ট্যাক্টিকাল ভিউঃ ভাগ্যের জোরে স্পেনের ভুলে নাকি রোনালদোর অতিমানবীয় পারফর্মেন্স, কোনটি বাঁচাল পর্তুগালকে?

ট্যাক্টিকাল ভিউঃ ভাগ্যের জোরে স্পেনের ভুলে নাকি রোনালদোর অতিমানবীয় পারফর্মেন্স, কোনটি বাঁচাল পর্তুগালকে?

রোনালদো থাকাকালীন বড় টুর্নামেন্টে কখনই স্পেনের সাথে জেতেনি পর্তুগাল। সেই আক্ষেপ ঘুচাতেই মাঠে নেমেছিলেন রোনালদো ও তার সতীর্থরা। মরিনহোর ভাষ্যমতে, স্পেন টুর্নামেন্টের সব থেকে সেরা। সেই সেরাদের বিরুদ্ধেই লড়তে নেমেছিল তার স্বদেশীরা।

স্পেন তাদের চিরাচরিত ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে মাঠে নামে। গোলবারে ডে হেয়া, সেন্টার হাফ জুটিতে রামোস আর পিকে, দুই প্রান্তে দুই ফুলব্যাক নাচো ও আলাবা। ডাবল  পিভোটে বুস্কেটস ও কোকে। ওয়াইডে ইনিয়েস্তা ও সিলভা, প্লে-মেকার ইস্কো এবং মেইন স্ট্রাইকার কস্তা।


পর্তুগালও ৪-২-৩-১ ফর্মেশনে কাগজে কলমে নামলেও তা প্রায়শই ৪-৪-২ রূপ ধারণ করছিল। 

গোলবারে প্যাট্রিসিও, সেন্টার হাফে পেপে ও ফন্তে, বাঁ ও ডান প্রান্তে যথাক্রমে গুইরেরো ও সেড্রিক। ডাবল পিভোটে উইলিয়াম ও মৌতিনহো। দুই উইঙ্গে ব্রুনো ফার্নান্দেস ও সিলভা, প্লে-মেকার রোলে গুয়েদস এবং মেইন স্ট্রাইকার
রোনালদো।


পর্তুগালের কাউন্টার এট্যাক নির্ভর কৌশল ও টগবগে রোনালদো এবং স্পেনের উইঙ্গে ওভারলোড করা

 

শুরুতে পর্তুগাল পাসের মাধ্যেম আক্রমণাত্মক মনোভাব নিয়েই শুরু করে, এবং বেশ কিছু আক্রমণাত্মক বল খেলে স্পেনের ডি বক্সে, এরই ফলশ্রুতিতে ৪ মিনিটের মাথায় পেনাল্টি পেয়ে যান রোনালদো নাচোর ট্যাকেলের কারণে, আর রোনালদো পেনাল্টি জালে পাঠাতে খুব কমই ভুল করেন।

দ্রুত ধাক্কা খেলেও ধীরে ধীরে স্পেন নিজেদের গুছিয়ে নিতে থাকে, পাসিং ফুটবলের পসরা সাজিয়ে তারা আগাতে থাকে। 

স্পেন আদৌতে ৪-২-৩-১ খেললেও ইস্কো সম্পূর্ণ ফ্রি রোলে ছিলেন, স্পেন যখন ডিফেন্ড করছিল তখন ইস্কো নীচে নেমে সাহায্যে করছিলেন বুস্কেটস আর কোকেকে, স্পেন ডিফেন্সিভলি ৪-৩-২-১ রূপ নিচ্ছিল। 


স্পেন আক্রমণের ক্ষেত্রে মূলত ওভারলোড এর উপরে জোর দেয়

ওভারলোড কি?

ওভারলোড হলো কোন একটা নির্দিষ্ট জোনে বা এলাকায় অতিরিক্ত প্রতিপক্ষের থেকে বেশি প্লেয়ার চাপিয়ে দেওয়া। মানে সহজ কথায় আউটনাম্বার তথা সাংখ্যিক সুবিধা নেওয়া, আরও সহজে বললে বেশি প্লেয়ার দিয়ে কম প্লেয়ার ঘায়েল করা।

 

দুই বল প্লেয়িং সেন্টার ব্যাক রামোস আর পিকে থাকায় তারা বুস্কেটসকে সঙ্গ দিচ্ছিলেন সেন্টার সামলাতে। এর ফলে কোকে ডানে ও ইস্কো বামে উঠে গিয়ে ফুলব্যাক ও উইঙ্গারদের সঙ্গ দিয়ে পর্তুগালের বিপক্ষে উইঙ্গে ওভারলোড তৈরী করেন। স্পেন ৩-১-৫-১ বা ২-২-৫-১ রূপে আক্রমণ করছিল।


পর্তুগাল তাদের ডান দিকে এই ওভারলোডের জবাব দিতে পারেনি, এইজন্য বেশিরভাগ আক্রমণ সব স্পেন তাদের বাম দিক থেকে সূচনা করে, এবং এর মধ্যে বেশ কয়টি সফল ছিল, ইস্কোর বা ইনিয়েস্তার শটগুলো বারে লেগে বা টার্গেট মিস করে।

কিন্তু পর্তুগাল বামে এইটার উত্তর দেয় রোনালদোকে বামে ড্রিফট করিয়ে, ফলে ফার্নান্দেস, গুইরেরো, রোনালদো বনাম নাচো, কোকে, সিলভা। এর ফলে স্পেন ক্রমাগত তাদের বামে বল পাঠাতে থাকে।

পর্তুগাল বুঝে যায় যে বলের লড়াইয়ে স্পনের মিডফিল্ডকে তারা টেক্কা দিতে পারবে না, তাই গুয়েদস, রোনালদো ও বার্নাদো সিলভা নির্ভর কাউন্টার এট্যাকিং সিস্টেম গড়ে তোলে। রোনালদোর নৈপুণ্য ও গুয়েদস দৌড়ে বেশ কয়টি সুযোগ গুয়েদস হাত ছাড়া(পড়ুন পা ছাড়া) করেন।


স্পেনের ধারাবাহিকভাবে বামে বল চ্যানেলের ফলে কস্তা বল পেয়ে যান, এবং একক নৈপুণ্য পেপ, ফন্তেদের পরাস্ত করে অসাধারণ একটি গোল করে স্প্যানিশ সমতায় ফেরান সারা কোয়ালিফাইয়ারে উপেক্ষিত এই স্ট্রাইকার। সত্যিই মানুষের ভাগ্য!

স্পেন এবার আরও ক্ষুরধার হয়ে ওঠে, ক্রমাগত বামে ওভারলোড করে সুযোগ খুঁজতে থাকে, এরই ধারাবাহিকতায় ইনিয়েস্তা সুবর্ণ সুযোগ টার্গেট ছাড়া হয়। 

স্পেনের ক্রমাগত শাসনের ফাঁকে স্রোতের বিপরীতে কিছু বল পাচ্ছিল পর্তুগাল, এরকমই একটি বলে বামে গুয়েদস ও ফার্নান্দেসের কল্যাণে আক্রমণে যায় পর্তুগাল, অবস্থা সুবিধা না হওয়ায় রোনালদোকে পাস দেন তারা। রোনালদোও একটা টেস্টিং শট নেন, কিন্তু ডে হেয়ার শিশুসুলভ ভুলে হাফ টাইমে একটু আগে আগিয়ে যায় পর্তুগাল!

স্পেনের মানসিক ভাবে ফিরে আসা এবং বাম দিকে আরও বেশি ওভারলোড করা

হাফ টাইমে কোন দল গোল পেলে তারা মানসিকভাবে প্রচণ্ড চাঙা থাকে, বিপরীত দল ভেঙে পড়ে বলাই বাহুল্য। নেদারল্যান্ডস গত বিশ্বকাপে এই জোরেই স্পেনকে ১-১ থেকে ৫-১ এর লজ্জা দেয়। 

স্পেন তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে যথার্থই শিক্ষা নিয়েছিল, তাই এবার আরও ক্ষুরধার ভাবে ফিরে আসে।


 গুয়েদস আর রোনালদোকে সাহায্যে করার জন্য সিলভা প্রায়ই সেন্টারে চলে আসছিলেন, ফলে পর্তুগাল ডান দিক তথা স্পেনের বাম দিকে একা সামাল দিচ্ছিলেন সেড্রিক। এটাকেই একিলিস হিল করে স্প্যানিশরা। শুধু আলবা, ইনিয়েস্তা, ইস্কো নয় এবার বামে যোগ হলো ডেভিড সিলভা। 

আক্রমণের পর আক্রমণ দিয়ে শানিয়ে যায় বাম দিক স্পেন অসহায় সেড্রিকের বিপক্ষে। এরই ধারাবাহিকতায় ১০ মিনিটের মাথায় গোল শোধ করে দেন কস্তা। বামদিক থেকে আসা বলে হালকা হেডের টোকা দেয় বুস্কেটস, বাকিটা কস্তার সরল একটা ট্যাপ-ইন।

স্পেন বাম দিকে হাবি হয়ে আক্রমণ করায় পর্তুগালের সেন্টার ব্যাকরাও ওইদিকে ড্রিফট করেন। তবুও সিলভা, ইনিয়েস্তা, ইস্কোরা ছোট পাসের মাধ্যমে আক্রমণ জারি রাখেন এবং এরমই একটা বল সিলভা সেট আপ করে দেন ইস্কোর জন্য যেটা ছিটকে যায় ডানে। পর্তুগাল স্পেনের বাম দিকে তথা নিজেদের ডান দিকে চেপে ডিফেন্ড করায় নাচো এক সমুদ্র স্পেস পেয়ে যান এবং অসাধারণ এক শটে স্পেনকে আগিয়ে নেন।

পর্তুগালে ও স্পেনের কৌশলগতভাবে উইঙ্গ থেকে সেন্টার সরে আসা এবং পর্তুগালের অভিজ্ঞতার উপর নির্ভর 

গোলের পর সান্তোস ব্রুনোকে তুলে জোয়াও মারিওকে নামান এবং পর্তুগাল ৪-২-১-৩ ফর্মেশনে রূপ নিচ্ছিল। এবং দ্রুতই সিলভাকে তুলে কারেজমাকে নামান। পেছনে পড়ায় ইউরোর লড়াই করা অভিজ্ঞ পর্তুগীজদের উপর ভরসা করেন সান্তোস। কারেজমা নেমে বেশ কয়েকটি আক্রমণের সূচনা করলেও জোয়াও মারিও চোখে পড়ার মতো কিছুই করতে পারেননি।

স্পেনও পর্তুগালের সেন্টারে ওভারলোড ঠেকাতে ইনিয়েস্তাকে উঠিয়ে আলাকান্তারাকে নামায়। ইস্কো এবার বামে সরে গিয়ে স্পেন ৪-১-২-৩ ফর্মেশনে খেলতে থাকে। ইস্কো ও সিলভার মাধ্যেম আক্রমণ কিছু আক্রমণের সূচনা করে, যার মধ্যে একটি কস্তা মিস করেন। এই সময়ে খেলার টেম্পো কিছুটা স্লো করে দেয় স্পেন। 


স্পেনের নিজেদেরকে গুটিয়ে নেওয়া এবং পর্তুগালের লাকি চার্ম আন্দ্রে সিলভাকে নামানো

স্পেন এবার রক্ষণে মনোযোগ দেওয়ার জন্য রোমিং স্ট্রাইকার আসপাস এবং রাইট উইঙ্গে ভাস্কেজকে নামায় কস্তা ও সিলভার বদলে। স্পেন এবার ৪-৫-১ ফর্মেশনে ডিপ ডিফেন্ড করা শুরু করে পর্তুগালকে। পর্তুগালের প্রতি আক্রমণে বলের পিছে ৯ জনই ছিল।

 

 

অপরদিকে আন্দ্রে সিলভাকে গুয়েদসের পরিবর্তে নামিয়ে, রোনালদোকে ড্রিফট করিয়ে পর্তুগাল ৪-২-১-৩ এ খেলা শুরু করে। রোনালদো ও আন্দ্রে সিলভা ক্রমাগত পজিশন অদলবদল করে স্পেনের হতভম্ব করার চেষ্টা করে, এবং এই প্রচেষ্টার ফলে পিকে অপ্রয়োজনীয় ফাউল করেন রোনলদোকে। ডেঞ্জারাস এরিয়ায় ফ্রি কিক এবং এই বিশ্বকাপের রীতি অক্ষুণ্ণ রেখে অসাধারণ এক ফ্রি কিকে পর্তুগালকে সমতায় ফেরান রোনালদো। ফ্রি কিকের পরও বেশি কয়েকটি আক্রমণের সূচনা করে পর্তুগাল তবে শেষ বাঁশির পর স্কোরলাইন ৩-৩। 

ম্যাচটা আদৌতে শাসন স্পেনই করেছে, তাদের কিছু শিশুসুলভ ভুল ছিল, তবে স্পেনের সাপেক্ষে নিজেদের ক্ষমতা মেপে সঠিক কৌশলে পর্তুগাল বলিষ্ঠভাবে লড়াই করে গেছিল, এই আত্মবিশ্বাসের প্রতিদান পরের ম্যাচগুলোতে হয়তো পাবে পর্তুগাল, আর যদি না পায়? তাদের তুরুপের তাস রোনালদো তো আছেনই!

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন