২০১৮ বিশ্বকাপে পর্তুগালের সম্ভাবনা

২০১৮ বিশ্বকাপে পর্তুগালের সম্ভাবনা

প্রথমেই বলে নেই আমি আসলে ব্রাজিলের সাপোর্টার।২০০২ বিশ্বকাপ থেকে এক রোনালদো এর জন্য আমি ব্রাজিলকে সাপোর্ট করে আসছি।আর সেই রোনালদোকে ধরেই আমি রিয়াল মাদ্রিদের সাপোর্টার।  এখন বলতেই পারেন  তাহলে পর্তুগালকে নিয়ে আমার এত কেন মাথা ব্যাথা ? আসলে এর পিছনের কারণও আরেক রোনালদো । হ্যাঁ ঠিকই ধরেছেন । ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো বা  সি আর সেভেন।

আমাকে কি এখন প্ল্যাস্টিক ট্যাগ দিবেন ?আসলে মানুষ মেসি এর জন্য আর্জেন্টিনা করতে পারে , রোনাল্ডিনহো বা কাকা এর জন্য ব্রাজিল করতে পারে , আবার ম্যারাদোনা  এর জন্য আর্জেন্টিনা করে আসছে অনেকে , ম্যাথেউস এর জন্য অনেকেই জার্মানি করে আসছে , কই তাদের তো প্ল্যাস্টিক ট্যাগ দিলেন না । আমরা বাংলাদেশি । আমাদের সাথে তাদের সম্পর্কটা রক্তের না , ভাষার না , জাতির না । তাও পাগলের মত সমর্থন করি । কেন ? কোন এক ভালো লাগা থেকে নিশ্চয়ই। হয়তো কারও খেলা ভালো লাগে , কারও কোন প্লেয়ারকে ভালো লাগে।

রোনালদো এখন আর ব্রাজিলে খেলে না , ম্যারাদোনাও আর্জেন্টিনাতে খেলা না এখন আর কিন্তু কেও কি তাই সাপোর্ট করা ছেড়ে দিয়েছে ? না দেয় নি । আর এজন্যেই তারা প্ল্যাস্টিক না । কিন্তু কোন না কোন ভাবে একটা দলকে সাপোর্ট করা শুরু করেছিল সেটা পুরো দলের  খেলা দেখে  হোক কিংবা কোন একজন প্লেয়ারের খেলা দেখে হোক।

পর্তুগালকে  সাপোর্ট করার পিছনে আমার কারণ হচ্ছে ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো । ২০১৬ এর ইউরো এর সময়ও আসলে  মন থেকে চেয়েছিলাম পর্তুগাল জিতুক । আসলে লোক হাসবে বলে ওইভাবে বলে উঠা হয়নি। কিন্তু ঠিকই  জিতে দেখিয়েছে পর্তুগাল।

এখন বলতে পারেন ব্রাজিল বনাম পর্তুগালের খেলা পরলে কাকে সাপোর্ট করবেন ? এই একটা প্রশ্নের উত্তর আসলে সব ঘাপলা দূর করে দিবে ।এই প্রশ্নের উত্তরটা আমি আজকের  পুরো আলোচনা শেষে দিব।

 

ফিরে আসা যাক মূল আলোচনায়।

 

 

 ২০১৬ ইউরো এর আগে পর্তুগালকে  আন্ডারডগ  হিসাবেই ধরা হত । হয়তো এখনও অনেকেই ধরেন । এখন আন্ডারডগ না হলেও পর্তুগাল আর যাই হোক ব্রাজিল , আর্জেন্টিনা , জার্মানি , ফ্রান্স এদের  মত হেভিওয়েট টিমও না এটা আমিও বিশ্বাস করি এবং মেনে নেই । তবে এবার ২০১৮ রাশিয়া বিশ্বকাপে পর্তুগাল আর যাই হোক আন্ডারডগ হিসাবে আসেনি । এর পিছনে কোচ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটা প্লেয়ারের ভূমিকা ছিল । সেটা কম হোক কিংবা বেশি ।  আরও একটা জিনিস আমি পরিষ্কার করে দেই এবার। প্রতিবার রোনালদো কেন্দ্রিক দল হলেও এবার এর ব্যাতিক্রম  । হ্যাঁ এটা বলা যায় যে  ভালো কিছু করতে হলে রোনালদো এর পারফরমেন্স  ভালো হতে হবে ।  কিংবা রোনালদো এবার বাকী বছর গুলোর তুলনায় অনেক ভালো টিম পেয়েছে।

২০১৮ বিশ্বকাপে পর্তুগালের সম্ভাবনার কথা বলতে হলে প্রথমেই আসা যাক পর্তুগাল টিমে কারা কারা আছেন। যেহেতু ফুটবল দলীয় খেলা প্রথমেই তাই দলের কোন পজিশনে  কে কে আছেন সেটা বলে নেই।

#গোলরক্ষক  – 

১) রুই পেত্রসিও । বর্তমানে শ্রেষ্ঠ গোলরক্ষকদের একজন বললে আসলে                        নিতান্তই মিথ্যা কথা বলা হবে । তবে হ্যাঁ বর্তমানে ভালো গোলরক্ষকদের একজন তিনি এটা বলাই যায়। তার সব থেকে ভালো দিক যেটা সেটা হলো তিনি গোলবারের সামনে ভুল সহজে করেন না । স্পোর্টিং এর হয়ে ২০১৭ সালেই পর্তুগিজ লিগ জিতেছেন।

২) এন্থনি লোপেজ – ২৭ বছর বয়স তার। বর্তমানে তিনি ফ্রান্সের অলিম্পিক লায়নাইস এর হয়ে খেলছেন।

৩) বেতো – ৩৬ বছর বয়স বর্তমানে । তুর্কি লিগে খেলছেন এখন।   

#লেফট ব্যাক -

১) রাফায়েল গুয়েররেরো – ২০১৬ ইউরো তে বেষ্ট পারফর্ম করা লেফট ব্যাকদের একজন। ২০১৮ সালে এসে এখন সে আরও পরিপক্ক। বরুশিয়া ডর্টমুন্ড এর হয়ে খেলছেন বর্তমানে।

২) মারিও রুই ২৭ বছর বয়স্ক এই রাইট ব্যাক বর্তমানে ইটালিয়ান ক্লাব ন্যাপোলি তে খেলছেন। শারীরিক  চ্যালেঞ্জে তার জুটি নেই । অসাধারণ গতি , লো সেন্টার অব গ্রেভিটি , শারীরিক সক্ষমতা এসব মিলিয়ে তিনি ভালো ভাবেই লেফট  ব্যাকওইং সামলাতে পারেন।

 

# সেন্ট্রাল ব্যাক –

১) পেপে – ৩৫ বছর বয়স বর্তমানে । তাঁকে নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই । অভিজ্ঞ ও ট্যাকলিং এ এক আস্থার নাম । যদিও গতি এখন কম কিন্তু  এরিয়েল ডুয়েট এ তার জুটি নেই । 

২) ফন্টে –  তিনি বর্তমানে চাইনিজ লিগে খেলছেন । তিনিও ভালোই অভিজ্ঞ আর ডিফেন্ডিং এর ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ৩৪ বছর বয়স তার বর্তমানে ।  এরিয়েল ডুয়েটে তিনি অনন্য। ২০১৭ সালে ৬৮% এরিয়েল ডুয়েটে দিতেছেন।

৩) ব্রুনো আল্ভেস – বয়স তার এখন ৩৬ বছর । তার গতি কম কিন্তু হার্ড  ট্যাকলিং , চ্যালেঞ্জে পারদর্শী।

৪) রুবেন দিয়াজ -  বয়স ২১ বছর । বুঝাই যাচ্ছে বাকী সব সেন্ট্রাল ব্যাকদের মধ্যে তিনিই সব থেকে কমবয়স্ক। বর্তমানে এস এল বেনিফিকাতে খেলছেন । অনেকে তাঁকে ক্লাবের ভবিষ্যতের ক্যাপ্টেন ভাবেন। পর্তুগিজ লিগ বিগত সিজনে অসাধারণ খেলার জন্যই তাঁকে দলে ডাকা হয়। তার খারাপ দিক গুলার একটি হচ্ছে তিনি প্রচুর গরম মাথার খেলোয়াড়। প্রচুর এগ্রেসিভ তিনি।

# রাইট ব্যাক –

১) সেড্রিক সোয়ার্স  - বয়স ২৬ বর্তমানে। সাউথহ্যামটনের হয়ে খেলছেন ইংলিশ প্রিমিইয়ার লিগে। ইউরো ২০১৬ তে তিনি কিছু ভুলত্রুটি করলেও ২০১৮ তে এসে আগের থেকে অনেকে পরিপক্ক হয়েছেন। কিন্তু ভুল করার তার অভ্যাস কিছুটা এখনও রয়ে গিয়েছে। সামনে বেড়ে অ্যাটাক করতে দলকে সাহায্য করেন।

২) রিকার্দো পেরেইরা – ২৪ বছর বয়স্ক এই প্লেয়ার বর্তমানে লেইচেষ্টার সিটি এর হয়ে খেলছেন। বার্সার সেমেদো কে বাদ দিয়ে তাঁকে নেয়ার হয়েছে এই বিশ্বকাপে। তার সব থেকে শক্তিশালী দিক গুলো হচ্ছে তার স্ট্যামিনা , গতি , ক্রসিং। যদিও এরিয়েল ডুয়েলে তিনি তেমন পারদর্শী না ।

# মিডফিল্ডার –

১) এন্দ্রে সিল্ভা – ২৯ বছর বয়স। লেইচেষ্টার সিটি এর হয়ে খেলছেন। সেন্ট্রাল মিড , ডিফেন্সিভ মিডে খেলতে পারেন।

২) ব্রুনো ফার্নান্দেজ  - ২৩ বছর বয়স। পর্তুগালের  স্পোর্টিং এর হয়ে খেলছেন। নতুন মুখ বলা যায় অনেকের কাছেই। তিনি অ্যাটাকিং মিড হিসাবে খেলেন মূলত। তার ড্রিবলিং , পাসিং দেখার মত। বলতে গেলে তিনি একজন ক্রিয়েটিভ প্লেয়ার ।এরকম প্লেয়ার এর অভাব ছিল এতদিন পর্তুগাল টিমে যে কিনা বল বানায় দিতে সক্ষম।

৩) জোয়াও মারিও – ইউরো ২০১৬ তে তাঁকে সবাই দেখেছে । অ্যাটাকিং মিড কিংবা রাইট মিড এ তিনি মূলত খেলেন। ড্রিবলিং , পাসিং , চান্স ক্রিয়েট করা । এসব এ তার জুটি নেই।

৪)জোয়াও মতিনহো – তিনি বর্তমানে মোনাকো এর হয়ে খেলছেন। বয়স ৩১ বছর এখন। আরেকজন ক্রিয়েটিভ প্লেয়ারঅভিজ্ঞও বটে।

৫) ম্যনুয়েল  ফার্নান্দেজ – ৩১ বছর বয়স। রাশিয়া এর লোকোমোটিভ মস্কো এর হয়ে খেলছেন । লং শট , ড্রিবলিং , ফ্রি কিক এ তিনি বেশ পারদর্শী।

৬) উইলিয়াম কারভালহো – আরও একজন স্পোর্টিং সিপি এর প্লেয়ার। ডিফেন্সিভ মিড হিসাবে খেলেন । তার গেম রিডিং দক্ষতা বেশ ভালো। তাছাড়া তিনি ট্যাকলিং এ দক্ষ । যদিও তার গতি অনেক কম।

 # ফরওয়ার্ড –

১) ক্রিস্তিয়ানো রোনালদো – তাঁকে নিয়ে কিছু বলব না । কিছু মানুষের নামই যথেষ্ট ।

২) আন্দ্রে সিল্ভা – ২২ বছর বয়সী এই স্ত্রাইকার এসি মিলানের হয়ে খেলছেন। বেশি ম্যাচ না খেললেও যে কয়টাই খেলেছেন গোল দিয়েছেন।  তার ফিনিশিং আগের থেকে কিছুটা ভালো হয়েছে । পজিশনিং , গতি বেশ ভালো ।  

৩) বার্নান্দো সিল্ভা – ম্যানচেস্টার সিটিতে খেলছেন। ক্রিয়েটিভ প্লেয়ার

৪) জেলসন মারটিন্স - স্পোর্টিং সিপি এর প্লেয়ার। তার গতি , ড্রিবলিং চোখ মাতানো পুরো।

৫) গঙ্কালো গুয়েদেস – পিএসজি এর প্লেয়ার হলেও গত সিজন ভ্যালেন্সিয়াতে লোনে ছিলেন। ছোট বেলার রোনালদো এর কথা মনে পরে যাবে তার খেলা দেখলে।গতি , শট , ড্রিবলিং , ফিজিক্স সব আছে তার খেলায়।

৬) রিকার্দো কোয়ারেজমা – পর্তুগাল দলের অন্যতম ট্যালেন্টটেড প্লেয়ার আমি বলব।

 

বিশ্বকাপের ২৩ জন কারা কারা আছেন পর্তুগাল দলএ টা এতক্ষণ জানলাম আমরা। এবার আসা যাক পর্তুগাল কোন ছকে খেলবে ।

ফার্নান্দো সান্তস দলের দায়িত্ব নেবার পর থেকে আমরা দেখে আসছি তিনি ৪-৪-২ ছকেই বেশি খেলিয়েছেন পর্তুগালকে । আশা করা যাচ্ছে একই ফর্মেশনই থাকবে বিশ্বকাপেও। 

মূলত ৪-৪-২ ফ্লাট ফর্মেশনে খেলে আসছে পর্তুগাল। এই ফর্মেশনে খেলেই ইউরো ২০১৬ জিতেছে। তাই এটা পরিবর্তনের সম্ভাবনা তেমন নেই ।

এই ফর্মেশনের বাইরে যদি খেলে থাকে  তাহলে ৪-৪-২ ডায়মন্ড ফর্মেশনে খেলার সম্ভাবনা আছে কিছুটা। কিন্তু পর্তুগালের অনেক গুলো জাতের ওয়িংগার আছে আর এই ফর্মেশনে ওয়িংগাররা তাদের মেলে ধরতে পারবে না, তাই বলা যায় মূলত ৪-৪-২ ফ্লাট ফর্মেশনেই খেলবে পর্তুগাল যদি কিনা ফার্নান্দো সান্তসের মাথায় নতুন কোন ট্যাকটিকস না থাকে । নিচে সম্ভাব্য এই ফর্মেশন ও লাইনআপের ছবি যোগ করে দিলাম।

 Description: Portuguese XI

এখন এখানে গুয়েদেস এর জায়গায় আন্দ্রে সিল্ভা , জেলসন মারটিন্স এর জায়গায় জোয়াও মারিও কেও খেলাতে পারে।

ফ্রেইন্দলি ম্যাচে আমরা আরও দুইটি ফর্মেশনে খেলতে দেখেছি পর্তুগাল কে। একটি ৪-৩-৩ অপরটি ৪-৩-১-২। এই দুটি ফর্মেশনের ছবি লাইনআপ সহ দিলাম নিচে। 

Portugal's defensive shape

Portugal attacking shape

এবার আসা যাক এই লাইনআপ আর এই এই ফর্মেশন নিয়ে পর্তুগালের পক্ষে কি বিশ্বকাপ জিতা সম্ভব ?

এই তিনটি ফর্মেশনের বাইরে যাবার সম্ভাবনা খুব বেশি একটা নেই । তবে ৪-৪-২ ফ্লাট ফর্মেশনটাকেই  বেশি ম্যাচে ব্যাবহার করবে বলে আমার ধারণা।  

পর্তুগাল এর থেকেও বাজে লাইনআপ নিয়ে ইউরো জিতেছে। আমরা যদি পর্তুগালের লাইনআপ দেখি তাহলে দেখতে পারব যে তাদের দলে অভিজ্ঞতাকে বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। এবং পাশাপাশি কিছু তরুণ প্লেয়ার আছে যারা জ্বলে উঠার সামর্থ্য রাখে। পর্তুগালের ডিফেন্সটা পূরাটাই অভিজ্ঞতা নির্ভর । 

পর্তুগালের ইউরো দল থেকে বরং এইদলটা ক্রিয়েটিভ প্লেয়ারে ভরপুর। ইউরোতে যেখানে বল বানানোর জন্য কিংবা গেম বিল্ডআপ করার জন্য কেও নেই তেমন এবার ঐ হিসাবে পর্তুগালের অনেক গুলো অপশন আছে।

অ্যাটাকিং এর দিকে যদি আমরা নজর দেই তাহলে  দলটাতে রোনালদো এর উপরই আমাদের শুধু ভরসা করে থাকতে হবে না ।  আছে তরুণ কিছু প্লেয়ার যারা হার জিতের পার্থক্য গড়ে দিতে পারে ।

তবুও বলা বাহুল্য রোনালদোকে তার সেরাটা দিতে হবে ।আলদা ভাবে জ্বলে উঠা লাগবে । তাহলে পর্তুগালের জন্য বিশ্বকাপের আসা টা অনেক সহজ হবে।

সব মিলিয়ে যদি দেখি পর্তুগাল যদি এবার দল গত ভাবে খেলে পর্তুগালের সম্ভাবনা আর্জেন্টিনা থেকেও বেশি আমি বলব। বাকিটা দেখা যাক । ইউরো জয় পর্তুগালকে  ভালোই সাহস জোগাবে।  দলটার বেশির ভাগ প্লেয়ার অনেক আগে থেকেই এক সাথে খেলছে। বুঝাপড়া এতদিনে ভালো হবার কথা। বিশ্বকাপের মঞ্চ , অনেক ভালো দলই নার্ভ ধরে রাখতে পারে না । দেখা যাক বাকিটা সময়ই বলে দিবে। 

 

এবার সেই প্রশ্নের উত্তর টা দেই।আমি মনে প্রানে চাইব ব্রাজিল বিশ্বকাপ জিতুক। তাদের হাতে এটা শোভা পায় বেশি। তবে যদি পর্তুগাল আর ব্রাজিলের খেলা পরে আমি চাইব পর্তুগাল জিতুক । নতুন কোন চ্যাম্পিয়ন চাই এবার।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন