজন একই সাথে মিডফিল্ড এর সাথে সংযোগ রেখে বল ফরোয়ার্ড লাইনে সাপ্লাই করতে পারে এবং প্রয়োজন মত নিচে নেমে ডিফেন্ড করতে পারে। এতে দেখা গেল তার দল বেশ ভালোভাবে ডিফেন্ড করতে পারছে। তখন চ্যাপম্যান তার দলকে বল পজেশনে না খেলিয়ে ডিপে নেমে ডিফেন্ড এর কাজে লাগিয়ে দিলেন যাতে অপনেন্ট দল বেশি পজেশন রেখে অ্যাটাক করে। ফরমেশনে পরিবর্তন এনে চ্যাপম্যান পুরাই ভেল্কি দেখালেন প্রতিপক্ষকে বল পজেশন ধরে না রেখেও। কেননা তখন চ্যাপম্যান এর দলের ফরমেশন ছিল ৩-২-২-৩। ফলে তার দল ডিফেন্ড করার সময় বেশ ডিপে থাকলেও উপরের ৩ জন অ্যাটাকার অপনেন্ট ডিফেন্ডারদের ঘেঁষে অবস্থান করত। এতে করে তার দল বল দখল করা মাত্র দ্রুত গতীতে অ্যাটাক করত এবং অপনেন্ট দল ডিফেন্ড করার জন্য সঠিক জায়গায় ফেরার আগেই চ্যাপম্যানের প্লেয়াররা বল তাদের জালে ঢুকিয়ে দিত।
                                       
কাউন্টার অ্যাটাককে এভাবে ট্যাক্টিস হিসেবে ইউজ করা শুরু করলেন চ্যাপম্যান এবং আবিস্কার হল বিখ্যাত “দ্যা WM ফরমেশন”। কেননা তার ৩-২-২-৩ দলকে দেখতে ইংরেজির W এবং M অক্ষরের মত লাগত।

তার এই বিখ্যাত ফরমেশনে সেন্টার ফরোয়ার্ড এর পাশে থাকা সেই দুজন ফরোয়ার্ড যাদের কিছুটা নিচে নামিয়ে দেয়া হল তারা ক্রিয়েটিভ রোলের দায়িত্ব নিল পুরোপুরি। ফলে ৩ জনের নতুন ডিফেন্স লাইনের সামনে যে দুজন মিডফিল্ডার ছিল তারা অ্যাটাকিং বা বল সাপ্লাই এ না গিয়ে ডিফেন্ডিং এ বেশি মনোযোগ দিল। এতে করে দলের যে দুজন ওয়াইড ফরোয়ার্ড ছিল, তাদের নাম পরিবর্তন হয়ে উইঙ্গার হয়ে গেল এবং তারা ফরোয়ার্ড সাপোর্ট রোল থেকে বেরিয়ে গোল স্কোরিং এও মনোযোগ দিল। তখন যেহেতু সবচেয়ে প্রচলিত ছিল দ্যা পিরামিড ফরমেশন সেহেতু চ্যাপম্যান এর দলকে ৫ জনের ফরোয়ার্ড লাইনকে ডিফেন্ড করতে হত। আগের দুজন ওয়াইড মিডফিল্ডার যারা এখন ডিফেন্স এর বেশি সাহায্য করত তারা মার্ক করত অপনেন্ট দলের দুজন ইনসাইড ফরোয়ার্ড কে। নিচে ডিফেন্স লাইনের মাঝেরজন অর্থাৎ সেন্টারব্যাক মার্ক করত অপনেন্ট এর সেন্টার ফরোয়ার্ড কে এবং সেন্টার ব্যাকের পাশের দুজন ডিফেন্ডার মার্ক করত অপনেন্ট দলের বাকি দুজন ওয়াইড ফরোয়ার্ড কে।

ফলাফল ছিল খুবই শক্তিশালী আর্সেনাল টিম যারা অনেক টাইটেল জিতে নেয় সেই সময় চ্যাপম্যানের আন্ডারে এই অভূতপূর্ব পরিবর্তনে।

তখন থেকে পিরামিড ফরমেশনের নাম-ডাক কে হটিয়ে এই WM ফরমেশনের নাম-ডাক ছড়িয়ে পড়ে এবং দীর্ঘদিন এই ফরমেশন ওয়ার্ল্ড ফুটবলে রাজত্ব করে। বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝির পর থেকে একবিংশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত অনেক ফরমেশনের পিছনের প্রধান কারিগর ছিল এই WM ফরমেশন। ফুটবল বিশ্ব কে পালটে দেয়ার এক অনন্য নাম চ্যাপম্যান এবং তার এই যুগান্তকারী আবিষ্কার। 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন