যদি হতে হয় আদর্শ ফুলব্যাক

যদি হতে হয় আদর্শ ফুলব্যাক

ফুটবল খেলায় প্রায়শই দেখা যাবে দৃশ্যগুলো। নিচের বাঁ অথবা ডান প্রান্তে খেলতে থাকা খেলোয়াড়টি পায়ে বল নিয়ে হঠাৎই দিলেন এক দৌড়। এক নজরে চারদিকে দেখে মাঝে প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট এর কাছে তার অপেক্ষমাণ সতীর্থদের উদ্দেশ্যে করলেন ক্রস,চমৎকার সুযোগ এবং গোল! আবার প্রতিপক্ষের আক্রমণের চেষ্টা প্রতিহত করতে তাদের বাড়ানো বলের সামনেই নিজের পুরো দেহটিকে বাধা হিসেবে লাগিয়ে দিলেন। চমৎকার ইন্টারসেপশন। বল বাড়িয়ে দিলেন তার সতীর্থদের দিকে। আবার একবার হঠাৎই দলের কাউন্টার এট্যাকে ভয়াবহ গতিতে একজন খেলোয়াড়কে নিচ থেকে ছুটে আসতে দেখা গেল। অথচ খানিক আগেও তাকে দলের ডিফেন্ডারদের সাথে রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে দেখা গিয়েছে। উপরে যেসকল দৃশ্যের কথা মাত্রই আপনার অবচেতন মনের মধ্যে উঁকি মেরে চলে গেল, প্রতিটাই একজন ফুলব্যাককে আপনারা মাঠে এগুলোর সম্মুখীন হতে দেখেছেন, একাধিকবার। একটা পুরো ম্যাচ দেখতে বসলে যেসকল টুকরো টুকরো ছবি আপনার মনের মধ্যে নজর কাড়বে, এই খেলোয়াড়টির খেলার ধরন সেই সারির উপরের দিকেই থাকবেই। দলের রক্ষণে যেমন তিনি কাজ করেন “প্রাথমিক নিরাপত্তা” হিসেবে, তেমনি দলের আক্রমণের সময়ে কাজ করেন “গোপন অস্ত্র” হিসেবে।

Image result

ফুটবল বিশ্ব বেশ কিছু বিখ্যাত ফুলব্যাকের সাথে ইতোমধ্যেই পরিচিত। এছাড়াও রয়েছে বর্তমান সময়ের তারকারা, আছেন বেশ কিছু প্রতিভাবান তাদের মাঝে এখন থেকেই কিংবদন্তীর ছায়া খুঁজাখুঁজি শুরুও হয়ে গিয়েছে। এদের কেউ তাদের খেলার ধরনে, কেউ বা তাদের শক্তির মাধ্যমে, একটানা খাটাখাটনির মানসিকতার মাধ্যমে জয় করেছেন অসংখ্য ফুটবলপ্রেমীর মন। এটি ফুটবলের অন্যরকম এক সৌন্দর্য, যার মাধ্যমে কাফু, কার্লোস আলবার্তো, রবার্তো কার্লোস, জিয়াসিনতো ফাচেট্টি, থুরাম, মালদিনি, জন আরনে রিসা, হাভিয়ের জেনেত্তি, ফিলিপ লাম, দারিও সার্না, অ্যাশলি কোল, দানি আলভেজ, মার্সেলো, সুবোটিচ, লুকাস পিসজ্যাক কিংবা আধুনিকের হেক্টর বায়েরিন, এরিক ডার্ম, দানি কারভাহাল, কাইরেন টেয়ারনি, জর্দি আলবা, থিও হার্নান্দেজ, অ্যালেক্স টেলেস, সিড কলাসিনাচ প্রমুখ যুগে যুগে ফুটবলীয় বিনোদন উপহার দিয়ে গিয়েছেন ও যাচ্ছেন।

Image result for jordi alba 2016

প্রশ্ন আসবে, ঠিক কি কি করলে নিজেকে একজন ফুলব্যাক বলা যায়? খালি কি ব্যাক পজিশনে খেললেই হবে? খুব কি খাটাখাটনি সইতে হবে? বেশ, উত্তরগুলো জানার আগে ফুলব্যাক সম্বন্ধে কিছু ধারনা নিয়ে নেওয়া যাক। ফুটবল দলীয় খেলা যেখানে ১১ জন খেলোয়াড় ১১ টা ভিন্ন পজিশন অনুযায়ী খেলতে থাকবে জয়লাভের লক্ষ্যে। আপাতত মাঠের দুই প্রান্তভাগে দৃষ্টি নিবন্ধন করা যাক। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দলে ৪ জন ডিফেন্ডার সাজানো থাকতে দেখা যায়। ক্ষেত্রবিশেষে সেটা ৩ জন কিংবা ৫ জনও হতে পারে,যা টিমের নিজ নিজ ট্যাকটিক্স হিসেবে সাজনো থাকে। যাইহোক, সাধারনভাবে দুই প্রান্তের দুইজন ডিফেন্ডারকে “ফুল ব্যাক" হিসেবে সম্বোধন করা হয়। “লেফট ব্যাক” ও “রাইট ব্যাক” হিসেবে খেলোয়াড়দের খেলতে দেখা যায়। বিশেষ ক্ষেত্রে, এই ব্যাক পজিশনের খেলোয়াড় রা একটু ওপরের দিকে থাকে যাদেরকে “ওয়েস্ট ব্যাক” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। একজন ফুলব্যাকের সত্যিকার অর্থেই একজন ফুলব্যাক হয়ে ওঠার জন্য আদর্শ ও প্রধান স্থান মূলত এই পজিশনগুলোই।

পরবর্তি ধাপে আলোচনা করা যাক সাধারণ একটি ফুটবল ম্যাচে একজন ফুলব্যাকের কর্মকাণ্ডগুলো নিয়ে। ফুলব্যাক যেমনই হোক না কেন, সবার আগে তার পরিচয় একজন “ডিফেন্ডার” হিসেবে। সুতরাং, একজন ফুলব্যাকের প্রধান কাজটি অবশ্যই দলের রক্ষণ ঘিরেই তথা রক্ষণে তার সতীর্থদের সহায়তা প্রদান। এগ্রেসিভ বা হার্ড ট্যাকলিং এর তেমন বাধ্যবাধকতা নেই। মূলত প্রতিপক্ষের উইং থেকে আসা আক্রমণগুলো যথাসম্ভব প্রতিহত করার চেষ্টা থেকেই একজন ফুলব্যাকের প্রথম পরিচয় ফুটে ওঠে। এর মধ্যে আরও বেশ কিছু জিনিষ অন্তর্ভুক্ত করা যায়। যেমন, উইং থেকে প্রতিপক্ষ পাসিং ডেভেলপ করতে থাকলে পাসিং লাইনগুলো প্রতিহতের চেষ্টা করা। যেটাকে আমরা অনেকেই “ইন্টারসেপটিং পাসেস” বা “কাটিং পাসিং লেনস” ইত্যাদি হিসেবে শুনেছি বা জেনেছি। ট্যাকলিং, প্রেসিং কিংবা নিজের আক্রমণাত্মক মনোভাব দেখানোর বিষয়টা বিবেচনায় আনা যায়। কারন মূলত উইং অঞ্চল থেকে যেসকল আক্রমণ তৈরি হয়, তার বেশিরভাগই রুপান্তরিত হয় ক্রসিং এ অথবা প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়ের দ্রুততার সাথে ড্রিবলের মাধ্যমে ডি-বক্সে প্রবেশের মাধ্যমে। এটাকে ফুটবলিয় ভাষায় “কাট-ইন” বলা যায়। এসকল ক্ষেত্রে ফুলব্যাকদের জন্য গায়ের জোর দেখানোর ব্যাপারটা মাঝেমধ্যে প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে। ডিফেন্ডার হিসেবে সম্বোধন করা হলেও একজন ফুলব্যাক যে শুধুমাত্র রক্ষণেই মনোনিবেশ করবে, এমনটি মোটেও নয়। বলা বাহুল্য, ফুটবল খেলায় প্রতিটা পজিশনের খেলোয়াড়দের মধ্যে দলের ট্যাকটিক্স অনুযায়ী টিম ক্যামেস্ট্রি বা সঠিক সংযোগ বজায় রাখার ব্যাপারটা গুরুত্বপূর্ণ। মিডফিল্ডে খেলা খেলোয়াড় গুলো সবসময়ই দলের ইঞ্জিন কিংবা প্রধান বল যোগানদাতা হিসেবে কাজ করতে থাকে। আর উইংগার বা ফরওয়ার্ড রা সবসময়ই বল যোগানের প্রচেষ্টাগুলো সফল করার চেষ্টা করতে থাকে তা গোলে রূপান্তরের মাধ্যমে। আর ফুলব্যাক মাঝমাঠের সাথে উইং কিংবা ফরওয়ার্ড লাইনে বল যোগানে বাহক হিসেবে কাজ করে। উইংয়ের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতেই দেখা যায় বেশিরভাগ সময়। তা ছাড়া উইং দিয়ে আক্রমণ সবচেয়ে সহজ এবং প্রভাবশালী প্রমাণিত হয়,কারন অবশ্যই প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের জটলা ওইদিকে কম আর তা ছাড়া ক্রসিং এটেম্পট এর একটা ব্যাপারও আছে। এ কাজে ফুলব্যাক ওই উইংগারটিকে সহায়তা দানের চেষ্টা করে।

Image result for dani carvajal

কিছু কিছু সময়ে দেখা যায়, ব্যাকে খেলতে থাকা খেলোয়াড়টি হঠাৎ করে উইং অঞ্চলে বেশ একটিভিটি দেখাতে দেখাতে রিতিমত ক্রস, পাস, কাট-ইন, চান্স ক্রিয়েশন,শট এটেম্পট ইত্যাদি করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকে। এটাকে “ওভারল্যাপ” বলা যেতে পারে। যখন ওভারল্যাপিং করা হয়, একজন ফুলব্যাক তখন শুধু একজন “ডিফেন্ডার” বা “ব্যাক প্লেয়ার” হিসেবেই কাজ করেনা, বরং সে দলের রিতিমত সেকেন্ডারি উইংগার হিসেবেও কাজ করে যেতে থাকে। এটা একজন ফুলব্যাকের আলাদা একটা বৈশিষ্ট্য যে, দলের প্রয়োজনের সময় নিজের সাধারন পজিশন ছেড়ে দলের আক্রমণে সে সহায়তা দান করতে পারে। এক্ষেত্রে তারা দুইটি সুবিধা পায়, প্রথমত,ডিফেন্ডার হিসেবে থাকার ফলে তাকে কেউ আলাদা করে মার্কিং করে রাখার প্রয়োজন বোধ করেনা,দ্বিতীয়ত, উইংগার হিসেবে পরিচালনা করে মাঝমাঠ ও ফরওয়ার্ড লাইনের মাঝের সংযোগ বজায় রাখতে পারে। ফলে দলের আক্রমণে তেমন কোনো ভাটা পড়েনা। এতে বেশ ইতিবাচক প্রভাব পড়তে দেখা যায়। বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গোল পাওয়া মূলত এসকল টোটকা থেকেই সম্ভব হয়। আর ফুলব্যাক এতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে।

মূলত ফুলব্যাক নিয়ে আলোচনার ইতি টানলেও কিছু প্রশ্ন এখনও থেকেই যায়। একটা সাধারন প্রশ্ন হতে পারে যে,ফুলব্যাক হতে হলে কি তবে শক্তিশালী হতে হবে? প্রচুর দম থাকাটা কি খুব দরকারি? হতে কি হবে খুবই দ্রুত? পাসিং সেন্স কি অনেক উচ্চমানের হওয়া দরকারি? প্রচুর ট্রাকলিং কিংবা স্ট্রেন্থফুল হতে হবে কি? আক্রমণাত্মক খেলতে চাইলে ঠিক কতটা মাত্রা বজায় রাখাটা জরুরী? বেশ, বর্তমান যুগ স্বাপেক্ষে বললে, ফুটবলটা গতির খেলা। গতির খেলাতে যার যত বেশি গতি, তারই দিকে বিজয়ের পাল্লা বেশি ঝোলা থাকে। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্র আছে, যেখানে গতির চেয়ে মগজ খাটানোটারই দরকার হয় বেশি। সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত যেমন ম্যাচের কোনো মুহূর্তে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে, ঠিক তেমনিভাবেই একটা ভুল সিদ্ধান্ত পুরো একটি ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। তবে যদি সবদিক থেকেই একটা মধ্যপন্থা অবলম্বন করা যায়, তবে আপনার নিজ ক্ষেত্রেও খেলা সহজ হয়ে যায়, আপনার সতীর্থদেরও খেলা সহজ হয়ে যায়। ফুলব্যাক হিসেবে খেললে সবসময় এটাই মাথায় থাকা দরকার, আপনি মাঠে যাই করেন না কেন, আপনার দল এবং সতীর্থ যেন তার মাধ্যমে ইতিবাচক সাড়া পায়। যারা এটাতে সফল, তারা নিজেরা শতভাগ সামর্থবান না হওয়া সত্ত্বেও দলের প্রধান খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, অনেকে অয়ায় কিংবদন্তির মর্যাদা। তাই আজও কাফু,মালদিনি,কার্লোস আলবার্তো,রবার্তো কার্লোস,ফাচেট্টী,জেনেত্তি কিংবা লামদের জনপ্রিয়তা এখনও কমেনি। অথচ তারা ছিলেন না তেমন আক্রমণাত্মক, সেরকম জোরে দৌড়ানোর মতোও ছিলেন না, ছিলেননা আক্রমণাত্মক,তাদের নেই তেমন ভুরিভুরি গোল কিংবা এসিস্ট, বরং তাদের সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার মানসিকতাটিই তাদের অনন্য করে তুলেছে। এটাই একজন ফুলব্যাকের আদর্শ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার গোপন চাবিকাঠি। তো, নিজেকে একবার ফুলব্যাক হিসেবে যাচাই করে দেখবেন নাকি?

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন