পেপ এবং সর্বজয়ী বার্সার ট্যাকটিস-টুকিটাকি

পেপ এবং সর্বজয়ী বার্সার ট্যাকটিস-টুকিটাকি
Kamil Al Ashik July 4, 2017, 5:37 pm La liga santander

নিজের অফিস রুমে এসে বসলেন গুয়ার্দিওলা। এসেই সবার আগে জানালেন, একটা বিশাল প্লাজমা টিভি লাগাতে হবে। প্রায় সবাই অবাক হলো ম্যানেজমেন্টের, "প্লাজমা টিভি কেন?" গুয়ার্দিওলার সরস উত্তর ছিল, "এটা হলো আমার ম্যাচ জেতার হাতিয়ার"

আরিগো সাচ্চি, আশির দশকের লিজেন্ডারি মিলান কোচ, বলে গিয়েছিলেন, "আমার পর যদি ফুটবলে রেভুল্যুশন হয়, তবে সেটা হবে পুরো মাঠটাকেই মিডফিল্ড এরিয়ে বানানো, যা আমি পারিনাই।" গুয়ার্দিওলা সাচ্চির সেই কথাটাকেই মুল মন্ত্র বানালেন, পুরো মাঠ বানিয়ে দিলেন দলের মিডফিল্ড। 
সেস্ক ফ্যাব্রেগাস কে যখন সাইন করানো হয়, তখন সবাই ভেবেছিল, ফ্যাব্রেগাস হয়ত জাভির বিকল্প হিসেবে খেলবে। কিন্তু সবাই কে ফাঁকি দিয়ে ফ্যাব্রেগাসকে গুয়ার্দিওলা খেলালেন সেন্টার ফরোয়ার্ডের যায়গায়, কাগজে কলমে। আদত ফলস নাইন আরকি।
আরেক দিকে মাশকেরানোকে আনার পর সবাই ভেবেছিল একটা মিডফিল্ডার এনেছে গুয়ার্দিওলা, ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার। হয়ত বুস্কেটস এর বিকল্প খেলবে। কিন্তু পরে দেখা গেল সে খেলতেসে সেন্টার ব্যাকে।

 

                                      ছবিঃ বার্সার ট্রেনিং পদ্ধতির চুম্বক অংশ।

 

এই দুইটা পজিশন চেঞ্জের কারণ কি?
মাশকেরানো যাতে সেন্টার ব্যাক থেকে উপরে উঠে মিডফিল্ডে হেল্প করতে পারে, আর ফ্যাব্রেগাস যাতে নিচে নেমে বল ধরে রাখতে পারে। মিডফিল্ডে ৪ বনাম ২/৩ সিচুয়েশন করা যাকে বলে ইনিয়েস্তা আর জাভির সাথে মিলে।
জাভির রোল এই দলে পুরো মিডফিল্ড দাপিয়ে বেড়ানো, বল ডিস্ট্রিবিউট করা এখান থেকে ওখানে। আর ইনিয়েস্তা ফ্রি প্লেয়ার, বামে যাচ্ছে, এটাকিং মিডফিল্ডার হিসেবে খেলছে, আবার জাভির সাথে মিলে চার জনের একটা মিডফিল্ড শিল্ড বানাচ্ছে।
এই শিল্ডের কাজ কি?
গুয়ার্দিওলার ট্রেনিং এ যাওয়া যাক একটু। ট্রেনিং এ গুয়ার্দিওলা প্লেয়ারদের গোল করে দাঁড় করাতেন। এরপর মাঝখানে রাখতেন দুই ফরোয়ার্ড বা ডিফেন্ডারকে। মুল উদ্দেশ্য প্রেসিং শেখানো। এখন সব প্লেয়ার নিজেদের মধ্যে আড়াআড়ি বা লম্বালম্বি পাস খেলে বল ছড়াচ্ছে, আর মাঝের দুজন সেই বল নিতে ছুটে বেড়াচ্ছে। 
কি? বাচ্চা কালে আপনিও খেলেছেন মনে হয়? গুয়ার্দিওলা এই বাচ্চাকালের খেলাটাকেই ট্রেনিং সেশন বানালেন। এর ফলে দেখা যায়, বার্সা বল পজিশনে থাকা অবস্থায় ২-২-৬/২-৩-৫ ফরমেশনে খেলত। পিরামিড ফরমেশন যাকে বলে সেটা, অনেক আগের WM ফরমেশনের পুনরাবৃত্তি। মাঝখানে এক বা দুই অপনেন্ট প্লেয়ার থাকত, আর চার দিকে বল নিয়ে ঘুরাতো জাভি ইনিয়েস্তা রা। মাস্কেরানো কাগজের ৩-৪-৩ ফরমেশনের সেন্টারব্যাক হলেও কাজের সময় উপরে উঠে সেন্টার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার, আর ডিফেন্সের সময় বুস্কেটস এর কাজ নিচে নেমে ৪ সেন্টারব্যাকের ডিফেন্স গড়া। যার ফলে ইতিহাসের অন্যতম সেরা ডিফেন্সিভ ট্যাকটিকস দেখে দুনিয়া। 
ডিফেন্ডারদের আরো কাহিনি ছিল, একজন খেলতেন একদম নিচে, ট্যাকলিং,ব্লক মেইন কাজ তার। বাকিজন বল প্লেয়িং ডিফেন্ডার। ধরা যাক পুয়োল ট্যাকল করার জন্য আছে নিচে লাস্ট ম্যান হিসেবে। তখন পিকের কাজ উপরে উঠে প্রেস করা ফরোয়ার্ড কে, মার্ক করে রাখা। আবার বল মিডফিল্ডে পাঠানো।

                      ছবিঃ বার্সার নিজেদের মাঝে ট্রায়াঙ্গেল বানিয়ে পজিশন ভাগ করে নেয়া।

 

এ গেল তিন জনের ডিফেন্স। কিন্তু দানি আলভেস আর আবিদাল যখন খেলতেন, তখনের কাজ কি ছিল। তখন ডিফেন্সের বেলায় চারজন একসাথে ডিফেন্সে, টিপিকাল ডিফেন্সিভ ফরমেশন, আর এটাকের বেলায় সেই আগের ৩ জনের ডিফেন্স। আবিদাল এর কাজ তখন লেফট সেন্টার ব্যাক হিসেবে খেলা। দানি আলভেসের কাজ মিডফিল্ডে বা উইং এ গিয়ে সাহায্য করা। সিম্পল কথা। অবশ্য আবিদাল কে বেশি দিন এভাবে খেলাতে পারেন নাই গুয়ার্দিওলা। অসুস্থ হয়ে যাওয়ায় তিন ম্যান ডিফেন্সে পার্মানেন্ট শিফট হয় বার্সা সেই দিন গুলোতে। এরপর যখন আলবা আসে তখন গুয়ার্দিওলা এটাকের টাইম দলকে শিফট করলেন ২-১-৪-৩ ফরমেশনে, যেখানে দুই উইং ব্যাক জাভি ইনিয়েস্তার সাথে সেম লাইনে থাকবে, আর ভিয়া/মেসি/পেদ্রোর সাথে মিলে অপনেন্ট এর ফুলব্যাকের সাথে ২ বনাম ১ সিচুয়েশন তৈরি করবে।

মুলত গুয়ার্দিওলা বিশ্বাসী ছিল 3P তে, পাস, পসেশন আর পজিশন। পজিশন এর মাঝে সবচেয়ে বড় জিনিস। আর যাই কর, গুয়ার্দিওলার মোতাবেক পজিশনে তোমাকে খেলতেই হবে। আর বাকিটা বিশ্বাস রাখতে হবে টিম মেটের উপর। এই বার্সা টিমের ১১ জনের ১১ জনই বল পায়ে খেলতে পারে, এমনটায় দরকার ছিল গুয়ার্দিওলার। কিন্তু খেলতে হবে এক পা থেকে অন্য পায়ে, অর্থাৎ মেসি ব্যতিত কেউ বল পায়ে বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারবেনা। গুয়ার্দিওলার মতে বল যত বেশি পায়ে ধরে রাখবে, বল হারানোর সম্ভবনা বেশি থাকবে তত। এক কথায় ওয়ান টাচ পাস। জাভি ইনিয়েস্তা এর জন্য ছিল আদর্শ। কেউ গুয়ার্দিওলার ট্যাকটিকসের বাইরে শো অফ করতে গেলেই, পরক্ষণে তাকে সাব করে ফেলতেন তিনি। উদাহরণ স্বরুপ এক ম্যাচে অঁরি পজিশনের বাইরে গিয়ে একা বল নিয়ে দারুন এক গোল করলেন। পরমুহুর্তেই সে সাবড, তুলে নিল গুয়ার্দিওলা। 
বল পায়ে যেই থাকুক, তাকে মারতে হবে ফাঁকা যায়গায়, আর কেউ না কেউ সব সময় ভীরের বাইরে গিয়ে ফাঁকা থাকবেই। উদাহরণ হিসেবে ডেভিড ভিয়ার একটা গোলের কথা বলি। ভিয়া আদত স্ট্রাইকার হলেও সেন্টারে ফ্যাব্রেগাস কে খেলিয়ে ভিয়াকে খেলাতেন গুয়ার্দিওলা লেফট সাইডে। সেখানে টোটালি আনমার্কড ভিয়া, জটলার আশে পাশেও নাই। মনেও হবেনা সে হুট করে এসে গোল করবে। মেসির পায়ে বল, মেসি বল নিয়ে ড্রিবল করছে। রামোস সামনে, এক পাশে জাভি, এক পাশে ইনিয়েস্তা। সামনে বুস্কেটস। এখন জাভিকে মার্ক করতে গেলে ইনিয়েস্তা আন মার্কড হবে, ইনিয়েস্তাকে মার্ক করতে গেলে জাভি। আবার বাঁ দিকের কোনায় ডেভিড ভিয়া। এই সিচুয়েশনে রামোসের কাজ কি? ভাগ্যের উপর অনেক টা ছেড়ে দেওয়া এই ভেবে, যে হয়ত বলটা ওইই দুই মিডফিল্ডারের কাছেই আসবে। কিন্তু মেসি সিম্পলি করলো কি, বল নিয়ে ভিয়াকে একটা থ্রু পাস দিল, ভিয়া বলটা নিয়ে সুন্দর করে ফিনিশিং দিল।

কি বোঝা গেল এখানে? পজিশন প্লে, আর বল পাসের ফ্রিডম। ফ্রিডম বা স্বাধীনতা কেন? কারণ নরমাল খেলায় বল যেকোন প্লেয়ার জাভি বা ইনিয়েস্তা কে দিবে, কিন্তু মেসি ট্রাস্ট করল ভিয়া কে। সে পাস দিল তাই ভিয়াকেই। এখানে ভিসনের একটা ব্যাপার আছে, যা মেসি-ইনিয়েস্তা বা জাভির যথেষ্ঠ ছিল। আলবা যখন আসল তখন গুয়ার্দিওলা এটাকের টাইম বার্সাকে শিফট করল ২-১-৪-৩ ফরমেশনে।

 

         

                              ছবিঃ ভিয়ার ফাঁকা স্থান থেকে এসে গোল করা।

 

আবার যখন ফ্যাব্রেগাস ছিল না, তখন কি করত বার্সা? 
তখন মেসি খেলত ফলস নাইনে, নিচে নেমে মিডফিল্ডে সাহায্য করত। পেদ্রো বা সাঞ্চেজের কাজ রাইট সাইড থেকে সেন্টারে কাট ইন করা। যেখানে মেসি নিচে নামায় ফাঁকা হয়ে গেসে। এখন সানচেজ বা পেদ্রো সেন্টার আসলে কি হবে? ধরা যাক পেদ্রো সেন্টারে চলে এসেছে, তখন সেন্টার ফরোয়ার্ড বা এটাকিং মিডফিল্ড এরিয়ায় দুজন প্লেয়ার থাকবে বার্সার, ফলে যে প্লেয়ার মেসিকে মার্ক করবে তার সাথে পেদ্রোকে মিলে ২ বনাম ১ সিচুয়েশন তৈরি হবে, বল হারানোর অবস্থায় গেলেই পাস পেদ্রোকে। আর উপরে ওই অবস্থায় ২-১-৪-২ থেকে ২-১-২-৫ সৃষ্টি করে অপনেন্ট কে ভড়কে দেওয়া।
 

গুয়ার্দিওলার আরেক ট্যাকটিস ছিল প্রেসিং এর সময় ৬ সেকেন্ড করে প্রেস করার। যখন বল অপনেন্টের পায়ে থাকত, প্রথম কাজ ছিল বার্সার ছ সেকেন্ড ধরে প্রেস করা। ২/৩ মিডফিল্ডার মিলে বল নেওয়ার চেষ্টা যাকে বলে। যদি বল না পায়, তবে আবার আগের ফরমেশনে ফিরে যাওয়া আর জোন মার্ক করে রাখা। 
আর বল যখন পায়ে থাকবে তখন বল নিজেদের কাছে ধরে রাখা ছিল আরেক মূল মন্ত্র। কারণ গুয়ার্দিওলার মতে, বল যতক্ষণ নিজেদের পায়ে থাকবে, ততক্ষণ অন্য দল গোল করতে পারবেনা। আগেই বলেছি তিন বা চার জন মিলে একটা শেপ করে নিয়ে নিজেদের মাঝে পাস করত বার্সা। কিন্তু এই শেপের বাইরে আরেকটা শেপ বানায় রাখত তারা বিকল্প হিসেবে। যেখানে প্রথম শেপে বল হারানোর মুহুর্তে চলে গেলে দ্বিতীয় শেপে বল পাস করে দেওয়া যায় যেন, এমন একটা ট্র‍্যায়াঙ্গেল বানিয়ে রাখা আছে।

শুরুটা যা দিয়ে করেছিলাম, তা দিয়েই শেষ করি। বিশাল।প্লাজমা টিভি লাগানোর কারণ ছিল অপনেন্টের সাথে ম্যাচের আগে তাদের খেলার স্টাইল বার বার দেখা। কমপক্ষে অপনেন্ট এর আগের খেলা ছ ম্যাচ দেখতেন গুয়ার্দিওলা, যেখানে থেকে ওই দলের ফরমেশন, গেম প্লে, ট্যাকটিকস সম্পর্কে প্রায় ক্লেয়ার আইডিয়া পেয়ে যেতেন। যার পরিণতিতে, তার এসব ফরমেশনের পূনউত্থাণ করা।





Similar Post You May Like

জনপ্রিয় খেলার সংবাদ

Find us on Facebook