ফ্যাসিবাদ এবং ফুটবলঃ ইতালি এবং মুসোলিনি অধ্যায়

ফ্যাসিবাদ এবং ফুটবলঃ ইতালি এবং মুসোলিনি অধ্যায়
Kamil Al Ashik July 4, 2017, 5:30 pm Articles

ফ্রান্সের মার্শেই শহরে '৩৮ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচ শুরু হতে যাচ্ছে। ইতালি আর নরওয়ের মাঝের খেলা। হঠাৎ চারদিক থেক্ব দুয়োধ্বনি আর হুইসেলের শব্দ তেড়ে আসতে থাকে ইতালির প্লেয়ারদের জন্য। ইতালিয়ান "ফ্যাসিস্ট তথা ফ্যাসিবাদী নেতা মুসোলিনির বিরুদ্ধে উপস্থিত দর্শকদের আন্দোলন আরকি!
তা দেখে দলের কোচ ভিত্তোরিও পোজ্জো দলকে আদেশ করলেন কুখ্যাত "ফ্যাসিস্ট" স্যালুট দিয়ে ধরে রাখার। যতক্ষণ পর্যন্ত দর্শকরা ক্ষান্ত হয়ে না বসেছিল, ততক্ষণ পর্যন্ত চলে সেই স্যালুট।

ফ্যাসিবাদ! প্রথম বিশ্বযুদ্ধে ইতালির অবিস্মরণীয় জয়ের পর যুদ্ধে যাওয়া উদ্ধত তরুণদের মাঝে বিপ্লবী একটা ভাব চলে আসে। স্বাধীনতার ষাট বছর পরও ধুকতে থাকা ইতালি, রাজতন্ত্রের ভারে ন্যুব্জ হয়ে যাওয়া অবস্থা। গরিব দিন দিন গরিব হয়েই যাচ্ছে, আর ধনীরা ফুলে ফেঁপে উঠছে। 
এ অবস্থায় সেই বিশ্বযুদ্ধে যাওয়া তরুণদের একাংশ আন্দোলন শুরু করে, যার নেতা ছিলেন কুখ্যাত ফ্যাসিবাদী নেতা বেনিটো মুসোলিনি। 
ফ্যাসিজম বা ফ্যাসিবাদ ব্যাখা করা হয় যদি, তবে এটা হচ্ছে একটা চরমপন্থী, জাতীয়তাবাদী, কর্তৃত্বপরায়ন রাজনৈতিক মতাদর্শ। এই দর্শন সবকিছুকেই রাষ্ট্রের নামে নিজেদের অধীন বলে মনে করে। রাষ্ট্র হচ্ছে বর্ম, নেপথ্যে থাকে একটি সর্বগ্রাসী দল বা গোষ্ঠী, ফ্যাসিবাদ যাদের আদর্শ। ফ্যাসিবাদে রাষ্ট্রের গুরুত্বের ওপর জোর দেয়া হয়। ফ্যাসিবাদ সেই গণতান্ত্রিক পদ্ধতির বিরোধী, যে গণতন্ত্রে জাতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতা দিয়ে বিচার করা হয়। এখানে ভিন্নমতের কোন ঠাঁই নেই। এ জন্য ফ্যাসিবাদে ভিন্নমতকে সহ্য না করে দমন করা হয়। 
সহজ কথায়, ফ্যাসিজম হচ্ছে ব্যক্তিতন্ত্র সরকার ব্যবস্থা,যেখানে জনগনের অধিকার প্রতিষ্ঠা করার কোনো সুযোগ থাকে না।

 

ইতালিয়ানদের ফ্যাসিস্ট স্যালুট

 

ফ্যাসিবাদের সাথে ফুটবলের সম্পর্ক কি? অবাক হলেও সত্য, এই ফ্যাসিবাদ নীতির ফলই আজকের ইতালিয়ান ফুটবল লীগ, সিরি-আ।

মুসোলিনি যখন ফ্যাসিবাদের দোহায় দিয়ে ইতালি দখল করলেন, তখন তার সর্বপ্রথম লক্ষ ছিল জনপ্রিয়তা সমগ্র ইতালিয়ান এবং বিশ্ববাসীদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়া। ফুটবল এবং খেলাধুলা ছিল এরই একটা ধাপ। অলিম্পিকের মত বিশাল ক্রিয়া উৎসব থেকে এ ধারণা পান মুসোলিনি, যখন দেখেন দেশ বিদেশের দর্শক,খেলোয়াড়রা সেখানে অংশ গ্রহণ করেন।
এছাড়া আরেকটা সুপ্ত কারণ ছিল বলা হয়ে থাকে। মুসোলিনি বিশ্বাস করতেন, যখম দেশের তরুণ প্রজন্ম খেলাধুলা নিয়ে ব্যস্ত থাকবে, তখন তারা রাজনীতি নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় কম পাবে। ফলে তার প্রতিদ্বন্দ্বী আসার সম্ভবনাও কমে যাবে দেশে। 
এরই ফলশ্রুতিতে মুসোলিনি নির্দেশ করেন আর্মির মত ফুটবল দল গঠন করতে, যেখানে ড্রিল-আদব-কায়দা দ্বারা এক একজন ফুটবল সৈনিক তৈরি করা হবে।

ইতালিয়ান লীগ শুরুর ঘটনাটা আবার আরেক। প্রচুর খরচ করে যায়গায় ফ্যাসিস্ট থিয়েটার তৈরি করে সরকার যার ক্যাপাসিটি ছিল ২০০০০ এর মত। কিন্তু শেষে দেখা যায় দু লাখেরও বেশি মানুষ যাচ্ছে প্রতি সপ্তাহে ফুটবল খেলা দেখতে। উলটো দিকে সরকারের থিয়েটার আইডিয়া ফ্লপ। এখন টাকা কামাই এর খুব ভালো উপাই দেখে যায়গায় যায়গায় এবার ফুটবল স্টেডিয়াম করে তুলল সরকার। সেই সাথে শুরু করে দিল লীগ- কম্পিটিশক। প্রথম বছর উত্তর-দক্ষিন দু দিকে আলাদা ভাবে লীগ করা হলেও ১৯৩০ সালে অর্থাৎ পরের বছরই দুই লীগ একত্রিত করে মুসোলিনি গড়ে তোলেন সিরি-আ। তবে এ সময় মুসোলিনির ইতালিয়ান জাতীয় দলকে সেরা বানানোর দূর দৃষ্টিও ছিল ব্যবসার পাশাপাশি। কারণ ভালো খেলোয়াড় উঠে আসতে ভালো কম্পিটিশন দরকার। ভালো কম্পিটিশনের জন্য সুযোগ সুবিধা এবং মাধ্যম দরকার। আর ভালো খেলোয়াড় উঠে আসলেই ইতালিয়ান জাতীয় দলের মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বে শো অফ করতে পারবেন মুসোলিনি।

১৯৩০ বিশ্বকাপটাকে মুসোলিনি নিজের দেশে করাতে চেয়েছিল, নিজেদের সাম্রাজ্যের বাহার শো অফ করার জন্য। কিন্তু ব্যর্থ হওয়ায়, ইতালি দলকেই যেতে দেয় নাই উরুগুয়ে তে। পরের বিশ্বকাপ যখন ইতালিতে হবে বলে ঠিক হয়, তখন সেই শোধ নিতেই কিনা স্বয়ং বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে আসলোই না ইতালিতে বিশ্বকাপ খেলতে। এদিকে নিজেদের শক্ত দল গঠনের পাশাপাশি অন্য দেশ থেকে বিপুল টাকায় প্লেয়ার আনা শুরু করে ইতালি, যাদের আনা হত, তাদের নাম দেয় "oriundi" 
এরা ইতালিয়ান লীগে খেলার জন্য ল্যাতিন আমেরিকা থেকে এসেছিল, কিন্তু পরে উন্নত জীবনের লোভ আর টাকা পয়সা দিয়ে ব্রেইন ওয়াশ করিয়ে ইতালিয়ান দলের হয়ে খেলতে নামিয়ে দেওয়া হয়। যাদের মাঝে মূল তিনজন ছিলেন আগে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলে আসা লুইসিতো মন্তি, রাইমুন্দো অর্সি, এনরিকো গুয়াইতা। উল্লেখ্য তিনজনই আর্জেন্টিনার সেরা প্লেয়ারদের একজন ছিলেন। এদের সাথে মিলান লিজেন্ড মিয়োজ্জা যুক্ত হলে অসাধারণ দল হয়ে যায় ইতালি। 
উল্টো দিকে আর্জেন্টিনা পাঠায় খুবই দূর্বল এক দল, যার ফলে আগেই বিদেয় হয়ে যেতে হয় তাদের।

এ গেলো ফুটবলার আনার ব্যাপার। এরপর কোয়ার্টার ফাইনালে স্পেনের সাথে ম্যাচে বিশ্ব দেখলো সর্বকালের সর্ব নিকৃষ্ট রেফারি। সেই ম্যাচের আগে নাকি স্বয়ং মুসোলিনি রেফারির সাথে ডিনার করেছিলেন। ম্যাচে একের পর এক ডিরেক্ট লাথি-কিল মারামারি করে দু দলই। স্পেনের গোল বারে ছিল লিজেন্ডারি কিপার জামোরা (যার নামানুসারে জামোরা ট্রফি দেয়া হয় স্প্যানিশ লীগের সেরা কিপারকে)।
সেই জামোরাকে পারি দিয়ে গোল করতে বারবার ব্যর্থ হওয়ায় ইতালির প্লেয়াররা চারদিক দিয়ে ঘিরে ধরে থাকে ডিবক্সের মাঝে। এরপর বল নিয়ে যাওয়ার নাম করব কনুই দিয়ে গুঁতো, বল শুটের নামে লাথি মারা শুরু করে। ফলে ইঞ্জুরিতে পরেন জামোরা। ম্যাচ শেষ হয় ১-১ গোলে।
পরদিনই খেলা হয় রিপ্লে ম্যাচ, যাতে ইঞ্জুরি থেকে রিকোভারির কোন সুযোগ না পায় জামোরা। ফলে রিজার্ভ কিপার নিয়ে নামে স্পেন। সেই ম্যাচে চার স্প্যানিশ প্লেয়ার ইঞ্জুরিতে পরে ম্যাচ থেকে ছিটকে যান।

পরের ম্যাচ, সেমি ফাইনাল ছিল অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে, যেই অস্ট্রিয়া ওয়ার্ন্ডার টিম নামে খ্যাত ছিল। পাসিং ছিল সেই দলের বিশিষ্টতা। অস্ট্রিয়া দলের পাসিং ট্যাকটিকস নাকোচ করে দিতে পুরো মাঠ কাদাময় করে রাখে ইতালি। ফলে অস্ট্রিয়ার স্বাভাবিক পাসিং খেলা নষ্ট হতে থাকে। সে ম্যাচেও নাকি বার বার রেফারি ভুল ডিসিশন দিয়েছিল। অস্ট্রিয়ান লিজেন্ড জোসেফ বাইকান, মারা যাবার আগ পর্যন্ত বলে গিয়েছেন, তিনি নাকি স্বয়ং রেফারিকে বল ক্লেয়ার করতে দেখেছেন ইতালিয়ান কিপারের কাছে থেকে। বলা হয়ে থাকে, ফ্যাসিস্ট ভি আই পি বক্সে নাকি দেখা গিয়েছিল সেই ম্যাচের রেফারিকে ফাইনালের দিন, হাসিমুখে ওয়াইন পান করছেন ইতালির নেতা-হোতাদের সাথে।

 

ইতালিয়ান সেই জাতীয় দল

 

ফাইনালে যখন ২-১ এ চেকদের হারিয়ে ইতালি জিতল, তখন ওয়ার্ল্ডকাপ তথা জুলেরিমে ট্রফির পাশাপাশি আরেকটা ট্রফি ইতালিকে দেন স্বয়ং মুসোলিনি, যার আকৃতি ছিল প্রায় তিন গুন বড় বিশ্বকাপ ট্রফিটার চেয়েও আর নাম ছিল "কোপা দেল ডিউস" তথা "সম্রাটের কাপ।"

পরের বিশ্বকাপ অর্থাৎ '৩৮ বিশ্বকাপ দিয়ে শুরু হয়েছিল লিখাটা, সেখানে ফিরে যাই। প্রথম ম্যাচের কান্ডের পর দ্বিতীয় ম্যাচে হোস্ট ফ্রান্সের সাথে ইতালির খেলা। ফ্রান্সের জার্সিও নীল, তাই ইতালী নীল পড়তে পারবেনা। সবাই ইতালিকে সাদা জার্সিতে দেখতে অপেক্ষা করছিল। কিন্তু শেষমেশ ইতালি মাঠে নামে ফ্যাসিবাদীর প্রতিক ফুল ব্ল্যাক জার্সিতে।

হাঙ্গেরির সাথে ফাইনালের আগে একটা টেলিগ্রাম এসেছিল ইতালিয়ান দলের জন্য। যাতে বলা হয়েছিল, “Vincere o morire" অর্থাৎ হয় জিতো নয় মরবে।
কথাটা ইতালিয়ান ফুটবলার তথা সৈনিকরা এতটাই সিরিয়াসলি নিয়েছিল যে জিতেই ফিরেছে তারা। ম্যাচ শেষে হাঙ্গেরির কিপার হানতাল জাবো এজন্যই বলেছিল হয়ত, "আজ আমি চারটা গোল হতে দিয়েছি, কিন্তু বিনিময়ে ওদের পুরো দলের জীবনটা বাঁচিয়ে দিয়েছি।"

 

(পরের পর্ব আসছে)





Similar Post You May Like

Find us on Facebook