ফুলব্যাকঃ একবিংশ শতাব্দীর ফুটবল বিপ্লব

ফুলব্যাকঃ একবিংশ শতাব্দীর ফুটবল বিপ্লব

ফুলব্যাক। বর্তমান সময়ের ফুটবলের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। সাইডলাইনের দাগ ধরে অবিরাম উঠানামা করা মাঠের সবচেয়ে পরিশ্রমী খেলোয়াড়যুগল। পজিশন হিসেবে বলতে গেলে দুই বা তিনজন মূল রক্ষণপ্রহরীর ডানে বামের দুই ডিফেন্ডার, উইং ধরে প্রতিপক্ষ যাতে আক্রমণে না আসতে পারে এটা নিশ্চিত করার জন্যই মূলত এই পজিশনের উৎপত্তি।

তড়িৎগতির ‘উইংরান’ আর বক্সে গোলার মত ক্রসগুলো উৎসেই সমাপ্ত করে দেওয়াই মুল কাজ। কিন্তু যুগে যুগে পাগলাটে, আক্রমণাত্বক কিছু ম্যানেজার আর রোমাঞ্চপ্রিয় কিছু ফুলব্যাকের আপাত পাগলামী যে এক সময় আধুনিক ফুটবলের অন্যতম অস্ত্র হয়ে উঠবে কে ভেবেছিল?

একবিংশ শতাব্দীর ফুটবলে আক্রমণাত্বক ফুলব্যাক ছাড়া আক্রমণ যেন ঠিক জমেনা। মাঝেমাঝে যে বিপদ ডেকে আনেনা এই অতি আক্রমণাত্বক মনোভাব তা বলা যায়না, কিন্তু প্রতিপক্ষ রক্ষণের ঘুম হারাম করা দুজন ফুলব্যাক দলে থাকলে ওটুক আধুনিক ফুটবলে ‘ক্যালকুটেড রিস্ক’ হিসেবে ছাড় পেয়ে যায়!

 

ঠিক কতটা গুরুত্বপুর্ণ হয়ে উঠেছে এই ‘লেফট ব্যাক’ আর ‘রাইট ব্যাক’ পজিশন দুটো  সেটা গত কয়েক বছরের সফলতম দলগুলোর ফুলব্যাকদের নাম দেখলে আরো পরিষ্কার হয়ে যায়।

গত দশকের সেরা দলগুলোর লিষ্ট করতে গেলে সবার আগে আসে পেপ গার্দিওলার সেই অজেয় বার্সেলোনা। ধীরগতির পাসিং আর ডমিনেটিং ফুটবল খেলা সেই দলের কেন্দ্র আর মূল স্কোরার লিও মেসিকে সাহায্য করতে মিডফিল্ডে জাভি-ইনিয়েস্তা-বুস্কেটস, আক্রমণভাগে ভিয়া-পেদ্রো-সানচেজরা ছিলেন। কিন্তু অনুমান করুন লিওনেল মেসির বার্সা ক্যারিয়ারের অবিশ্বাস্য সংখ্যক গোলের সর্বোচ্চ কারিগর কে? হ্যাঁ, দলের রাইটব্যাক দানি আলভেজ!

কিংবা শেষ চার মৌসুমে তিনবার চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতা রিয়াল মাদ্রিদের দিকে তাকান। দলের প্রাণভোমরা রোনালদোর পাশে মদ্রিচ-ক্রুস-বেল-বেঞ্জেমা থাকার পরও এমনকি আলোচিত ‘বি-বি-সি’ এর চেয়েও কার্যকরী ছিলো মার্সেলো-রোনালদো জুটি যেখানে মার্সেলোর পজিশন আসলে কিনা লেফটব্যাক!

                                     

 

ফুলব্যাকদের আক্রমণে আসার এ সংস্কৃতির শুরুতে যে বাধা আসেনি তা কিন্তু নয়। তৎকালীন জনপ্রিয় ফরমেশনগুলোতে মাঝে দুই ফরোয়ার্ডের পাশে ‘উইং’ নামক জায়গাটা আউট এন্ড আউট উইংগারদের দখলেই থাকত। এযুগের কাট-ইন করা উইংগার সংখ্যা যেহেতু কম ছিল, আর প্রতিপক্ষ ফুলব্যাকদের পরীক্ষা নেওয়ার কাজটা উইংগাররাই করত, তাই ফুলব্যাকদের আর নিজ ডিফেন্স ছেড়ে খুব একটা প্রতিপক্ষ এলাকায় যাওয়া লাগত না।  আর নিয়ম ভেঙ্গে পাগলাটে কেউ উঠে গেলেও সেটাকে খুব কমই প্রশ্রয় দেয়া হত।

চিন্তা করুন ইন্টার মিলানে যোগ দেওয়ার এক বছরের মাথায় রবার্তো কার্লোস দলে জায়গা হারান। খেলোয়াড়ি দক্ষতার অভাবে না। কোচ রয় হজসন খুঁত ধরেছিলেন তার অতিরিক্ত আক্রমণমনষ্কতায়! সেই কার্লোসকে তৎকালীন রিয়াল মাদ্রিদ কোচ ফ্যাবিয়ো ক্যাপেলো যখন লুফে নিলেন, ভুরু কুচকানোর লোকও নেহাত কম ছিলো না। কিন্তু পরবর্তী কয়েক বছর কার্লোস যা করলেন তা শুধু নিজের বদনামই ঘুচালো না, নিজ পজিশনের সংগাটা আক্ষরিক অর্থে নতুন করে লিখালো!

 

পাগলামীর শুরুটাও ব্রাজিলিয়ানদের হাত ধরেই। ’৫৮, ’৬২ বিশ্বকাপে ব্রাজিলের  নিয়েলটন সান্তোস আর জালমা সান্তোস পদ্ধতিটা দেখিয়ে যান। তবে নজরে আসে ৭০ দশকের দিকে কিংবদন্তী কার্লোস আলবার্তোর মাধ্যমে।  ’৭০ বিশ্বকাপ ফাইনালে তার সেই গোল, যেখানে ডানদিক ধরে তার ধেয়ে আসা কল্পনাই করতে পারেনি ইতালী ডিফেন্স! একজন ডিফেন্ডার যে এভাবে ঝড়ের বেগে বক্সে ঢুকে যাবে সেযুগে যে ভাবাই যেত না! তৎকালীন ব্রাজিলিয়ান ঘরোয়া ফুটবলে এর চর্চা থাকলেও বিশ্ব দেখে সেই প্রথম।

কিন্তু তবু ইউরোপিয়ান ফুটবল তখন এই ধরণটা  ঠিক গ্রহণ করতে পারেনি। বিপ্লব ঘটালেন সেই কার্লোস আর তারই ব্রাজিলীয় সতীর্থ কাফু। ব্রাজিল জাতীয় দলের হয়ে প্রতিপক্ষ ফুলব্যাকদের ঘোল খাওয়ানোর কাজটা নিয়মিতই করতেন তারা। কিন্তু ইউরোপিয়ান ট্যাকটিসিয়ানরা যে চুপচাপ মার খাওয়ার নয়! এ শতাব্দীর শুরু থেকেই ধীরে কিন্তু কার্যকরভাবে পাল্টানো শুরু করে ইউরোপিয়ান ফুলব্যাকদের খেলানোর স্টাইলও। সেই বিপ্লবের ধারাতেই এখন ইংলিশ, জার্মান কিংবা ট্যাকটিকস নিয়ে খুঁতখুঁতে ইতালীয়  ফুটবলের দ্বিতীয় বিভাগের কোনো দলের ফুলব্যাকও হুটহাট প্রতিপক্ষ বক্সের আশেপাশে চলে আসলে আর কেউ ভুরু কুঁচকে তাকায় না!

 

দলবদলের বাজারে এখন তাই এতদিন তুলনামূলক সস্তায় বিকোনো ফুলব্যাকদের চাহিদা মিডফিল্ডার বা ফরোয়ার্ডদের চেয়ে কিছুমাত্র কম না। বছর দুয়েক আগে  ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এর লেফট ব্যাক লুক শ এর জন্য গুণতে হয়েছে ৩০মিলিয়ন পাউন্ড, চেলসির মার্কোস আলোনসোর জন্য ২৩মিলিয়ন পাউন্ড। আর জুভেন্তাসের তরুণ লেফট ব্যাক এলেক্স সান্দ্রোর জন্য এ সিজনে তো ৬০মিলিয়ন পাউন্ডের কমে আলোচনায় বসতেই নারাজ তারা! সময়ের সাথে ফুলব্যাকদের এ দামের হার বাড়বে বৈ কমবে না তা চোখ বন্ধ করেই বলে দেয়া যায়।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন