বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস (পর্ব-১০)ঃ যাদের খেলা বদলে দিয়েছিল বাংলার ফুটবল

বাংলাদেশের ফুটবল ইতিহাস (পর্ব-১০)ঃ যাদের খেলা বদলে দিয়েছিল বাংলার ফুটবল

এ দেশে ফুটবলের প্রসারের শুরু থেকেই বাংলার ফুটবলারদের নৈপুণ্য ছিল চোখে পড়ার মত। তারা যেখানেই খেলতে গিয়েছেন নিজেদের শৈল্পিক ফুটবলে দর্শক মনে যেমন স্থায়ী আসন গেড়েছেন, বিপক্ষ দলের প্রশংসা কুড়িয়েছেন তেমনি বাংলার ফুটবল ঐতিহ্যকে আরো সমৃদ্ধ করেছেন। তাদের পথ ধরেই ব্রিটিশ শাসন আমল পেরিয়ে পাকিস্তান শাসন আমলেও প্রতিভাবান, দক্ষতা সম্পন্ন খেলোয়ার বেড়িয়ে এসেছে। এখন আমরা এবং দক্ষিণ এশীয়রা লীগের জন্য যেমন আফ্রিকান ফুটবলারদের দিকে ঝুঁকে পড়েছি, ইউরোপিয়ানরাও মানসম্মত আফ্রিকানদের নাগরিকত্ব পর্যন্ত দিচ্ছে, তেমনি দশ ও বিশের দশকে কলকাতার ক্লাবগুলো ঢাকার ফুটবলারদের দলে ভেড়ানোর জন্য হামলে পড়ত। এ পর্বে আমরা সে সময়ের তেমনই কয়েকজন মাঠ কাঁপানো ফুটবলার সম্পর্কে জানব।

যতীন্দ্রনাথ রায়ঃ মতান্তরে জীতেন্দ্রনাথ রায়। তবে ফুটবল মাঠে কানু রায় নামেই বেশি পরিচিত ছিলেন। ঢাকার অধিবাসী। প্রেসিডেন্সী কলেজ এর ছাত্র ছিলেন। তিনি ছিলেন ঢাকার ওয়ারী ক্লাবের নিয়মিত খেলোয়াড়। কানু রায় ছিলেন সেকালের সর্বজনস্বীকৃত সেরা রাইট আউট। যদিও তিনি সমান দক্ষতায় লেফটআউট পজিশনেও খেলতে পারতেন। পরে তিনি মোহনবাগানে যোগ দেন। ক্ষিপ্র গতিতে বল নিয়ে এগোতে পারতেন। রংধনু শটে পারদর্শী ছিলেন। খেলা ছাড়ার পর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে চাকরী করেছেন। ব্যক্তিগত জীবনে রায়বাহাদুর খেতাব পেয়েছিলেন। ১৯৬২ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

রাজেন সেনগুপ্তঃ রাজেন সেন নামে অধিক পরিচিত। ঢাকার বিক্রমপুরের অধিবাসী। কলকাতা স্কটিশ চার্চ কলেজের ছাত্র ছিলেন। সেন্টার হাফ পজিশনে খেলতেন। বেঁটে-খাটো হলেও দূর্দান্ত সাহস এবং অফুরন্ত দমের কারণে সারা মাঠেই তাঁর বিচরণ ছিল। কলেজজীবনে স্বদেশি আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। পরে আকাশবাণী, কলকাতায় যুক্ত হন। বলা হয়ে থাকে, তিনি বাংলা ফুটবল ধারাভাষ্যকে দেশব্যাপী জনপ্রিয় করা এবং একটি শিল্প হিসেবে ধারাভাষ্যকে জনপ্রিয় করার মূল সুতিকাগার তিনি । ১৯৪৮ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।

অভিলাষ ঘোষঃ জন্ম ১৮৯৪ সালে পাউলদিয়া-বিক্রমপুর, ঢাকায়। ১৯১১ খ্রীস্টাব্দে আইএফএ শীল্ড জয় করে মোহনবাগান ক্লাব, বাঙালী তথা ভারতীয়দের মধ্যে যে নবচেতনার জোয়ার জাগিয়েছিল, সেই জয়ের অন্যতম স্তম্ভ ছিলেন অভিলাষ। সেন্টার ফরোয়ার্ড পজিশনে খেলতেন। গায়ের কালো রঙের জন্য ‘কালো দৈত্য’ নামে পরিচিত ছিলেন। ১৯১১ আইএফএ শিল্ডের চূড়ান্ত খেলায় বিজয়সূচক গোলটি অভিলাষের পা থেকে আসে। পিতার কর্মস্থল ময়মনসিংহে স্কুলের ছাত্র থাকাকালীনই তিনি ফুটবলে নাম করেন। ম্যাট্রিক পাশ করে কলিকাতার স্কটিশচার্চ কলেজে ভর্তি হন। মোহনবাগান ক্লাবের দলভুক্ত হন। তিনি মোহনবাগানের নিয়মিত সেন্টার হাফে খেলেছেন। ১৯২০-২২ খ্রীস্টাব্দ পর্যন্ত এই ক্লাবের অধিনায়ক ছিলেন। এরপর খেলা থেকে অবসর গ্ৰহণ করেন। ব্রিটিশ ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান ‘ব্রুকবণ্ড টী কোম্পানী’র পদস্থ অফিসার ছিলেন। ১৯৬৩ সালে মৃত্যুবরণ করেন।

বিজয়দাস ভাদুড়ীঃ ফরিদপুরের অধিবাসী। লেফট ইন পজিশনে খেলতেন। তাঁর অসাধারণ পায়ের কাজ আর শরীরের মোচড়ে প্রতিপক্ষের রক্ষণভাগ বিধ্বস্ত হয়ে যেত। কর্মজীবনে ব্যবসা করতেন। ১৯৩৬ সালে তাঁর মৃত্যু হয়।

শিবদাস ভাদুড়ীঃ ফরিদপুরের অধিবাসী। লেফট আউট পজিশনে খেলতেন। ১৯১১ এর বিজয়ী দলের দলপতি ছিলেন। ফর্সা দীর্ঘকায় চেহারার শিবদাসকে সে সময় ফুটবলের জাদুকর বলা হতো। ১৯১১-এর চূড়ান্ত খেলায় পিছিয়ে থাকা অবস্থায় শিবদাস প্রথমে নিজে এক গোল দিয়ে সমতা আনেন, আর শেষ মুহূর্তে অভিলাষকে পাস দিয়ে জয়সূচক গোলের সুযোগটি করে দেন। কর্মজীবনে শিবদাস সরকারি পশু চিকিৎসা বিভাগের ইন্সপেক্টর ছিলেন। ১৯৩২ সালে শিবদাস ইহলোক ত্যাগ করেন।

কলকাতার ফুটবলে একসময় বাঘা সোম নামটি বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিলো। বাঘা সোমের প্রকৃত নাম ছিলো তেজশচন্দ্র সোম। তিনি ডিফেন্সে খেলা শুরু করলেও পরে মিডফিল্ড পজিশনে খেলে প্রশংসা কুড়ান।

সৈয়দ আব্দুস সামাদঃ ডাকনাম যাদুকর সামাদ। পশ্চিমবঙ্গের পুর্ণিয়া জেলায় ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দের ৬ ডিসেম্বর ‘ফুটবল যাদুকর সামাদ’ জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক নিবাস পশ্চিমবঙ্গের বর্ধমান জেলার ভুরী গামে। তার ফুটবল নৈপুণ্য এক কলামে লিখে শেষ করা একপ্রকার অসাধ্য সাধন। তার সম্মানে এই সিরিজটির প্রথম পর্বই শুরু করা হয়েছে তার নামে। এই গুণী ফুটবলার ১৯৬৪ সালের ২ ফেব্রুয়ারী ৬৯ বছর বয়সে পার্বতীপুরে মৃত্যুবরণ করেন।

এছাড়াও আরও কৃতি ফুটবলারদের মধ্যে নগেন কালী, মেজর জেনারেল এবিএস রায়, সিদ্দিক দেওয়ান, সোনা মিয়া, সাহেব আলী, আলাউদ্দিন, রশিদ, আব্বাস মির্জা, মোনা দত্তের নাম উল্লেখযোগ্য। 

বাংলার কৃতি সন্তানদের প্রতি শদ্ধা রেখে এ পর্ব শেষ করছি। 

 

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন