একজন রোনালদিনহো এবং মেসি সমাচার

একজন রোনালদিনহো এবং মেসি সমাচার
Sadman Taha July 5, 2017, 4:33 pm La liga santander

রোনালদিনহোর বার্সার হয়ে শেষ দিনগুলোতে মেসির আগমন বার্সার মূলদলে। দিনহো তখনও বার্সার মেইন ম্যান। বিশ্বসেরা ফুটবলার হিসেবে তখনও মেনে নিত মানুষ তাকে, যদিও পিক ফর্ম হারিয়ে তখন পার্ফরমেন্স পড়তির দিকে কিছুটা । সে সময় মেসির দুর্দান্ত ডেব্যু একবারের জন্য হলেও কিউল ম্যানেজারকে স্বস্তি দিয়েছিল নিঃসন্দেহে। যেমন ধরেন, মেসি বার্সা ছাড়ার পর তার জায়গা কে নিবে এই ব্যাপারে প্রত্যেক বার্সা ফ্যানই অনেক চিন্তিত এবং বার্সা ম্যানেজমেন্টও একই অবস্থায় আছে এ মুহূর্তে। মেসি ২০২১ পর্যন্ত চুক্তি নবায়ন করেছে । সে সময় অর্থাৎ আর ৪ বছর পর মেসির বয়স গিয়ে দাঁড়াবে ৩৪। তারপর? ঠিক এমনই পরিস্থিতিতে রোনালদিনহোর বার্সায় শেষ সময়ের দিনগুলোতে পড়েছিল বার্সা বোর্ড,ম্যানেজমেন্ট। মেসি এসে খুব দ্রুতই দুশ্চিন্তামুক্ত করে পুরো কাতালান ক্লাবটির বোর্ড, ম্যানেজমেন্ট এবং সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা সব ফ্যানদের। অর্থাৎ, মেসি খুব দ্রুতই রোনিকে রিপ্লেস করেন।

এবার শিরোনামে আসি, পিক ফর্মে এরা দুজন কেমন ছিলেন? প্রথমেই রোনিকে নিয়ে কথা বলি। বলা হয়, পিক ফর্মের রোনি গ্রেটেস্ট ফুটবলার এভার। কথাটার প্রচলন এমনি এমনি হয়নি নিশ্চয়ই। পিক ফর্মের দিনহো বার্সা এবং ব্রাজিলের হয়ে যা করেছেন, এক কথায় অবিশ্বাস্য! গ্যালাক্টিকো যুগের তারকাবহুল মাদ্রিদ টিমকে একাই পর্যদুস্ত করে গেছেন, যতদিন ছিলেন। ভাবা যায়? জিদান, বেকহাম, রোনালডো, কার্লোস, ম্যাকলেলে, রাউলদের মাদ্রিদের বিরুদ্ধে একাই ম্যাচ বের করে আনা মুখের কথা নয়। এ কাজটি ধারাবাহিকভাবে করে দেখিয়েছেন একজনই। তিনিই রোনালদিনহো। সে সময় বার্সার আক্রমনের সূচনা, সমাপ্তি দুটোতেই রোনালদিনহোর দেহের ছোঁয়া থাকতই। তার সেই বিখ্যাত নো লুক পাসের কথা মনে আছে সবার নিশ্চয়ই। রিসেন্টলি বেশ কয়েকটা লেজেন্ডস ম্যাচেও এই কারিশমা দেখিয়েছেন তিনি। বল নিজের কন্ট্রোলে রেখে একদিকে নজর দিয়ে মার্কারদের নজর একদিকে রেখে হুট করে অন্যদিকে বল পাঠিয়ে দেয়ার কাজটা করায় পটু এই রোনালদিনহোই। আর ড্রিব্লিং? সর্বকালের সেরাদের মধ্যে সেরা তিনে রাখব আমি তাঁকে। পেস,ড্রিবলিং, বল কন্ট্রোলিং, ফিনিশিং, ফ্রিকিক কোনকিছুতেই কমতি ছিল না ফুটবলের এই কম্পলিট প্যাকেজের। রোনালদিনহোর স্ট্যাটিস্টিক্স দেখে তাকে মাপতে গেলে আপনি বড্ড ভুল করবেন। বার্সার হয়ে ২০০ এর অধীক ম্যাচে ৯৪-৯৫ গোল সাথে, ৬০-৭০ এসিস্ট। এ তো এ সময়ের অনেক এভারেজ প্লেয়ারের স্ট্যাটস। আসলে দিনহো পুরো ক্যারিয়ারে এমন রোল প্লে করে এসেছেন যে তিনি স্কোরিং বা ক্রিয়েটিং যা ইচ্ছা তাতেই অংশ নিতেন। হ্যাঁ, তার রোল সম্পর্কে কথা বলতে আসি এবার। স্কোরার রোল প্লে করেননি কখনোই। যদিও গোল করতে পারার এবং গোল তৈরি করার উভয় এবিলিটিই থাকায় চাইলে যেকোন জায়গায় খেলতে পারতেন তিনি, উইং এ বা সেন্টার পজিশন। লেফট উইং খুব সম্ভবত তার পছন্দের জায়গাই ছিল মাঠে। সেখান থেকেই দারুণ সব গোল করে এবং করিয়ে বার্সাকে অনেক বছরের লীগ খরা কাটাতে মূল ভুমিকা এই কুতসিত লোকটারই।

দিনহোকে নিয়ে লিখতে গিয়ে তাঁর বার্সা অধ্যায় নিয়েই শুধু বলছি কেন? কারণ হচ্ছে শিরোনামটা। আর রোনি তাঁর পিক ফর্ম যে বার্সায়ই কাটিয়ে যান। বার্সায় জয়েন করার আগেও তিনি অন্যতম সেরাদের কাতারেই ছিলেন। কিন্তু বার্সায় এসে তিনি সেরাদের সেরা জায়গাটায় বসে পড়েন অতিমানবীয় পারফর্মেন্স করে। তার পিক ফর্মেই বার্সা লীগ খরা ঘোচায়, উচল জিতে নেয়, ব্রাজিল বিশ্বকাপ জেতে এবং সবগুলো অর্জনে তিনি মূল ভুমিকাই রেখেছিলেন। পিক ফর্মের দিনহো ভয়ংকর সুন্দর ছিলেন। সুন্দর ফুটবলের মাধ্যমেই প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করেছেন সে সময়। তার এই ভয়ানক সৌন্দর্যই ইউরোপিয়ান বাকিসব জায়ান্টদের আউটপ্লে করে দিত তখন। তাই, পিক ফর্মের দিনহোকে গ্রেটেস্ট অফ গ্রেটেস্টস মানতে কষ্ট হয়না ফুটবল ফ্যানদের। রোনালদিনহোর হেটার বোধহয় সারা বিশ্বে একজনও খুঁজে পাওয়া যাবে না। সারা বিশ্বের প্রত্যেক ফুটবলপ্রেমী তাঁকে ভালবাসে। বল যেভাবে দিনহোর পায়ের সাথে সেঁটে থাকে, তা দেখে যে কেউ যদি বলে দেয় যে ফুটবলও তাঁকে সারা বিশ্বের সব ফুটবলপ্রেমীর মতই ভালবাসে; ভুল হবে?

 

 

এবার আর্জেন্টাইন ম্যাজিশিয়ান লিওনেল মেসির পিক ফর্ম তুলে ধরার চেষ্টা করি। দিনহোর উত্তরসূরি হিসেবে মেনে নিয়েছিল তাকে প্রায় সবাই বার্সা মূল দলে তার প্রথম দিনগুলোতেই। মেনে নিবেই না কেন? প্লেয়িং স্টাইল যেন দিনহোর প্রতিচ্ছবি। শুধু মেসি বাঁ পায়ের ফুটবলার, দিনহো ডান পায়ের ; এটুকুই ডিফারেন্স। লিওনেল মেসিকে দিনহোর প্রতিরুপ বললে এক বিন্দুও ভুল হবে না। দিনহোর শেষ কিছুদিন একসাথেই প্রতিপক্ষকে কুপোকাত করেছেন দুজনে। দিনহো তখন যোগানদাতা এবং মেসি দারুণ ড্রিবলিং, বল কন্ট্রোলিং এবিলিটির ব্যবহার করে গোল দিচ্ছেন এবং একইসাথে সতীর্থদের জন্য গোলের সু্যোগ করে দিচ্ছেন। দিনহোর পর থেকে বার্সা মেসি-জাভি-ইনিয়েস্তা- বুস্কেটস এবং বাকিদের দুর্দান্ত টিমওয়ার্কে ভর করে দারুণ সময় কাটায় ইউরোপে। টিকিটাকা দিয়ে পেপের বার্সা তখন সর্বজয়ী। বার্সার সে সময়ের টিমটাকে সর্বকালের অন্যতম সেরা দল হিসেবে গণ্য করা হয়। মেসির ভুমিকা ছিল তাতে ফলস নাইন বা সেকেন্ডারি স্ট্রাইকার হিসেবে। ফলস নাইন হিসেবে সর্বকালের সেরা ফুটবলার নিঃসন্দেহে লিও মেসি। এ সময় দলের প্রাণ বনে যান তিনি। মাঝ মাঠ থেকে একক প্রচেষ্টায় দারুণ ক্লোজ কন্ট্রোলের সাহায্যে কখনও দারুণ সব ফিনিশিং দিতেন, কখনও বা মাঝ মাঠ থেকে একা নিয়ে আসা বলটাই সুবিধাজনক অবস্থানে থাকা সতীর্থর দিকে ঠেলে দিতেন দারুণ স্কিল এবং বুদ্ধিমত্তায়। এটাই লিওনেল মেসি, যার শক্তির জায়গা হচ্ছে অসাধারণের থেকেও বেশি কিছু এই "ক্লোজ কন্ট্রোল"। দুর্দান্ত স্পিড এবং বডি ফেইন্টে একের পর এক মার্কারকে পরাস্ত করে প্রতিপক্ষের ডিবক্সে থাকা শেষ প্রহরীকেও হিউমিলেট করাই বোধহয় মেসির প্রিয় কাজ।

সর্বকালের অন্যতম সেরা কোচদের একজন পেপ গার্দিওলা একবার মেসির ব্যাপারে বলেছিলেন, "মেসি আমার দেখা একমাত্র ফুটবলার যে বল ছাড়া যত দ্রুত দৌড়াতে পারেন, বল পায়ে তার থেকে অনেক বেশি দ্রুত দৌড়াতে পারেন।"

 

এভাবেই নিজের খেলা সেরা সময়ে ১ ক্যালেন্ডার ইয়ারে সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড করেন। ৯১ গোল এক বছরে! চিন্তা করত তখন কেউ? জার্ড মুলারের বহু আগে গড়ে যাওয়া এ রেকর্ড কেউ ভাঙবে, তাওতো ভাবেনি কেউ। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করলেন ছোটবেলায় হরমোনজনিত অসুখে ভোগা লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। এ সময় মেসি স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন দলে, ক্যাম পজিশনে ছিলেন সেস্ক ফ্যাব্রেগাস ; সে সময়ের সেরা ক্যাম তিনিই ছিলেন। মেসি এবং দিনহো একইরকমের প্লেয়ার প্রায়। এ জন্যেই তারা যেকোন অফেন্সিভ পজিশনেই খাপ খাইয়ে নিতে পারেন দ্রুতই। ২০১২-১৩ সিজনে সর্বোচ্চ ৭৩ গোলের রেকর্ড গড়েন স্ট্রাইকার হিসেবে খেলে। মেসি যে সে সময়ও টিপিক্যাল ট্যাপ ইন প্রত্যাশী স্ট্রাইকারদের মত নন, সেটা তার সে সময়ের ম্যাচ গুলো দেখলেই পরিস্কার বুঝবেন। উইং ছেড়ে স্ট্রাইকার হিসেবে খেলেন, তাও স্বভাবজাত ৩-৪-৫ জনকে ড্রিবল, বডি ফেইন্ট, ক্লোজ কন্ট্রোলে পরাস্ত করতেই থাকেন প্রত্যেক ম্যাচে। কখনও নিজে দারুণ ফিনিশিং এ গোল করেন, কখনও বা এসিস্ট করে সতীর্থকে দিয়ে গোল করান। ২০১২-১৩ মৌসুমকে মেসির বেস্ট সিজন বলা হয় শুধু তার গোল স্কোরিং স্ট্যাটস এর জন্যই না। বরং বার্সার হয়ে অনবদ্য স্কিলফুল খেলায় একইসাথে স্কোরিং করে নিজেকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ায় এবং এ পারফর্মেন্সে ভর করেই বার্সা যেভাবে ইউরোপিয়ান সুপার জায়ান্ট টিমগুলোকে একরকম ধ্বংস করে দিয়েছিল। এই মৌসুমেই দেখা যায় "হাও গুড মেসি ইজ এট হিজ বেস্ট"। রোনালদিনহো - যার খেলা দেখে আমি ফুটবল দেখা শুরু করি ;বার্সা, ব্রাজিল ফ্যান হই। রোনালদিনহোর পাশে মেসিকে খেলতে দেখেই মেসির ফ্যান হয়ে যাই একসময়। তাই দুজনই আমার চোখে সেরার তালিকায় অনেক উঁচুতেই থাকবে সবসময়ই। মেসি এবং রোনালদিনহোর খেলা লাইভ দেখাটা জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তিগুলোর একটি।





Similar Post You May Like

Find us on Facebook