বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ ক্রোয়েশিয়া

বিশ্বকাপ স্কোয়াড এনালাইসিসঃ ক্রোয়েশিয়া



১৯৯৮ এ ডেভর সুকারের ক্রোয়েশিয়া বিশ্বকাপে ৩য় হয়েছিলো। সেটা ছিলো ক্রোয়েশিয়ার গোল্ডেন জেনারেশন , এটাই তাদের সর্বোচ্চ অবস্থান।

এবারো তারা বিশ্বকাপে আরেক কথিত গোল্ডেন জেনারেশন নিয়ে এসেছে। ক্রোয়েশিয়ার মূল একাদশের গড় বয়স ৩০। বর্তমান ফিফা র্যাং কিং এ ১৭তম দল, দলে আছে বেশ কিছু ওয়ার্ল্ড ক্লাস সুপারস্টার। কোয়ালিটি এক্সপেরিয়েন্স দুটোই আছে। 

তবে গোল্ডেন জেনারেশনের পার্ফরমেন্স তাদের হয়ে কথা বলে না। কোয়ালিফিকেশনে আইসল্যান্ডের পেছনে পড়ে দ্বিতীয় হয়ে তাদের প্লে অফ খেলতে হয়। ১০ ম্যাচে ১৫ গোল, এই বিশ্বকাপে কোয়ালিফাই করা দলগুলোর মধ্যে কোয়ালিফাইংএ সবচেয়ে কম গোল টালি। ডাগআউটেও স্থিতিশীলতা নেই। স্যাক করা হলো কোচ আনতে ক্যাসিচকে। নিয়োগ পেলেন জ্লাতকো দালিচ । এক ম্যাচ হাতে রেখেই কোয়ালিফাই করালেন দলকে। সাথে গ্রীকদের ৪-১ গোলে হারানো তো আছেই। 

কে কে আছেন দলে? 
গোল্কিপারঃ ড্যানিয়েল সুবাসিচ( মোনাকো), লভ্রে কালিনিচ(গেন্ট) ডমিনিক লিভাকোভিচ( ডায়নামো জাগ্রেব)


ডিফেন্ডারঃ ভেদ্রান করলুকা( লোকোমোটিভ) ডোমাগোয় ভিদা(বেসিকতাস), ইভান স্ট্রিনিচ( এসি মিলান), দেজান লভ্রেন(লিভারপুল), সিমে ভ্রসাল্কো(অ্যাতলেটিকো), জোসিপ পিভারিচ ডায়নামো কিয়েভ), টিন ইয়েদভাজ( লেভারকুসেন), দুয়ে ক্যালেটা-কার ( রেডবুল সালজবার্গ)

মিডফিল্ডারঃ লুকা মদ্রিচ( রিয়াল মাদ্রিদ), ইভান রাকিতিচ( বার্সেলোনা), মাতেও কোভাচিচ( রিয়াল মাদ্রিদ), মিলান বাদেলজ(ফিওরেন্তিনা) , মারসেলো ব্রজোভিচ( ইন্টার মিলান), ফিলিপ ব্রাদারিচ( রিয়েকা)

ফরোয়ার্ডঃ মারিও মানজুকিচ( ইয়ুভেন্তাস) ,ইভান পেরিসিচ( ইন্টার মিলান), নিকোলা কালিনিচ (এসি মিলান), আন্দ্রেই ক্রামারিচ(হফেনহাইম) ,মারকো পিয়াচা(ইয়ুভেন্তাস), আনতে রেবিচ (ফ্রাঙ্কফুর্ট)

টিম ফর্মেশনঃ

গোলকিপারঃ

 

গোল্কিপিং পজিশনে সুবাসিচ থাকবেন। এই এক্সপেরিয়েন্সড কিপারের এটাই শেষ বিশ্বকাপ সম্ভবত। তার রিপ্লেসমেন্ট কালিনিচ গেন্তের হয়ে যথেষ্ট ইম্প্রুভ করেছেন। তার কিছু নয়ারের মতো এবিলিটি দেখা যায়, যার মধ্যে একটা হচ্ছে বল নিয়ে মুভমেন্ট, যেটা ক্রোয়েশিয়া এর কীপারদের মধ্যে দুর্লভ। আর দলের ভবিষ্যৎ কীপার লিভাকোভিচ আছেন থার্ড চয়েজে।

সেন্টার ব্যাকঃ


ডিফেন্সের অবস্থা অসন্তোষজনক। ক্রোয়েশিয়া অনেকদিন ধরেই ডিফেন্সিভলি স্ট্রং সেন্টার ব্যাক পাচ্ছেনা। এটার সমাধান হতে পারেন ক্যালেটা-কার আর টিন ইয়েদভাজ। কিন্তু তা এখন নয়। ইয়েদভাজ, ক্যালেটা-কার ট্যালেন্টেড হলেও দলে সুযোগ পাবেন না বয়সের কারণে । পূর্বে করলুকা এক্সপেরিয়েন্সের কারণে সুযোগ পেলেও ইঞ্জুরি আর ফিটনেসের অভাবে এবার হয়তো দলে থাকবেননা। ক্লাব লেভেলে আপ টু দ্যা মার্ক পারফর্ম না দেখিয়েও দলে সুযোগ পাচ্ছেন লভ্রেন, লিভাপুল বনাম রোমার চ্যাম্পিয়ন্স লীগ ম্যাচ টা তো ভুলতেই চাইবেন। ডিফেন্সে একমাত্র নির্ভরযোগ্য ডিফেন্ডার হচ্ছেন ভিদা যিনি এই বিশ্বকাপেও থাকবেন। লভ্রেনের বিগ ম্যাচে খারাপ পার্ফর্মেন্সের সুযোগ নিয়ে ইয়েদভাজ বিশ্বকাপের মতো বড় স্টেজে নিজেকে চেনাতে পারেন। 

ফুলব্যাকঃ


লেফট ব্যাকের থেকে রাইটব্যাক স্ট্রং । ভ্রসালকো এটাক মাইন্ডেড প্লেয়ার, ক্রোয়েশিয়ার উইং এটাক এই ফুলব্যাক থেকেই আসে। লেফটব্যাকে স্টার্ট করবেন স্ট্রিনিচ, খুবই আন্ডারেটেড একটা লেফটব্যাক। টিন ইয়েদভাজ দুই ব্যাকেই খেলতে পারেন এবং ভ্রসালকোর পজিশনে সুযোগ পেতে পারেন। লেফটব্যাকে স্ট্রিনিচের ব্যাকআপ পিভারিচ।

মিডফিল্ডঃ


ক্রোয়েশিয়ার মূল শক্তি মিডফিল্ডে। বিশেষ করে মদ্রিচ আর রাকিতিচ ।সেরা দুই ক্লাবের মিডফিল্ড এরা সামলান। কিন্তু তাদের এবিলিটির সঠিক সম্মেল কোন কোচই করতে পারছেন না।
ক্যাসিচের ক্রোয়েশিয়াতে মদ্রিচকে কিছুটা ডিপ লাইং রোল দেওয়া হতো, যেটা রিয়ালে সে করেন আর রাকিতিচ কিংবা কোভাচিচ কিংবা ব্রজোভিচ যাকেই এডভান্সড মিডফিল্ড রোল দেওয়া হতো, কাউকে দিয়েই সেই কিলার পাস পাওয়া যেতো না। মদ্রিচ এর রোলটাও লিমিট হয়ে যেতো, কারণ রিয়ালে তাকে বল ডিস্ট্রিবিউশন করার জন্য ক্রুজ আছেন, কিন্তু ক্রোয়েশিয়ায় তিনি একা । এটাক হতো মূলত উইং দিয়ে । ক্রোয়েশিয়ার এতো স্ট্রং মিডফিল্ড কাজেই লাগতো না। 

দালিচ এসে প্রথমেই মদ্রিচকে এডভান্সড মিডফিল্ড পজিশনটা দেন। এটা সত্য মদ্রিচের থেকেও সেই কিলার পাস আশা করা ঠিক না, কিন্তু তার ড্রিবল আর মুভমেন্ট মিডফিল্ড থেকে এটাক টা বজায় রাখে। দালিচ চাচ্ছেন এই ত্রয়ী দিয়ে মিডফিল্ড ডমিনেট করে প্রতিপক্ষের মিডফিল্ডারদের ওয়াইডে পুশ করা। এই ট্যাক্টিক্স কাজেও দিয়েছে কোয়ালিফাইং এবং প্লেঅফে। কিন্তু বড় দলের বিপক্ষে মিডফিল্ড ডমিনেন্স ধরে রাখা যাচ্ছে না। 



কারণ এই সিস্টেমে একজন জাত ডেস্ট্রয়ার লাগবে, ফিওরেন্তিনার বাদেলজ হোল্ডিং মিডফিল্ডার যার কিছু ডেস্ট্রয়ার এবিলিটি আছে। তাই দালিচ তাকে দলে রেখে সুবিধা পাচ্ছেন, কিন্তু সে লং টাইম সলিউশন নন। তার সাথে রাকিতিচকেও ডিপ্লয় করা হচ্ছে রাকিতিচকে, যার দায়িত্ব হচ্ছে মার্কিং আর পাসিং। কিন্তু সেও যখন প্লেমেকিং করতে সামনে চলে যায়, তখন ডিফেন্স এক্সপোজ হয়ে পড়ে । ৪-৩-৩ ফর্মেশনে এই ত্রয়ী ভালো কাজে দিতে পারে। কিন্তু দালিচ বারবার ৪-২-৩-১ খেলিয়ে যাচ্ছেন।

ক্লাব লেভেলে রাকিতিচ আর কোভাচিচ ভালোই ইম্প্রুভ করেছেন। রাকিতিচের আছে তিকি-তাকার সাথে ম্যাচ করা পার্ফেক্ট পাসিং এবিলিটি। বাকি মিডফিল্ডার অর্থাৎ ব্রজোভিচ কোভাচিচ প্লেমেকিং রোল ভালোই প্লে করতে পারেন। বিশেষ করে কোভাচিচ, যিনি মদ্রিচের মতোই অ্যাবিলিটি রাখেন এবং ৪-৩-৩ এ ক্রিয়েটর রোলে পার্ফেক্ট। রিয়ালে যথেষ্ট ইম্প্রুভ করেছে। কিন্তু একটা জাত ডেস্ট্রয়ার এর অভাব ক্রোয়েশিয়া কে ভোগাবে । যেটা আরেক হোল্ডিং মিড ব্রাদারিচকেও দিয়েও পূরণ সম্ভব নয়। দালিচ চাচ্ছেন মিডফিল্ড ডমিনেশন, তাদের হাই প্রেসিং করে বল উইন করে পেরিসিচ, ক্র্যামারিচ দিয়ে দ্রুত কাউন্টার এটাক লঞ্চ করা, এই প্লান কাজে লাগলে ক্রোয়েশিয়ার মিডফিল্ড এই বিশ্বকাপের সবচেয়ে বিপদজনক মিডফিল্ড প্রমাণিত হবে। 
 

এট্যাকঃ

 

 পেরিসিচ-ক্রামারিচ-মান্দজুকিচ এই ফরোয়ার্ড লাইনাপ দেখা যাবে এই ওয়ার্ল্ডকাপে। পেরিসিচ লেফট উইং থেকে একটা এটাকিং থ্রেট। ক্রসিং অথবা স্কোর করে ডিফেন্স ওপেন আপ করে দেন। ক্রামারিচ আর কালিনিচ দলের সবচেয়ে পরিশ্রমী দুই ফুটবলার । ক্রামারিচ বর্তমানের বুন্দেসলীগার সবচেয়ে বিপদজনক স্ট্রাইকার। হাইট কম হলেও পেস আর বিটুইন দ্যা লাইনে স্পেস খুঁজে নিয়ে স্কোর করতে পারেন। আর কালিনিচ একটা টারগেট ম্যান, তার এরিয়াল এবিলিটির জন্য । মান্দজুকিচকে ইঞ্জুরির সাথে অনেক লড়াই করতে হয়েছে। কিন্তু সে এখনো দলের নির্ভরযোগ্য টার্গেট ম্যান। কোয়ালিফাইং এ সবচেয়ে বেশি গোল তিনিই করেছেন। মান্দজুকিচ লেফট আর পেরিসিচ রাইট থেকে স্টার্ট করতে পারেন। এটাকে থাকবেন ক্রামারিচ। যদিও পজিশন ধরে লাভ নেই,কারণ তাদের মধ্যে পজিশন ইন্টারচেঞ্জ হবেই। 

তাহলে লাইনাপ দাঁড়াচ্ছে ৪-২-৩-১/৪-৩-৩ ; সুবাসিচ- ভ্রসাল্কো-ভিদা-লভ্রেন/করলুকা-স্ট্রিনিচ-বাদেলজ- রাকিতিচ-মদ্রিচ-পেরিসিচ-মান্দজুকিচ-ক্রামারিচ



লাইনাপ দেখেই বুঝা যায় ক্রোয়েশিয়া বাস্তবে তিন স্ট্রাইকার সামনে নিয়ে খেলছে । এই উইঙ্গারের অভাব ক্রোয়েশিয়ার একটা প্রবলেম। দুই উইঙ্গার রেবিচ আর পিয়াচাকে সুযোগ দেওয়া হচ্ছেনা, কারণটা তাদের অল্পবয়স এর থেকে বেশি পেরিসিচ আর ক্রামারিচের ক্লাব লেভেলের পার্ফর্মেন্স এর জন্য। পিয়াচার আছে ডেভাস্টেটিং ডিব্লিং স্পিড আর রেবিচ উইঙ্গার হিসেবে ডাইরেক্ট এবং অ্যাগ্রেসিভ এপ্রোচ ফলো করেন সরাসরি ডিবক্সে ঢুকে ফরোয়ার্ড প্লেতে অংশ নেন , একটু বেশিই এগ্রেসিভ। এত অল্পবয়সে বিগম্যাচএর প্রেশার নেওয়ার এবিলিটি তাদের অনিশ্চিত।

পেরিসিচ আসলে উইঙ্গার হলেও সে ক্রসিং এর থেকে ফিনিশিংএ বেশি মনোযোগ দেন, যার কারণে তার এবার ইন্টারের হয়ে এসিস্টের থেকে গোল বেশি। দুই উইঙ্গারই যখন বল নিয়ে ডিবক্সে কাটইন করে ঢুকে যাবে, ক্রস করার দায়িত্ব তখন পড়বে ফুলব্যাকদের কাধে। এতে করে কাউন্টার এটাকে ক্রোয়েশিয়াকে ভালোই সমস্যা হবে, যেহেতু ভ্রসাল্কো আর স্ট্রিনিচ দুইজনেই এটাক মাইন্ডেড ফুলব্যাক। এই কারণে নাইজেরিয়ার মতো কাউন্টার এটাক দলের সাথে দুর্বলতা প্রকাশ পাবে। আর ডেস্ট্রয়ার সমস্যা তো আছেই। নাইজেরিয়ার সাথে ম্যাচটা খুব গুরুত্বপূর্ন হবে, এই ম্যাচের দ্বারাই বোঝা যাবে বাকি টুর্নামেন্ট কেমন যাবে। 

 


খেলার বাইরের রাজনীতিঃ

 

সমর্থকদের প্রশ্নবিদ্ধ আচরণ(যেমন খেলার মাঠে ফ্লেয়ার ছুড়ে দেওয়া) এই মাঠের বাইরের বিষয়গুলো বারবার সাফল্যের সামনে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু নিজেদের দিনে যেকোনো দলকেই হারিয়ে দিতে পারে, এই সব সমস্যা নিয়েই ক্যাসিচের ক্রোয়েশিয়া ইউরো ২০১৬ তে স্পেনকে হারিয়ে দিয়েছিলো। তাই আশা তারা করতেই পারে।

নতুন আর্টিক্যাল পাবলিশড হওয়া মাত্রই পড়তে চান?

আজই সাবস্ক্রিপশন করে নিন