একজন গোল মেশিন এর গল্প

একজন গোল মেশিন এর গল্প

ফুটবল গোলের খেলা। আর তাই গোলটাই এখানে মুখ্য বিষয় দিনশেষে। 
ফুটবলের ইতিহাসে কত লিজেন্ডই তো এসেছে, তাইনা? আচ্ছা, সবাই কি গোল করেই লিজেন্ড হয়েছে?

উত্তর হল না। 

কিন্তু যারা গোল করে তাদের আমরা বেশী মনে রাখি অন্যান্যদের চেয়ে। কারণ উত্তেজনা গোল আটকানো কিংবা ট্যাকলে নয়, উত্তেজনা গোল করাতেই বেশী। যেমন ধরুন ফুটবলের সম্রাট পেলে তার ক্যারিয়ারি জীবনে সর্বমোট গোল করেছে ১২৮৩ টি। অন্যদিকে ফুটবলের জাদুকর ম্যারাডোনার সর্বমোট গোল সংখ্যা মাত্র ৩৪৬ টি। আমাদের জেনারেশনের মাঝে ফুটবল প্রেম তৈরি করা আরেক প্লেয়ার রোনালদো লিমার ক্যারিয়ারে গোল সংখ্যা ৪১৪ টি। অথচ কে কত গোল বেশী করেছে সেই হিসেবে কি আমরা তাদের মনে রাখি? উহু, রাখি না। কারণ গোলসংখ্যা দিয়ে তাদের মাহাত্ম্য মাপা যাবে না। বরং আমাদের ভালোলাগাটার তৈরি হয়ত কে কিভাবে গোল করত, কে কিভাবে গোলকিপার কে বোকা বানাতো কিংবা কে কিভাবে নিজেকে আলাদাভাবে আমাদের সামনে তুলে ধরত তা দেখেই। পেলে, ম্যারাডোনার খেলা দেখার সৌভাগ্য আমার হয় নি। ইভেন রোনালদো লিমার পুরো ক্যারিয়ারেরও নয়। তবে আমার এমন একজনের মোটামুটি চলমান পুরো ক্যারিয়ারের খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়েছে যাকে অনেকের মতে ফুটবল ইতিহাসের ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট কমপ্লিট গোলস্কোরার হিসেবে ভাবা হয়।

হ্যা, ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো দস সান্তোস এভেইরোর কথাই বলছি।

বয়সে একটু কাপন ধরলেও বর্তমানে ওয়ার্ল্ড ফুটবলের মোস্ট প্রলিফিক গোল স্কোরার সে। আদতে একজন মিডফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার শুরু করলেও অসম্ভব গতি আর অসাধারণ ড্রিবলিং এর জন্য মাঝে মাঝেই তাকে উইং এ খেলানো হত। ১৮ বছর বয়সে যখন ইউনাইটেডে যোগ দিলেন তখনও একজন উইঙ্গার হিসেবেই খেলতেন। লিকলিকে গড়নের হওয়ায় প্রচুর ফাউলের শিকার হতেন। তবে কোচের যতই না ইচ্ছা তাকে একজন পিওর উইঙ্গার বানানো, ক্রিসের ততই ইচ্ছা গোলস্কোরার হবার। সে সময় স্যার অ্যালেক্স একটু ঝামেলাতেই পড়লেন ক্রিস কে নিয়ে। ছেলেটা ডি বক্সে বল ডেলিভারি দিতে যতটা না আগ্রহী, তার চেয়ে বেশী আগ্রহী ২-৩ জন কে কাটিয়ে মাঠের ডান প্রান্ত থেকে কাট ইনসাইড করে বক্সে ঢুকে শুট করায়। একরকম বাধ্য হয়ে আর এক্সপেরিমেন্ট এর জন্যই স্যার অ্যালেক্স ক্রিস কে কয়েকম্যাচ পর গিগস এর পজিশনে খেলালেন। এটা ছিল জাস্ট তার স্বাভাবিক পছন্দের পজিশনে যেয়ে নিজের ঝলক দেখানোর শুরু। গোলস্কোরার হিসেবে তার নামটা তখনও ফুটে ওঠে নি। ২-৩ সিজনের মাঝে ক্রিস ওয়ার্ল্ড ফুটবলের অন্যতম তারকা হিসেবে তার নাম চিনিয়ে ফেললেন। কিন্তু এরই মাঝে আনলেন নিজের মাঝেও অসম্ভব পরিবর্তন। শুরুটা হয়েছিলো লিকলিকে গড়নের শরীরটার চর্চার মাধ্যমে। এরপর এলো শক্তির সাথে গতি আর ড্রিবলের সমন্বয়।

২০০৭-২০০৮ সিজন।

 

 

লেফট উইঙ্গার হয়েও সে তখন দলের মেইন স্কোরার। করলেন ৪২ গোল। আর সেটা কেবল শুরু ছিল ক্রিসের। ২০০৯-২০১০ সিজনে মাদ্রিদে যোগ দেয়ার পর যেন নিজের খেলার চেহারাটাই পালটে ফেললেন। কোনভাবে গোল করে না সে? হেডার বলুন আর ট্যাপ ইন, ফ্রি কিক বলুন আর পেনাল্টি, লং রেঞ্জ বলুন আর সলো গোল বলুন সব শো সে একাই দেখাতে সক্ষম। তবে এভাবে মুড়ি মুড়কির মত গোল করতে হলে আপনাকে যে সবার চেয়ে স্পেশাল হতে হয় একটু। ক্রিস একটু স্পেশাল নয়, এখানে ইউনিক। কিভাবে? আজ সেই গল্পই শোনাবো আপনাদের। 

এই গল্প শুরু করতে গেলে প্রথমেই ফুটবলের কিছু বেসিক জিনিস আলোচনা করতে হবে। আর তা হল গোল স্কোরারদের রকমারিতা। প্রতিটি ফিনিশারের আলাদা কিছু ইউনিক এবিলিটি থাকে যেগুলো ব্যবহার করে তারা গোল করে। এই ক্ষেত্রে আপনার সাইজ, আপানার শক্তি, আপনার উচ্চতা, আপনার গতি, আপনার শুটিং একুরেসি এই ধরনের বিষয়গুলো খুবই ইম্পরট্যান্ট। প্রথম রকমারিতায় আসে গতি। আগুয়েরো কিংবা হালের লাকাজেত কিংবা এক সময়ের দানব টরেস, এদের বেসিক এবিলিটি হচ্ছে গতি ব্যবহার করে স্কোর করা। এরা কাউন্টার এটাকে অনেক পারদর্শী এবং গতির মাধ্যমে খুব সহজেই ২-৩ জন ডিফেন্ডারকে বিট করতে পারে। বিশেষণ হিসেবে ফুটবলীয় ভাষায় আমরা এদের বলতে পারি স্পীডস্টার। দ্বিতীয় রকমারিতায় আসে শক্তি আর উচ্চতার ব্যবহার। বর্তমানে এধরনের ফিনিশার বেশী ফুটবলে। শক্তি দিয়ে বল নিজের পায়ে রাখো কিংবা দখল কর আর উচ্চতা ব্যবহার করে হেড কর। মারিও গোমেজ, অবামায়েং, ইব্রাহিমোভিচ, ডিয়েগো কস্তা কিংবা মানজুকিচ কে এই ধাপে ফেলতে পারেন আপনি। এদের ফুটবলীয় ভাষায় আপনি বলতে পারেন এরিয়াল থ্রেট। এরপর যেই রকমারিতা আসে তা হল ড্রিবলার স্কোরার। তবে আগেই বলে নেই এই ধরনের স্কোরাররা অবশ্যই মেসি কিংবা হালের হ্যাজারড এর মত ড্রিবলিং এ পারদর্শী স্কোরার নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় সুয়ারেজ কিংবা বেনজেমা কিংবা লেওয়ান্ডস্কির কথা। এরা খুব সহজেই ডিবক্স কিংবা এর বাইরে ২-১ জনকে ড্রিবলে পরাস্ত করে স্কোর করতে পারে। এছাড়া আরও একটি রকমারিতা দেখা যায় যা বর্তমান ফুটবলে খুবই আনকমন। আর তা হল ডিস্টেন্স শুটার। যারা বক্সের বাইরে থেকে বেশী গোল করায়। এক্ষেত্রে তাদের শুটিং একুরেসি থাকা প্রয়োজন অনেক ভালো। ভ্যান পার্সি কিংবা ওয়েইন রুনি ছিলেন এ ধরনের স্কোরার। তবে এই সকল ধরনের স্কোরার যে শুধু এভাবেই গোল করে, তা কিন্তু নয়। এটা হচ্ছে তাদের কমন এবং বেস্ট এবিলিটির ব্যবহার। এদের মাঝে অনেকেই ২-৩ টি রকমারিতা নিজের ভেতর ঢুকিয়ে নিয়ে হয়ে যান পোচার কিংবা কমপ্লিট ফরোয়ার্ড। কিন্তু কেও কমপ্লিট স্কোরার নয়।

মজার বেপারটা এখানেই। ওয়ার্ল্ড ফুটবলে এখন পর্যন্ত ক্রিসই একমাত্র ফুটবলার যার মাঝে এই সকল রকমারিতা আছে এবং সে এই সকল ভাবেই স্কোর করতে পারে এবং প্রত্যেকটি গুণাবলীতে সে অসাধারনভাবে পারদর্শী। বরং এর সাথে আরও যোগ হয়েছে তার ফ্রি কিক স্কোরিং। আর একারণেই ক্রিস এরকম মুড়ি মুড়কির মত গোল করতে পারে একজন উইঙ্গার হয়েও। এই ছিল গল্পীয় অংশ। এবার আসি এসবের একটু ট্যাক্টিকাল ব্যখ্যায়।

শুরুতেই আসি তার গতির ব্যবহারে। মোরিনহোর আমলে রিয়াল মাদ্রিদের কাউন্টার এটাক পছন্দ করত না আর ভয় পেত না এরকম ফ্যান মনে হয় নেই। যাই হোক, সেই কাউন্টার এটাকের মেইন অস্ত্রই ছিল ক্রিস। ক্রিস কে নরমালি আপনি ট্র্যাক ব্যাক করে কোন অপনেন্ট মিডফিল্ডার কে মার্ক করতে দেখবেন, ইভেন বল যদি অপনেন্ট এর পায়ে ক্রিসের টীমের জোন ১৪ তে থাকে, তাও সে অপনেন্ট হাফে কিংবা মাঝমাঠে এমন কোন জায়গায় অবস্থান করে যেখানে সে টোটালি আনমার্কড কিংবা এটলিস্ট ২ জন প্লেয়ার তাকে মার্ক করে 
আছে। কারণ?

১. কাউন্টার এটাকের প্রথম ফরোয়ার্ড পাস যদি তার কাছে আসে আর সে যদি মার্কড থাকে তো ক্রিস তা কোন টীমমেট কে পাস করে তার জোনে চলে আসা। ফলে কি হয়? ক্রিস কে যারা মার্ক করে ছিল তারা আউট অফ ইকুয়েশনে চলে যায় নতুবা ট্র্যাক ব্যাক করতে বাধ্য হয় যার পায়ে বল তার কাছে। ফলাফল? ক্রিস পায় ফ্রি স্পেস আর সেই ফাকে সে জায়গায়মত পৌঁছে যায় ফিনিশিং এর জন্য। এর মাঝে যদি তাকেও পাসিং বিল্ডআপ এ অংশ নিতে হয় তো সে সেটাও করে। বাট তা অবশ্যই এমনভাবে যাতে বল ছেড়ে দেবার পর সে যেন আনমার্কড হয়ে যায় এবং ফাইনাল পাসের জন্য অপেক্ষা করতে পারে।

২. যদি সে আনমার্কড থাকা অবস্থায় বল পায় কাউন্টার এটাকের জন্য তো সে তার গতি ব্যবহার করে সেই স্পেসটুকু কভার করে যতক্ষণ না অপনেন্ট প্লেয়ার মার্ক করতে তার বিপদসীমায় চলে আসে। এতে ওই সময়ে ক্রিসের টীমমেটরা উপরে উঠে আসতে পারে এবং ডিফেন্ডার তার কাছে আসা মাত্র সে আনমার্কড টীমমেট এর কাছে বল পাস করে। ফলে যেই ডিফেন্ডারটি তাকে মার্ক করতে এসেছিল, আগের মতই সে আউট অফ ইকুয়েশনে চলে যায়। এভাবেই গতি আর অফ দ্যা বল, অন দ্যা বল উভয় মুভমেন্ট দিয়ে ক্রিস কাউন্টার এটাকে গোল করে।

৩. এবার আসি তার শক্তি আর উচ্চতার ব্যবহারে। সাধারনভাবে প্রতিটি মানুষ ১৮০ ডিগ্রী এঙ্গেলের সবকিছু তার দৃষ্টিসীমায় দেখে। একজন উইঙ্গার হবার কারণে ক্রিস মাঝে মাঝেই সেই দৃষ্টিসীমা উপেক্ষা করতে পারেন। শুধু তাই নয়, ফিনিশিং এ অসাধারণ হবার পরেও সে কখনওই নাম্বার ৯ পজিশনে নিজেকে মানিয়ে নিয়ে পারে না। কারণ সেখানে সে অলওয়েজ মার্কড থাকবে। উইঙ্গার হবার কারণে সে ডীফেন্ডারের অগোচরে ক্রস রান নেয় অপর পাশে যদি তার টীমমেট এর পায়ে বল থাকে। কেন? এতে ক্রসে সে খুব সহজেই হেডারে গোল করতে পারবে। বাট এই বিষয়ে তার কিছু ইউনিক এবিলিটি আছে। একটা উদাহরণ দিলে আশা করি ক্লিয়ার হবে।

 

 

ধরুন আপনি একজন হাই জাম্পার। আপনি গড়ে ৮-৯ ফিট উচ্চতায় লাফ দিতে পারেন। এ থেকে কি বোঝা গেলো? একজন স্বাভাবিক মানুষ হয়ত গড়ে ৫-৬ কিংবা ৭ ফিট উচ্চতায় লাফ দিতে পারে। এখন ধরুন আপনি একজন ফুটবলার এবং আপনি ৩ ফুট লাফিয়ে হেড করতে পারেন যা একজন ফুটবলার হিসেবে সরবোচ্চ। যেখানে সাধারণ একজন ফুটবলার ২ ফুট লাফাতে পারে। তাহলে ক্রস যদি আড়াই ফিট উচু হয়ে আসে তো আপনি তা সহজে স্কোর করতে পারবেন অথচ আপনাকে চার্জ করা ডিফেন্ডারের কাছে কিন্তু তা মোটেই সহজ হবে না। আবার ডিফেন্ডার জানে সে ২ ফিট লাফাতে পারবে। আসছে আড়াই ফুট উচ্চতার ক্রসে হেডেড ক্লিয়ারে জন্য লাফ দিলো। অন্য কেও হয়ত জানে না সে ব্যর্থ হবে কিনা। কিন্তু আপনি জানেন। কিভাবে? কারণ একজন ফুটবলার যদি সরবোচ্চ ৩ ফিট লাফ দিতে পারে দাঁড়িয়ে তো সেটা আপনি পারেন। সো আপনি সেই ডিফেন্ডারের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকলেও ইজিলি স্কোর করতে পারবেন কারণ সে মিস করবে হেডারটি। এখন আপনি ডিফেন্ডারের সামনে যেয়ে হেড করবেন নাকি পিছনে যেয়ে সেটা আপনার বেপার।


৪. এবার আসি ক্রিসের অফ দা বল মুভমেন্টের কথায়। তার ফেইক রানগুলো এখানে ইউনিক। সে সাধারানত ওয়াইড সাইডে রান নেয় যাতে ডিফেন্ডারের আড়ালে সে হেডিং পজিশনের স্থানে পৌছাতে পারে। এরপর তাকে চার্জ করতে আসা ডিফেন্ডারটিকে বোকা বানায় ঠিক ওইভাবে যেভাবে আপনি উদাহরনে বোকা বানালেন। আই মিন, দুই ফিট লাফ দিতে সক্ষম ডিফেন্ডার যদি ক্রিসের আগে লাফ দেয় আড়াই ফিট উচ্চতার ক্রসে তো সে সুন্দর মত তার পিছনে চলে আসে। কারণ সে জানে ডিফেন্ডার সেটি মিস করবে। অন্যদিকে যেহেতু ডিফেডারও তার সীমা যানে, সো সে যদি আগে লাফ না দিয়ে পিছিয়ে যায় ক্রিস কে মার্ক রেখে যেখানে ক্রসের উচ্চতা থাকবে ২ ফিট তো ক্রিস তখন টপকে সামনে চলে আসে এবং সেই উচ্চতায় লাফিয়ে হেড করে। তার শরীরের সকল অংশ দিয়ে সে স্কোর করতে সক্ষম হলেও আমাদ দৃষ্টি সে ক্রিস সবচেয়ে পারদর্শী এই হেডারে গোল করতে। ৬ ফুট দেড় ইঞ্চি উচ্চতার কারণে সে তার আকৃতির সঠিক ব্যবহার বেশ যথাযথ ভাবেই করে। এই গেলো তার ক্রসিং এ স্কোরিং। এবার আসি গ্রাউন্ড কি পাস কিংবা গ্রাউন্ড ক্রস কিংবা ট্যাপইনের কথায়। গ্রাউন্ড পাসে স্কোর করায় ক্ষেত্রে ক্রিসের ইউনিক বিষয়টি হল নিজের সামনে কিংবা আশে-পাশে এটলিস্ট ৩ ইয়ার্ড স্পেস বরাদ্দ রাখা? কিন্তু কেন? সে কিভাবে রাখবে আর রেখেই বা কি লাভ? উত্তর হল ক্রিস এই ৩ ইয়ার্ড জায়গা তার জন্য রাখে না। রাখে তার টীমমেট এর জন্য যাতে সে এনাফ স্পেস পায় তাকে গ্রাউন্ড পাস দেবার অথবা তার পাস যদি একুরেট নাও হয় তো ওই ৩ ইয়ার্ড এর মাঝ দিয়ে বল গেলে ক্রিস যেন তা থেকে স্কোর করতে পারে অথবা ওই স্পেস এ কোন ডিফেন্ডার আসলে যেন তাকে সে শক্তিতে পরাস্ত করে যেয়ে ফাইনাল টাচ দিতে পারে। ফাইনাল পাস পাবার কয়েক মুহূর্ত আগে ক্রিস তার রান থামিয়ে নিজেকে অনেকটা সরল দোলকের মত করে নেন যাতে টীমমেট ধারণা করে নিতে পারে কোন এঙ্গেল এ পাস দিলে তা ক্রিসের সীমায় পৌছে যাবে। এই পারফেক্ট পজিশনিং সেন্স ব্যবহার করার কারণে ক্রিস প্রচুর ট্যাপ ইন এবং গ্রাউন্ড পাসে স্কোর করতে পারে। প্রতিটি ফাইনাল রান সে নেয় তার বল পায়ে থাকা টীমমেট কে লক্ষ্য রেখে যাতে তার টীমেমেট তাকে হারিয়ে ফেললেও সে নিজে হারিয়ে না ফেলে ফাইনাল পাস পাবার আগে। এখন সবসময় তো আর সে ওই নির্দিষ্ট স্পেস রাখতে পারবে না তার জন্য কিংবা তার টীমমেট এর জন্য। তখন কি করে? এই সময় ক্রিসকে ৩ টি পন্থা অবলম্বন করতে দেখা যায়। আসুন একে একে দেখি পন্থাগুলো।

প্রথমত সে মাঠের অন্য জায়গায় ড্রিবল কম করলেও ওই সময় সে ড্রিবল করে কেননা তাকে সেই সময় ফাউল করা মানেই পেনাল্টি। অনেক ক্ষেত্রে সে ডি বক্সেই ২-১ জন কে কাটিয়ে স্কোর করে ফেলে।

দ্বিতীয়ত সে চাইলেও ডি বক্স এরিয়ার বল নিজের পায়ে রাখার সুযোগ পায় না। সেক্ষেত্রে ক্রিস তার পরিচিত পাওয়ারফুল লং রেঞ্জ শট এর সাহায্য নেয়। বক্সের বাইরে থেকে স্ট্রং এবং উইক দুই ফুটেই তার অহরহ গোল রয়েছে।

তৃতীয়ত সেইসকল ক্ষেত্রে সে টীমমেট সে দিয়ে স্কোর করায়। কিভাবে? নিজের পায়ে বল নিয়ে সে ওয়াইড এঙ্গেল এ রান করে যাতে ডি বক্সে ডিফেন্ডারের চাপাচাপি একটু কমে এবং তাকে মার্ক করে কেও তার পিছু নেয়। ফলে সেই স্পেসে থাকা/স্পেস দখল করা প্লেয়ারকে ক্রিস ক্রস কিংবা গ্রাউন্ড পাস দিতে পারে স্কোর করার জন্য। আর তাই প্লে মেকিং এর জন্যও ক্রিস একসময় সেরা ছিলেন। প্রচুর এসিস্ট ও রয়েছে তার।

যাই হোক, এবার আসি তার আরও কিছু এবিলিটি নিয়ে।

১. ক্রিস একজন কনফিডেন্ট পেনাল্টি টেকার এবং তার পেনাল্টি স্কোরিং রেশিও অন্যান্য সবার চেয়েই মোটামুটি ভালো। আগেও বলেছি কেন সে বেশী ফাউল এর শিকার হয়। এবার আসি কেন সে ফাউলের শিকার হয় তা নিয়ে।

২. শারীরিকভাবে ক্রিস অনেক স্ট্রং এবং লম্বা হবার কারণে ডিফেন্ডারের পুল কিংবা পুশ সহ্য করেও সে বল কন্ট্রোল করতে পারে। এখন ডি বক্সে ক্রিস কে ১ ইয়ার্ড জায়গা দেয়া মানেই তাকে স্কোর করার স্পেস দেয়া। তাই বক্সের ভেতর ডিফেন্ডাররা অলওয়েজ ট্রাই করেন ক্রিস কে ট্যাকল অথবা পুশ করে বল ক্লিয়ার করা। আর ক্রিস একারণেই বেশী ফাউলের শিকার হয় এবং পেনাল্টি বেশী পায়।

৩. এরপর আসি ওপেন প্লেস এ ক্রিসের স্কোরিং নিয়ে। ধরুন আপনার দলের আপনি সহ ৩ জন অপনেন্ট ডি বক্সে। কিন্তু সামনে ডিফেন্ডার মাত্র দুজন। সেক্ষেত্রে আপনারা চাইলেই দুজনে ওয়ান টু ওয়ান খেলে স্কোর করতে পারেন। বাট ৩য় ব্যক্তি হিসেবে যদি বক্সে ক্রিস থাকে তো প্রথমেই সে এমন একটি জায়গায় চলে যায় যেখানে আপনার বল পায়ে থাকা টীমমেটটি আপনাকে স্পট দেখতে পাবে। ফলে তাকে পাস দেয়ার একটি অপশন তৈরি হয়। কিন্তু সেই আনমার্কড জোনে গিয়ে ক্রিস স্টিল একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে যায় টীমমেট কে অবজারভ করার জন্য। যাতে টীমমেট সম্ভাব্য কোথায় পাস দিতে পারে এবং সেখান থেকে স্কোর করা তার সম্ভব কিনা। যদি তার আয়ত্তের বাইরে থাকে তো সেখানে সে লাস্ট চান্স স্কোরার হিসেবে থাকে যেগুলো অনেক সময় রিবাউন্ড করে তাকে স্কোর করতে দেখা যায়। কিন্তু যদি তার সেখান থেকে গোল করার সম্ভাবনা থাকে তো টীমমেট কে কোন নির্দেশনা ছাড়াই ক্রিস সেখানে পৌছে যায়। ফলাফল? উইং থেকে রানআপ নিয়ে আসা প্লেয়ারটি বক্সে যেখানেই বল পাস দিক, ক্রিস সবার আগে বলে টাচ নিবে এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা গোলে পরিনত হয়। আগেও একবার তার ট্যাপইনে গোল সংখ্যা কেন বেশী তার কারণ উল্লেখ করলেও বেসিকালি এই দুইটা উপায়ে সব ট্যাপইন গুলো আসে তার এবং এ কারনেই বিগত ২ বছর যাবত ক্রিস একজন উইঙ্গারের চেয়ে অনেকটা একজন সেন্ট্রাল ফরোয়ার্ড হিসেবে খেলতেই সাছন্দ্য বোধ করেন এখন। যদিও ইনজুরির কিছু ইস্যুও আছে এর পিছনে।

৪. তার সাথে আবার ক্রিসের কাঁধে রয়েছে ইউরোপের ওয়ান অফ দ্যা মোস্ট ফ্রি কিক টেকার উপাধি। ইউনাইটেডের জার্সি গায়ে নিজের প্রথম গোলটিও করেছিলেন ফ্রি কিক থেকে। অফিশিয়াল, আনঅফিশিয়াল সব মিলিয়ে প্রায় ৬০ এর বেশী তার ফ্রি কিক থেকে গোল সংখ্যা। তার পাওয়ারফুল মাপা শট কিংবা মানব দেয়ালের উপর দিয়ে আউট বেন্ডিং নাকল শট এগুলোকে নিজের সম্পত্তি বানিয়ে ফেলেছেন একরকম।

অর্থাৎ আপনি লং রেঞ্জ বলুন আর ট্যাপ ইন, হেডার বলুন আর ওয়ান অন ওয়ান, ডিফেন্ডারকে বামন বানানো বলুন আর ফ্রি কিক সকল দিক দিয়ে ক্রিস স্কোর করতে সক্ষম এবং তা খুব ভালোভাবেই। তবে যেই প্রধান জিনিসটি তাকে এই প্রত্যেকটি বিষয়ে আরও ধারলো করেছে তা হল তার অফ দ্যা বল মুভমেন্ট।

ফুটবল কিন্তু ছন্দের খেলা আর তাই নান্দনিকতায় ব্রাজিলের নাম সবার আগে আসে। কিন্তু মডার্ন ফুটবলে নান্দনিকতার চেয়ে ফলাফলে এবং ক্রিয়েটিভিটি তে সবাই মনযোগী। আমার দেখা অফ দ্যা বল মুভমেন্ট এ বেস্ট প্লেয়ার এই ক্রিস্টিয়ানো রোনালদো এবং সে এখানে ইউনিক, অদ্বিতীয়। তার প্রত্যেকটি রানআপ, ফেইক রানে ডিফেন্ডারকে বোকা বানানো, নিজের টীমমেট এর পাস কে খুজে নেওয়া, কর্নার কিকে দৌড়ে সবার সামনে যেয়ে মাপা একটা টোকা, উইং থেকে উড়ে আসা ক্রসে হেড এসবকিছুই ক্রিসের অফ দ্যা বল মুভমেন্ট এর খেলা। তার অফ দ্যা বল মুভমেন্ট নিয়ে কথা বলতে গেলে অনেক কিছু চলে আসবে। সে নাহয় আরেকদিন বলব।

গোল করাটা যেন ক্রিস্টিয়ানোর কাছে ছেলে খেলার মত। ইতালির ওয়ান অফ দ্যা গ্রেট কোচ কার্লো আঞ্চেলত্তি এ কারনেই বলেছিলেন,- আপনার দলে ক্রিস্টিয়ানো থাকা মানে আপনি অলরেডি ১-০ তে এগিয়ে আছে।
এর মানে কিন্তু শুধু তাকে প্রশংসা করাই নয়, তার কন্সিস্টেন্সি আর গোল করার আত্মবিশ্বাস থেকেই কিন্তু বলা।

আপনি ডান পা বলুন আর বাম পা, সব পায়েই সে সমান ভাবে শুট করতে সক্ষম। এছাড়াও ক্রিস এর আরেকটি বিষয় হল গোলপোস্ট এ প্রচুর শুট নেয়া এবং অধিকাংশ শুট অন টার্গেট এ রাখা। হোক ৪০-৪৫ ইয়ার্ড, সুযোগ পেলেই সে শট নিবেই। এতসব গুণাবলীর সাথে তার যোগ হয়েছে প্রচন্ড আত্মবিশ্বাস আর পরিশ্রম করার অভূতপূর্ব মানসিকতা। ২০১৫ সালে ওয়ার্ল্ড বেস্ট হিউম্যান বডির পুরষ্কার সে একারণেই জিতেছিল। ফিটনেস এবং ফিজিক্যাল এট্রিবিউটস এ ক্রিস সর্বদা সচেতন।

আর এভাবেই একবিংশ শতাব্দি খুজে নিলো ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা এক গোলস্কোরার কে। 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন