১৯৩০ বিশ্বকাপ – বিশকাপের ইতিহাস - ২

এর আগের পর্বে আমরা জেনেছি  ফুটবল বিশ্বকাপ কিভাবে শুরু হল আজকে আমরা প্রথম বিশ্বকাপ নিয়ে কিছু আলোচনা করব

১৯২৮ সালে অলিম্পিক কমিটি অলিম্পিক থেকে ফুটবলকে বাতিল করার ঘোষণা দিলে  ফিফা ফুটবলের জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চ গড়ার উদ্দেশ্যে  ১৯২৯ সালে ফুটবল বিশ্বকাপ আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেয়।  তকালিন  ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলিয়েস রিমেট ১৯২৯ সালে তখন একটি ইন্টারন্যাশনাল ফুটবল কম্পিটিশন করার জন্য ভোট পাশ করান ঠিক তার একবছর পর ১৯৩০ সালে ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজন করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়

উরুগুয়ের ১০০ বছর স্বাধীনতা উদযাপনের জন্য ও ১৯২৮ সালে অলিম্পিকে ফুটবলে স্বর্ণপদক পাওয়াতে  উরুগুয়েকে ১৯৩০ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের আয়োজক  দেশ হিসাবে ফিফা ঠিক করে

বিশ্বকাপে অংশ নেয় মোট ১৩  টি দেশ। তখন যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত ছিল না যার ফলে ইউরোপ থেকে বেশি দেশ অংশ নিতে পারে নি । তখন বিমান ব্যবস্থাও ছিল না থাকার মত। যাত্রীবাহী বিমান তখন চালু করা হলেও তা ছিল অনেক ব্যয়বহুল  ও তখন সব শহরে এবং দেশে বিমানবন্দরও ছিল না । আর এর ফলেই হয়তো বিশ্বকাপের ২ মাস আগেও কোন ইউরোপ এর দল বিশ্বকাপ খেলবে এটা অফিশিয়াল ভাবে  তারা জানায়নি। অবশেষে  জুলিয়েস রিমেট  তাদের সাথে কথা বলার পর মাত্র চারটি ইউরোপের দেশ বিশ্বকাপে অংশ গ্রহণ করতে সমুদ্রপথে রওনা দেয়। দক্ষিণ আমেরিকা এর সাতটি দেশ ( ব্রাজিল , আর্জেন্টিনা , উরুগুয়ে, চিলি , বলিভিয়া , পেরু , প্যারাগুয়ে) , উত্তর আমেরিকা এর ২ টি দেশ ( উ,এস,এ , মেক্সিকো ) এবং ইউরোপের ৪ টি দেশ ( ফ্রান্স , ইয়ুগোস্লাভিয়া , রোমানিয়া , বেলজিয়াম) নিয়ে মত ১৩ টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত হয় প্রথম বিশ্বকাপ।

 

প্রথম বিশকাপের জন্য মোট ৩ টি  ভেনু ঠিক করা হয়েছিল । এবং সব গুলো ভেনু একটি শহরেই ছিল ।উরুগুয়ের রাজধানী মন্তেভিদিও । এখানেই ১৯৩০ বিশ্বকাপের সব গুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল ।

ভেনু গুলো ছিল –

 ১) এস্তাদিও সেন্তেনারিও   (Estadio Centenario)  -  যার ধারণ ক্ষমতা ছিল ৯০.০০০ দর্শক এবং এই স্টেডিয়ামটি বিশ্বকাপের জন্যই বানানো হয়েছিল তখন। গ্রেট ব্রিটেনের বাহিরে এটাই ছিল তখন বিশ্বের সবথেকে বড় স্টেডিয়াম। এখানে ১৯৩০ বিশ্বকাপের ১৮ টি ম্যাচের মধ্যে ১০ টি ম্যাচই অনুষ্ঠিত হয়েছিল । দুটো সেমি-ফাইনাল ও ফাইনালও এখানেই অনুষ্ঠিত হয়েছিল।

২) এস্তাদিও গ্রান পারকুয়ে সেন্ট্রাল (Estadio Gran Parque Central) -  এর ধারণ ক্ষমতা ছিল ২০.০০০ দর্শক বিশ্বকাপের প্রথম দিকের ম্যাচ গুলো এখনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ।

৩)  এস্তাদিও পাসিতস্ (Estadio Pocitos) - এর ধারণ ক্ষমতা ছিল ১.০০০ দর্শক বিশ্বকাপের প্রথম দিকের ম্যাচ গুলো এখনে অনুষ্ঠিত হয়েছিল

১৩ টি দলকে মোট ৪ টি গ্রুপে ভাগ করে দেয়া হয় । যেখানে গ্রুপ -১ এ ছিল ৪ টি দল (আর্জেন্টিনা , চিলি, ফ্রান্সমেক্সিকো) গ্রুপ-২ এ ছিল ৩ টি দল (ইয়ুগোস্লাভিয়া , ব্রাজিল ও বলিভিয়া ) । গ্রুপ – ৩ এ ৩ টি দল (উরুগুয়ে , রোমানিয়া ও পেরু ) । এবং গ্রুপ – ৪ এ তিনটি দল (ইউনাইটেড স্টেট্‌স, প্যারাগুয়ে ও বেলজিয়াম) ।

গ্রুপ পর্যায়ে প্রতিটি গ্রুপ রাউন্ড- রবিন রুলে খেলে। অর্থাৎ একটি গ্রুপের প্রতিটি দল ঐ গ্রুপের বাকী সবগুলো দলের সাথে খেলবে । উদাহরণস্বরূপ গ্রুপ -১ এর আর্জেন্টিনা ঐ গ্রুপের বাকী দল গুলো অর্থাৎ চিলি, ফ্রান্স ও মেক্সিকো  এর সাথে একটি করে ম্যাচ খেলেছিল। ম্যাচ জিতার জন্য প্রতিটি দলকে ২ পয়েন্ট ও ড্রয়ের জন্য ১ পয়েন্ট করে দেয়া হয়েছিল । গ্রুপ পর্বের পর সরাসরি সেমিফাইনাল খেলা হয়েছিল চারটি গ্রুপের  গ্রুপ চ্যাম্পিয়নদের নিয়ে ।

১৯৩০ সালের ১৩ই জুলাই প্রথম বিশ্বকাপ ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় । একই সময়ে দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় তখন । যেখানে একটি ম্যাচে ফ্রান্স মেক্সিকোকে ৪-১ গোলে হারায় ও অপর ম্যাচে ইউনাইটেড স্টেট্‌স বেলজিয়ামকে ৩-০ গোলে হারায়।

চারটি গ্রুপের চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল  যথাক্রমে আর্জেন্টিনা , ইয়ুগোস্লাভিয়া , উরুগুয়ে ও ইউনাইটেড স্টেট্‌স ।

সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা ইউনাইটেড স্টেট্‌স-এর মুখোমুখি হয় । ২৬ জুলাই ,১৯৩০ এ যেই ম্যাচটিতে আর্জেন্টিনা ৬-১ গোলে জয় লাভ করে ।

অপর সেমিফাইনালে উরুগুয়ে ইয়ুগোস্লাভিয়ার মুখোমুখি হয়েছিল । ২৭ জুল্য,১৯৩০- এ যেই ম্যাচটিতে উরুগুয়ে ৬-১ গোলে হয় লাভ করে ফাইনালে চলে যায়।

১৯৩০ সালের ৩০ জুলাই এস্তাদিও সেন্তেনারিও  -তে উরুগুয়ে বনাম আর্জেন্টিনা ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়েছিল। যেই ম্যাচে উরুগুয়ে ৪-২ গোলে জয় লাভ করে প্রথম বিশ্বকাপের  বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এর মুকুট  কেড়ে নেয়।

উরুগুয়ের পাব্লো দুরাডো ম্যাচ শুরুর ১২ মিনিটেই উরুগুয়েকে লিড এনে দিলেও তাঁর ঠিক আট মিনিট পর কার্লোস পিয়েসেল্লি আর্জেন্টিনাকে সমতা এনে দেয়। হাফ টাইমের ঠিক আগেই পুরো টুর্নামেন্টের টপ গোল স্কোরার গুইলার্মো  ইস্টাবিল আর্জেন্টিনাকে লিড এনে দেয়। উরুগুয়ের  ক্যাপ্টেন হোসে ন্যাসাজ্জি  ঐ গোলেকে অফসাইড বলে রেফারী  এর সাথে তর্ক করেন। কিন্তু রেফারি এরপরেও এটিকে গোল দেয় ।

এরপর শুরু হয় দ্বিতীয় হাফ। দ্বিতীয় হাফ ছিল শুধুই উরুগুয়েময়। পেদ্র সিয়া সোলো রান করে গোল করে সমতায় আনে উরুগুয়ে কে ম্যাচের ৫৭ মিনিটে। এরপর ম্যাচের ৬৭ মিনিটে সান্তস ইরিয়ার্তে   উরুগুয়েকে ৩-২ এর লিড এনে দেয়। সব শেষ গোলটি আসে হেক্টর কাস্ত্রো এর হেডার থেকে ম্যাচের একদম শেষ সময়ে যা তাদের জয় সুনিশ্চিত করে ।