খেলার দ্বাদশ ব্যক্তিরা

খেলার দ্বাদশ ব্যক্তিরা

প্রথমেই বলে নেই, বাংলাদেশের সাথে যে কারো যে কোন খেলায় আমি বাংলাদেশকে সমর্থন করি। এর বিকল্প নেই। এই ক্ষেত্রে আমি কিছুটা বায়াসড বলা যেতে পারে। মূল প্রসঙ্গে যাই। 

ফুটবল নিয়ে শুরু করার আগে প্রথমে ক্রিকেট নিয়ে একটু বলি। কারণ ক্রিকেট সম্পর্কে দেশের মানুষের জ্ঞান তুলনামূলক ভাল। ক্রিকেটে বর্তমানে বাংলাদেশ এমন একটা পর্যায়ে এসে পৌছেছে যে বাংলাদেশ বাদে অন্য কারো সাপোর্ট না করলেও চলে। আমরা যখন খেলা দেখা শুরু করি তখন কিন্তু বিষয়টা এমন ছিল না। এখন বাংলাদেশ একটা শক্ত অবস্থানে চলে আসাতে পরিস্থিতি কিছুটা পাল্টেছে। তবে প্রথম দিকে কিংবা এই মুহুর্তেও বাংলাদেশের খেলা যখন না হয় তখন কোন একটা দলের সাপোর্ট তো অবশ্যই করি। কথা হচ্ছে আমি ঠিক অন্যান্য সাপোর্টার দের মতো নই। একটা উদাহরণ দেই। ধরি ভারত আর অষ্ট্রেলিয়ার খেলা হচ্ছে। এই খেলায় ভারতের সাপোর্টাররা চাইবে যদি আগে ব্যাটিং করে তাহলে ৩০০ এর আশেপাশে রান করতে, আর প্রথমে বোলিং করলে অষ্ট্রেলিয়াকে ২০০ রানের নিচে বেধে ফেলতে। যারা অষ্ট্রেলিয়ার সাপোর্টার তারা আবার একই কায়দায় ভারতের অমঙ্গল কামনা করবে। আমার এই ধরণের খেলা ভালো লাগে না। ভারত বা অষ্ট্রেলিয়া যেই জিতুক তাতে সময় নষ্ট করে খেলা দেখে আমার কি লাভ? আমার ভালো লাগে সেরার সাথে সেরার লড়াই।

 ১৯৯৯ সালের একটা খেলার কথা বলি। ওয়েষ্ট ইন্ডিজের সাথে অষ্ট্রেলিয়ার টেষ্ট ম্যাচ হচ্ছে। ৩১১ রানের টার্গেটে ব্যাট করতে নেমে ১০৫ রানে ৫ উইকেট পড়ে যাওয়ার পরে অষ্ট্রেলিয়ার জয় নিয়ে কারো মনে কোন সন্দেহ ছিল না। ম্যাকগ্রার আগুন ঝরানো বোলিং এর সামনে শেষ পর্যন্ত ওয়েষ্ট ইন্ডিজ ১ উইকেটে জয়ী আর ব্রায়ান লারা ১৫৩ রানে অপরাজিত, ইনিংসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৩৮ রান। আমার কাছে খেলায় এই ধরণের মুহুর্ত ভালো লাগে।

১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপ জয়ের পর শ্রীলঙ্কা কিছুদিন অন্য গ্রহের খেলা খেলছিল। তারা তখন প্রতিপক্ষকে শুধু হারাতো না, বরং গুড়িয়ে দিত। বিশ্বকাপের পর পরই সিঙ্গাপুরে একটা টুর্নামেন্টে ভারত আর পাকিস্তানের সাথে যখন শ্রীলঙ্কা খেলতে নামল তখন প্রথম বারের মতো ফেভারিটের মর্যাদা পেল। পাকিস্তানের শক্তিশালী বোলিং এর বিরুদ্ধে জয়াসুরিয়া মাত্র ৪৮ বলে সেঞ্চুরীর রেকর্ড গড়ে তার কিছু প্রমান ও দিল। ফাইনালে তাই পাকিস্তান যখন ব্যাট করতে নামলো তখন ধারণা করা হচ্ছিল শ্রীলঙ্কার ব্যাটিং কে চ্যালেঞ্জ জানানোর জন্য কম পক্ষে ৩০০ রান করতেই হবে। পাকিস্তান ২১৫ রানে অল আউট হওয়ার পর দেখার বিষয় ছিল শ্রীলঙ্কা কত তাড়াতাড়ি খেলাটা শেষ করবে। ৭০ রানে যখন শ্রীলঙ্কার প্রথম উইকেট পড়ে তখন অবাক হওয়ার বিষয় ছিল কালুভিথরানার শূন্য রানে আউট হওয়া। জয়াসুরিয়া ২৮ বলে ৭৪ রান করে আউট হলেও শ্রীলঙ্কা মাত্র ১০ ওভারে ২ উইকেটে ১০০ রান ছুয়ে ফেলে। কিন্তু মজার বিষয় হচ্ছে শেষ পর্যন্ত শ্রীলঙ্কা ৩২.৫ ওভারে মাত্র ১৭২ রানে অল আউট হয়ে যায়। পাকিস্তান ৪৩ রানে ম্যাচ জিতে। 

 ক্রিকেটের মজাটাই এখানে। নিশ্চিত জেতা ম্যাচটাও হেরে যেতে হয় কোন জিনিয়াসের অসাধারণ নৈপুন্যে। এই জিনিয়াসের প্রসঙ্গে ব্রায়ান লারার একটা ঘটনা বলি। ১৯৯৬ সালের বিশ্বকাপে আফ্রিকা তখন অসাধারণ খেলছে। ক্রনিয়ের নেতৃত্বে দলটাও আমার দেখা সেরা আফ্রিকান দল। কিন্তু কোয়ার্টার ফাইনালে এসে ধুকতে থাকা ওয়েষ্ট ইন্ডিজের কাছে বলা চলে ব্রায়ান লারার কাছেই ধরা খেয়ে গেল। আসলে জিনিয়াসরা এমনই হয়। সব আশা যখন শেষ হয়ে যায় ঠিক তখনই তারা জ্বলে উঠে। 

২০০০ সালের নক আউট বিশ্বকাপের ফাইনালের কথা মনে আছে? আন্ডার ডগ হিসেবে শুরু করলেও ফেভারিট অষ্ট্রেলিয়া আর সাউথ আফ্রিকাকে হারিয়ে ফাইনালে উঠা ভারত নিউজিল্যান্ডের তুলনায় ফেভারিট ছিল। নিউজিল্যান্ডের সবচেয়ে বড় অস্ত্র ক্রিস কেয়ার্নসের ইনজুরির জন্য ম্যাচ খেলার কথা ছিল না। শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র ব্যাটসম্যান হিসাবে খেলা শুরু করেন। কিন্তু পরিস্থিতির কারণে ম্যাচে তাকে বোলিং করতে হয় এবং ম্যাচে দলের পক্ষে সবচেয়ে ইকোনমি বোলার ছিলেন। এরপরেও গাঙ্গুলীর সেঞ্চুরীর সুবাধে যখন ভারত ২৬৪ রান করেন তখনো পাল্লা ভারতের দিকেই ছিল। ৮২ রানে ৩ উইকেট পড়ার পর কেয়ার্নস নামেন এবং ২ বল বাকি থাকতে যখন ম্যাচ জিতেন তখন উনি ১০২ রানে অপরাজিত। এটাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিউজিল্যন্ডদের প্রথম শিরোপা। 

১৯৯৯ সালেরই আরেকটা টেষ্ট ম্যাচের কথা বলি। ভারত ২৭২ রানের টার্গেটে ব্যাট করছে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে। পাকিস্তানের বোলিং আক্রমন তখন মোটামুটি বিশ্বসেরা, তুলনায় ভারতের ব্যাটিং ও কম সেরা নয়। কিন্তু ৮২ রানে ৫ উইকেট পরে যাওয়ার পরে টেন্ডুলকারের ১৩৬ রানের ইনিংস আমার দেখা তার ৫১ টি টেষ্ট ইনিংসের মাঝে সেরা। যদিও ১৭ রান বাকি থাকা অবস্থায় টেন্ডুলকারের আউটের পরে সেই ম্যাচ পাকিস্তান ১৪ রানে জিতে। আসলে ক্রিকেট খেলাটাই এমন, শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে কখনই সুযোগ দেয়া যাবে না। এই ম্যাচ শেষ করতে না পারার জন্যই শচীন কে আমার কাছে কখনো ভালো লাগে না। তবে অন্যান্য সব গুণাবলীর জন্য শচীনকে উপেক্ষাও করা যায় না। 

আমার দেখা সময়ে এই ধরণের মোড় ঘুরানো খেলা ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি খেলেছে অষ্ট্রেলিয়া আর পাকিস্তান। কত অল্প রানের সংগ্রহ নিয়ে যে পাকিস্তান অবিশ্বাস্য ম্যাচ জিতেছে তার কোন ইয়াত্তা নেই। 

মোড় ঘুরানো খেলা খেলতে পারতো না বলে ভারত কখনই আমার পছন্দের কাতারে আসতো না। তবে গাঙ্গুলী অধিনায়ক হওয়ার পর থেকে তাদের খেলা পালটে যায়। সেবাগ, যুবরাজ, ধোনী, হরভজন সিং রা দলের মানসিকতা পরিবর্তন করে ফেলে। অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লক্ষনের ২৮১ রানের ইনিংস টা তো অসাধারণ। আসলে বিরুদ্ধ পরিবেশে ব্যাটিং বা বোলিং করে ম্যাচ জেতানো আমাকে সবসময় আনন্দ দেয়। ১০ ওভারে ২৫ রান দরকার, হাতে ৮ উইকেট। এমন পরিস্থিতিতে কোন বোলার যদি ম্যাচ জেতায় আপনি তাকে সাপোর্ট না করলেও করতে পারেন তবে আমি এই ধরণের খেলোয়ার দের সবসময় পছন্দ করি। 

আমার কাছে সবসময় জমজমাট খেলা পছন্দ। শেষ ১০ ওভারে রান দরকার ৭৫, ওয়াসিম আকরাম আর ওয়াকারের মতো বোলারের বিরুদ্ধে এই রান কেউ করে ফেলতে পারলে তাকে সাপোর্ট করা উচিত। আমি আসলে কোন দলকে একক ভাবে সাপোর্ট করি না। প্রতি দলেই আমার কিছু খেলোয়ারের খেলা ভালো লাগে। আমি চাইতাম এদের লড়াইটা যেন কঠিন হয়।

ফুটবলের ব্যাপারটাও অনেকটা একই রকম। আন্তর্জাতিক ফুটবলের কথা আপাতত আর না বলি। অনেকের ধারণা আমি শুধু চার বছর পর পর বিশ্বকাপই দেখি, আর সারা বছর ঘুমাই। তাই আমি ক্লাব ফুটবলও দেখি এই কথাটা প্রমাণের জন্য ক্লাব ফুটবল নিয়েই কথা বলি। 

২০০২-০৩ এর একটা ম্যাচের কথা বলি। চ্যাম্পিয়ন্স লীগের কোয়ার্টার ফাইনাল, রিয়াল মাদ্রিদ বনাম ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এর খেলা। রোনালদো লিমা, জিদান, ক্যাসিয়াস কার্লোস, ফিগোর কাছাকাছি মানের খেলোয়াড় ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডে তখন শুধুমাত্র বেকহাম; নিস্তলরয় কিংবা কিন ও খারাপ ছিলেন না। কিন্তু ম্যাচের আগে সবাই জানতো যে রিয়াল নিশ্চিত ফেভারিট। প্রথম লেগে রিয়ালের মাঠে দেখা গেল কোচের সাথে বিবাদের জন্য বেকহাম দলে নেই, ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড ছন্নছাড়া খেললো। ফিগোর এক আর রাউলের দুই গোলে জিতলেও মূল্যবান একটা অ্যাওয়ে গোল পায় ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড। ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেড এর জন্য পরের লেগের সমীকরণ ছিল ঘরের মাঠে ২-০ তে জেতা। পরের ম্যাচেও বেকহাম শুরুর একাদশে নেই। ম্যান ইউ ২ গোল করলেও (১ টা আত্মঘাতি গোল) রোনালদো লিমা একাই হ্যট্রিক করে ম্যানচেষ্টার ইউনাইটেডকে ছিটকে দেন। শেষ পর্যন্ত ফার্গি ৬৩ মিনিটে বেকহামকে মাঠে নামান। ৭১ আর ৮৫ মিনিটে দুটি গোল করে আমাদের আক্ষেপ শুধু বাড়িয়ে দিলেন। শেষ পর্যন্ত ফল ৪-৩ এ জয়। ম্যাচের পরিস্থিতিও অনেকটা নিজের নিয়ন্ত্রনে নিয়ে এসেছিলেন। কিন্তু হাতে বেশি সময় পাননি। পেলে দুই লেগ মিলিয়ে জয় পাওয়ায়টাও সম্ভব ছিল। এই ম্যাচে আমি কাকে সমর্থন করবো? আমি তো শেষ পর্যন্ত চাচ্ছিলাম যেন বেকহাম আরো দুটি গোল করে ম্যাচটা জিতিয়ে দেয়? দুই লেগের পুরো সময় বেকহাম খেলতে পারলে লড়াইটা আরো জমজমাট হতো। আমি তো চাইছিলাম রিয়ালের কাজটা যত সম্ভব কঠিন করে দেয়া যায়, সেই কঠিন পরিস্থিতি জিততে পারলেই না মজা। 

আরেকটা ম্যাচের কথা বলি। ২০০৪-০৫ এর ফাইনাল, মুখোমুখি লিভারপুল আর মিলান। শক্তিমত্তায় এগিয়ে এক বছর আগের চ্যম্পিয়ন মিলান। প্রথম হাফে তিন গোল করে ম্যাচ জেতাটা শুধুমাত্র সময়ের ব্যাপার করে ফেলল। বাকি হাফটা নিয়ম রক্ষার জন্য খেলাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু ৫৪,৫৬ আর ৬০ মিনিটে গোল করে লিভারপুল ম্যাচে ফিরে আসে। ট্রাইবেকারে শেষ পর্যন্ত লিভার পুলই জিতে আমি সাক্ষী হয়ে রইলাম স্মরণিয় এক ম্যাচের। 
২০০৫ সালের একটা এল ক্ল্যাসিকোর কথা বলি। রিয়ালে তখন রোনালদো, রবিনহো, জিদান, বেকহাম, রাউল, কার্লোস, ক্যাসিয়াসের মতো তারকা খেলোয়াড়। বার্সায় ছিল রোনালদিনহো; এতো, ডেকো কিংবা জাভিও ছিল। মেসিও ছিলো তবে তখন তার মাত্র শুরু। সব মিলিয়ে রিয়ালই ফেভারিট ছিল। ৩-০ গোলে জেতা সেই ম্যাচে দিনহো দুই গোল করেন। দ্বিতীয় গোল করার পর মাদ্রিদের দর্শকেরা ষ্টেডিয়ামে দাঁড়িয়ে রাজসম্মান দেন যা নাকি এর আগ পর্যন্ত মাদ্রিদের মাঠে বার্সা খেলোয়াড় হিসেবে ম্যারাডোনা পেয়েছিলেন ১৯৮৩ সালে। এই খেলায় কি বার্সাকে সমর্থন না করে পারা যায়? এই ম্যাচের পরেই দিনহোর বক্তব্য ছিল "I will never forget this because it is very rare for any footballer to be applauded in this way by the opposition fans”. 

 এতক্ষন এত কথা বলার মূল বক্তব্য কি? আমি আসলে এককভাবে কোন দলকে সমর্থন করতে পারিনা। অনেকদিন ধরে খেলা দেখার সুবাধে কিছু ধারণা হয়েছে। ফুটবল বুঝে এমন যে কেউই ধারণা করতে পারবে কোন ম্যাচের আগে কে ফেভারিট এবং কি কারণে ফেভারিট? কিন্তু দিন শেষে কোন দল বা খেলোয়াড় যদি সেই অনুমান ভুল করে দিতে পারে তাহলে আমি তাকে সমর্থন না করে পারিনা। যেমন অ্যাথলিটিকো মাদ্রিদ যে দুইবার উচল ফাইনাল খেলেছে আমি দুই বারই তাদের সমর্থন করেছিলাম। যদিও ম্যাচের আগে জানা ছিল মাদ্রিদ ফেভারিট তবুও যতটুকু ভেবেছিলাম অ্যাথলিটিকো মাদ্রিদ তার চেয়ে অনেক বেশি লড়াই করেছে। এবং প্রথম ফাইনালটাতো মাদ্রিদ কিছুটা ভাগ্যের জোড়েই জিতেছে বলা চলে। আপাতত খেলার ধারা বিবরণী বাদ দিয়ে মূল প্রসঙ্গে চলে আসি।

যে কোন খেলাতেই সমর্থন করার সময় বেশির ভাগ সমর্থকই আবেগী থাকে। যুক্তি দিয়ে বিচার করতে চায় না। এজন্য মেসি কিংবা রোনালদোর মতো খেলোয়াড় ইনজুরির জন্য কোন গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ খেলতে না পারলে অনেকে খুশি হয়। নিজ দলের জয়ে যতটা খুশি হয়, রাইভালের হারেও কম খুশি হয়না। আমি কাউকে নিজের দলেরও মনে করি না, কাউকে রাইভালও মনে করি না। আমার পছন্দ সেরার সাথে সেরার লড়াই। যদি কখনো পর্তুগাল আর আর্জেন্টিনা মুখোমুখি হয় তাহলে আমি কখনোই চাইবো না মেসি কিংবা রোনালদো খেলতে না পারুক। আমি চাইবো দুই দলই সর্বশক্তি নিয়ে মাঠে নামুক। এরপর যে জিততে পারবে তাকে সমর্থন দেব। জিততে পারা মানা শুধু জয় না। গত বিশ্বকাপের প্লে অফের পর্তুগাল বনাম সুইডেনের খেলার কথা মনে আছে? দ্বিতীয় লেগে ইব্রা দুই গোল করে দলকে এগিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু রোনালদো হ্যট্রিক করে পর্তুগালকে বাচিয়ে দেয়। রোনালদো জয়ী হলেও ইব্রা কি হেরেছে? 

                                                         

আমি আবেগের চেয়ে যুক্তিই বেশী পছন্দ করি। আবেগ অবশ্যই মূল্যবান । আমার নিজের মাঝেও আবেগ কম নেই। কিন্তু বিচার করার সময় চেষ্টা করি আবেগটাকে একপাশে চাপিয়ে রাখতে। কতটুকু পারি জানিনা। মেসি বা রোনালদোর কেউই সর্বকালের সেরা হয়ে গেলে আমার কোন সমস্যা নাই, আবার দুজনেই সেরা ১৫ এর বাইরে চলে গেলেও আক্ষেপ নেই। তারা যা অর্জন করতে পারবে তা দিয়েই বিবেচনা করতে হবে, আবেগ দিয়ে কাউকে বিচার করার প্রয়োজন নেই। আমার জোর করে কিছু চাওয়ারও প্রয়োজন নেই। আমার দেখা সেরা খেলোয়াড় ম্যারাডোনা, এর পর জিদান। কাউকেই আমি নিজে চেয়ে সেরা বানাই নি। তাদের পারফর্মেন্সই আমাকে সেরা বলতে বাধ্য করেছে। হ্যা, আমি মানছি আমার যে কোন সিদ্ধান্তও ভুল হতে পারে। কেউই নিখুত নই। 

 শুধুমাত্র একটা ক্ষেত্রে যুক্তিটা কাজ করেনা, বাংলাদেশের সময়। সেটা নিয়ে আমি অখুশীও নই। বর্তমানে বাংলাদেশ ক্রিকেটে একটা অন্যতম শক্তিশালী দল। ফুটবলে কিছুই না। কিন্তু আজ যদি আর্জেন্টিনা কিংবা পর্তুগালের সাথে বাংলাদেশের খেলা হয় তাহলে হেরে যাব জেনেও আমি বাংলাদেশের সমর্থন করব। 

আমার বাংলাদেশের জন্য যতটা আবেগ, ঠিক ততটুকু আবেগই বাংলাদেশের অনেক মানুষের মনে আছে মেসি কিংবা রোনালদোর জন্য। আমি যদি মেসিকে নিয়ে কোন বাজে কথা বলি তাহলে অনেক মেসি ভক্ত আমার গায়ে হাতও তুলতে পারে। রোনালদো ভক্তের ক্ষেত্রেও একই কথা প্রজোয্য। অথচ এই আবেগের সামান্য টুকুও যদি আমাদের দেশের জন্য কেউ ব্যবহার করতো তাহলে আমাদের এই দেশটা অনেক এগিয়ে যেত। আমরা আমাদের এই আবেগটাকে মনে হয় ভুল জায়গায় ব্যবহার করছি। 

অষ্ট্রেলিয়ায় আমার এক বন্ধুর বড় ভাই নাকি বাংলাদেশকে বিকৃত ভাবে ডাকায় সেই লোকের নাক ঘুষি দিয়ে ভেঙ্গে ফেলেছে। লোকটা অষ্ট্রেলিয়ান নাগরিক ছিল, আমার বন্ধুর বড় ভাইকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে এই কারণে আমি কখনো তাকে দুঃখী হতে দেখিনি। বরং তার ভাষ্য মতে আরো দুই তিনটা ঘুষি মারতে পারলে নাকি তার শান্তি হতো। একে কি বলবেন, দেশের জন্য ভালোবাসা নাকি পাগলামি? 
 এতক্ষন কি বলতে চেয়েছি আশা করি বুঝাতে পেরেছি। এত বড় পোষ্ট পড়ার পরেও না বুঝে থাকলে দুঃখিত। শেষ পর্যন্ত এক কথায় বলার চেষ্টা করি। বাংলাদেশ বাদে অন্য কারো খেলায় শুধুমাত্র খেলাটার সমর্থন করি, কোন বিশেষ দলের নয়। আমার কাছে দিন শেষে খেলাটাকেই বড় মনে হয়। তবে বাকি যারা ভিন্ন ভাবে দেখে আমি তাদেরও বিরুদ্ধে নই। সবারই নিজের মতো করে চিন্তা করার অধিকার আছে। কিন্তু আমার মতো গুটি কয়েকজন মানুষের ভিন্ন চিন্তা ধারাকেও মনে হয় সম্মান জানানো উচিত। 

 

 লেখকঃ রাসেল আহমেদ

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন