এ জার্নি ফ্রম বুয়েন্স আয়ার্স টু ম্যানচেস্টার : পাবলো জাবালেতা

এ জার্নি ফ্রম বুয়েন্স আয়ার্স টু ম্যানচেস্টার : পাবলো জাবালেতা

বুয়েন্স আয়ার্স এর ছোট্ট শহর এরিসাইফেস। সেখানে ১৯৮৫ সালের ১৬ জানুয়ারি বাবা মা এর কোল জুড়ে আসে পাবলো। বাবা, মা ও ছোট ভাইকে নিয়ে ছোট সংসার তাদের।

১৯৯৭ সালের কথা। ১২ বছর বয়সী জাবালেটা তখন বুয়েন্স আয়ার্স এর স্থানীয় ওবরাস স্যানিটারিস ক্লাবের হয়ে খেলে। মা তাকে নিয়মিত ট্রেনিং গ্রাউন্ডে নিয়ে যেত খেলার সময়, ফুটবল খেলার ব্যাপারে মা বাবার সাপোর্ট সে সবসময় পেত। অজপাড়াগায়ের অপরিচিত ক্লাবের হয়ে খেলেও নিজের নৈপুণ্যের কারনে বুয়েন্স আয়ার্সের বিখ্যাত সান লরেঞ্জো ক্লাবের দৃষ্টি কাড়তে সমর্থ হয় সে। তারা তাদের স্কাউটদের পাঠায় জাবার খেলা পর্যবেক্ষনের জন্য। জাবাও তাদের হতাশ করেনি। সুযোগ হয়ে যায় সান লরেঞ্জোর একাডেমিতে খেলার। সব কিছুই ঠিক ঠাক মত চলছিল। মা তাকে নিয়মিত একাডেমিতে পৌছে দিত আবার নিয়ে আসতো। কিন্তু হঠাৎ মাত্র ১৫ বছর বয়সে এক দূর্ঘটনায় মা কে হারায় জাবা। মা হীন জাবার জীবন দূর্বিষহ হয়ে ওঠে। ভেঙ্গে পড়ে জাবা। কিন্তু বাবা জর্জ রুবেন ছেলেকে এভাবে বেশিদিন সহ্য করতে পারেন নি। ছেলেকে অনুপ্রেরনা দিয়ে আবারো সান লরেঞ্জোতে পাঠান। জাবাও তার বাবা মার এ অনুপ্রেরনা - এ ভালবাসা বিফলে যেতে দেয় নি। মায়ের মৃত্যুর শোক কে শক্তিতে পরিনত করে ২ বছর পর ই নিজের প্রথম প্রফেশনাল কন্ট্রাক্ট অর্জন করে নেয়।

জানুয়ারি ২০০৩। সান লরেঞ্জোর হয়ে জাবার অভিষেক ম্যাচ। প্রতিপক্ষ আর্জেন্টাইন জায়ান্ট বোকা জুনিয়ার্স। নিজেকে সেরাদের কাতারে প্রমানের প্রথম চেস্টা জাবার শুরু হয় অভিষেক ম্যাচে ম্যান অফ দা ম্যাচ এর এওয়ার্ড দিয়ে। নিজের টিম হেরেছে কিন্তু সে জিতে নিয়েছে দর্শকদের হৃদয়, কোচের মন। ক্যারিয়ারের শুরুটা তার ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার হিসেবে শুরু হয়েছিল - যা বর্তমানে তার ভার্সাটালিটিকে প্রমান করে। যদিও এরপর সে ডিফেন্ডার হিসেবেই খেলতে থাকে। সেখান থেকে নিজেকে সান লরেঞ্জোর ডিফেন্সের প্রান ভোমরা হিসেবে প্রমান করে সে মাত্র ৩ সিজনে ৬৬ ম্যাচ খেলে, ডিফেন্ডার হয়েও সে গোল করে ৮ টি!

আর্জেন্টিনার জাতীয় দলের অনুর্ধ ১৯, ২০ দলেও খুব দ্রুতই ডাক পায় পাবলো এবং নির্বাচিত হয় অধিনায়ক হিসেবে এবং তার নেতৃত্বে ২০০৫ সালে আর্জেন্টিনা অনুর্ধ ২০ বিশ্বকাপ জিতে। সে নিজেও দলের হয়ে টুর্নামেন্ট এ ৩ গোল করে। "অধিনায়ক হিসেবে জাবা কেমন ছিল?" - জানতে চাওয়া হয় দলের সেরা খেলোয়াড় মেসির কাছে। ক্যাপ্টেন জাবার ব্যাপারে তার মন্তব্য ছিল : "অধিনায়ন হিসেবে সে সেরা ছিল। সব সময় দলের প্লেয়ার রা ওকে আছে কিনা সে খোজ খবর রাখতো। দলের কোচ এবং ডাক্তারের কাছে সবার খবর নিত নিয়মিত। পজিটিভ লিডার ছিল একজন জাবা। সব সময় দলকে চাংগা রাখতো এবং একমাত্র তার মতামতকেই আমরা সবাই খুব শ্রদ্ধা করতাম "

আর্জেন্টাইন যুব দলের হয়ে ৭৫ এপিয়ারেন্স হয় জাবার। ২০০৫ বিশ্বকাপ তার পারফোম্যান্স এতটাই নজর কাড়া ছিল যে এরপর পর ই এস্পানিওল ৩ মিলিয়ন ট্রান্সফার ফিতে তাকে দলে ভিড়িয়ে নেয়। এস্পানিওলের হয়ে ২০০৬ এ কোপা ডেল রে জিতে জাবা। এক ই বছর ই ইউরোপা লীগের ফাইনালে যায় জাবার দল এস্পানিওল। যদিও পেনাল্টিতে এস্পানিওল হেরে যায় এবং শিরোপা জিততে ব্যর্থ হয়। ২০০৫-৮ পর্যন্ত এস্পানিওল এর হয়ে ৭৯ বার মাঠে নামে জাবা। এস্পানিওল এর হয়ে জাবা তার কমিটেড এবং পরিশ্রমী গুনের কারনে সব সময় ই প্রশংসার পাত্র হয়ে ছিল।

২০০৫ সালের আর্জেন্টাইন সিনিয়র দলের হয়ে অভিষেক হয় জাবার - এক ই ম্যাচে লিওনেল মেসির ও অভিষেক হয়। ২০০৬ সালে বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পেয়ে কিছুটা হতাশ হয়ে যায় জাবা।

২০০৮ সালের অলিম্পিকে মেসি, আগুয়েরা, ডি মারিয়া, মাসচেরানো সাথে আর্জেন্টিনা দলের হয়ে স্বর্ন পদক জিতে জাবা - যা তাকে আরো ভাল ক্লাব পাবার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ন ভুমিকা পালন করে। আগস্ট ২০০৮ এ সিটির ভেদরান করলুকা টটেনহাম এ জয়েন করলে ৬.৪৫ পাউন্ডে মার্ক হিউজেস জাবা কে দলে ভিড়ান। সিটিতে জয়েন করার পর জাবা ইন্টারভিউ তে বলে " ইংলিশ লীগে খেলা আমার সারাজীবনের স্বপ্ন। সিটির স্টেডিয়ামে কিছুক্ষন হাটার পর আমি আর অপেক্ষা করতে পারছিনা ফ্যানদের সামনে খেলার জন্য। আমি খুব ই এক্সাইটেড "

১৩ ই সেপ্টেম্বর ২০০৮ সালে চেলসির বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সিটির হয়ে অভিষেক হয় জাবার। ডিফেন্সিভ্লি তাকে স্ট্রাগল করতে হলেও তার অক্লান্ত পরিশ্রমী ওয়ার্ক এথিক আর ডিফেন্স ও মিডফিল্ডে ভার্সাটালিটি সব সময় তখন কার সিটি টিমের জন্য খুব ই প্রয়োজনীয় ছিল। দ্রুতই জাবা ফ্যান ফেভারিট হিসেবে সমর্থক দের মনে জায়গা করে নেয়। তার সিটি ক্যারিয়ার এর প্রথম গোল আসে ২০০৯ সালে উইগানের বিপক্ষে ম্যাচে ১-০ গোলে জয়ের ম্যাচে। নিজের প্রথম সিজনেই যোগ্যতার প্রমান দিয়ে সে ৩৯ ম্যাচে স্টার্ট করে এবং প্লেয়ার অফ দা ইয়ার এওয়ার্ড এ তৃতীয় সর্বোচ্চ ভোট পায়।

মার্ক হিউজেস এর পর মানচিনি সিটির কোচ হয়ে আসে এবং নতুন এক সিটির শুরু হয়। কিন্তু গেম টাইম কমতে থাকে জাবার। ২০০৮-৯ এ ৩৯, ৯-১০ এ ৩১, ১০-১১ তে ৩২ এবং ১১-১২ তে ২৬। কিন্তু মানচিনি সবসময় ই জাবার বিগ ফ্যান ছিলেন। এত ইম্প্রুভমেন্ট এবং কমিটেড পারফোম্যান্স এর সত্বেও জাবা ২০১০ সালে আবারো বিশ্বকাপ দলে ডাক পায়নি। কিন্তু সে কখনই হতাশ হয়ে যাবার পাত্র ছিল না।

২০১০-১১ সিজন। মনসুরের আধুনিক ম্যানসিটির স্বপ্নযাত্রায় যোগ হয় তোরে, সিলভারা। এই আধুনিক ম্যান সিটি তৈরীর শুরু থেকেই সাক্ষী হয়ে ছিল জাবা।
" আমার মনে পড়ছে সেই প্রথম দিন যখন আমি সিটির ট্রেনিং গ্রাউন্ডে আসি। আজ প্রতিটা পরিবর্তন ই আমার চোখে ভেসে উঠছে। ক্লাবের এই উন্নতির যাত্রায় সঙ্গী হতে পেরে খুব খুশি। আশা করি আমাদের প্যাশনেট সিটি ফ্যানদের ভালবাসার প্রতিদান দিতে পারবো সব সময় ক্লাবের একটা পার্ট হিসেবে।''

মার্চ ১১ তে জাবালেটার বাবা এক মারাত্নক সড়ক দূর্ঘটনায় পতিত হয় । ক্লাব থেকে তাকে ছুটি দেওয়া হয়।আমাদের এফ এ কাপ সেমিফাইনাল এর প্রতিপক্ষ হয় ইউনাইটেড। একদিকে বাবার অসুস্থতা অন্যদিকে ক্যারিয়ারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক ম্যাচ।জাবা ফিরে আসে আর্জেন্টিনা থেকে এবং এ ম্যাচ জিতে ফাইনালে গিয়ে এফ এ কাপ জিতার জন্য প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয় এবং এ জয় তার অসুস্থ বাবাকে ডেডিকেট করার প্রতিজ্ঞা করে।

জাবা তার প্রতিজ্ঞা পূরন করে। এফ এ কাপ জিতে বাবাকে ডেডিকেট করে। সাথে আমরা লীগে থার্ড হই, প্রথম বারের মত ইউসিএল এ কোয়ালিফাই করি। জাবা ও লীগের ওয়ান অফ দা বেস্ট রাইট ব্যাক হিসেবে খ্যাতি লাভ করতে থাকে মিকাহ রিচার্ডস এর সাথে । ২০১১ এর নভেম্বর এ সিটি তাকে ২০১৫ পর্যন্ত কন্ট্রাক্ট অফার করে এবং জাবা বলে সে এতটাই খুশি ছিল যে সাইন করার জন্য দ্বিতীয়বার কোনো চিন্তাই করেনি।

১১-১২ সিজন। আমরা লীগ জিতলাম। জাবা শুধু ওই ম্যাচে গোল ই করেনি - সে ফুল ফিট ইন ফর্ম মিকাহ কে ড্রপ করে লাস্টের ক্রুশ্যাল ৬ ম্যাচ স্টার্ট ও করেছিলো। কিউ পি আর ম্যাচে প্রথম গোল টা জাবার ছিল। ম্যাচে কিউপিয়ার সেকেন্ড গোল টার পর জাবা বলে :

" ২০১১-১২ সিজনে আমার কোনো গোল ছিল না। ম্যাচের আগে ভাবছিলাম - হায় এই ম্যাচে গোল না করলে এটা আমার প্রথম সিজন যাবে গোলহীন হয়ে। আমি দলের প্রথম গোল টা করলাম। কিন্তু তারা দ্বিতীয় গোল টা করার পর খুব ই খারাপ লাগছিলো। ভাবছিলাম আমার গোল টা কি কোনো কাজে আসবে না। কিন্তু ভরসা হারায় নি কখনো টিমের উপর থেকে, টিমমেট দের উপর থেকে। সবাই এই চেতনাতেই ছিলাম যে আমাদের ম্যাচ টা জিততেই হবে। আমাদের ফ্যান দের জন্য - সবার জন্য! কিউপিয়ার ম্যাচের পর আমি সেদিন কেঁদেছিলাম। আমরা পুরোটা সিজন খুব ই হার্ড ওয়ার্ক করেছি এবং লীগ টা আমরাই ডিজার্ভ করতাম। ফুটবলার হিসেবে ছোট থেকে বড় হওয়া এই মুহুর্ত গুলোকেই পাওয়ার জন্য। কিউপিয়ার ম্যাচ টা আমি দ্বিতীয়বার আর কখনো দেখিনি। কারন আমি নার্ভাস ফিল করি। ম্যাচ টা দেখে নিজেকে ধরে রাখতে পারিনা। "

সেই সান লরেঞ্জোর কন্ট্রাক্ট। এরপর জাবাকে কখনোই পিছনে তাকাতে হয়নি। নিজের অর্জনের থলি দুইটি পিএল শিরোপা, একটি এফ এ কাপ, দুটি লীগ কাপ, কমিউনিটি শিল্ড, দলের প্লেয়ার অফ দা ইয়ার এওয়ার্ড দিয়ে সাজিয়েছেন। আর সাথে ফ্যানদের সীমাহীন ভালোবাসা।প্যাশন শব্দে যোগ করেছেন এক নতুন মাত্রা। হার্ড ওয়ার্ক, ডেডিকেশন শব্দের সমার্থক শব্দে নিজের নাম স্বর্ণাক্ষরে যুক্ত করে নিয়েছেন। নিজের ১১০% দিয়ে খেলেছেন সবসময়। মাথায় আঘাত পেয়ে রক্তাক্ত অবস্থায় খেলেছেন - নিজের চিন্তা করেননি, করেছেন দলের চিন্তা। রোমার বিপক্ষে গোল করে আবেগ আপ্লুত হয়ে অশ্রুসজল হয়ে পড়েন। সেলেব্রেট করতে ছুটে যান ফ্যানদের কাছে। গোল করেই চুমো খান ক্লাবের ব্যাজে - ক্লাবের প্রতি ভালবাসার দেখানোর কোনো কমতি রাখেন না কখনোই ।

ধন্যবাদ পাবলো  । :বিদায় জিনিস্টা সবসময় ই কস্টের। তবুও আমরা বাস্তবতা মেনে নিয়ে এগিয়ে যাই। তোমার প্রতি ভালবাসা টা অন্তরের একদম গভীর থেকে। কারন তুমি শিখিয়েছো কিভাবে ভালবাসতে হয় এই ব্যাজটাকে , শিখিয়েছো কিভাবে যোদ্ধা হয়ে টিকে থাকতে হয় যুদ্ধের ময়দানে। এই ভালবাসার টানেই হয়তোবা একদিন তোমায় দেখতে পাবো হয়তো ক্লাবের ডাগ আউটে কিংবা ইতিহাদের ক্লাব এম্বাসেডর এর চেয়ারে।

ভাল থেকো জাবা ।

Adios Legend

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন