চেলসিতে কন্তের জাদু

চেলসিতে কন্তের জাদু

উত্তেজনা আর প্রতিযোগিতার খেলা ফুটবল প্রতিনিয়তই আমাদের দিচ্ছে বিনোদন। ফুটবলে সবসময়ই দৃষ্টিনন্দন এবং নতুন কিছু থাকে যা সকলের আলোচনার কেন্দ্রে থাকে। আর যদি তা হয় খুবই ফলপ্রসূ তো আমাদের আগ্রহের শেষ নেই সে বিষয়ে। তেমনই একটি দৃষ্টিনন্দন এবং আলোচনার বিষয় হল কন্তের চেলসি। ৩-৪-৩ এর এক অভূতপূর্ব সাফল্য এবারের পিএল কে অনেকটাই ম্যাড়মেড়ে করে দিয়েছে। টানা ১৩ ম্যাচ জয়, সবচেয়ে কম গোল হজম, বিশাল ব্যবধানে এগিয়ে থাকা সহ কি করে নি তারা? অথচ এই চেলসিই না গত সিজনে রেলিগেশন থেকে ঘুরে এলো? চলুন আজ জেনে নেই কন্তের চেলসির গল্প আর তাদের কার্যক্রমঃ

৩-৪-৩ এ চেলসির বেষ্ট লাইন আপ হল:

গোলবারে কোরতোয়া,
ডিফেন্স লাইনে অ্যাজপিলিকুয়েতা, ডেভিড লুইজ এবং ক্যাপ্টেন গ্যারি কাহিল
মিডফিল্ডে দুই উইংব্যাক আলোন্সো এবং মোসেস। সাথে দুই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার কান্তে ও ম্যাটিচ।
ফরোয়ার্ড লাইনে লেফট উইং এ হ্যাজারড, স্ট্রাইকার কস্তা এবং রাইট উইং এ পেদ্রো/উইলিয়ান।

                                                                  


এই সিজনে চেলসি কোথায় ডমিনেট করে নি? এটাক বলুন আর মিডফিল্ড আর ডিফেন্স, সব জায়গায় তারা ছিল পারফেক্ট। তবে আমার দৃষ্টি তে চেলসির সবচেয়ে স্ট্রং পয়েন্ট হল তাদের ডিফেন্স। তাই শুরুটা ডিফেন্স দিয়েই করি।

চেলসি সাধারণত হাই প্রেসিং এ যায় না এবং ফরোয়ার্ড লাইনের প্লেয়ার ছাড়া বাকি সবাই নিজেদের হাফেই বেশী সময় অবস্থান করে। অপনেন্ট যখন বল পায়ে চেলসির হাফে থাকে তখন তাদের ফর্মেশন হয়ে যায় ৫-৪-১ যেখানে একমাত্র স্ট্রাইকার উপরে থাকে। বাকি সবাই তাদের ফরমেশন বজায় রেখে ডিফেন্স করে। এখন অপনেন্ট যখন উইং দিয়ে এটাক করে তখন অপনেন্ট উইঙ্গার কে মার্ক করার দায়িত্ব পড়ে সেই উইং এ থাকা চেলসির উইংব্যাক এর উপর। যে কোন একটা উইং নিয়ে বর্ণনা দিলে বেপার টা ক্লিয়ার হয়ে যাবে আপনাদের কাছে। উদারহন হিসেবে রাইট উইং এর কথাই ধরুন। অপনেন্ট রাইট উইঙ্গারকে যখন মোসেস মার্ক করতে যায় তখন চেলসির রাইট উইঙ্গার চলে আসে মোসেস এর সাপোর্ট রোলে। কিভাবে? এক উইঙ্গার তো আর বল নিয়ে উপরে উঠে যেতে পারে না। তাকে সাপোর্ট দেবার জন্য যেই অপনেন্ট প্লেয়ারটি তার কাছাকাছি থাকে তাকে মার্ক করে পেদ্রো। যাতে অপনেন্ট উইঙ্গারের বল সাপ্লাই কাট অফ হয়ে যায়। আবার যখন রাইটব্যাক বল পায়ে সামনে এগিয়ে আসে তখন তাকে একই ভাবে মার্ক করতে যায় মোসেস। সেইম ভাবে তখন অপনেন্ট রাইট উইঙ্গারকে মার্ক করে রাখে পেদ্রো। এভাবে উইং দিয়ে সকল লাইন কাট অফ করে চেলসি অপনেন্ট এর উইংবেজ এটাক বন্ধ করে। এবার আসি মাঝমাঠের ডিফেন্ডিং নিয়ে। দুজন ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডার এবং দুই উইঙ্গার তাদের সাথে যোগ হবার কারণে সেন্ট্রাল স্পেস এমনিতেই অনেক কম থাকে চেলসি হাফে। চেলসি যদি অপনেন্ট হাফেও বল হারায় তো কোচের নির্দেশ থাকে নিজের হাফে এসে ফরমেশন বজায় রেখে বল ক্লিয়ার/দখল করতে। যেহেতু নিজের হাফে চেলসির ফরমেশন হয়ে যায় ৫-৪-১ তাই ৪ জন মিডফিল্ড এবং ৫ জন ডিফেন্ডারের কারণে অপনেন্ট এর মিডফিল্ড থেকে ফরোয়ার্ড লাইনে বল সাপ্লাই এর সকল রাস্তা চেলসি ব্লক করে দেয় যাতে অপনেন্ট বাধ্য হয় ভুল পাস/ইন্টারসেপশন এর শিকার হয়ে বল হারায়। অন্যদিকে অপনেন্ট কাউন্টার এটাকে যখন চেলসির দুই উইঙ্গার ফরমেশনে যোগ দিতে পারে না তখন দুই উইংব্যাক মিডফিল্ডারদের সাথে যোগ দিয়ে নিচে নেমে আসে। এখন ৩ জনের সেন্ট্রাল ডিফেন্স লাইন থাকার কারণে কাউন্টারে ২ জন প্লেয়ার এগিয়ে এলেও তারা যথাসাধ্য স্পেস পায় না। কারণ তাদের পেছনে ট্র্যাকব্যাক করে ২ জন মিডফিল্ডার/উইংব্যাক ধেয়ে আসে। সাথে সামনের ৩ জন সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার তো আছেই। আবার অপনেন্ট মিডফিল্ডার এবং উইঙ্গারদের মার্ক করার জন্য চেলসির তিন সেন্ট্রাল ব্যাকের দরকার পড়ে না। দুই উইঙ্গার এর সাপোর্ট এ মিডফিল্ড ডুয়ো এবং দুই উইংব্যাক তাদের মার্ক করতে সক্ষম। ফলাফল কি? ৩ জন ডিফেন্ডার মিলে ১ জন স্ট্রাইকার কে মার্ক করে রাখে। সো এটা অনেকটাই ইম্পসিবল বলা যায় ওই ৩ জন কে বিট করে ফরোয়ার্ড এর বল পায়ে রেখে গোল করা। সো আমরা ইজিলি বলতে পারি চেলসি অপনেন্ট উইঙ্গারের সকল অপশন বন্ধ করে দেয় এবং স্ট্রাইকারের কাছে বল পৌছানোর সকল সেন্ট্রাল স্পেস ক্লোজ করে রাখে ডীপ লাইন ফরমেশনের মাধ্যমে। কন্তের কড়া নির্দেশ থাকে অলওয়েজ নিজেদের ফরমেশন ধরে রাখার যাতে সকল অপনেন্ট থ্রেট ব্লক করে রাখা যায় এবং চেলসির দুই উইঙ্গার এতে যোগ দিয়ে বেশ ভালোভাবেই এই ফরমেশন বজায় এবং ডিফেন্সিভ ডিউটি তে সাহায্য করে যা অন্য টীমে দেখা যায় না।

এবার আসি এটাক বিল্ড আপ নিয়ে। এটাক বিল্ড আপ চেলসি সাধারণত নিজেদের হাফ থেকেই শুরু করে এবং অধিকাংশ ছোট পাসের সাথে ২-১ টি লং পাসের মাধ্যমে তারা বিল্ড আপ শুরু করে। চেলসির সবচেয়ে ডিপে থাকা প্লেয়ারটি হল ডেভিড লুইজ এবং বল প্লেয়িং সিবি হিসেবে তার নাম বিশ্বসেরা। আর তাই শুরুটা তার পা থেকেই হয়। চেলসি যখন নিজেদের হাফ থেকে বিল্ড আপ শুরু করে তখন অ্যাজপিলিকুয়েতা এবং কাহিল যতটা সম্ভব ওয়াইড স্পেসে চলে যায় যাতে দুই উইংব্যাক তখন উপরে উঠে যেতে পারে। দুই উইঙ্গার এসে যোগ দেয় দুই সেন্ট্রাল মিডফিল্ডারের সাথে পাসিং এর মাধ্যমে প্লে বিল্ড আপ করার জন্য। এই সময়ে দুই উইংব্যাক বনে যায় দুই উইঙ্গার এবং একদম ওয়াইড এরিয়াতে তারা অবস্থান করে যাতে তাদের মার্ক করা প্লেয়ার দুটি আর অন্যান্য প্লেয়ারের মাঝে অনেক স্পেস থাকে। আবার সবসময় তো হাই প্রেসিং এর কারণে বিল্ড আপে যাওয়া যায় না। এক্ষেত্রে শুধুমাত্র সিবি ছাড়া বাকি সবাই মার্কড থাকে এবং স্পেস পাস না মুভমেন্ট এর জন্য। তখন এগিয়ে আসে ডেভিড লুইজ। কেননা সবচেয়ে ডিপেস্ট প্লেয়ার সে হবার কারণে তার হাতে সময় বল পায়ে রাখার, সাথে থাকে স্পেস ও। তখন সে ওই স্পেস কভার করে লং বল সাপ্লাই করে। আর বল সাপ্লাই এর জন্য ডেভিড লুইজ কেমন তা আমরা সবাই মোটামুটি জানি। যেহেতু আগেই বলেছি প্লে বিল্ড আপে কোন উইংব্যাক অংশ নেয় না এবং তখন তারা ওয়াইড স্পেসে যেয়ে উইঙ্গার এর দায়িত্ব পালন করে সো এটাতে প্রথমত কোন সমস্যা না থাকলেও অপনেন্ট বোকা বনে কিছুখন পরে। কিভাবে? দুই সেন্ট্রাল মিডের সাথে যখন বিল্ড আপ করতে করতে দুই উইঙ্গার অপনেন্ট হাফে আসে তখন একমাত্র স্ট্রাইকার কস্তা অপনেন্ট বক্সের আশেপাশে ঘোরাঘুরি করে। সো তাকে মার্ক করতে তেমন কোন কষ্ট হয় না। কিন্তু বল যখন অপনেন্ট ডি বক্সের কাছে আসে বিপদটা ঘটে তখন। আগে থেকেই পজিশন নিয়ে রাখা উইংব্যাক তখন উইঙ্গার হয়ে বল প্লে তে অংশ নেয় আর এর মাঝে ডিয়েগো কস্তার সাথে সাথে চেলসির দুই উইঙ্গার হ্যাজারড এবং পেদ্রো অপনেন্ট বক্সে ঢুকে পড়ে। ফলে যেখানে অপনেন্ট সেন্ট্রালব্যাকদের আগে শুধু কস্তাকে মার্ক করতে হচ্ছিলো, সেখানে তাদের এখন কস্তা, হ্যাজারড এবং পেদ্রো এই ৩ জন কে মার্ক করতে হচ্ছে যা তাদের পক্ষে অনেকটাই অসম্ভব। ঠান্ডা মাথায় বেপারটা আরও একবার ভাবুন তো। সেন্ট্রালব্যাকদের কাজ থাকে অপনেন্ট স্ট্রাইকার কে মার্ক করা এবং তার সাথে অন্য উইঙ্গারদের স্পেস অফ করে বক্সে বল সাপ্লাই করতে না দেয়া। বাট চেলসি পুরা ফরোয়ার্ড লাইনই বক্সে ঢুকিয়ে দেয় উইংব্যাকদের উইঙ্গার বানিয়ে। ব্যাপারটা কি আসলেও ভয়াবহ নয়? কেননা যারা ৪ ম্যান ডিফেন্স লাইনে খেলে তাদের দুই ফুলব্যাক তো মোসেস আর আলোনসো কে মার্ক করতে যায়। সো এক্ষেত্রে দেখা যায় দুজন সেন্ট্রালব্যাককে মার্ক করতে হচ্ছে ৩ জন চেলসির প্লেয়ারকে। এটা কি আদৌ সম্ভব?


এই হল তাদের জেনারেল ডিফেন্ডিং এবং এটাক বিল্ড আপ প্রসেস। এছাড়া চেলসি কাউন্টার এটাকে অনেক পারদর্শী এবং তারা চেষ্টা করে প্রতিটি কাউন্টার এটাকের যথাযথ ব্যাবহার করা। সেখানে তাদের ৩ জন ফরোয়ার্ড এ বেপারে যথেষ্ট উপযোগী। এছাড়া যে দুজন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার খেলে চেলসির মাঝমাঠে তাদের প্লে মেকিং এবিলিটি কম এবং ডিফেন্সিভ এবিলিটি বেশী থাকায় মাঝে মাঝেই দেখা যায় ম্যাটিচ এর জায়গায় কন্তে ফ্যাব্রেগাস কে খেলাচ্ছেন। কন্তের নির্দেশ এতোটাই কড়া থাকে যে কাউন্টার এটাকে ৩ জন ফরোয়ার্ড শুধু যোগ দিতে পারে। মিডফিল্ডার এবং উইংব্যাকদের নিজেদের ফরমেশন বজায় রাখতে হয় কাউন্টারে যোগ না দিয়ে। চেলসির এই ৩-৪-৩ ফরমেশনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্লেয়ার হল দুই উইংব্যাক। এদের যে পরিমান পরিশ্রম আর ওভারল্যাপিং করতে হয় তা সত্যিই ভাবা যায় না। কলুর বলদের মত তারা পরিশ্রম করে মাঠে। অন্যদিকে ম্যাটিচ একটু ডিপে নেমে খেললেও কান্তে কে মিডফিল্ডে পুরা ফ্রিডম দেয়া হয় তার ডিফেন্সিভ ডিউটি পালনের জন্য। এতে ফরোয়ার্ড লাইনের উপর প্রেসিং এর চাপ ও কমে যায়। মোদ্দাকথায় চেলসির প্রতিটি পজিশনে রয়েছে এই ফরমেশনে এবং প্রেশ্রার সামলিয়ে খেলার মত যোগ্যতাসম্পন্ন প্লেয়ার। আর যদি তার সাথে কন্তের মত একজন কোচ থাকে তো আর কি লাগে?
বরতমান ফরমেশন এবং ফর্ম বজায় রাখলে অদূর ভবিষ্যৎ এ চেলসি যে আমাদের অবাক করতে পারে তা বলাই যায়।  

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন