সোয়াইপিং কিপিং এবং ম্যানুয়েল নয়্যার

সোয়াইপিং কিপিং এবং ম্যানুয়েল নয়্যার

দাবা আর ফুটবল, দুটো একসাথে তুলনা করি কিছু সময়ের জন্য। দাবাতে দু দলের সমান ঘুঁটি থাকে, ফুটবলেও থাকে সমান প্লেয়ার। দাবাতে, এক দল অন্যদলের পরস্পর মুখোমুখি হয়ে থাকে, সামনের দিকে এগুতে চায় প্রতিপক্ষ ডিঙ্গিয়ে। ফুটবলেও সেম, গোল করতে চায় প্রতিপক্ষ ডিঙ্গিয়ে। দাবার সমান সংখ্যক প্লেয়ার কে একজন খেলোয়াড় পুরোদমে ইউটিলাইজ তথা ব্যবহার করতে চায়, যেমন "কিং", সেও একটা ঘুঁটি, তাকে কেন ফেলে রাখবে একজন পাকা খেলোয়াড়। অন্য দিকে তার প্রতিপক্ষ খেলোয়াড় যদি কিং কে না খেলিয়ে প্রটেক্ট করে রাখে, কিং কে বাঁচিয়ে খেলতে চায়, কারণ এটা সবচেয়ে দুর্বল আর একই সাথে গুরুত্বপূর্ণ ঘুঁটি, তবে সে ইতিমধ্যে পিছিয়ে গিয়েছে প্রথম খেলোয়াড়ের থেকে। কারণ একটাই, একজন প্লেয়ারের কম-বেশি হওয়া, অর্থাৎ ওই "কিং" নামের ঘুঁটিটা। এখন কিং এর যায়গায় ফুটবলে গোলকিপার ধরি, একটা দলের কিপার ধরা যায় গোলবারে ঠায় বসে আছে। অন্য দলের কিপারটা এক ধারে লম্বালম্বি ভাবে সঠিক লং পাস দিচ্ছে নিজ প্লেয়ারদের কাছে, ডিফেন্ড করছে উপরে উঠে ডিফেন্ডারদের মত, সেভও করছে অসাধারণ আবার নিজেদের প্লেয়ারদের মাঝে পাস-পাস করে বল ধরে রাখছে। কোন দল বেশি এডভান্টেজ পাবে? নিশ্চয় পরের দল? প্রায় প্রতিটা দলই গোলকিপারকে ১১তম প্লেয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, প্রায় প্রতিটাই! বিশ্বাস হয়? আমরা অনেক সময় খেয়াল করিনা, কারণ খুব অল্প সময়ের জন্য দেখা যায় বেশির ভাগ দলে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে গোলকিপারকে বল ডিস্ট্রিবিউট করতে দেখা যায় ম্যাচের শেষ অবস্থায়, যখন গোল দরকার বা পিছিয়ে আছে। এমন বল ডিস্ট্রিবিউট যে কিপার করে, তাকে বলা হয় প্রোএক্টিভ গোলকিপার। এরা সাধারণত বল অপনেন্টদের পায়ে থাকা অবস্থায় তেমন রিএক্ট করেনা, কিন্তু নিজেদের পায়ে থাকা অবস্থায় দলের এটাক বিল্ডিং এ সাহায্য করে। যদি কোন গোলকিপার ম্যাচের শেষের দিকে বল ডিস্ট্রিবিউট করতে পারে, পাস-পাস খেলতে পারে নিজেদের প্লেয়ারদের সাথে, তবে কেন সে পুরো ম্যাচ পারবে না? এই থিউরি থেকেই মডার্ন গোলকিপার তথা ১১ তম প্লেয়ারের জন্ম।

প্রোএকটিভ কিপারের বর্তমান উদাহরণ হল টের স্টেগেন। লা লিগায় বর্তমানে সম্ভবত তার পাসিং রেট সর্বোচ্চ। লং পাসে কিপারদের মাঝে সম্ভবত এই মুহুর্তে অন্যতম সেরা স্টেগেন। . এখন প্রোএক্টিভ কিপার গেলো, এর পরের স্টেপ কি? এর পরের স্টেপ হলো মডার্ন গোলকিপিং বিপ্লবের সবচেয়ে বড় আবিষ্কার, "গোলকিপার -লিবেরো" তথা সোয়াইপার কিপার। সোয়াইপার কিপার, প্রোএক্টিভ কিপার কে একটু মডিফাইড করা, এরা বল নিজেদের পায়ে থাকা অবস্থায় যেমন পাসিং করে বল ডিস্ট্রিবিউট করে, বল না থাকা অবস্থায় আবার ৬ বাই ১৮ গজের ডি বক্সের মাথায় থাকে, পঞ্চম ডিফেন্ডার হিসেবে। এদের মেইন কাজ, ডিফেন্ডারদের সাথে গোলবারের যে গ্যাপ, সেটা কমিয়ে আনা না কন্ট্রোল করা। সাধারণত হাই-লাইন ডিফেন্সে অর্থাৎ যখন সেন্টার ডিফেন্ডাররা বেশি উপরে থাকে কোন দলের, সে দলের জন্য এমন কিপার একবারে আদর্শ।

                                                  

গুয়ার্দিওলার বায়ার্নে যে টা হতো, ৩০-৪০ মিটার গ্যাপ থাকত লাস্ট ডিফেন্ডার আর গোল কিপারের মাঝে, সেটা কমিয়ে আনার জন্য ম্যানুয়েল নয়্যারের উপরে ওঠা শুরু। সেখান থেকে আসে সোয়াইপার কিপার টার্মটা। . একজন সোয়াইপার কিপারের কি কি গুন থাকা আবশ্যক? সবার আগে তাকে হতে হবে ইন্টিলিজেন্ট। বর্তমান-অতীত সব মিলে সোয়াইপার কিপার শুনলে কার নাম আসে? ম্যানুয়েল নয়্যার নিশ্চয়? নয়্যার কিন্তু টেকনিকালি বেস্ট না, ইভেন টের স্টেগানও নয়্যার থেকে টেকনিকালি ভালো। আর বল হ্যান্ডেলিং এ ডি গেয়াও অনেক বেটার। কিন্তু নয়্যারের ক্ষেত্রে যেটা আসে, সেটা হলো সে ইন্টিলিজেন্ট। তার যেগুলো দুর্বল দিক আছে, অন্য আট্রিবিউট দিয়ে সে ঢেকে দেয় সেগুলো। যেমন, নয়্যার ডান পায়ের খেলোয়াড়, বাঁ দিকে লাফাতে তার বেশি সুবিধা হয়। দিন রাত ট্রেনিং করে সে তার ডান পা টা এমন করে ফেলেছে, যে বা দিকে লাফ দিলেও ডান পা দিয়ে বল আটকাতে পারে সে। বল ডিস্ট্রিবিউটে সেরা নয়, তবে কোথায় বল দিলে গেম বিল্ড আপ বেশি ভালো হবে এটা নয়্যারের থেকে কেউ ভালো জানেনা। কিভাবে বলটা হাতে আসবে,আটকে যাবে হাতে, এটার চেয়ে কিভাবে কি করলে গোলটা বাচানো যাবে, নয়্যারের চিন্তাভাবনা এভাবে হয়। এখানেই সে অনন্য, টেকনিকালি বেটার না হয়েও অনেক বেশি ভালো কিপার। ইন্টিলিজেন্ট হতে হবে, বলার আরেকটা কারণ, যখন একজন সোয়াইপার কিপারকে ডিফেন্ড করতে হবে অর্থাৎ একজন প্লেয়ার বল পায়ে এগিয়ে আসছে (ওয়ান অন ওয়ান সিচুয়েশন) অথবা থ্রু পাস আসছে একটা, এই সময় কিপারকে ঠিক করতে হবে সে উপরে যাবে কিনা! যদি এই জাজমেন্টে ভুল হয়, পরিনামে খাওয়া লাগবে গোল, সাথে হাস্যকর একটা ভুল হয়ে যাবে সবার কাছে। তাই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার উপরে যাওয়ার ক্ষেত্রে। এর সাথে দরকার নিজের স্পিড সম্পর্কে ধারণা, কত স্পিডে সেই কিপার দৌড়াতে পারবে। কারণ প্রতিপক্ষের সেই প্লেয়ারটিকে তার বিট করতে মাথার মধ্যে অংক কষতে হবে একটা, কোন সময় রওনা দিলে সে অন্য দলের প্লেয়ারের আগে বা একই সময়ে পৌছাতে পারবে বলের কাছে। সে যত দ্রুত অংক কষবে, সিদ্ধান্ত নিবে, বলটা সেভ করার সম্ভবনা ততই বেশি হবে।

উদাহরণ দেই একটা। ডিএফবি পোকালের ফাইনাল, থ্রু বল আসছে একটা। বায়ার্নের গোল বারে ম্যানুয়েল নয়্যার, আর বলের কাছে স্পিডি অবামেয়াং। নয়্যার এখন উপরে উঠে যাবে কিনা সবার আগে সে এটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সিদ্ধান্ত হ্যাঁ যেহেতু, তাই এরপর তাকে ঠিক করতে হয়েছে কতখানি বেগে তাকে ছুটতে হবে। এরপর লাস্ট স্টেপ হলো, স্পিড কমিয়ে কিভাবে বলকে লাথি মারা যায় কিংবা প্লেয়ারকে ট্যাকল করা যায়? এর জন্য নয়্যার প্রায় দু মিটার আগে স্লাইড করল। ফলাফল, বল ক্লেয়ার! স্পিডি অবামেয়াংও হার মেনে গেল ইন্টিলিজেন্সের কাছে। এই যে আগে স্লাইড করল স্পিড কমানোর জন্য, এটার কি দরকার ছিল? খালি চোখে মনে না হলেও, স্লাইড না করলে ধাক্কা খাওয়ার সম্ভবনা ছিল অবামেয়াং এর সাথে।ফলে কার্ড পেতে হত নয়্যারকে, যার জন্য এই কাজ। অর্থাৎ সোয়াইপিং এর জন্য এক কথায় দরকার, টেকনিক, ইন্টিলিজেন্স, স্পিড, পজিশনাল সেন্স, সেন্টার মিডফিল্ডারের মত গেম রিড করার ক্ষমতা আর সেই সাথে কনফিডেন্স।

সোয়াইপার কিপারের উপকারিতা কি? এটাকিং এর ক্ষেত্রে যদি বলি, টোটাল ফুটবলের জনক ক্রুইফের একটা উক্তি আছে, "আমার দলে গোলকিপার হলো প্রথম এটাকার, আর ফরোয়ার্ড হলো প্রথম ডিফেন্ডার।" ম্যানুয়েল নয়্যারের এমন অনেক এসিস্ট আছে, যেখানে সে কাউন্টার এটাকের সময় লম্বা পাস দিয়েছে, আর পাসটা এতই পারফেক্ট যে বল ঠিক নিজ দলের প্লেয়ারের কাছে গিয়েছে এবং গোল! গত সিজনে ম্যানুয়েল নয়্যারের পাসিং রেট ছিল।কত। আন্দাজ করেন দেখি? ৮৯%, অবাক করার মত না? একজন গোলকিপার, যে কিনা প্রায় লং বল মারে উপরে, থ্রো করে হাত দিয়ে, তার এত পাসিং রেট। এটা দিয়ে বোঝা যায় কি পরিমান পার্ফেক্ট পাস নয়্যার দিয়ে থাকে। সে একজন গোলকিপার শুধু নয়, আউটফিল্ডের প্লেয়ার একটা। আর ডিফেন্সিভলি, সোয়াইপার কিপারের জন্য দলের ডিফেন্ডাররা উপরে ওঠার সুযোগ পায়, তাদের উপরে ওঠা মানে এটাক হওয়ার আগেই অপনেন্ট হাফেই গোলের চান্স নষ্ট করে দেওয়া। আমার কাছে নয়্যার কেন সেরা? নয়্যার আমার দেখা সেরা গোলকিপার, শুধু গোলকিপারই নয় সেরা, অন্যতম সেরা প্লেয়ারওও। কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কেন? তবে এই প্রশ্নের উত্তরে আমি বলব,

১) অর্জন: টানা চার বারের সেরা কিপার জয়ী। সামনে আছে শুধু ক্যাসিয়াস, এ সিজনে সেটা সমান-সমান হয়ে যাচ্ছে শিউর। ওয়ার্ল্ড কাপে গোল্ডেন গ্লাভস জয়ী, ব্যালন ডি অরে থার্ড, বিশ্বের সবচেয়ে কম ম্যাচে ১০০ ক্লিন শিটের রেকর্ড (১৮৮ ম্যাচে, সেকেন্ডে থাকা প্লেয়ারের ২৩৬ ম্যাচ লেগেছে), এক সিজনে সবচেয়ে বেশি ক্লিন শিট (৩৪ ম্যাচে ২১ টা) এছাড়াও, ইউরো বাদে এখন অব্দি সব ট্রফি জেতা।

২) সোয়াইপিং কিপিং: নয়্যারের সোয়াইপিং কিপিং এর জোড়ে বহুত ম্যাচ বেঁচে যায় বায়ার্ন আর জার্মানি। ১৪ বিশ্বকাপে আলজেরিয়া-ফ্রান্স ম্যাচ দুটো তো একা বাচিয়ে দিয়েছে। আলজেরিয়ার সাথে ডি বক্সের বাইরে ১৫ টার মত ট্যাকল ছিল, ভাবা যায়? নয়্যারের কথা হলো, দাঁড়িয়ে থাকলে গোল খেতে হবে। কিন্তু যদি সামনে আগানো যায়, তবে বাঁচানোর একটা চান্স থাকবে। যদি প্লেয়ার কাটিয়ে ফেলে তাকে, তবুও গোলবার থেকে অনেক দূরে থাকবে, যেখানে থেকে গোল করতে সামান্য হলেও সমস্যা হবে। আবার, ততক্ষণে ডিফেন্ডাররাও চলে আসতে পারে। শুধুমাত্র সোয়াইপিং দিয়ে নয়্যার কত গোল বাঁচিয়েছে?৩০?৪০?৫০? বা তারও বেশি? কিন্তু খেয়েছে কটা? ২?৪?৫? এর বেশি না।

৩) রিফ্লেক্স/ডিসিশন মেকিং: কোন দিকে কিভাবে রিএক্ট করলে বল আটকাবে এটা নয়্যারের চেয়ে ভালো কারো দেখিনাই। পা দিয়ে সে যেভাবে বল আটকায়, যেন তার পাও একটা হাত। বিশ্বকাপে ফ্রান্সের সাথে ম্যাচে বেনজেমার যে ম্যাচ বাচানো সেভটা ছিল একেবারে ক্লোজ রেঞ্জে, তা কজন পারত!

৪) বল ডিস্ট্রিবিউশন: বল ডিস্ট্রিবিউশনে নয়্যার থেকে অনেক বেটার প্লেয়ার আছে যারা ভালো পাস করতে পারে, যেমন ভালদেস পারত বা এখন স্টেগেন পারে। কিন্তু নয়্যার যেটা পারে, সেটা হলো, ও চুজ করতে পারে কোন প্লেয়ারকে বল দিলে দলের আক্রমনে সাহায্য হবে, এবং সে এটা করে মাইক্রো সেকেন্ডে নেয়া ডিসিশনে, একদম ওয়ান টাচে। বল পায়ে নিয়ে ভেবে দেখতে হয় না।

সর্বোপরি গোলকিপার অনেক এসেছে,আসবে আরো। কিন্তু ১০ বছর পরে সবচেয়ে প্রভাবশালী গোল কিপার হিসেবে নাম থাকবে ম্যানুয়েল নয়্যারের, শুধু মাত্র অন্য সব কিপার থেকে নিজেকে আলাদা ভাবায়। মাঠের একজন মেইন প্লেয়ার ভাবায়, শুধু গোলকিপার নিজেকে না ভেবে। আজকাল জার্মানি সহ প্রায় দেশের বড় বড় ফুটবল একাডেমিতে একজন ক্ষুদে নয়্যার বানানো প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে শুরুই হয়ে গিয়েছে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন