ভালো থেকো, ছোট্ট ব্র্যাডলি

ভালো থেকো, ছোট্ট ব্র্যাডলি
Iftekhar I. Pranta July 8, 2017, 5:37 pm Articles

ব্র্যাডলি লাওরি। ব্রিটেনের হার্টলপুলের ছোট্ট শিশুটা। বয়স তখন মোটে আঠারো মাস। সদা হাসিমাখা মুখের ফুটফুটে ছেলেটার শৈশব যে হঠাতই এভাবে বদলে যাবে কে ভেবেছিলো? ধরা পড়ে নিউরোব্ল্যাসটোমা, বিরলতম ক্যান্সারগুলোর একটি।

অতটুকুন বাচ্চা, মরনব্যাধি ছোট্ট শরীরে ছড়িয়ে পড়ছে, চিরচেনা মুখভরা হাসি কি তবে মুছে যাবে? আরে ধুর! হোক না পুঁচকে, ফুটবল পাগল ছেলে শেষ বাঁশির আগে হার মেনে নেবে নাকি? চ্যাম্পিয়নের মতই ফিরে এসেছিলো মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ে। প্রথম দফায় হারিয়ে দেয় ক্যান্সারকে। সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে ধীরে ধীরে।

কিন্তু প্রতিপক্ষ যে বড্ড শক্তিশালী! ফিরে আসে সেই ক্যান্সার আবার ২০১৬ এর মাঝামাঝি। এবার আরো বিপুল বিক্রমে। ছড়িয়ে পড়ে বুক, ফুসফুস, মেরুদন্ডে। লড়াই কিন্তু থামে না। ষষ্ঠ জন্মদিনটা কাটে হাসপাতালেই। অবস্থা খারাপের দিকে চলে যায়। ডাক্তাররা জানিয়ে দেন সময় আর বেশি নেই।   

ব্র্যাডলির গল্প শুনে সান্ডারল্যান্ড ফুটবল ক্লাবের পাঁড় ভক্ত ব্র্যাডলিকে গত সেপ্টেম্বরে এভারটনের বিপক্ষে ম্যাচে ‘মাসকট’ হিসেবে আমন্ত্রণ জানায় ক্লাবটি। সেখানে হাত ধরে হাঁটে তাঁর প্রিয় খেলোয়াড় জার্মেই ডেফোর। বন্ধুত্বের শুরুটা সেখানেই। বন্ধুত্বের এক সপ্তাহের মধ্যেই ব্র্যাডলিকে হাসপাতালে ফিরে যেতে হলেও ডেফো কিন্তু নিয়মিত খোঁজখবর নিতে ভুলেন নি। পেশাদারিত্বের খোলস ছেড়ে ইংলিশ ফুটলের ব্যস্ত সূচিতেও প্রিয় বন্ধুর হাসপাতালের বিছানায় ডেফোকে পাওয়া যেত নিয়মিতই। নিজের হিরোকে জড়িয়ে ঘুমন্ত ‘সুপারহিরো’ ব্র্যাডলি লাওরির ছবিও দেখা যায় সংবাদ মাধ্যমে।

                        

এরপর আবার ওয়েম্বলি স্টেডিয়ামের ৭৮,০০০ দর্শকের সামনে ইংল্যান্ড বনাম লিথুনিয়া ম্যাচে ডেফোর হাত ধরে হাঁটে ব্র্যাডলি। গোটা স্টেডিয়াম দাঁড়িয়ে সম্মান জানায় পুঁচকে ছেলেটির সাহসীকতার। প্রতিদ্বন্দ্বীতা ছাপিয়ে ফুটবলের মূল সৌন্দর্য যে ভাতৃত্ব আর সৌহার্দ্র আর মানবতায় তা যেন আরেকবার মনে করিয়ে দিয়ে যায় মৃত্যুর পথে থাকা ছোট্ট ব্র্যাডলি।

ডিসেম্বরে চেলসি বনাম সান্ডারল্যান্ড ম্যাচের আগে ব্র্যাডলির পেনাল্টি কিকে গোলটা গোলকিপার বেগোভিচও নিশ্চয়ই আজীবন মনে রাখবেন। গুটি গুটি পায়ে পায়ে যখন বলটা জালে ঠেলে দিচ্ছিলো ছোট্ট ব্র্যাডলি তখন গোটা গ্যালারির সাথে তিনিও আনন্দে শামিল। ফুটবল-আবেগ-মানবতা যখন মিলেমিশে একাকার, জার্সির রঙ তখন কে দেখে!  ডিসেম্বরের ‘গোল অফ দ্য মান্থ’ ট্রফিটাও ব্র্যাডলিকে দিয়ে দেওয়া হয়। এমনকি হাফ টাইমে ‘বদমেজাজি’ বলে পরিচিত চেলসি স্ট্রাইকার ডিয়েগো কস্তাও তাকে হাসিমুখে গোল করার টিপস দেন।

                  

গতবছর ব্র্যাডলির জন্য বিভিন্ন উৎস থেকে শুভাকাঙ্ক্ষীদের ডোনেশন আসে প্রায় ৭ লক্ষ পাউন্ড, যেখানে ইংলিশ ফুটবল ক্লাব এভারটন তার জন্য ২ লক্ষ পাউন্ড তুলে দেয় । এপ্রিলে ব্রিটেনের সবচেয়ে বড় ঘোড়দৌড় গ্রান্ড ন্যাশনালসের ‘অনারারি’ ৪১তম স্থান দেওয়া হয়। এ বছরের ‘চাইল্ড অব কারেজ’ এওয়ার্ডের রেড কার্পেটেও হাঁটে বন্ধু ডেফোর সাথে। স্টেজেও ওঠে ডেফোর হাত ধরে। বিবিসির স্পোর্টস পার্সোনালিটি এওয়ার্ডে ‘গেস্ট অব অনার’ হিসেবে আমন্ত্রণ পায় ব্র্যাডলি।

এতকিছুর পরও ব্র্যাডলিকে হারতে দেখাটা যে অবধারিত ছিলো। শরীরটা দুতিন দিন আগে থেকেই আর সাড়া দিচ্ছিল না।  জুলাই ৭, স্থানীয় দুপুর ১: ৩৫ । কিছুদিন থেকেই শয্যাশায়ী ব্র্যাডলি আর উঠলো না। ব্র্যাডলির মা টুইট করে জানালেন তার ‘সুপারহিরোর’ যুদ্ধ শেষ। গোটা ফুটবলবিশ্ব শ্রদ্ধা জানালো এক সাহসী যোদ্ধাকে, ডেফো সংবাদ সম্মেলনে কেঁদেই ফেললেন। ফুটবল তারকা থেকে শুরু করে ইংল্যান্ড জাতীয় ফুটবল দলের টুইটার পেইজ পর্যন্ত শোকের রঙে আবৃত।

সান্ডারল্যান্ড তাদের পরবর্তী ম্যাচে নামবে কালো ব্যাজ পড়ে, খেলার শুরুতে নীরবতা পালন হবে এক মিনিট। আর ব্র্যাডলির জন্য করা ডোনেশনের বাকি টাকা চলে যাবে ‘ব্র্যাডলি ফাউন্ডেশনে’। ওরই মত যোদ্ধাদের সাহায্যে। শেষ বাঁশির আগে যে কেউ মাঠ ছাড়বে না!         





Similar Post You May Like

Find us on Facebook