জাতীয় দলের মেসি – রোনালদো

জাতীয় দলের মেসি – রোনালদো

আমরা সবাই একটা জিনিস মেনে নিয়েছি যে রোনালদো এবং মেসি সর্বকালের সেরা না হলেও তারা কম করে হলেও এই যুগের সেরা । এখন কারও কারও কাছে মেসি সেরা আবার কারও কারও কাছে রোনালদো। এই কথা গুলোতে আমরা সবাই একমত আমি আশা  করি।

 

এবার আসি আমরা ফুটবল খেলা বলতে কি বুঝি ?ফুটবল খেলাটা কেউ একা খেলে না । একটা দলে ১১ জন খেলে। একটা ম্যাচে দুই দলের ২২ জন খেলে। সুতরাং আমরা বলতে পারি ফুটবল একটি দলীয় খেলা। আজকের আলোচনার জন্য এটুকু জানাই যথেষ্ট।

 

প্রথমে আমরা রোনালদোকে নিয়ে কথা বলব। 

আমরা যদি ক্লাব  ফুটবলের দিকে নজর দেই তাহলে দেখব রিয়াল মাদ্রিদে রোনালদো  বর্তমানে স্কোরিংয়ের কাজটাই করছে। সে প্লে-মেকিং করছে না।আরও বিশ্লেষণ যদি করি তাহলে দেখব রোনালদো  মূলত বল পায়ে পাবার জন্য  অপেক্ষা করে। সে তার অসাধারণ পজিশন  সেন্সিং  কাজে লাগিয়ে মার্কিং এর বাইরে নিজেকে নিয়ে যেয়ে নিজেকে এমন জায়গায় অবাস্থান করায় যে দলের অন্যরা তাকে সহজেই পাস দিতে পারে কিংবা পাস দেবার জন্য সহজলভ্য জায়গায় পায় । দিবক্স কিংবা তার আশেপাশে কথাও পাস পেয়েই রোনালদো তার অসাধারণ ফিনিশিং এবিলিটির  মাধ্যমে তারপর নিজের কাজটা করে। আর যদি এমন অবস্থানে থাকে যে সেখান থেকে শট নেয়া যাচ্ছে না বা তখনও ১-২ জন প্রতিপক্ষের  প্লেয়ারকে বিট করতে হবে তাহলে তখন সে বেস্ট পাসিং অপশনটা খুঁজে বের করে আর নিজের টিমমেটকে পাস দেয়। সে ড্রিবলিং কিংবা অন্য কোন কিছু করতে যায় না। অনেক সময় ক্রসিং রিসিভ করার মত কেউ থাকলে ক্রস ও দেয় । রিয়ালে রোনালদোকে  বিল্ড-আপ কিংবা চান্স ক্রিয়েট কিংবা প্রতিপক্ষ প্লেয়ারদের ড্রিবলিং করে বল বের করার কাজ কিংবা বল হোল্ড করে রাখার  কাজ গুলো করতে হয় না । এবং সে এগুলা তাই করতে যায়ও না। এগুলো করার জন্য তার দলে অন্য প্লেয়াররা আছে। এবং বলা বাহুল্য রোনালদো পুরোপুরিভাবে সার্থক তার নিজের কাজ করতে যেটা তার করার কথা ক্লাবে।এজন্যই রিয়ালের সাফল্যের জন্য রোনালদোর স্কিল কিংবা ড্রিবলিং থেকে সহজ ভাবে নিজের কাজ করাটা বেশি জরুরি এবং সে সেটাই করে আসছে। এমন না যে সে বাকী কাজ গুলো পারে না । ২০০৯-২০১২ পর্যন্ত তাকে বাকী কাজ গুলাও খুব ভালো ভাবেই করতে দেখা গিয়েছে রিয়াল মাদ্রিদে। কিন্তু তখনের চেয়ে বরং এখন বেশি সাফল্য পেয়েছে  সে।

 

এবার আসা যাক জাতীয় দলে রোনালদোর  ভূমিকা নিয়ে।

রোনালদো জাতীয় দলে কখনই আহামরি কোন দল পায় নেই। তবে এটা স্বীকার করতেই হবে এবার রোনালদো তার জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের বেষ্ট দলটা সাথে পেয়েছে(২০০৪,২০০৬ ভিন্ন কথা)।আমি আমার আগের লিখাতে বলেছি এই কথা গুলো বিস্তারিত এবং এটাও বলেছি যে এই বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনা থেকেও পর্তুগালের সম্ভাবনা বেশি।ঐ পোস্টটা পরলেই কিছুটা বুঝতে পারবেন কেন এবারের পর্তুগাল ভয়ানক।এই বিষয়ে বিস্তারিত পড়তে চাইলে এই লিংকে যেয়ে পড়তে পারেন

 

মুরদা কথায় আসা যাক আবার। পর্তুগালের ক্যাপ্টেন হচ্ছে রোনালদো। এটা একটা বাড়তি চাপও আসলে। কিন্তু চাপে রোনালদো নিজের সেরাটা দেয় আসলে।  আমরা যদি এবারের পর্তুগাল দলের দিকে তাকাই দেখব যে দলে বিল্ড-আপের জন্য অন্যরা আছে। হয়তো রিয়ালের সাথে তুলনা করলে ঐ একই ক্যালিবারের কেও নেই তবে আছে যারা অ্যাটাকিং গেম-প্লে  তৈরি করতে সক্ষম। এবং কয়েকটা ক্রিয়েটিভ প্লেয়ারও আছে পর্তুগালে। এখানেও রোনালদোকে রিয়ালের মত সেম বা একই কাজটাই করতে হচ্ছে। তবে পর্তুগাল টিমটাতে রিয়ালের ক্যালিবারের টিমমেট নেই বলে এখানে রোনালদো কিন্তু নিচে নেমেও বল উপরে উঠাতে সাহায্য করছে।কিন্তু এখনও কিন্তু তার মূল কাজটা একই রয়েছে। পর্তুগালে  বার্নান্দো সিল্ভা, রিকার্দো কোয়ারেজমাদের মত পিওর উয়িঙ্গার  আছে যারা মাঠের ওয়াইড সাইড বা উইং-সাইড গুলো ভালোই কভার দেয় এবং এসিস্ট করতে সক্ষম। তারা যখন মাঠের ঐ দিক গুলো সামলাচ্ছে কিংবা প্রতিপক্ষ তাদেরকেও ট্যাকল করতে বাস্ত রোনালদো ততক্ষণে নিজেকে আন-মার্ক পজিশনে নিয়ে যায়। কিংবা আমরা বলতে পারি রোনালদোকে  এসিস্ট নিয়ে বা চান্স তৈরি করা নিয়ে ভাবতে হচ্ছে না খুব বেশি। তারপরও সে নিচে নেমে বল রিকভার বলুন , অ্যাটাক তৈরিতে সাহায্য বলুন সব কিছুতেই নিজের সব দিয়ে চেষ্টা করে। স্পেনের সাথে শেষ ম্যাচে আমরা টা দেখছি।এর মানে এই না যে রোনালদো  ড্রিবলিং পারে না বা চান্স ক্রিয়েট করতে পারে না বা আগের মত উইং-এ খেলতে পারে না। কিন্তু সে ওটাই করছে যেটা তার দলের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এবং এখানেও সে পুরোপুরি সার্থক আমি বলব। এবং সে যদি পুরো ওয়ার্ল্ড কাপে এই কাজটাই করতে পারে আমি পর্তুগালের ভালো সম্ভাবনা দেখছি এবার। তবে দলের বাকিদেরও এজন্যে নিজেদের  কাজটুকু করতে হবে।  আর না বললেই নয় রোনালদো নিজের দলের সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ সময় নিজের সেরাটা দিতে পেরেছে। শেষ ম্যাচের ফ্রি-কিক টা তার উদাহরণ। আমরা এতদিনে এটা একটু হলেও আঁচ করতে পেরেছি আমি আসা করি যে পেনাল্টি নেয়াটাও যে কতটা কঠিন আর কত প্রেসার থাকে তখন। রোনালদো এসব খুব ভালো করেই করতে পেরেছে। বাকী ম্যাচ গুলোতে কি হয় সেটাই দেখার বিষয় এখন।

আমরা রোনালদো এর ক্ষেত্রে এটা বলতেই পারি তার খেলার ধরণটা তাকে তার দলের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে যেমন একই ভাবে তার দলের সাফল্যের জন্যও রোনালদোর  এধরনের খেলাটা বেশি এফেক্টিভ ।

 

এখন কথা হচ্ছে মেসির রোল বা খেলার ধরণটাও কি তার দলের জন্য একই ভাবে এফেক্টিভ ?

 

আমরা যদি বার্সা অর্থাৎ মেসি এর ক্লাবের খেলার দিকে তাকাই তাহলে দেখব মেসি ও বার্সা এর স্বর্ণ যুগে মেসি মূলত ফলস –নাইন রোল প্লে করত এবং তার আগে সে মূলত উইংঙ্গার ছিল। সে ড্রিবলিং করুক আর যাই করুক চান্স বানানো কিংবা বাকী কাজ গুলো করার জন্য দলে ছিল জাভি , ইনিয়েস্তা ও আরও অনেকে। মেসি বাকী কাজ গুলা তবুও কম বেশি করত। কিন্তু তার মূল কাজ ছিল ঐ সময় গোল দেয়া। সেটা ৩-৪ জনকে ড্রিবলিং করে করবে নাকি রোনালদো এখন যেভাবে করে সেভাবে করবে সেটা তার ব্যাপার ছিল। কিন্তু কাজটা ছিল গোল দেয়া। এখন যদি দেখি দলে আগের অনেক প্লেয়ার নেই যারা গেম-প্লে কিংবা চান্স তৈরি এসব করে থাকত। মেসিকে তাই অনেকটাই আগের জায়গা থেকে সরে এসে দলের দলের ঐ খালি জায়গাটা পূরণ করতে হচ্ছে।

এবার আসা যাক জাতীয় দলে মেসির অবস্থান নিয়ে।

আমরা আগের বছর গুলো নিয়ে আজকে কথা বলব না । এই বিশকাপ ও একালের ম্যাচ গুলো নিয়েই করব আলোচনা।

আমরা যদি বিশ্লেষণ করি তাহলে দেখব মেসি আর্জেন্টিনা এর জার্সি গায়ে বল বেশিক্ষণ নিজের পায়ে হোল্ড রাখে। এবং তাকে এখানে সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিড হিসাবে খেলানো হচ্ছে কিংবা দলের মূল চান্স ক্রিয়েটর হিসাবে এবং একই সাথে সে গোল করতেও মরিয়া। মেসি এমন এক রোল প্লে করছে দলে কিংবা তাকে করতে বলা হচ্ছে যেটা হয়তো সে খুব ভালো ভাবে করতে সক্ষম কিন্তু সেটা কি দলকে কোন ভাবে সাহায্য করছে ? দলে হয়তো তার থেকে ভালো প্লেমেকার নেই । তারপরও কি দলে তার রোল টা সে ঠিক মত প্লে করতে পারছে ? বা তার এই রোল প্লে  এর জন্য কি দলের সুবিধা হচ্ছে কোন নাকি উল্টোটা হচ্ছে?

প্রথমেই আসা যাক পেনাল্টির ব্যাপারটা নিয়ে।

আর্জেন্টিনাতে অনেকেই আছে যারা নিজের ক্লাবের পেনাল্টি নিয়ে আসছে অনেক আগে থেকেই। পেনাল্টিতে মেসির দুর্বলতাটা নতুন কিছু না । ঐ হিসাবে এই দায়িত্বটা অন্য কাউকে দেয়াই যায়। কিন্তু মেসির ইগোর জন্য কি সেটা সম্ভব?

 

আর্জেন্টিনা দলের দিবালা সেন্ট্রাল অ্যাটাকিং মিড হিসাবে খেলে মূলত তার ক্লাব জুভেন্তাস এর হয়ে। এছাড়াও রাইট উইং- খেলে সে। তাকেও আর্জেন্টিনা চাইলেই এখানে খেলাতে পারে।

 

মেসির বেশিক্ষণ বল হোল্ডে রাখাটা কি দলকে কোন না কোন ভাবে বিপদে ফেলে দিচ্ছে না ? এমনিতেই সে থাকে করা মার্কিং –এ। পেলে ম্যারাদোনা  হয়তো সেই সময় দলের জয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিল। এর মানে এই নয় যএ বেশিক্ষণ তাদের মত বল হোল্ডে রাখলেই  নিজের সেরাটা দেয়া যাবে বা সেরা হওয়া যাবে। নেইমারেরও মাঝেও একই মনোভাব দেখা গিয়েছে বিগত ম্যাচে। বার্সা এর স্বর্ণ যুগে এই কাজটা করত ইনিয়েস্তা ,জাভি এরা। মেসি ততক্ষণে নিজেকে গোল করার মত পজিশনে নিয়ে যেত বা বিল্ডআপে অংশ নিয়ে আসতে আসতে সেই পজিশনে যেত।

 

কিন্তু আর্জেন্টিনাতে  একই সাথে বল হোল্ড করা , ড্রিবলিং করা , চান্স তৈরি করা এবং তার উপর নিজে গোল দেয়ার প্রবণতা। এসব মিলিয়ে মেসির উপর চাপটা একটু বেশিই হচ্ছে। দলটা ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। এটা দলগত খেলা। সব কাজ একজন করতে গেলে শেষমেশ কিছুই আর হয়ে উঠে না।

 

আবার যদি দেখি মেসি বল ড্রিবলিং করে সামনে বেড়ে গেল। যেয়ে যে পাস দিবে ঐ অপশনটাও সে পায়নি । অর্থাৎ  যার যা করার কথা মাঠে সেই কাজের জন্য সেই থাকছে না সময় মত।

 

এখন সমস্যা হচ্ছে মেসিকে উইংগার হিসাবে খেলানটাও বোকামি। বর্তমানে দেখা যায় যে   উইংগারদের কাছে কোচরা  একটা বাড়তি জিনিস চায় যেটা হচ্ছে ওয়িং-ব্যাক এর ফেলে আসা জায়গা কভার দেয়া বা ম্যাচের দরকারের সময় ট্রেস –ব্যাক করা। মেসি কি এটা করে ? বা কখনও করেছে ?

 

জাতীয় দলের হয়ে তাই মেসি নিজেকে কখনই মেলে ধরতে পারে নাই ।আগেই বলেছি ফুটবল দলগত খেলা। এখানে একাই সব করতে গেলে সেটা দলকে বিপদে ফেলে দেয়।

বলতে গেলে পুরো আর্জেন্টিনা দলকেই মেসি কেন্দ্রিক করে গড়ে তুলা হয়েছে আর যেটা তাদের বেশি ভুগাচ্ছে। বা বাড়তি প্রেশার নিতে সে প্রস্তুত না ।

যেটা বলতে চাচ্ছিলাম আর কি, মেসি কি এই রোলে দলের জন্য এফিক্টভ? মোটেও না।

আর এজন্যই মেসিকে তার বিধ্বংসী রুপে আর্জেন্টিনার জার্সিতে দেখা যায়নি ।যেখানে রোনালদো জাতীয় দলের জার্সি গায়ে অন্যতম সেরা ।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন